এইচএসসি (বিএমটি) ভোকেশনাল - ফিন্যান্সিয়াল কাস্টমার সার্ভিসেস-১ - NCTB BOOK

রহিমা একজন উদ্যমী নারী। তিনি তার ও তার পরিবারের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার জন্য হাঁস-মুরগীর খামার, মৎস্য চাষ ও বাড়ির আঙ্গিনায় কৃষি কাজ করে থাকেন। কিন্তু তিনি উক্ত খাতগুলোর আয়-ব্যয় হিসাব আলাদাভাবে রাখার জন্য তার ঘরের আলমারিতে তিনটি আলাদা কৌটা সংরক্ষণ করেন। এই কৌটাসমূহে খামারের ব্যয় নির্বাহের জন্য খাত অনুযায়ী টাকা জমা রাখেন। সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যয় সংশ্লিষ্ট কৌটা থেকে বহন করেন। এভাবে তার আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই টাকা চুরি, ডাকাতি ও অর্থের অপব্যবহারের সমস্যায় পড়েন। এজন্য তিনি গ্রামের শিক্ষিত ব্যাংকার যুবক জুনায়েদের স্বরণাপন্ন হন। জুনায়েদ তাকে ব্যাংকের বিভিন্ন প্রকার হিসাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে হিসাব সম্পর্কে বলেন, আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ব্যাংকে অর্থ জমা ও উত্তোলনের সুযোগ প্রদান করা হয়। এ উপ-অধ্যায়ে আমরা ব্যাংক হিসাবের ধারণা, ব্যাংক হিসাবের শ্রেণিবিভাগ, ব্যাংক হিসাবের গুরুত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারব।

Content added By

ব্যাংক জনসাধারণের কাছ থেকে আমানত হিসেবে অর্থ সংগ্রহ করে এবং জনগণের প্রয়োজনেই তা ঋণ হিসেবে প্রদান করে। কিন্তু অসংখ্য গ্রাহকদের অর্থ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং তারল্য বজায় রেখে ঋণ প্রদান করা অত্যন্ত ড. এ.আর. খান-এর মতে, “ব্যাংকের নিজস্ব নথিপত্রে যে প্রতীক বা ঠিকানার মাধ্যমে প্রতিটি মক্কেলের জমা জটিল ব্যাপার। এজন্য ব্যাংককে প্রতিটি গ্রাহকের নামে আলাদা হিসাব সংরক্ষণ করতে হয়, যা ব্যাংক হিসাব নামে পরিচিত। সাধারণ অর্থে, আমানতকারীর নামে ব্যাংকে যে হিসাব খোলা হয় তাকে ব্যাংক হিসাব বলে।

 ব্যাপক অর্থে, আমানতকারীদের আমানতি অর্থের নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং তাদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য অর্থাৎ তাদের হিসাবে অর্থ জমা ও আমানতি অর্থ থেকে উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার জন্য ব্যাংক আমানতকারীদের জন্য যে পৃথক হিসাব খুলে থাকে তাকে ব্যাংক হিসাব বলে ।

ও উত্তোলনের ব্যবহার দেখানো হয় তাকে ব্যাংক হিসাব বলা হয়।” সুতরাং, উপরিউক্ত আলোচনায় ব্যাংক হিসাব বলতে আমানতকারীর নামে রক্ষিত হিসাবকেই বোঝায়। এর মাধ্যমে আমানতকারীর জমাকৃত অর্থ গ্রহণ এবং উত্তোলনের সুযোগ দিয়ে থাকে। গ্রাহক ও ব্যাংক উভয়ের সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের হিসাব খুলে থাকে। এগুলো হলো চলতি হিসাব, সঞ্চয়ী হিসাব ও স্থায়ী হিসাব। জনগণের আয়, পেশা ও চাহিদা অনুযায়ী তারা এই তিন প্রকারের যেকোনো হিসাব খুলতে পারে।

ব্যাংকিং সেবা নেওয়ার প্রবেশদ্বার কোনটি?

ব্যাংক হিসাব হলো ব্যাংকিং সেবা নেওয়ার প্রবেশদ্বার।এটি গ্রাহকের সাথে সম্পর্ক রক্ষা ও আর্থিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম। ব্যাংকে হিসাব না খুলে কোনো ব্যাংকিং সেবা পাওয়া যায় না। তাই বলা যায়, ব্যাংক হিসাব হলো গ্রাহকের ব্যাংকিং সেবা নেওয়ার প্রবেশদ্বার।

Content added By

সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনগণের বিভিন্নমুখী চাহিদা পূরণের জন্য ব্যাংক বিভিন্ন প্রকার হিসাব খোলার সুবিধা প্রদান করে। সকল শ্রেণির জনগণের ব্যাংকিং চাহিদা একরকম হয় না। ফলে একজাতীয় হিসাবের মাধ্যমে জনগণের সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। এজন্য ব্যাংকিং চাহিদার প্রতি দৃষ্টি রেখে ব্যাংক হিসাবকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। নিছে তা ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো-

ক. চলতি হিসাব (Current account) :

যে হিসাবের মাধ্যমে আমানতকারীকে চাহিবামাত্র অর্থ পরিশোধ করা হয় তাকে চলতি হিসাব বলে। অর্থাৎ যে হিসাবের মাধ্যমে ব্যাংক চলাকালীন সময়ে ইচ্ছামতো অর্থ উত্তোলন বা জমা রাখা যায় সেটি চলতি হিসাব। কমপক্ষে ৫০০ টাকা জমা দিয়ে এ হিসাব খুলতে হয়। চলতি হিসাবে কোনো প্রকার সুদ প্রদান করা হয় না। চলতি হিসাবের আমানতকারীগণ ব্যাংক থেকে জমাতিরিক্ত ঋণের সুবিধা পেয়ে থাকে। এ ধরনের হিসাব সাধারণত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, বড় বড় কারবারী প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ খুলে থাকেন। চলতি হিসাবের দু'টি ধরন আছে। যথা-

১. সাধারণ চলতি হিসাব (General current account): এ হিসাবে ব্যাংকিং সময়ে যতবার ইচ্ছা টাকা জমা দেওয়া এবং তোলা যায়। ব্যাংক এ ধরনের আমানতের ওপর কোনো প্রকার সুদ দেয় না।

২. বিশেষ চলতি হিসাব (Special current account): এ ধরনের চলতি হিসাবে বেশি পরিমাণ অলস অর্থ জমা থাকে এবং এ জমা করা অর্থ স্বল্পকালীন আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এর বিপরীতে ব্যাংক অল্প সুদ দিয়ে থাকে।

