এইচএসসি (বিএমটি) ভোকেশনাল - ফিন্যান্সিয়াল কাস্টমার সার্ভিসেস-২ - NCTB BOOK

শাকিরের বড় ভাই মাশরিফ তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে একটি ফাস্টফুডের দোকান দিবেন বলে ঠিক করলেন। কিন্তু সকলে মিলে যে মূলধন জোগাড় হলো দোকান দিতে হলে তার চাইতে আরো ১০ লক্ষ টাকা বেশি প্রয়োজন। জনাব মাশরিফ তাই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। শাকির তার ভাইকে চিন্তিত দেখে জিজ্ঞেস করলে মাশরিফ মূলধনের স্বল্পতার বিষয়টি বললেন। তখন শাকির তার ভাইকে বলল যে, তাদের একাদশ শ্রেণির ফিন্যান্সিয়াল কাস্টমার সার্ভিসেস বিষয়ের একটি ক্লাসে শিক্ষক জনাব ইনতেসার মাহমুদ শিক্ষার্থীদের এ ধরনের একটি গল্প বলেছিলেন এবং কীভাবে মূলধন যোগাড় হয়েছিল সেটিও বলেছিলেন। শাকির তার ভাইকে সেটি বলল এবং আরো বলল যে, ব্যাংক এসব কাজে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতার জন্য সবসময় এগিয়ে আসে। ছোট ভাই থেকে এসব শুনে মাশরিফ তার বন্ধুদের সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে ব্যাংকের সহায়তার বিষয়টি বললেন। অতঃপর মাশরিফ তার বন্ধুদের নিয়ে ব্যাংকে গেলেন এবং ব্যাংক ম্যানেজারের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন। ব্যাংক তাদের কিছু কাগজপত্র (ব্যবসায়ের ধরন, জামানত ইত্যাদি) যাচাই-বাছাই করল। অতঃপর সেই কাগজপত্র জমা রেখে তাদের হিসাবের বিপরীতে ১০ লক্ষ টাকার একটি ঋণ মঞ্জুর করল। মাশরিফ ও তার বন্ধুরা সেই ঋণের টাকা নিয়ে তাদের স্বপ্নের ফাস্টফুডের দোকানটি চমৎকারভাবে পরিচালনা করল। এই ঘটনা থেকে ব্যাংক ঋণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ উপ-অধ্যায়ে আমরা ব্যাংক ঋণের ধারণা, ঋণ বিশ্লেষণ, ব্যাংক ঋণের প্রকারভেদ এবং ব্যাংকের ঋণদান পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারব।

Content added By

ব্যাংক হলো এমন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যার প্রধান কাজ জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের অর্থ সুদের বিনিময়ে ব্যবসায়ীদের প্রদান করা। সুদের বিনিময়ে ব্যাংক প্রদত্ত এই ধারই হলো ব্যাংক ঋণ বা আগাম।

আমরা জানি, আমানতকারীদের আমানতের বিপরীতে ব্যাংক স্বল্প পরিমাণে সুদ প্রদান করে। তাছাড়া ব্যাংক পরিচালনা করার জন্য কর্মচারীদের বেতন প্রদানসহ কিছু খরচ আছে। এই সুদ ও খরচ মেটানোর জন্য ব্যাংকের কিছু উপার্জন করতে হয়। তাই ব্যাংক আমানতের সব অর্থ নগদ বা তারল্য হিসেবে জমা না রেখে এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চড়া সুদে ব্যবসায়ীদের ঋণ হিসেবে প্রদান করে। প্রদত্ত এই ঋণের বিপরীতে ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যাংক অনেক সময় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জামানত হিসাবে গ্রহণ করে থাকে। তবে এই জামানত নেওয়া বা না নেওয়া সম্পূর্ণই নির্ভর করে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক ও বিশ্বস্ততার ওপর। ব্যাংক শুধু নগদ অর্থই ধার দেয় না বরং গ্রাহকের প্রয়োজনে ব্যাংকের সুনাম, বিশ্বাসসহ বিভিন্ন প্রকার দলিলপত্র ঋণ হিসেবে প্রদান করে। এসব ঋণ দেশ-বিদেশে ব্যবসায় করতে গেলে ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থের মতোই কাজ করে ।

