On This Page
এইচএসসি (বিএমটি) ভোকেশনাল - হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট-১ - NCTB BOOK

জাভেদ হাসান “ওয়াইজার লি.” এর একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানটিকে সঠিক পন্থায় লক্ষ্যের দিকে পরিচালনা করা তার দায়িত্ব। তিনি মনে করেন যে, দক্ষ লোক ছাড়া লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য তিনি দক্ষতা সম্পন্ন লোকবল সংগ্রহের ওপর জোর দিয়ে থাকেন। তিনি সর্বদা খেয়াল রাখেন যে, কোন বিভাগে কোন ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন লোক প্রয়োজন। তাদেরকে কোথা থেকে সহজে পাওয়া যাবে তা বিবেচনা করে বিজ্ঞাপন দেন। চাকরি করতে আগ্রহীদের মধ্য থেকে প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত মানের লোকদের বাছাই করে কাজে নিয়োগ দেন। তাদের কার কী দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকবে, ক্ষমতা কীরূপ হবে, সুযোগ-সুবিধা কেমন পাবে প্রভৃতি বিষয় তিনি নির্ধারণ করে দেন। নিয়োজিত লোকবলের কার কী ধরনের প্রশিক্ষণ লাগবে তা যাচাই করে প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করেন। যোগ্য কর্মীরা যাতে প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থাকে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও তিনিই নেন।

ওপরের ঘটনায় জাভেদ হাসান যে কাজগুলো করছেন, সেগুলোর সমন্বয় হলো হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা।

Content added || updated By

হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ বলতে কর্মীদের মধ্যে এমন জ্ঞান, দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও অন্যান্য অদৃশ্যমান গুণ বা যোগ্যতা থাকাকে বোঝায়, যার অর্থনৈতিক মূল্য আছে। শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় হিউম্যান রিসোর্সের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য হিউম্যান রিসোর্সই প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে। এ উপাদানটি উৎপাদনের অন্যান্য উপাদানগুলোকে সমন্বিত করে। আর যে ব্যবস্থার মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিয়ন্ত্রণ করা হয় তাকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বলে।

চিত্র: হিউম্যান রিসোর্স

 ব্যবস্থাপকগণ ছয়টি M দ্বারা কার্য সম্পাদন করেন। এগুলো হলো- Man, Mechine, Material Money, Market ও Method। এগুলোর ৫টি উপকরণ পরিচালনার জন্য মানুষের ছোঁয়া অত্যাবশ্যক। আর এ কারণে ব্যবস্থাপনাবিদগণ হিউম্যান রিসোর্সকে ব্যবস্থাপকীয় কার্য সম্পাদনের সর্বপ্রথম উপকরণ বলে গণ্য করেছেন। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা সার্বিক ব্যবস্থাপনার অংশ। কিন্তু একে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনে করা হয়। ব্যবস্থাপনার যে অংশ দ্বারা কর্মী সংক্রান্ত প্রশাসন চালানো হয় তাই হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কর্মীদের যাবতীয় বিষয়াদি নিয়ে কাজ করে। তাই প্রতিষ্ঠানে এর অবস্থান অনেক ওপরে।

▪️জেনে রাখো

হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে ব্যবস্থাপনাবিদগণ বলেন—

Ricky W. Griffin-এর মতে, "Human Resource management is the set of organizational activities directed at attracting, developing and maintaining an effective workforce " অর্থাৎ, হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা হলো পরস্পর সম্পূরক কতকগুলো সাংগঠনিক কার্যাবলি, যা কার্যকর কর্মীদল আকর্ষণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণে পরিচালিত হয়।

• Gary Dessler-এর মতে, "The policies and pactices are needs to carry out people or human resource aspects of a management position, including recruiting, screening, training, rewarding and appraising " অর্থাৎ, হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা হচ্ছে কতগুলো নীতি ও তার প্রয়োগ, যা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ‘মানুষ' বা মানবসম্পদের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে কর্মী নির্বাচন, বাছাই, প্রশিক্ষণ, পুরস্কার এবং মূল্যায়ন।

• David A. Decenzo & P. Robbins-এর মতে, "HRM is made of four actvities (i) Staffing (ii) Training and Development (iii) Motivation and (iv) Mantenance " অর্থাৎ, হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা চারটি কাজের সমন্বয়ে গঠিত : (i) কর্মীসংস্থান (ii) প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন (iii) প্রেষণা দান এবং (iv) সংরক্ষণ ।