খ. সঞ্চয়ী হিসাব (Savings account) : সাধারণত নির্দিষ্ট এবং স্থির আয়ের লোকজন সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে যে হিসাব খোলে তাকে সঞ্চয়ী হিসাব বলা হয়। ব্যাংকিং সময়ে যতবার খুশি এ হিসাবে অর্থ জমা করা যায় কিন্তু কিছু বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে টাকা উত্তোলন করতে হয়। তবে বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকগুলো সপ্তাহে দু'বারের বেশি অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয়। এরূপ হিসাব নিম্নোক্ত বিভিন্ন ধরনের হতে পারে—

১. গৃহ সঞ্চয়ী হিসাব (Home savings) : ব্যাংক যে হিসাবের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করে থাকে তাকে গৃহ সঞ্চয়ী হিসাব বলে। এ হিসাবের জন্য ব্যাংক স্বপ্ন হারে সুদ দিয়ে থাকে।

২. স্কুল সঞ্চয়ী হিসাব (School savings accounts): যে হিসাবের মাধ্যমে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করা হয় তাকে স্কুল সঞ্চয়ী হিসাব বলা হয়।

৩. মহিলা সঞ্চয়ী হিসাব (Female savings accounts): যে হিসাবের মাধ্যমে সমাজের মহিলাদের মধ্যে সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করা হয়ে থাকে তাকে মহিলা সঞ্চয়ী হিসাব বলে ।

৪. শ্রমিক সঞ্চয়ী হিসাব ( Laboure savings accounts): যে হিসাবের মাধ্যমে শিল্প এলাকার শ্রমিকদের মধ্যে সঞ্চয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করা হয় তাকে শ্রমিক সঞ্চয়ী হিসাব বলা হয়। শ্রমিকগণ তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় এ হিসাবের মাধ্যমে ব্যাংকে জমা রাখে।

গ. স্থায়ী হিসাব (Fixed account): যে হিসাবে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ বা সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে টাকা জমা দেওয়া হয় তাকে স্থায়ী হিসাব বলে। এই হিসাবের উপর উচ্চহারে সুদ দেওয়া হয়। এ হিসাবে আমানতকারী প্রয়োজনে তার আমানতের বিপরীতে ৮০% পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। তবে ঋণের উপর ব্যাংক কর্তৃক ধার্যকৃত হারে সুদ দিতে হয়। এটি অধিক লাভে নিরাপদ বিনিয়োগ । যাদের অলস অর্থ হাতে থাকে তাদের জন্য এ হিসাব লাভজনক। স্থায়ী হিসাব দু'ধরনের হয়ে থাকে। যথা-,

১. সাধারণ স্থায়ী হিসাব (General fixed account) : যে স্থায়ী হিসারের মাধ্যমে কমপক্ষে ৩ (তিন) মাস এবং সর্বোচ্চ ১০ (দশ) বছর বা ততোধিক সময়ের জন্য টাকা জমা রাখা হয় তাকে সাধারণ স্থায়ী হিসাব বলে।

২. বিশেষ মেয়াদি স্থায়ী হিসাব (Special fixed account) : যে স্থায়ী হিসাবের জমাকৃত অর্থ ব্যাংক আমানতকারীকে ৭ (সাত) দিনের নোটিশ অন্তে পরিশোধ্য এবং নির্দিষ্ট হারে ব্যাংক সুদ প্রদান করে তাকে বিশেষ মেয়াদি স্থায়ী হিসাব বলে।

ঘ. বিশেষ হিসাব (Special account) :

১. বিমা সঞ্চয়ী হিসাব (Insurance saving account) : এই হিসাবে সঞ্চয়ী হিসাবের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়াও আমানতকারী স্বল্প ব্যয়ে জীবন বিমার অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে। 

২. পেনশন জামানতি হিসাব (Pension account) : প্রতিমাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরে এককালীন অথবা পেনশনের মতো কিস্তিতে চক্রবৃদ্ধি হারে মুনাফাসহ মোট পাওনা শর্তে যে হিসাব খোলা হয় তাকে পেনশন জামানতি হিসাব বলে । যেমন : ডিপাজিট পেনশন স্কীম (DPS)।

৩. পৌনঃপুনিক হিসাব (Recurring account): যে হিসাবের মাধ্যমে আমানতকারী নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে বারবার অর্থ জমা দিতে পারে এবং মেয়াদ শেষে এককালীন টাকা উত্তোলন করতে পারে তাকে পৌনঃপুনিক হিসাব বলে ।

৪. ঋণ আমানাত হিসাব ( Loan account) : ঋণ প্রদানের সময় ব্যাংক যে হিসাবে মঞ্জুরকৃত ঋণের অর্থ ঋণগ্রহীতার নামে ক্রেডিট করে তাকে ঋণ আমানত হিসাব বলে।

৫. বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব (Foreign currency account): যে হিসাবের মাধ্যমে বিদেশে কর্মরত ব্যক্তিদের অর্জিত টাকা দেশে অবস্থিত কোনো ব্যাংকে জমা রাখা হয় তাকে বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব বলা হয়। উপরিউক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যে, জনগণের ব্যাংকিং চাহিদার প্রতি দৃষ্টি রেখে ব্যাংক বিভিন্ন প্রকার হিসাব খোলার সুবিধা প্রদান করে। ব্যাংকের কাজই হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে জনগণকে নিরাপদে সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করা। 

জনগণের কর্মকান্ড বহুমুখী হওয়ার সাথে সাথে ব্যাংকের হিসাবও বহুমুখী হচ্ছে। আর ব্যাংকের হিসাব বহুমুখী হওয়ার সাথে সাথে ব্যাংকের সংখ্যা এবং মুনাফা উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

▪️জেনে রাখো

সঞ্চয়ী হিসাব ও স্থায়ী হিসাবের মধ্যে পার্থক্য :

সঞ্চয়ী হিসাবস্থায়ী হিসাব
যে হিসাবের মাধ্যমে ব্যাংকিং সময়ে একাধিকবার টাকা জমা রাখা যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম | মেনে অর্থ উত্তোলন করতে হয় তাকে সঞ্চয়ী হিসাব বলে।যে হিসাবের টাকা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংকে জমা রাখা হয় এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে সাধারণত টাকা উত্তোলন করা যায় না তাকে স্থায়ী হিসাব বলে।
সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আবেদনপত্র পূরণের মাধ্যমে হিসাব খুলতে হয়।এ হিসাবের ক্ষেত্রে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ পূরণ করে আমানতকারী হিসাব খুলতে পারে।
এ হিসাব খুলতে গ্রাহককে তৃতীয় পক্ষের পরিচিতিকরণের প্রয়োজন পড়ে।স্থায়ী হিসাবের ক্ষেত্রে পরিচিতিকরণের প্রয়োজন হয় না।
স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের লোকের জন্য এ হিসাব উপযোগী।যাদের হাতে অলস অর্থ জমা থাকে তাদের জন্য এ হিসাব উপযোগী।
মক্কেলদের চেক ও পাস বই দেওয়া হয়।মক্কেলদের স্থায়ী আমানত রসিদ দেওয়া হয়।
অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মানতে হয়মেয়াদপূর্তির আগে সাধারণত টাকা তোলা যায় না ।

▪️নাবালক কি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারে ?