অতএব, মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যাংক তার নগদ অর্থ এবং দলিলের মাধ্যমে সুনাম, বিশ্বাস নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উপযুক্ত জামানত নিয়ে বা না নিয়ে গ্রাহককে যে সহযোগিতা করে তাকে ব্যাংক ঋণ বলে । 

 অতএব, মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যাংক তার নগদ অর্থ এবং দলিলের মাধ্যমে সুনাম, বিশ্বাস ও সেবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য উপযুক্ত জামানত নিয়ে বা না নিয়ে গ্রাহককে যে সহযোগিতা করে তাকে ব্যাংক ঋণ বলে ।

Content added By

ব্যাংক অর্থের ব্যবসায়ী। জনসাধারণের আমানতের অর্থ ব্যাংক বিভিন্ন খাতে ঋণ দিয়ে মুনাফা অর্জন করে থাকে। ব্যাংকের মুনাফা ও অস্তিত্ব রক্ষা উভয়ই নির্ভর করে সঠিক ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর। ঋণ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ঋণ বিশ্লেষণ। ঋণের বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের লাভের একটি বড় অংশ আসলেও ঋণদান বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কারণ, ঋণগ্রহীতা দেউলিয়া হয়ে গেলে অথবা কোনো ঋণ খেলাপি বা দেউলিয়া হয়ে গেলে বাণিজ্যিক ব্যাংককে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। তাই ঋণের অর্থ যাতে নির্ধারিত সময়ে সুদসহ ব্যাংকে ফেরত আসে সেজন্য ঋণদানের পূর্বে ঋণের প্রকৃতি বিশ্লেষণ অর্থাৎ, ঋণগ্রহীতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আর্থিক সামর্থ্য, লেনদেনের পূর্ব-ইতিহাস, ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্য প্রভৃতি বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করার প্রক্রিয়াকে ঋণ বিশ্লেষণ বলে।

ঋণের সাথে যেহেতু ঝুঁকি বিদ্যমান, সেহেতু ঋণ মঞ্জুরের সময় অত্যন্ত সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই বলা যায়, ঋণদানের সতর্ক পদক্ষেপই ঋণ বিশ্লেষণ। ঋণ বিশ্লেষণের কাজ নিম্নলিখিত পদক্ষেপ অনুসরণে সম্পাদন করা হয়-

১.তথ্য সংগ্ৰহ পর্যায় (Data collection stage) : ঋণ প্রত্যাশী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঋণের জন্য আবেদন করলে ঋণগ্রহীতা সম্পর্কে ব্যাংক বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। যেমন— ঋণগ্রহীতার চরিত্র, ঋণ গ্রহণের উদ্দেশ্য, ব্যবসায় প্রকল্পের সম্ভাবনা, ঋণের ফেরতযোগ্যতা, ঋণগ্রহীতার আর্থিক সচ্ছলতা, ব্যবসায়িক লেনদেনের অভ্যাস, জামানতের প্রকৃতি ইত্যাদি।

২.তথ্য বিশ্লেষণ পর্যায় (Data analysis stage) : ব্যাংক পর্যায়ে ঋণ আবেদন বা ঋণ প্রত্যাশী সম্পর্কে ইতোমধ্যে সংগৃহীত তথ্যাদি বিচার- বিশ্লেষণ করে দেখে ঋণ মঞ্জুর করা যায় কি না। এক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো যাচাই- বাছাই করে দেখা হয়, সেগুলো হলো—