ওপরের আলোচনা থেকে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজেমেন্টের কতগুলো বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। এগুলো হলো— 

• হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় 'মানুষ' বা মানবসম্পদই প্রধান আলোচ্য বিষয়; 

• হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়া;

• প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মী বাছাই, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন, প্রেষণা, বেতন, সুযোগ-সুবিধা প্রদান প্রভৃতি কর্মী সংক্রান্ত কাজ হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার অধীনে সম্পাদিত হয়;

• কর্মীশক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জিত হয়;

• প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও হিউম্যান রিসোর্সের মধ্যে এর মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

সুতরাং, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট হলো প্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ হিউম্যান রিসোর্স গঠন এবং তাদেরকে আত্মপ্রণোদিত ও প্রতিশ্রুতিশীল কর্মীবাহিনীতে পরিণত করার একটি ব্যবস্থাপকীয় প্রক্রিয়া।

Content added || updated By

হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট হলো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য দক্ষ কর্মী সংগ্রহ, নির্বাচন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি, পদোন্নতি, প্রেষণা দান প্রভৃতি কার্যক্রমের সমন্বয়। এক সময় মানুষকে শুধুই উৎপাদনের উপকরণ মনে করা হতো। তবে বর্তমানে একে একটি সম্পদ বলে গণ্য করা হয়। নিচে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করা হলো-

→ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি (Increase in productivity) : সংগঠনে শুধু উন্নত প্রযুক্তি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেই উৎপাদনশীলতা বাড়ে না। উৎপাদনের উপকরণকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সংগঠনের কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার কাজই হলো দক্ষ কর্মীবাহিনী গঠন এবং তাদের কাছ থেকে শতভাগ কার্য আদায় করা।

→ সংগঠনের প্রাণশক্তি (Life blood of the organization) : সংগঠনের বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে মানবীয় উপাদানকে বলা হয় সংগঠনের প্রাণশক্তি। তবে সংগঠনে মানবীয় উপাদানগুলো যদি হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদের ভূমিকায় না থাকে তবে তা সংগঠনে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে না। দক্ষ হিউম্যান রিসোর্স হলো সংগঠনের প্রাণ। সংগঠনের অন্যান্য অংশগুলো সঠিকভাবে কার্যকর রাখতে হলে প্রাণশক্তি ঠিক থাকা প্রয়োজন। এটি কেবল হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভব।

→ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা (Continuity of production) : উৎপাদন একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। এর গতি সর্বদাই সচল রাখা জরুরি। এই গতিকে সর্বদা সচল রেখে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিত করতে হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থেকে কাম্য মুনাফা অর্জন করতে হলে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু প্রয়োগ দরকার। আর হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাই পারে প্রতিষ্ঠানের জন্য সঠিক কর্মী নিয়োগ করে তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুগোপযোগী করে তুলতে।

→ লক্ষ্য অর্জন (Achieving goal) : প্রতিষ্ঠানের সব উপকরণ সঠিক থাকলেই লক্ষ্যার্জন সহজ হয় না। এজন্য অন্য সব উপকরণের সাথে মানবসম্পদের সুষ্ঠু সমন্বয় হওয়া জরুরি। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কর্মীদের জন্য সঠিক কার্যনীতি, কর্মপরিবেশ ও অন্যান্য সব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে তাদের মাধ্যমে সংগঠনের লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

→ উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার (Use of modern technology) : প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। এই প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানকে তার উদ্দেশ্য অর্জন করতে হয়। আর হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করে তাদেরকে নিত্য নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করে। এভাবে তাদেরকে নির্বিঘ্নে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে উপযোগী করে তোলে ।

→ উৎপাদন ব্যয় হ্রাস (Reducing the production cost) : প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের গতিকে সচল রেখে কাম্য মুনাফা অর্জন করতে হলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করা খুবই জরুরি। মুনাফার সাথে ব্যয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আর ব্যয় হ্রাস করে মুনাফা সর্বাধিকরণের ক্ষেত্রে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ভূমিকাই বেশি। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের কাজই হলো কর্মীদেরকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে তোলা। আর দক্ষ জনশক্তিই পারে ব্যয় হ্রাস করে মুনাফা বৃদ্ধি করতে।