কিছু বিশেষ শর্ত অনুসরণ করে নাবালক ব্যাংক হিসাব খুলতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংক নাবালকের স্বাক্ষর গ্রহণ ছাড়াও তার জন্ম তারিখ ও প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার তারিখ নমুনা স্বাক্ষরের কার্ডের ওপর লিখে রাখে। গ্রাহক প্রাপ্ত বয়স্ক হলে ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

Content added || updated By

ব্যাংক হিসাব হলো আমানতকারী ও ব্যাংকের মধ্যে যোগাযোগ এবং লেনদেনের মাধ্যম। ব্যাংকে মূলত তিন ধরনের হিসাব বিদ্যমান। যথা :

ক. চলতি হিসাব (Current Account );

খ. সঞ্চয়ী হিসাব (Savings Account) এবং

গ. স্থায়ী হিসাব (Fixed Account )

এই তিন প্রকারের হিসাবের মধ্যে কোন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য কোন ধরনের হিসাব প্রযোজ্য নিচে তা আলোচনা করা হলো-

ক. চলতি হিসাব (Current account) : ব্যাংক চলাকালীন সময়ে আমানতকারী যে হিসাবের মাধ্যমে দিনে যতবার ইচ্ছা টাকা জমা এবং যতবার ইচ্ছা টাকা উঠিয়ে নেওয়ার সুযোগ লাভ করে তাকে চলতি হিসাব বলে। হিসাব জগতে সব প্রকার হিসাবের মধ্যে চলতি হিসাবের গুরুত্ব ব্যবসায়ীদের নিকট অতি জনপ্রিয়। কারণ এ হিসাবধারীগণ নিচের সুবিধাসমূহ পেয়ে থাকেন—

১. যতবার ইচ্ছা ততবার জমা ও উত্তোলনের সুবিধা পেয়ে থাকেন।

২. সুদ নয় বরং লেনদেনের সুবিধা প্রদান করাই এর উদ্দেশ্য।

৩. চেক ব্যবহারের মাধ্যমে লেনদেনের সুবিধা ।

৪. অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা।

৫. জমাতিরিক্ত ঋণের সুবিধা।

৬. যেকোনো পরিমাণ টাকা জমা রাখা যায়।

৭. বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী চেক এবং বিল আদায় ও পরিশোধের সুবিধা পাওয়া যায়।

খ. সঞ্চয়ী হিসাব (Savings account) : সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে যে হিসাব খোলা হয় তাকে সঞ্চয়ী হিসাব বলে। সমাজে চাকরিজীবী, স্থির ও স্বল্প আয়ের লোকেরা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে এ হিসাব খুলে থাকে। এ ধরনের হিসাবধারীগণ উক্ত হিসাব থেকে নিচের সুবিধাসমূহ পেয়ে থাকে—

১. ন্যূনতম জমার মাধ্যমে হিসাব খোলা হয়।

২. এ হিসাবের মাধ্যমে গ্রাহক অল্প সঞ্চয়গুলোকে জমা রাখতে পারে।

৩. প্রতিদিন অর্থ জমা দেওয়া যায়।

৪. অর্থ প্রেরণ ও সংগ্রহের সুবিধা।

৫. বেতন ও পেনশন উত্তোলনের সুবিধা।

৬. সুদ প্রাপ্তি।

গ. স্থায়ী হিসাব (Fixed account) : সমাজে এমন কিছু লোক আছে যারা ঝুঁকি গ্রহণ করতে চায় না। আবার বিনিয়োগকৃত টাকার নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। ঐসব লোকদের জন্য স্থায়ী হিসাব উপযোগী। এ হিসাবের বিপরীতে নিচের সুবিধাগুলো পাওয়া যায়—

১. এ হিসাবে ব্যাংক আমানতকারীর আমানতের উপর বিভিন্ন হারে সুদ বা মুনাফা দেয়। 

২. এ হিসাবে মুনাফার পরিমাণ অন্যান্য হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।

৩. এ হিসাবে আমানতের ৮০% পর্যন্ত টাকা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

৪. মেয়াদ শেষ হবার পূর্বে টাকার প্রয়োজনে তা উত্তোলনও করতে পারবে।

৫. যেসব লোকের অলস অর্থ যেমন লটারি জিতার টাকা, পেনশন, সম্পত্তি বিক্রি, বিমা থেকে প্রাপ্ত টাকা পড়ে থাকে তাদের জন্য স্থায়ী হিসাব উপযোগী।

▪️ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকের বিবেচ্য বিষয়সমূহ কী কী ?

১. ব্যাংকের অবস্থান ( Location of bank) : সঠিক ব্যাংক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাংকের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যক্তিক হিসাব হলে নিজের বাসার কাছে। আর ব্যবসায়িক হিসাবের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক কেন্দ্রস্থল বা শিল্প এলাকায় অবস্থিত ব্যাংকের শাখায় হিসাব খোলা উচিত।

২. দক্ষ ব্যাংকিং (Efficient banking) : ব্যাংকের কর্মচারীদের দক্ষতার ওপর ব্যাংকের সেবার মান নির্ভর করে। কর্মীরা দক্ষ হলে দ্রুত সেবা দিতে পারেন। ফলে গ্রাহকরা দ্রুত সেবা পেয়ে সন্তুষ্ট হয়।

৩. সেবা (Services) : গ্রাহকরা সবসময় বেশি সেবা দিতে পারে এমন ব্যাংকই পছন্দ করে। তাই বহুমুখী সেবা দিতে পারে এমন ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য বেশি উপযোগী।

৪. বৈদেশিক বিনিময় (Foreign exchange) : ব্যবসায়ীদের জন্য এমন ব্যাংক নির্বাচন করা উচিত যাদের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের অনুমতি আছে। এতে করে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য করা সহজ হবে।

৫. সুনাম (Goodwill) : হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সুনাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে ব্যাংকের সুনাম বেশি সেটিকে অধিক নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।

৬. অধিক শাখা (More branches) : অনেক শাখা আছে এমন ব্যাংক নির্বাচন করা উচিত। কারণ শাখা বেশি থাকলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে লেনদেন করা সম্ভব।

৭. তালিকাভুক্ত ব্যাংক (Scheduled bank) : তালিকাভুক্ত ব্যাংক অ-তালিকাভুক্ত ব্যাংক থেকে বেশি নিরাপদ। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর তত্ত্বাবধান করে। ফলে জালিয়াতির আশঙ্কা থাকে না।

৮. ঋণ সুবিধা (Loan facility) : ঋণদান নীতি নমনীয় হলে গ্রাহকরা সহজে ঋণ নিতে পারে। তাই ব্যাংক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির ঋণদান নীতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া উচিত ।