• আবেদনের যথার্থতা

• আবেদনকারীর সামর্থ্য

• ঋণ ব্যবহারের যোগ্যতা

• ঋণ ফেরতের নিশ্চয়তা

• জামানতের মূল্য ও বিক্রয়যোগ্যতা

৩. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায় (Final decision making stage) : ঋণ আবেদনের প্রেক্ষিতে সংগৃহীত তথ্যাদি বিচার-বিশ্লেষণ শেষে ব্যাংক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় যে, আবেদনটি গ্রহণ করবে নাকি নাকচ করে দিবে। আবেদনপত্রটি গ্রহণ করা হলে ব্যাংক নিজস্ব ঋণ নীতির অধীনে ঋণ পরিশোধে প্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত শর্তসমূহ আরোপ করে। ব্যাংকের দেওয়া শর্তে ঋণগ্রহীতা রাজি থাকলে ব্যাংক তাকে ঋণ সরবরাহ করে থাকে।

অতএব, ঋণের ঝুঁকি ও আয়ের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়াদি চিহ্নিতকরণ, সেগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, সংগৃহীত তথ্য সহজভাবে উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ এবং সর্বোপরি ঋণ প্রদানের সম্ভাব্যতা সম্পর্কিত সুপারিশমালা প্রণয়নকেই ঋণ বিশ্লেষণ বলা হয়।

▪️জেনে রাখো

ঋণ বিশ্লেষণের পদ্ধতিসমূহ

বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত কাজ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ব্যাংক প্রদত্ত ঋণ ফেরত আসা নিশ্চিত করার জন্য ঋণ ও ঋণগ্রহীতা সম্পর্কিত তথ্যের বিচার বিশ্লেষণ করে।

ঋণ বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিগুলো SCs, SRs, CAMPARI, PARSAR ইত্যাদি সংক্ষিপ্তরূপে প্রকাশ করা যায়। নিচের চিত্রে ঋণ বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গিগুলো দেখানো হলো :

চিত্র : ঋণ বিশ্লেষণের উপাদানসমূহ

সাধারণত নিচের পদ্ধতিসমূহের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ বিশ্লেষণ করে—

★ ঋণ নীতি নির্দেশক (Credit Policy Guidelines বা CPG) 

★ ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি (Credit Risk Management Principles বা CRM)

★ ঋণ ঝুঁকি গ্রেড (Credit Risk Grading বা CRG) 

★ পূর্ব সতর্কীকরণ সংকেত (Early Warning Signals বা EWS )

নিচে এদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো-

ঋণ নীতি নির্দেশক (Credit policy guidelines) : এ পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব ঋণদান নির্দেশনা থাকে। এতে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন থাকে। যেমন : বিভিন্ন ঋণের সুবিধা বিশ্লেষণ (ঋণের সর্বোচ্চ আকার, ঋণের সহজলভ্যতা ও জামানতের পরিমাণ ইত্যাদি)। ঋণ নীতি নির্দেশনাসমূহের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে ঋণের প্রকৃতি ও এর গ্রহণযোগ্যতা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়।

ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি (Credit risk management Principles) : ঋণের অর্থ আদায় না হওয়ার আশঙ্কাকে ঋণ ঝুঁকি বলে। ঋণ দেওয়ার আগে ঋণ পর্যালোচনা করতে হয়। পরবর্তী সময়ে সেই পর্যালোচনার আলোকে ঝুঁকি গ্রেডিং করতে হবে। ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি অনুসরণের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো বা ক্ষেত্রবিশেষে ঝুঁকি রোধ করা সম্ভব হয়। CRM বা ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ধাপগুলো হলো— 

১. ঝুঁকি নির্ধারণ (Risk Identification); 

২. ঝুঁকি মূল্যায়ন (Risk Evaluation) 

৩. ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ (Risk Monitoring) | 

১. উক্ত পদ্ধতি অনুযায়ী ঋণের ঝুঁকি নির্ধারণের জন্য নিম্নোক্ত কাঠামোটি অনুসরণ করা হয়— 