চিত্র: উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের প্রভাব

→ পণ্যের মান উন্নয়ন (Develop the quality of product) : আধুনিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন বিষয়। এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পণ্যের মান বা উৎকর্ষতা বৃদ্ধি । হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কর্মীদেরকে উন্নতমানের পণ্য উৎপাদনের উপযোগী করে তোলে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান সহজে সফলতা পেতে পারে।

→ পণ্য মূল্য হ্রাস (Reducing the selling price) : ক্রেতা ধরে রাখতে হলে পণ্যের মূল্য কমানো জরুরি। একই মানের পণ্য কেউই অধিকমূল্যে ক্রয়ে আগ্রহী থাকে না। তাই কম মূল্যে ভালো মানের পণ্য সরবরাহের বিষয়টি চিন্তা করতে হয়। এজন্য প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রশিক্ষিত জনশক্তি। কারণ এরাই পারে পণ্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে উৎপাদন ব্যয় ও মূল্য হ্রাস করতে।

→ শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নয়ন (Developing the labour management relationship) : সফলভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পূর্বশর্ত হলো শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্কের উন্নয়ন। উত্তম শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠানের যেকোনো সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখে। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কর্মীদের ন্যায্য মজুরি ও বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।

→ দক্ষ জনবল সৃষ্টি (Creating efficient work force) : প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। দক্ষ কর্মীবাহিনীই পারে প্রতিষ্ঠানের উন্নতির ধারাকে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে। হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী সংগ্রহ, নির্বাচন, নিয়োগ, উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান করে তাদেরকে দক্ষ জনবলে পরিণত করে তোলে।

→ হিউম্যান রিসোর্স পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ( Human resource planning and its implementation) : সংগঠনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুষ্ঠু হিউম্যান রিসোর্স পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন দরকার। সাধারণ ব্যবস্থাপনার যেমন সুষ্ঠু পরিকল্পনা থাকা অত্যাবশ্যক তেমনি হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের জন্যও হিউম্যান রিসোর্স পরিকল্পনা ও তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। আর এটি হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের প্রধান কাজ।

→ কর্মীদের প্রেষণা দান (Employee motivation) : প্রেষণা কর্মীদের সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে । প্রত্যেক কর্মীর ভেতরেই কার্যদক্ষতা থাকে; প্রয়োজন শুধু জাগ্রত করার ব্যবস্থা নেওয়া। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা এক্ষেত্রে কর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট বেতন ও মজুরি কাঠামো নিশ্চিত করে এবং বিভিন্ন আর্থিক ও অনার্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে তাদেরকে প্রেষণা দিতে পারে, যা তাদেরকে শতভাগ কার্যে মনোনিবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

→ কর্মসন্তুষ্টি বৃদ্ধি (Increase job satisfaction) : আদর্শমানের দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন করতে কর্মীদের কর্মসন্তুষ্টির মাত্রা বৃদ্ধি করানো দরকার। কর্মসন্তুষ্টি না থাকলে কাজের মান ভালো হয় না। আর হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কর্মীদের কর্মসন্তুষ্টি বৃদ্ধিতে যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে থাকে।

→ কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি (Incerease morale of the employee) : উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের মান উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনের গতিশীলতা বাড়ানো বা সচল রাখতে কর্মীদের মনোবল বাড়ানো খুবই জরুরি। উচ্চ মনোবল সম্পন্ন কর্মীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব। হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাই পারে কর্মীদের প্রয়োজন পূরণ করে তাদের মনোবল বৃদ্ধি করতে। 

   পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করে উন্নতির শীর্ষে আরোহণ করতে হলে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের বিকল্প নেই। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা শুধু দক্ষ কর্মীবাহিনীই গড়ে তোলে না, বরং তাদেরকে উৎসাহ নিয়ে কাজ করার জন্য প্রেষণা, প্রশিক্ষণ, মনোবল বৃদ্ধি প্রভৃতি বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে।

Content added By

হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের কার্যাবলি (Functions of Human Resource Management )

হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের মানুষদেরকে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্সের পেশাগত দক্ষতার সর্বোচ্চ উন্নয়ন, নিয়োগকর্তা ও কর্মীদের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা এবং হিউম্যান রিসোর্সের যোগ্যতা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে সর্বাত্মকভাবে ব্যবহার করা। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের কাজগুলো হলো-