৯. সেবার ওপর চার্জ (Charge on service) : প্রতিটি ব্যাংক তাদের সেবার জন্য গ্রাহকদের কাছে অর্থ চার্জ করে। যে ব্যাংকের চার্জ অল্প, সে ব্যাংকে হিসাব খোলা উত্তম।

১০. সুদ (Interest) : ব্যাংক আমানতকারীর জমা করা অর্থের ওপর সুদ দিয়ে থাকে। যে ব্যাংক অধিক সুদ দেয়, সে ব্যাংক গ্রাহকের কাছে বেশি পছন্দনীয়।

১১. ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং সেবা (Electronic banking facility) : বর্তমান যুগে ই-ব্যাংকিং ব্যাংক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অঙ্গ। তাই যেসব ব্যাংক এ সুবিধা বেশি দিয়ে থাকে, গ্রাহকরা তাদেরকে বেশি মূল্যায়ন করে।

জেনে রাখো

সঠিক ব্যাংক হিসাব নির্বাচনে বিবেচ্য বিষয়—

১. লেনদেনের প্রকৃতি (Nature of transaction): একজন গ্রাহককে হিসাব খোলার সময় লেনদেনের প্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে সঠিক হিসাবটি খুলতে হয়। গ্রাহকের প্রতিদিন টাকা জমা রাখা ও উত্তোলনের প্রয়োজন হলে তার জন্য চলতি হিসাব খোলাই উত্তম। আবার গ্রাহক যদি টাকা জমাতে চান, তাহলে তার জন্য সঞ্চয়ী হিসাব খোলাই উত্তম।

২. সুদ বা মুনাফা প্রাপ্তি (Receiving interest and profit) : সুদ বা মুনাফা প্রাপ্তির বিষয়টিও সঠিক ব্যাংক হিসাব নির্বাচনের ওপর নির্ভর করে। ব্যাংকে টাকা জমা রেখে বেশি সুদ বা মুনাফা পেতে চাইলে তাদের জন্য স্থায়ী হিসাবই উত্তম। কেউ যদি ভুল করে স্থায়ী হিসাবের পরিবর্তে চলতি বা সঞ্চয়ী হিসাব খোলে, তবে তিনি এ ধরনের সুদ বা মুনাফা থেকে বঞ্চিত হবেন।

৩. ঋণ সুবিধা (Over-draft loans) : যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে জমাতিরিক্ত ঋণ প্রত্যাশা করে তাহলে তার জন্য চলতি হিসাব খোলা উত্তম। সঞ্চয়ী হিসাবের বিপরীতে ঋণ পাওয়া যায় না। কারণ ব্যাংক শুধু চলতি হিসাবের বিপরীতে জমাতিরিক্ত ঋণ মঞ্জুর করে।

৪. সার্বক্ষণিক ব্যাংকিং সেবা (Continuous banking services): যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক ব্যাংকিং সেবা প্রয়োজন তাদের জন্য চলতি হিসাবই উত্তম। কারণ এ হিসাবের বিপরীতে ব্যাংক চেক, ড্রাফট, বিল বা হুন্ডির অর্থ সংগ্রহ করে। আবার গ্রাহকের পক্ষে বিভিন্ন বিল পরিশোধ, অর্থ আদায়, প্রত্যয়পত্র ইস্যু ইত্যাদি সেবা দিয়ে থাকে। অন্য কোনো হিসাব থেকে এ ধরনের সুবিধা পাওয়া যায় না।

৫. নিরাপদ সংরক্ষণ (Safe custody) : যারা জমাকৃত অর্থের বেশি নিরাপত্তার প্রত্যাশা করে, তাদের জন্য স্থায়ী হিসাব উত্তম। চলতি বা সঞ্চয়ী হিসাবে অর্থ জমা রাখলে চেক কেটে সহজেই তা উত্তোলন করা যায়। তাই অনেকের পক্ষে উক্ত হিসাবে অর্থের যথাযথ সংরক্ষণ সম্ভব হয় না। অনেক সময় বাড়তি খরচ বা ধার দেওয়ার ফলে অর্থ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে, যারা নিয়মিত লেনদেনে অভ্যস্ত তাদের জন্য সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাব খোলাই উত্তম হবে।

Content added By

ব্যাংক হিসাব খোলার পর তা পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ব্যাংকের সাথে গ্রাহকের লেনদেন, যোগাযোগ এবং সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সাধারণত টাকা জমা ও তোলার মাধ্যমে হিসাব পরিচালনা করা হয়। নিচে ব্যাংক হিসাব পরিচালনার নিয়ম বর্ণনা করা হলো-

১. ব্যাংকে টাকা জমা রাখার নিয়ম (Rules of depositing money in bank account): হিসাব খেলার পর ব্যাংক গ্রাহককে একটি জমার রসিদ বই বিনামূল্যে সরবরাহ করে। আমানতকারী ব্যাংকের সরবরাহ করা জমা রসিদের মাধ্যমে ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন। টাকা জমা দেওয়ার রসিদে আমানতকারীর নাম, তারিখ, হিসাব নম্বর এবং টাকার পরিমাণ উল্লেখ করতে হয়। জমাকারী এ রসিদে নিজের নাম স্বাক্ষর করে ব্যাংক কর্মকর্তার কাছে জমা দেন। ব্যাংক কর্মকর্তা টাকা সংগ্রহ করে এ রসিদে স্বাক্ষর করে এর একটি অংশ জমাকারীকে ফেরত দেন। অন্য অংশ ব্যাংক রেখে দেয়। এভাবে জমা রাখা টাকা আমানতকারীর হিসাবে ক্রেডিট করা হয়।

চিত্র : টাকা জমা দেওয়ার রসিদের নমুনা

২. ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পদ্ধতি (Procedure of withdrawing money from bank): ব্যাংকে হিসাব খোলার পর চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে ব্যাংক আমানতকারীকে চেক বই সরবরাহ করে। আমানতকারী চেক বই থেকে একটি পাতা পূরণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী তার হিসাবে জমাকৃত টাকা তুলতে পারেন। চেকের পাতায় তারিখ, টাকার পরিমাণ ( অঙ্ক ও কথায়) লিখতে হয়। তারপর নির্দিষ্ট স্থানে স্বাক্ষর (আমানতকারীর) করে ব্যাংক কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পর চেকে কোনো রকম ভুল-ত্রুটি না পেলে অর্থ পরিশোধে বাধ্য থাকে। তুলে নেওয়া টাকা আমানতকারীর হিসাবে ডেবিট করা হয়।

চিত্র : একটি চেকের পাতার নমুনা
Content added || updated By

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও দিন দিন বেড়েই চলছে। ফলে একজন গ্রাহক ব্যাংকে হিসাব খোলার মাধ্যমে যেমন আর্থিক সুবিধা পায়, তেমনি ব্যাংক আমানতকারীর অর্থ বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংক হিসাবের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো—

গ্রাহকের জন্য (For clients )

• আমানতকারীর অর্থ ও মূল্যবান দ্রব্যাদি নিরাপদে সংরক্ষণ করা ব্যাংক হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য । 