২. ঋণের ঝুঁকির ভার পরিমাপের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকির মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়। ঋণের মোট ভার সন্তোষজনক হলে উক্ত ঋণ মঞ্জুর করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আবার ঋণের মোট ভার কম হলে এর সুনির্দিষ্ট কারণও চিহ্নিত করা সম্ভব হয় ।

৩. ঋণের ঝুঁকি পুনঃবিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে ঝুঁকি পুনঃবিশ্লেষণের জন্য ঋণ প্রস্তাব রিলেশনশিপ অফিসারের (RM) কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে Zonal Credit Officer Head of Credit (HOC) & Head of Corporate Banking (HOCB), Managing Director ও Executive Committee / Board এর কাছে পাঠানো হয়। সবার সম্মতিতে ঋণ প্রস্তাব গৃহীত হলে তা আবার প্রতিটি ধাপ হয়ে ঋণ রিলেশনশিপ অফিসারের কাছে ফিরে আসে। উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গকে ঋণ অনুমোদনের কর্তৃপক্ষ বলা হয়।

→ ঋণ ঝুঁকি গ্রেডিং (Credit risk grading) : ঝুঁকি পর্যালোচনার পরপরই ঝুঁকির গ্রেডিং করা হয়। এটি ঋণ বিশ্লেষণে কার্যকরী হাতিয়ার। CRG পদ্ধতি অনুযায়ী ঋণ ঝুঁকি বিশ্লেষণের জন্য ঋণকে সর্বমোট আটটি ঝুঁকি গ্রেডে বিভক্ত করা যায়।

→ ঋণ অনুমোদন (Loan approval) : ঋণ অনুমোদনের জন্য একটি ঋণ ক্রেডিট কমিটি (Credit Committee) থাকে। এই কমিটি যদি আবেদনকারীর ঝুঁকি গ্রেডিং-এ সন্তুষ্ট হয়, তবে ঋণ অনুমোদন দিয়ে থাকে।

→ অভ্যন্তরীণ অডিট (Internal audit) : ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগ থাকে, যাদের কাজ হচ্ছে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত যেসব নীতিমালা হয়েছে তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না তা যাচাই করা। এভাবে ঋণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণের অর্থ আদায়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পায়। তাই অবশ্যই ঋণ অনুমোদনের আগে ঋণ বিশ্লেষণ করতে হয়। এক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করে।

Content added By

জনাব কামাল এবং জনাব রসিদ দু'জনই ব্যবসায়ী। জনাব রসিদ মোট মূলধনের ৮০% ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু জনাব কামালের ব্যবসায় সম্প্রসারণে মূলধন সরবরাহ করতে বেশ সমস্যা হচ্ছে। জনাব রসিদ জনাব কামালকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বলেন। তিনি নিজের উদাহরণ টেনে বলেন, কারখানা স্থাপন, মেশিন বসাতে এক ধরনের ঋণ নিয়েছেন যা অনেকদিন ব্যবহার করতে পারবেন। চলতি মূলধনের জন্যও ঋণ নিয়েছেন, যার জন্য পৃথক ঋণ হিসাব খুলতে হয়েছে। পণ্য জামানত রেখে এ হিসাব থেকে তিনি ঋণ নেন। সময়-সুযোগমতো ঋণ পরিশোধ করেন। আবার, পণ্য রপ্তানিতে ব্যাংক থেকে দলিলের মাধ্যমেও অর্থ সংস্থান করতে পারেন। জনাব কামাল ভাবেন, এতো রকমের ঋণ ব্যাংক দেয়। ব্যাংক একজন গ্রাহককে শর্তসাপেক্ষে যে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে তাকে ব্যাংক ঋণ বলে। এখানে শর্তের বিষয়টি গ্রাহক ও ব্যাংকের সুবিধার কথা বিবেচনা করে নির্ধারিত হয়। ব্যাংক নানা ধরনের ঋণ ব্যবস্থার প্রচলন করে থাকে। সরকারি নীতির সমর্থন, দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ, শিল্পায়ন ও ব্যবসায়িক প্রয়োজন পূরণে ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা প্রদান করে। নিচে একটি ছকের সাহায্যে ব্যাংক ঋণের প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো-