→ হিউম্যান রিসোর্স পরিকল্পনা প্রণয়ন (Human resource planning) : প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্সকে বর্তমান অবস্থান থেকে ভবিষ্যতের কাঙ্ক্ষিত হিউম্যান রিসোর্সে পরিণত করার করণীয় নির্ধারণকে হিউম্যান রিসোর্স পরিকল্পনা বলে। এজন্য প্রথমে কর্মরত হিউম্যান রিসোর্সের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ, তাদের সংখ্যা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম-বর্ণ প্রভৃতি সম্পর্কে তথ্য নিতে হবে। এরপর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতজন কর্মী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যেতে পারে, অবসরে যেতে পারে তার আগাম ধারণা নিতে হবে। এর আলোকে ভবিষ্যৎ কর্মীর চাহিদা নিরূপণ করতে হবে এবং বর্তমান হিউম্যান রিসোর্সের একটি মজুদ গড়ে তুলতে হবে। এছাড়াও হিউম্যান রিসোর্সের ভবিষ্যৎ সমস্যা সম্পর্কে পূর্বানুমান করে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে কর্মী চাহিদা, নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে।

→ হিউম্যান রিসোর্স সংগ্রহ ও নির্বাচন ( Recruitment and selection of human resource ) : হিউম্যান রিসোর্স সংগ্রহ হলো সম্ভাব্য প্রার্থীদেরকে প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করতে উৎসাহিত করা। আর হিউম্যান রিসোর্স নির্বাচন হলো সংগৃহীত কর্মী তথা আবেদনকারীদের মধ্য হতে কাঙ্ক্ষিত মানের হিউম্যান রিসোর্স খুঁজে বের করা বা বাছাই করা। এজন্য হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে ঠিক করতে হবে যে একজন প্রার্থীর কী ধরনের শারীরিক ও মানবিক গুণাবলি অবশ্যই দরকার, কোন কোন যোগ্যতা ও দৃষ্টিভঙ্গি আকাঙ্ক্ষিত এবং কোন কোন বৈশিষ্ট্য ক্ষতির কারণ। হিউম্যান রিসোর্স সংগ্রহের জন্য প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক যেকোনো উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে। আর  হিউম্যান রিসোর্স নির্বাচনের ক্ষেত্রে কর্মীর ঝোঁক বা প্রবণতা, বুদ্ধিমত্তা, নেতৃত্বের দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা প্রভৃতি বিষয় খেয়াল করতে হবে।

চিত্র: হিউম্যান রিসোর্স সংগ্রহ

 

→প্রেষণা দান (Motivation) : হিউম্যান রিসোর্সের কর্মদক্ষতার পূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজের প্রতি তাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরিকে প্রেষণা বলে। এটি হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মনস্তাত্ত্বিক কাজ। এটি হিউম্যান রিসোর্সকে কাজের প্রতি ইচ্ছা, আগ্রহ, কর্মশক্তি এবং উদ্দীপনা বাড়াতে সহায়তা করে। এতে সবাই সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে সচেষ্ট হয়। এটি আর্থিক বা অনার্থিক দুভাবেই হতে পারে।

→ কর্মী মূল্যায়ন (Employee evaluation) : সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময় পরপর কর্মরত কর্মীদের কর্মদক্ষতা এবং আরও ভালো কাজের সামর্থ্য যাচাইয়ের পদ্ধতিকে কর্মী মূল্যায়ন বলে। এর উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিগত কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজের উন্নয়ন করা। মেধা বাছাই এবং মেধাবীদেরকে দিয়ে উচ্চতর শূন্যপদ পূরণ বা তাদেরকে যথাযথ পদে পদায়ন করাও এর উদ্দেশ্য। এছাড়া কর্মদক্ষতা অনুযায়ী সম্মানী প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও এটি করা হয়।

→ উত্তম শিল্প সম্পর্ক স্থাপন (Establishing good industrial relation) : মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের মধ্যকার সম্পর্ককে শিল্প সম্পর্ক বলে। একে শ্রম ব্যবস্থাপনা বা মানবীয় সম্পর্ক বলা হয়ে থাকে। মালিক, ব্যবস্থাপক, কর্মী, শ্রমিক সংঘ ও সরকারের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক এর আওতাভুক্ত। এর সাথে হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক জোরালোভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে তাকে যে কাজগুলো করতে হয় তা হলো-

• শিল্প আইন মেনে চলা এবং ব্যবস্থাপকদের তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া; 

• স্থানীয়ভাবে দরকষাকষি পরিচালনা করা এবং জাতীয়ভাবে দরকষাকষিতে নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা;