• ব্যবসায়ীগণ ব্যাংকে হিসাব খোলার মাধ্যমে চেক, ড্রাফট, বিল বাট্টাকরণ ইত্যাদির মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে আর্থিক লেনদেন সম্পাদন করতে পারে।

• চলতি ও স্থায়ী হিসাবের গ্রাহকদের ব্যাংক ঋণ সুবিধা প্রদান করে ।

• ব্যাংক হিসাব খোলার মাধ্যমে গ্রাহক দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে নিরাপদে অর্থ স্থানান্তর করতে পারে।

• গ্রাহক ব্যাংকের আধুনিকায়নের নীতি যেমন : ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, অনলাইন ব্যাংকিং সেবাসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা ভোগ করতে পারে।

• নগদ অর্থ হাতে থাকলে তা খরচ করার সম্ভাবনা থাকে। ব্যাংকে হিসাব খুলে অর্থ জমা রাখলে তা গ্রাহককে মিতব্যয়ী হতে সহায়তা করে। 

• সঞ্চয়ী ও স্থায়ী হিসাবের গ্রাহক তার জমাকৃত অর্থের ওপর মুনাফা পেয়ে থাকে, যা গ্রাহককে সঞ্চয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করে। নগদ অর্থ বহন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করায় গ্রাহকের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

ব্যাংকের জন্য (For bank )

• ব্যাংক তার তহবিল গঠনের জন্য বিভিন্ন হিসাবের মাধ্যমে জনগণের সঞ্চিত অর্থ আমানত হিসেবে গ্রহণ করে।

• আমানতকারীর সংগৃহীত অর্থ লাভজনক খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংক মুনাফা অর্জন করে। ব্যাংক ঋণ আমানত সৃষ্টি করে জনগণকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করে।

• গ্রাহককে বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানের বিনিময়ে ব্যাংক সার্ভিস চার্জ আদায় করে।

জাতীয় অর্থনীতির জন্য (For national economy) 

• মূলধন গঠন একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। ব্যাংক জনগণের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সঞ্চয়গুলোকে একত্র করে মূলধন গঠনে সহায়তা করে ।

• সংগৃহীত আমানতকে লাভজনক খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের উৎপাদনের চাকাকে গতিশীল রাখে।

• বৈদেশিক বাণিজ্যও ব্যাংক নির্ভর। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে উন্নতি করতে ব্যাংক হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।

• ব্যাংকে যত বেশি হিসাব খোলা হবে তত বেশি সঞ্চয় বৃদ্ধি পাবে। ফলে সকলের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি হবে। 

পরিশেষে বলা যায়, ব্যাংক হিসাবে দ্বারা আমানতকারীর অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকও উপকৃত হয়। ব্যাংক হিসাব একজন অর্থ উপার্জনকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার জন্য অত্যাবশ্যক ও অপরিহার্য।

ব্যাংক হিসাব কীভাবে সঞ্চয় সৃষ্টিতে সহায়তা করে?

ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থ জমা রাখলে ব্যাংক গ্রাহককে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ দেয়। অপরদিকে, গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তাও দিয়ে থাকে। ফলে গ্রাহক ব্যাংকে অর্থ সঞ্চয় করতে আগ্রহী হয়। তাই বলা যায়, ব্যাংক হিসাব সঞ্চয় সৃষ্টিতে সহায়ক।

জেনে রাখো

ব্যাংকে হিসাব খোলার পদ্ধতি-

ব্যাংক হিসাব হলো আমানতকারীর Identification নম্বর, যার মাধ্যমে টাকা জমা ও উত্তোলন করা হয়। আমানতকারী ও ব্যাংকের মধ্যে যোগাযোগ এবং লেনদেনের মাধ্যমই ব্যাংক হিসাব। ব্যাংক মূলত তিন প্রকার হিসাব খোলার ব্যবস্থা করে থাকে। যথা:

ক. চলতি হিসাব (Current Account); 

খ. সঞ্চয়ী হিসাব (Savings Account) এবং

গ. স্থায়ী হিসাব (Fixed Account)।

উক্ত হিসাবসমূহ খোলার জন্য প্রতিটি ব্যাংকে তিন রঙের আবেদনপত্র বা ফর্ম রয়েছে। ব্যাংকের নির্দেশিত নিয়ম-কানুন মেনে হিসাব খুলতে হয় ।

কীভাবে চলতি হিসাব এবং সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয় (How to open current account ' and savings account ? )

ব্যাংকে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব খোলার পদ্ধতি প্রায় একই ধরনের। শুধু আবেদনপত্রের রং-এর ভিন্নতা ছাড়া কোনো পার্থক্য নেই। তাই এই দুটি বিষয়কে একই সাথে আলোচনা করা হলো-

১. আবেদনপত্র সংগ্রহ (Collection of application form) : চলতি বা সঞ্চয়ী হিসাব খোলার জন্য আগ্রহী ব্যক্তিকে তার পছন্দ মোতাবেক ব্যাংকের শাখায় উপস্থিত হয়ে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে হবে। আবেদনপত্র বন্টনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চলতি বা সঞ্চয়ী হিসাব খোলার নির্ধারিত আবেদনপত্র প্রদান করেন। এর সাথে তিনি দস্তখতের নমুনা কার্ড প্রদান করেন এবং কীভাবে আবেদনপত্র ও দস্তখত কার্ড পূরণ করা হবে তাও বলে দেন।

২. আবেদনপত্র পূরণ (Filling up the application form) : আবেদনপত্রে কয়েকটি অংশ থাকে। ঘষামাজা বা কাটাছেঁড়া আবেদনপত্র গ্রহণযোগ্য নয়। আবেদনপত্রের অংশগুলো সাধারণত নিম্নরূপ তথ্যাদি দ্বারা পূরণ করতে হয়-

i. আবেদনকারীর বিবরণ (Applicant details) : এই অংশ আবেদনকারীর নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, জাতীয়তা, পেশা, বয়স, বর্তমান এবং স্থায়ী ঠিকানা সংক্রান্ত তথ্যাদি দ্বারা পূরণ করতে হয়। বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর এবং টিন (TIN) নম্বর দেওয়া বাধ্যতামূলক। এগুলোর কপিও সংযুক্ত করতে হয়।

ii. পরিচয়দানকারীর বিবরণ (Identifier's details) : আবেদনকারীকে উক্ত ব্যাংকে পূর্ব থেকেই হিসাব রয়েছে এরূপ একজন ব্যক্তি দ্বারা সনাক্ত করার দরকার হয়। এই অংশে সনাক্তকারী ব্যক্তিকে তার নাম, ঠিকানা, স্বাক্ষর এবং তার হিসাব নম্বর উল্লেখ করতে হয়। পরিচয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো আবেদনকারী ব্যক্তি এই লোকই কি না তা নিশ্চিত হওয়া। পরিচয়দানকারী পাওয়া না গেলে ব্যাংকের কর্মকর্তা এ ব্যাপারে সাহায্য করেন।