১. প্রকৃতি অনুযায়ী ব্যাংক ঋণ (Bank credit on the basis of nature) :  ব্যাংক তার গ্রাহককে চাহিদা ও ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে যে ঋণ প্রদান করে তাকে প্রকৃতিভিত্তিক ঋণ বলে। এর প্রকারভেদ নিম্নরূপ :

ক. তহবিল থেকে প্রদত্ত ঋণ ( Loans provided from the fund) : আমানতকারীর চেকের মর্যাদা করার লক্ষ্যে ব্যাংক যথাযথ নগদ বা তারল্য সংরক্ষণ করে থাকে। পরবর্তীতে ঋণগ্রহীতার আবেদনের ফলে ব্যাংক তার তহবিল থেকে যে অর্থ সহায়তা করে তাকে তহবিল থেকে প্রদত্ত ঋণ বলে। এ ঋণ গ্রাহককে চলতি হিসাবের বা ঋণ হিসাবের মাধ্যমে দেওয়া হয়। তিনভাবে এই ঋণ দেওয়া হয়—

• ধার ( Borrow) : ব্যাংক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্দিষ্ট সুদের হারে গ্রাহককে অগ্রিম প্রদান করলে তাকে ধার বলে। স্বল্প, মধ্যম বা দীর্ঘ যেকোনো মেয়াদেই এই ঋণ দেওয়া হয়। ঋণের অর্থ নগদে না দিয়ে গ্রাহকের চলতি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। গ্রাহক প্রয়োজনে চেক কেটে ঋণের অর্থ ব্যবহার করে। চলতি হিসাব না থাকলে গ্রাহককে পৃথক ঋণ হিসাব খুলতে হয়। এই ঋণ গ্রহণের জন্য গ্রাহক যতখানি ঋণ নেয় তার সম্পূর্ণটার ওপরই সুদ দিতে হয়। ঋণের অর্থ সুদসহ একসঙ্গে ফেরত দিতে হয় অথবা কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়। জামানতের বিপরীতে এই ঋণ দেওয়া হয়। 

• নগদ ঋণ (Cash loan) : ব্যাংক মূল্যবান জামানত, যেমন: বন্ড বা সিকিউরিটি অথবা ব্যক্তিগত জামানত রেখে যে ঋণ দেয় তাকে নগদ ঋণ বলে। সে সম্পত্তি জামানত হিসেবে ব্যাংকে বন্ধক থাকে। তবে সম্পত্তির ভোগ দখল ঋণগ্রহীতা করে থাকে। কেবল উত্তোলিত অর্থের ওপর গ্রাহক ব্যাংককে সুদ দেয়। ঋণের অর্থ সুদসহ কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়।

• জমাতিরিক্ত ঋণ ( Overdraft) : চলতি হিসাবে জমাকৃত অর্থের অতিরিক্ত যে পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা যায় তাকে জমাতিরিক্ত ঋণ বলে। চলতি হিসাবের গ্রাহকগণ স্বল্প সময়ের জন্য অর্থের প্রয়োজন হলে আমানতি অর্থের চেয়েও অতিরিক্ত অর্থ ঋণ হিসাবে উত্তোলন করার সুযোগ পায়, যা জমাতিরিক্ত ঋণ হিসেবে পরিচিত। ব্যাংক সাধারণত দীর্ঘদিনের পরিচয়, বিশ্বস্ততা ও সুনামের ভিত্তিতে গ্রাহককে এই ঋণ দিয়ে থাকে। ব্যক্তিগত ও অব্যক্তিগত উভয় প্রকার জামানতের বিপরীতে ব্যাংক এই ঋণ মঞ্জুর করে। খুব অল্প সময়ের জন্য গ্রাহকগণ এই ঋণের সুবিধা পেয়ে থাকে। এই ঋণে কেবল উত্তোলিত অর্থের ওপর সুদ দিতে হয়।