• সম্পাদিত চুক্তিগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করা; 

• চুক্তি যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা এবং চুক্তি যেন সঠিকভাবে পালিত হয় সেজন্য কৌশল প্রণয়ন করা; 

• অনিয়ন্ত্রিত এবং ভুল পরিস্থিতিকে পরিশুদ্ধ করা;

• সমন্বিতভাবে আলাপ-আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কর্মীদের প্রণোদনা বা উৎসাহ প্রদান করা;

• কর্মীবাহিনীর সংখ্যা, ব্যয় দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তথ্য ও পরিসংখ্যান প্রদান করা প্রভৃতি।

→ কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা (Ensuring employee benefits ) : প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের অনুগত রাখা এবং আগ্রহী করে তোলার জন্য তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া ভালো প্রতিষ্ঠানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই সুবিধাগুলোর মধ্যে থাকতে পারে কর্মীদের ঋণ প্রদান এমনকি তাদের ব্যক্তিগত সমস্যায় পরামর্শ প্রদান। এটি হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর অন্তর্ভুক্ত হলো-

• চিকিৎসা ভাতা, অসুস্থতার জন্য ছুটি বাড়ানো এবং রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা;

• বিশেষ বিশেষ দিনে ছুটির প্রচলন করা;

• আঘাতপ্রাপ্ত, অনুপযুক্ত এবং শারীরিকভাবে অক্ষম কর্মীদের পুনর্বাসন করা এবং তাদেরকে অপেক্ষাকৃত সহজ ও হালকা কাজে নিয়োজিত করা;

• বিকলাঙ্গতার পরিসংখ্যান এবং নিবন্ধনপত্র রক্ষণাবেক্ষণ করা;

• খেলাধুলা, সামাজিকতা, শখ এবং প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন কাজের জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া;

• ক্যান্টিনের ব্যবস্থা করা এবং অন্যান্য প্রক্রিয়ায় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা;

• প্রয়োজনের সময় কর্মীদের আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করা;

• তথ্যপুঞ্জি রাখার বিধান করা;

• বিভিন্ন প্রান্তিক সুযোগ-সুবিধা এবং অবসরপূর্ব বিভিন্ন কোর্স পরিচালনা করা;

• স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য বিধান প্রণয়ন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রভৃতি ।

→ কর্মীদের শিক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং উন্নয়ন (Employee education, training and development) : শিক্ষা হলো মনকে উন্নত করা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা অর্জন করা। 

প্রশিক্ষণ হলো কোনো কাজ বা চাকরিতে একজন ব্যক্তির প্রয়োজনীয় দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞান বা দক্ষতার প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন সাধন করা। আর কর্মী উন্নয়ন হলো সক্ষমতা, উপলব্ধি এবং সচেতনতার নিরিখে কোনো ব্যক্তির উন্নয়ন করা। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের এই কাজগুলো করতে হয়।

 

▪️হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য (Objectives and Goal of Human Resource Management)

উদ্দেশ্য হলো সেসব পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য, যা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পূরণ করতে চায়। অনুরূপভাবে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনে একটি যথাযোগ্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা। এ উদ্দেশ্য পূরণে যথোপযুক্ত হিউম্যান রিসোর্স সংগ্রহ, নির্বাচন, সামাজিকীকরণ, বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন, প্রেষণা বা প্রণোদনা দান, সংরক্ষণ প্রভৃতি কার্যের মাধ্যমে হিউম্যান রিসোর্সের সর্বোত্তম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও মুনাফা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়। নিচে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আলোচনা করা হলো-

চিত্র: হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

→ উপযুক্ত কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ (Selection and recruitment of suitable employee ) : প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে সঠিক পদে সঠিক ব্যক্তি নিয়োগের জন্য যথোপযুক্ত কর্মী সংগ্রহ ও বাছাই করা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে শুরুতেই হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা একটি যথার্থ কর্মী নীতি ও নিয়োগ বিধি প্রণয়ন এবং পদ ও দায়িত্বভেদে যাচাই বাছাইয়ের ধরন নির্ধারণ করে থাকে।

→ দক্ষ ও সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা (To build an efficient and disciplined workforce) : প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি দক্ষ ও সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী গঠন করা হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয়, বাজারজাতকরণসহ সব কাজের সাথেই কর্মীবাহিনী সম্পৃক্ত। তাই সুদক্ষ ও সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী গঠন করা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নের প্রধান পূর্বশর্ত। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কর্মী সংগ্রহ, সুযোগ্য কর্মী নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন, প্রেষণা দান এবং ন্যায্য বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি সুদক্ষ ও সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে ।