iii. মনোনীত ব্যক্তি বা নমিনীর পরিচয় (Nominated person's or nominee's identity) : এই অংশে আবেদনকারীকে তার পরিচিত নমিনী ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, বয়স সংক্রান্ত তথ্যাদি সংযুক্ত করতে হয়। আমানতকারীর মৃত্যুর পর এই মনোনীত ব্যক্তি হিসাবের সব টাকা পেয়ে থাকে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো আবেদনপত্রে মনোনীত ব্যক্তির ছবি সংযুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশের সাধারণ ও ইসলামী উভয় ধরনের ব্যাংকের প্রচলন রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই নমিনীর প্রয়োজন রয়েছে ।

iv. স্বাক্ষর (Signature ) : আবেদনপত্রের নির্ধারিত স্থানে আবেদনকারীকে স্বাক্ষর প্রদান করতে হয়। যৌথ নামে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্থানে প্রত্যেককেই স্বাক্ষর দিতে হয়।

v. ছবি (Picture ) : আবেদনপত্রের সাথে আবেদনকারীকে দুই কপি (পাসপোর্ট সাইজ) সত্যায়িত ছবি সংযুক্ত করতে হয়, যা পরিচয়দানকারী সত্যায়িত করে থাকে। 

৩. নমুনা স্বাক্ষর কার্ড পূরণ (Filling up the specimen signature card) : এরপর সতর্কতার সাথে নমুনা স্বাক্ষর কার্ড পূরণ করতে হয়। এই কার্ডের নির্দিষ্ট স্থানে তাকে নিজ নাম তিনবার লিখতে হয় এবং তিনটি স্বাক্ষর দিতে হয়। বর্তমানে ব্যাংক এই কার্ড কম্পিউটারে স্ক্যান করে সংরক্ষণ করে। টাকা উত্তোলনের সময় ব্যাংক কর্মকর্তা গ্রাহকের চেকের স্বাক্ষরের সাথে নমুনা স্বাক্ষর মিললে টাকা প্রদান করে।

৪. প্রয়োজনীয় দলিলপত্রাদি সংযোজন (Attaching necessary documents) : আবেদনকারী ব্যক্তি হলে তার ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও টিন (TIN) নম্বর ইত্যাদির দলিলপত্রাদি আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত করতে হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নামে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে নিচের দলিলপত্রাদি আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত করতে হয়-

ক. একমালিকানা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে (In case of sole proprietorship business ) : হিসাব পরিচালনাকারীর নাম ও স্বাক্ষর, ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয়পত্র ও আয়কর সনাক্তকরণ নম্বর (TIN) অবশ্যই জমা দিতে হবে।

খ. অংশীদারী ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে (In case of partnership business) : অংশীদারী ব্যবসায়ের চুক্তিপত্র, ট্রেড লাইসেন্স, হিসাব পরিচালনাকারী ব্যক্তির নাম ও স্বাক্ষর এবং এ সম্পর্কিত অংশীদারদের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও আয়কর সনাক্তকরণ নম্বর (TIN) অবশ্যই জমা দিতে হবে।

গ. কোম্পানির ক্ষেত্রে (In case of company ) : স্মারকলিপি, পরিমেল নিয়মাবলি, কার্যারম্ভের অনুমতিপত্র, নিবন্ধনপত্র, হিসাব পরিচালনাকারী ব্যক্তির নাম ও স্বাক্ষর এবং কোম্পানির সভায় এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও আয়কর সনাক্তকরণ নম্বর (TIN) অবশ্যই জমা দিতে হবে।

ঘ. সমবায় সমিতির ক্ষেত্রে (In case of co-operative society) : ট্রেড লাইসেন্স, নিবন্ধনপত্র, উপ- বিধি, হিসাব পরিচালনাকারী ব্যক্তির নাম ও স্বাক্ষর এবং সমিতির সভায় এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের কপি, এগুলো অবশ্যই জমা দিতে হবে।

ঙ. স্কুল, কলেজ, ক্লাব সমিতি এবং সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রে (In case of school, college, club and social organisation) : হিসাব পরিচালনাকারী ব্যক্তির নাম ও স্বাক্ষর এবং পরিচালনা কমিটি বা কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের কপি জমা দিতে হবে। উল্লেখ্য যে, ক্লাব বা সামাজিক সংগঠনের বেলায় সঞ্চয়ী হিসাব খোলা গেলেও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের বেলায় সঞ্চয়ী হিসাব খোলা যায় না, চলতি হিসাব খুলতে হয়। তবে ইদানিং ব্যাংকগুলো তাদেরকে Short Notice Deposit (SND) হিসাব খোলার সুযোগ দিয়ে থাকে।

৫. আবেদনপত্র জমাদান (Submission of application form) : এই পর্যায়ে আবেদনকারীকে পূরণকৃত আবেদনপত্র, নমুনা স্বাক্ষর কার্ড এবং প্রয়োজনীয় দলিলসমূহ হিসাব খোলার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তার নিকট জমা দিতে হয়। পূরণকৃত ফরম এবং সংযুক্ত সব তথ্যাদিতে সন্তুষ্ট হলে তিনি একটি হিসাব নম্বর নির্ধারণ করে তা আবেদনপত্র এবং নমুনা স্বাক্ষর কার্ডের নির্দিষ্ট স্থানে লিপিবদ্ধ করেন। অতঃপর ম্যানেজার আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন এবং এর সাথে সাথেই আবেদনকারী হিসাব খোলার অনুমতি প্রাপ্ত হয়।

উল্লেখ্য যে, হিসাব খোলার আগে ব্যাংক আবেদনকারীর সব তথ্য যাচাই করে। একে Know Your Customer (KYC) বলা হয়। এছাড়া ব্যাংক গ্রাহকের Transaction Profile (TP) নিশ্চিত করবে। এটি হচ্ছে ব্যাংক হিসাবে গ্রাহক কর্তৃক ঘোষিত লেনদেনের অনুমিত মাত্রা। প্রতিনিয়ত লেনদেন হওয়া হিসাবগুলোর (সঞ্চয়ী, চলতি, এসএনডি, সিসি, ওডি ইত্যাদি) ক্ষেত্রেই গ্রাহকের কাছ থেকে টিপির ঘোষণা নিতে হয়।

৬. জমার রসিদ সংগ্রহ এবং প্রাথমিক আমানত জমা (Collecting deposit receipt and depositing primary credit): হিসাব খোলার অনুমতি পত্র পাওয়ার পরই আবেদনকারী টাকা জমা দেওয়ার রসিদ সংগ্রহ করে তা পূরণ করে প্রাথমিক জমা তার নামে বরাদ্দকৃত হিসাবে জমা দেয়। প্রাথমিক জমা একেক ব্যাংকে একেক রকম। প্রায় সব ব্যাংকই ন্যূনতম ৫০০ টাকা প্রাথমিক জমা হিসেবে নিয়ে থাকে।

৭. চেক প্রদান (Providing cheque book) : প্রাথমিক আমানত ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর ব্যাংক আমানতকারীকে টাকা উঠানোর সুবিধার জন্য চেক বই এবং টাকা জমা ও উঠানোর হিসাব সংরক্ষণের জন্য পাস বই প্রদান করে থাকে।

অতএব, উপর্যুক্ত প্রক্রিয়ায় চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব খোলার কার্যক্রম সমাপ্ত হয় এবং আমানতকারী ব্যাংকের গ্রাহকে পরিণত হয়।

▪️কীভাবে স্থায়ী হিসাব খোলা যায়? (How to open fixed account?)

যাদের হাতে প্রচুর অর্থ রয়েছে কিন্তু তা ব্যবসায়ে বিনিয়োগে শঙ্কায় থাকে, তাদের জন্য স্থায়ী হিসাব সবচেয়ে উপযোগী। কীভাবে স্থায়ী হিসাব খোলা হয় তার পদ্ধতি নিচে তুলে ধরা হলো-

১. আবেদনপত্র সংগ্রহ (Collection of application form) : স্থায়ী হিসাব খোলার জন্য নির্বাচিত শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে নির্ধারিত আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে হয়।

২. আবেদনপত্র পূরণ (Filling up the application form) : আবেদনের নির্ধারিত স্থানে নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা, পেশা, জাতীয়তা, আমানতের পরিমাণ, কাঙ্খিত মেয়াদ ইত্যাদি তথ্য লিপিবদ্ধ করে স্বাক্ষর দিতে হয়। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আবেদনপত্রের সাথে প্রয়োজনীয় দলিল ও কাগজপত্র জমা দিতে হয়।

৩. আবেদনপত্র জমা (Submission of application form): পূরণকৃত আবেদনপত্র দায়িত্ব-প্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হয়। আবেদনপত্রের সাথে KYC ফরমটিও জমা দিতে হয়।

৪. অনুমতি এবং জমার রসিদ সংগ্রহ (Depositing money and collecting fixed deposit receipt) : দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পূরণকৃত ফরম ও সাথে সংযুক্ত সব তথ্যে সন্তুষ্ট হলে হিসাব খোলার অনুমতি প্রদান করেন। অতঃপর আবেদনপত্রে উল্লিখিত অর্থ গ্রহণের জন্য একটি রসিদ প্রদান করেন।

৫. অর্থ গ্রহণ এবং স্থায়ী জমার রসিদ প্রদান (Receiving money & return the fixed deposit receipt) : এই পর্যায়ে পূরণকৃত টাকা জমার রসিদটি নির্ধারিত অর্থসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গ্রহণ করে রসিদে একটি নম্বর প্রদান করেন। তারপর তা স্থায়ী হিসাব রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করেন। অতঃপর নম্বরযুক্ত স্থায়ী জমা রসিদটি (FDR) আমানতকারীকে হস্তান্তর করেন। এই রসিদে টাকার পরিমাণ, জমার মেয়াদ, সুদের হার, জমাকারীর নাম, ঠিকানা, স্বাক্ষরসহ অন্যান্য নিয়মকানুন লিপিবদ্ধ থাকে। আমানতকারী এ রসিদ মেয়াদ শেষে ব্যাংকে উপস্থাপন করলে ব্যাংক সুদ বা মুনাফাসহ সব অর্থ প্রদান করে ।

Content added By

ব্যাংক হিসাব খোলার মাধ্যমে ব্যাংক ও গ্রাহকের মাঝে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। ব্যাংক হিসাব বন্ধ করার মাধ্যমে এ সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে। গ্রাহক ইচ্ছে করলে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যাংক হিসাব বন্ধ করতে পারে। এজন্য গ্রাহককে অবশ্যই সাদা কাগজে হিসাব বন্ধ করার আবেদন করতে হবে। এ আবেদনপত্রের সাথে তাকে চেক বই ও পাশ বই জমা দিতে হয়। যদিও বর্তমানে অনেক ব্যাংকেই পাশ বই প্রথাটি নেই। ব্যাংক কর্মকর্তাগণ আবেদনপত্র গ্রহন করার পর হিসাবে জমাকৃত টাকা থেকে হিসাব বন্ধের চার্জ বাদ দিয়ে আমানতকারীকে তার প্রাপ্য অবশিষ্ট টাকা চেকের মাধ্যমে প্রদান করে। এর সাথে সাথে কর্মকর্তাগণ কম্পিউটারে রক্ষিত ব্যাংক খতিয়ান হতে আমানতকারীর নাম কেটে দেন এবং হিসাব বন্ধ কার্যক্রম চিহ্নিত করতে আমানতকারীর হিসাবটি বন্ধ হিসাব ফোল্ডারে (Folder) স্থানান্তর করেন। নিচে বর্ণিত কিছু কারণসমূহের জন্য ব্যাংক নিজেই গ্রাহকের হিসাব বন্ধ করে দিতে পারে। যেমন :

• আমানতকারী বা গ্রাহকের মৃত্যু ঘটলে ।

• ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহক প্রতারক হিসেবে প্রমাণিত হলে

• কোনো কারণে গ্রাহকের মস্তিষ্ক বিকৃতির খবর পেলে এবং প্রমাণিত হলে।

• কোনো কারণে গ্রাহক দেউলিয়া ঘোষিত হলে।

• সরকারের বা আদালতের নির্দেশে।

• ব্যাংক গ্রাহকের হিসাব পরিচালনাকে অলাভজনক হিসেবে বিবেচনা করলে।

• ব্যাংকের হিসাব হস্তান্তর করার নোটিশ পেলে।

সুতরাং, উপরের যেকোনো একটি ঘটনার কারণে ব্যাংক হিসাব দন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