→ হিউম্যান রিসোর্সের কার্যকর ব্যবহার (Effective use of human resource): যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ। হিউম্যান রিসোর্সের দ্বারাই প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সম্পদগুলো ব্যবহার করতে হয়। তাই হিউম্যান রিসোর্সের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা বিভাগ কর্মীদের কার্য নির্ধারণ, কার্য সম্পাদন মূল্যায়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার ব্যাপারে তৎপর থাকে ।

→ কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি (Increase the efficiency of employee ) : কর্মী দক্ষতার উন্নতি প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের পূর্বশর্ত। কর্মীদের দক্ষতার অভাব থাকলে সব পরিকল্পনা, উদ্যোগই ব্যর্থ হবে। তাই উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রকার উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

→ মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক (Cordial relationship between worker and management) : একটি সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী গঠন করা এবং কর্মী-ব্যবস্থাপক-মালিক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার লক্ষ্যে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা বিভাগ সর্বদা চেষ্টা করে। এটি পরিকল্পনা প্রণয়ন, কার্য নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সমৃদ্ধি লাভের পথ সহজ করে তোলে।

→ কার্যসন্তুষ্টি নিশ্চিতকরণ (Ensuring job satisfaction) : যেকোনো ব্যক্তি কাজ করে উপযুক্ত প্রতিদানের আশায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ প্রতিদান বলতে শুধু পারিশ্রমিককেই বোঝায় না। বরং কাজের স্বীকৃতি দান, ন্যায্য পারিশ্রমিকের পাশাপাশি চিকিৎসা সুবিধা, বিমা, বোনাস, খেলাধুলা ও অন্যান্য চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাকরণ প্রভৃতি সুযোগ- সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কর্মীর কার্যসন্তুষ্টি বিধান করা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানজেমেন্টের অন্যতম উদ্দেশ্য।

চিত্র : কার্যসন্তুষ্টি লাভ

→ কার্য সম্পাদন মূল্যায়ন (Performance appraisal) : হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে যোগ্য কর্মী চিহ্নিতকরণ এবং কর্মীদের যোগ্যতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে কার্যসম্পাদন মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ  কাজটি সম্পাদন করতে হয়। একজন কর্মীর সম্পাদিত কার্যসমূহের মূল্য নির্ণয় করার একটি রীতিবদ্ধ পদ্ধতি হলো কার্যসম্পাদন মূল্যায়ন। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কার্যক্ষেত্রে কর্মীর ভূমিকা মূল্যায়ন করা হয়। 

→ উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান (To pay proper compensation) : ক্ষতিপূরণ হচ্ছে কর্মীদের শ্রমের আর্থিক পুরস্কার। কর্মীরা প্রতিষ্ঠানে যে শ্রম বিনিয়োগ করে তার প্রতিদান হিসেবে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে মজুরি, বেতন, বোনাস ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়।

→ কর্মীদের উন্নত মনোবল প্রতিষ্ঠাকরণ (Build up strong morality of employee ) : দৃঢ় মনোবলই কর্মীদের আন্তরিকভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা যোগায়। তাই হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা উত্তম কার্য পরিবেশ, ন্যায্য মজুরি প্রদান এবং কর্মীদের ব্যক্তিগত ও দলীয় সুখ- স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থাকরণের মাধ্যমে দৃঢ় মনোবল প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করতে সচেষ্ট থাকে।

→ সুষ্ঠু সমন্বয়সাধন (Proper coordination) : প্রতিষ্ঠানের সবপর্যায়ের ব্যক্তি, শাখা, উপবিভাগ ও বিভাগের কাজের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয়সাধন প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যার্জনের জন্য অত্যাবশ্যক। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সুষ্ঠু সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে কাজের গতি বজায় রাখা এবং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি অর্জন। সঠিক সমন্বয়ের অভাবে যেকোনো পরিকল্পনা বা উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বাধ্য ।

→ শ্রম কল্যাণমূলক কার্যক্রম (Labour welfare activities) : বর্তমান সময়ে মজুরিই শ্রমিকদের একমাত্র প্রাপ্য নয়। এখন শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অনেক সচেতন। কর্মীদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা, খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থাকরণ, ক্যান্টিন সুবিধা, বোনাস, ভবিষ্যৎ তহবিল, অবসর ভাতা, সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ দান, স্কুল, কলেজ, উপাসনালয় প্রভৃতির সুব্যবস্থা করাও হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের অন্যতম উদ্দেশ্য। এসব কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কর্মীর কার্যসন্তুষ্টি বৃদ্ধি করে কর্মীর কাজে আত্মনিয়োগে উৎসাহিত করে।

    উপরিউক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও যৌথ দরকষাকষির সুযোগ দান, শ্রম ঘূর্ণায়মানতার হার হ্রাস করে কর্মীদের সংরক্ষণ, পদোন্নতির সুযোগ দান প্রভৃতি ব্যবস্থা গ্রহণ করাও হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এসব উদ্দেশ্য অর্জনে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু কার্যপন্থা গ্রহণ করে থাকে ।

Content added || updated By

হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজেমেন্টের লক্ষ্য হলো হিউম্যান রিসোর্সকে এমনভাবে উন্নয়ন করা যাতে তারা কৌশলগত, নৈতিক ও সামাজিকভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়। এজন্য হিউম্যান রিসোর্স ম্যানজেমেন্টের ওপর যে দায়িত্বসমূহ আসে তা হলো-

• প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করা;

• হিউম্যান রিসোর্সের কার্যকর ব্যবহার এবং সর্বাধিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা;

• মানবীয় গুণাবলিকে মূল্যায়ন করা;

• হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব

• ব্যক্তিক চাহিদা নির্দিষ্ট করা এবং তা পূরণ করা;

• সাংগঠনিক উদ্দেশ্যের সাথে ব্যক্তিক উদ্দেশ্যের মতভেদ দূর করা;

• প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে উচ্চ মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং তা অক্ষুণ্ণ রাখা;

• প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মী প্রদান এবং তাদেরকে ভালোভাবে প্রেষণা প্রদান করা;

• কর্মীদের মধ্যে কার্যসন্তুষ্টি বাড়ানো এবং তা বহাল রাখা; সেবা বা কাজের পরিবেশকে মানসম্পন্ন পর্যায়ে উন্নয়ন এবং তা ধরে রাখা;

• নৈতিক এবং সামাজিকভাবে সমাজের দায়বদ্ধতা তৈরি করা ;

• কর্মীদের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে গড়ে তোলা;

• বর্তমান কাজে আরও ভালো করার জন্য কর্মীদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো;

• ব্যবসায়িক লেনদেনে কর্মীদেরকে আরও বেশি নির্ভুল ও স্বচ্ছভাবে গড়ে তোলা;

• কর্মীদের মধ্যে আন্তঃদলীয় সংহতি, দলগত কাজ এবং দলীয় অনুপ্রেরণা জাগ্রত করা প্রভৃতি ।

তাই বলা যায়, হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ হলো প্রতিষ্ঠানের মূল উপাদান। এর সঠিক পরিচালনার ওপর প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে। এজন্য একজন হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজারকে উপরিউক্ত দায়িত্বসমূহ পালন করতে হয়।

Content added By

প্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ লোকবল বাছাই, তাদের উন্নয়ন, প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে তাদের যোগ্যতার সর্বোচ্চ ব্যবহার ও তাদেরকে প্রতিষ্ঠানে ধরে রাখার কাজকে বলে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট। এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনাকে অনেক বাধা বা হুমকির সম্মুখীন হতে হয়। তাকে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তা হলো—

▪️বিশ্বায়ন ও বিশ্ব প্রতিযোগিতা (Globalization and global competition) : তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবাদে পৃথিবী অনেক সংকুচিত হয়ে এসেছে। বর্তমানে যেকোনো জায়গা থেকেই বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক কাজ পরিচালনা করা যায়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ব প্রতিযোগিতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। এর প্রভাব হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপরও পড়ছে। ব্যবস্থাপনাকে এখন বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যবস্থাপকীয় কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।

▪️প্রযুক্তিগত পরিবর্তন (Technological change) : প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। এর কারণে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার কৌশল ও পদ্ধতিতেও সর্বদা পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন ও প্রয়োগ ব্যবস্থাপকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

▪️কৌশলগত পরিবর্তন (Stratigical change) : হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ পরিচালনার কৌশলও সদা পরিবর্তনশীল। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার প্রচলন ঘটছে। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপককেও পরিচালনাগত কৌশলে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। তবে সবক্ষেত্রে পরিবর্তনকে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয় না। তাই এটিও হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ।