Content added By

সঞ্চয়ী হিসাবে সঞ্চিত আমানতের পরিমাণ ব্যাংক সবসময় গোপন রাখে। ফলে আমানতকারী তার জমাকৃত অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে। আদালতের নির্দেশ ছাড়া কোনো ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনকেও দেওয়া যাবে না। তথ্য নিতে হলে আদালতের লিখিত অনুমতি লাগবে। এই আইনটি সুচারুভাবে পালনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অভিযোগ ও অনুসন্ধান তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের হিসাব সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের বিষয়ে ২০০৯ সালের ২৩ জুন জারি করা দুদকের আদেশ মেনে চলতে হবে। দুদকের ঐ আদেশে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে দুদক কর্তৃক সুষ্ঠু অনুসন্ধান এবং মামলা তদন্তের স্বার্থে দুদক আইন ২০০৪-এর ১৯(১)(ঘ) ধারার ক্ষমতাবলে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয়/বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গের ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকার্স বুকস এভিডেন্স অ্যাক্ট (বিবিইএ) ১৮৯১-এর ৫ও ৬(১)ধারা এবং কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৯৮-এর ৯৪(১) ধারা অনুযায়ী আদালতের সুনির্দিষ্ট আদেশ ব্যতীত আমানতকারী/হিসাবধারীর হিসাব সংক্রান্ত তথ্য অন্য কোনো পক্ষকে প্রদানের সুযোগ নেই । তবে আদালত বা থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার কার্যবিধি অনুসারে তদন্ত ও বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন মনে করলে পূর্বঘোষিত সময় ও স্থানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দলিলপত্র নিয়ে হাজির হতে আদেশ দিতে পারেন। এই সংক্রান্ত তথ্য যদি কোনো ব্যাংক বা ব্যাংকারের হেফাজতে থাকে তাহলে দায়রা জজের পূর্বানুমতি নিয়ে দন্ডবিধির সুনির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী অপরাধ তদন্তের জন্য তথ্য দিতে আদেশ দিতে পারে। অন্যান্য ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের লিখিত পূর্বানুমতি লাগবে। ব্যক্তির সম্পদ বা ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের পরিমাণ কার্যত ব্যক্তির একটি গোপনীয় বিষয়। আন্তর্জাতিকভাবেও এক্ষেত্রে যথেষ্ট গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। তবে নিম্নোক্ত কারণে ব্যাংক গ্রাহকের হিসাবের গোপনীয়তা ভঙ্গ করতে পারে—

১. গ্রাহকের নিজস্ব আদেশক্রমে

২. সরকারের বিশেষ আইনের নির্দেশে

৩. দেশের প্রচলিত আইনের প্রয়োজনে ব্যাংক গ্রাহকের হিসাবের গোপনীয়তা প্রকাশ করতে পারে। যেমন :আয়কর আইনের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য।

   উপরের আলোচনার শেষে এটাই প্রতিয়মান হয় যে, ব্যাংকের হিসাবের গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রত্যেক ব্যাংক কর্মচারীর অবশ্যই কর্তব্য।

Content added By

ক. KYC ফর্মের গুরুত্ব ( Importance of KYC form) 

 ব্যাংক হিসাব খোলার সময় আবেদন ফর্মের সাথে যে ফর্ম বাধ্যতামূলকভাবে হিসাবগ্রহীতাকে পূরণ করতে হয় এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে হিসাবগ্রহীতা প্রদত্ত তথ্যের বিষয়ে যাচাই করে স্বাক্ষর দিতে হয় তাকে KYC ফর্ম বলে। KYC-এর পূর্ণরূপ হলো Know Your Customer। অর্থাৎ তোমার গ্রাহককে জানো। মানি লন্ডারিং আইন সব দেশে চালু হওয়ার পর থেকে ভুয়া নামে হিসাব খোলা ও অন্যায় লেনদেন নিয়ন্ত্রণের জন্য হিসাব খোলার সময় এ ধরনের ফর্ম পূরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে হিসাবগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতিমূলক প্রয়োজনীয় তথ্যের সাথে ব্যাংকে যে অর্থ জমা হবে তার উৎস কী, হিসাবগ্রহীতা কোন ধরনের কাজ বা ব্যবসায়ের সাথে জড়িত, গ্রাহকের মোট সম্পত্তির পরিমাণ, কীভাবে হিসাব খোলা হয়েছে, প্রত্যাশিত আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ, হিসাবগ্রহীতার তথ্য বিবেচনায় তার লেনদেনে ঝুঁকির মাত্রা ইত্যাদি বিষয় লেখা হয়। এরূপ ফর্ম পূরণ ব্যাংক কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সতর্কতা, সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা বাড়িয়েছে। এতে ভুয়া নামে হিসাব খোলার প্রবণতা বন্ধ হয়েছে এবং অন্যায় লেনদেন বিশেষ করে সন্ত্রাসী বা জঙ্গী কর্মকান্ডে অর্থায়ন অনেকটা প্রতিরোধ করা গেছে। তাই ব্যাংক হিসাবের ক্ষেত্রে KYC ফর্মের গুরুত্ব অপরিসীম।

চিত্র: গ্রাহক পরিচিতি ফর্ম

গ্রাহক সম্পর্কে সঠিক তথ্য জেনে লেনদেন বা ব্যবসায় পরিচালনা করার ক্ষেত্রে KYC ফর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । নিচে KYC ফর্মের গুরুত্ব তুলে ধরা হলো- 

→ KYC ফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকের সঠিক পরিচয় সনাক্ত করা যায় এবং নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গ্রাহক কোনো রকম অবৈধ ও সন্ত্রাসী কাজের সাথে জড়িত আছে কি না। 

→ গ্রাহক কী উদ্দেশ্যে ব্যাংকে হিসাব খুলতে আগ্রহী এবং তার লেনদেনের প্রকৃতি কেমন হবে ইত্যাদি তথ্য KYC ফর্মের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। গ্রাহক একবারে কী পরিমাণ অর্থ তুলবে এবং জমা দিবে, এসব তথ্য KYC ফর্মের মাধ্যমে সংগ্রহ করায় লেনদেনে সচ্ছতা বজায় থাকে। 

→ ব্যাংক KYC ফর্মের মাধ্যমে গ্রাহকের হিসাবকে শ্রেণিবিভাগ করে। যেমন: ঝুঁকিপূর্ণ হিসাব, কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসাব। কোনো গ্রাহক অস্বাভাবিক লেনদেন করে কি না, তা KYC ফর্মে দেওয়া তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখতে পারে।

→ অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার মাধ্যমে গ্রাহক KYC ফর্মে উল্লিখিত শর্ত অনুযায়ী লেনদেন করছে কি না, তা জানা যায় এর মাধ্যমে লেনদেনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

তাই বলা যায়, গ্রাহকের সঠিক পরিচয় সনাক্তকরণে KYC ফর্মের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

খ. TP-এর ধারণা (Concept of Transaction Profile)

  প্রতিযোগিতার বাজারে গ্রাহক সেবা ব্যাংকারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। দ্রুততম সময়ে সেবাদান যেকোনো ব্যাংকেরই সেবামান বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু দ্রুততম সেবা মানে ব্যাংকের স্বার্থ বিসর্জন কিংবা গ্রাহকের নিরাপত্তার জলাঞ্জলি নয়। আবার ঠিক একইভাবে কোনো সেবার নিরাপত্তা বলয় যেন এমন না হয় যে, গ্রাহক সেই সেবাটি গ্রহণেই নিরুৎসাহিত হয়। অন্যদিকে, দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং আইনের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো লেনদেন অনুমোদন করা বা সেবা প্রদান করাটাও ব্যাংকের সুনামের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং আইন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অর্থাৎ ব্যাংককে একটি নির্দিষ্ট আইনি ও বিধিবদ্ধ কাঠামোর মধ্যেই তার ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।