▪️শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রসার (Expansion of education and training) : উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। এসব দেশে যথেষ্ট পরিমাণে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবল রয়েছে। তবে সুশিক্ষিত না হলে তাদেরকে দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। বিষয়টি হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার জন্য খুবই কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে।

▪️রুচি ও চাহিদার পরিবর্তন (Change in choice and demand) : মানুষের চাহিদা ও পছন্দে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। তাই প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্স পরিকল্পনা ও পরিচালনায় নতুনত্ব ও পরিবর্তন আনতে হয়। তবে বাস্তবে এটি বেশ কঠিন ও ব্যয়বহুল। তাই এক্ষেত্রেও হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপককে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

▪️মেধা পাচার (Brain drain) : অনেক পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় করে হিউম্যান রিসোর্স প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত করা হয়। এই প্রশিক্ষিত হিউম্যান রিসোর্সকে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান বেশি সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে নেয়। আবার অনেক মেধাবী কর্মী বিদেশেও চলে যায়। এতে প্রথমোক্ত প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের ক্ষতি হয়। তাই মেধাবীদেরকে ধরে রাখাও হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

▪️আইনগত আনুষ্ঠানিকতা (Legal formality) : হিউম্যান রিসোর্স সংগ্রহ ও নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক আইনি বিধি-বিধান মেনে চলতে হয়। এলাকাভিত্তিক, জাতি-গোত্র ভিত্তিক ও লিঙ্গগত সমতা বজায় রাখতে হয়। এজন্য অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীকেও নেওয়া যায় না। এতে কাঙ্ক্ষিত মানের কর্মীবাহিনী গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবস্থাপনার জন্য এটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

▪️রাজনৈতিক প্রভাব (Political influence) : সরকার কর্তৃক নানা সময়ে প্রণীত নীতি ও বিধান অনুযায়ী বিভিন্ন শিল্পভেদে প্রতিষ্ঠান চালাতে হয়। আকস্মিক আনুষঙ্গিক আইনের পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই হিউম্যান রিসোর্স অনুশীলনের ওপর প্রভাব ফেলে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবেলা করা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়।

▪️শ্রমিক সংঘের চাপ (Pressure of trade union) : ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা অনেক সময় হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজারের ওপর অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এর ফলে সঠিক পন্থায় হিউম্যান রিসোর্স পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অযাচিত চাপ থেকে বেরিয়ে আসা হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

▪️শ্রমিকদের ক্ষমতায়ন (Empowerment of employees) : বর্তমানে সবশ্রেণির লোকই স্বার্থ সচেতন। অপরদিকে, সরকার ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলোও শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক। এর সুবাদে কর্মীরা নিজেদেরকে যথেষ্ট ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী মনে করে। অনেকক্ষেত্রে তারা হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকদেরকে তেমন গুরুত্ব দিতে চায় না। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা ব্যবস্থাপকদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

▪️কর্মশক্তির বৈচিত্র্য (Diversification of manpower) : কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকার ধর্ম-বর্ণের, রুচি- পছন্দের লোক কাজ করে। তাদের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতায়ও ভিন্নতা থাকে। এই বৈচিত্র্যময় হিউম্যান রিসোর্সকে সমন্বয় করে লক্ষ্যের দিকে চালানো সত্যিই খুব কঠিন কাজ। এজন্য ব্যবস্থাপককে সর্বোচ্চ কৌশলী হতে হয় ।

সুতরাং বলা যায়, জগতে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো লোকজন পরিচালনা করা। আর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজারকে এই কঠিন কাজটিই প্রতিনিয়ত করতে হয়। আর এক্ষেত্রে উপরিউক্ত চ্যালেঞ্জসমূহ তাকে মোকাবেলা করতে হয়।

Content added By

লাইন ও স্টাফ ম্যানেজারগণ হলেন পাশাপাশি অবস্থান করা ম্যানেজার। তারা একটি বিশেষ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পরিচালনা করেন। নিচে তাদের সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো-

 ▪️লাইন ম্যানেজার (Line Manager) : লাইন ম্যানেজার হলেন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। লাইন ম্যানেজারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে প্রতিষ্ঠানের পদসমূহকে মর্যাদা ও ক্ষমতার ভিত্তিতে সাজানো হয়। এখানে কর্তৃত্ব রেখা ঊর্ধ্বতন নির্বাহী হতে ধাপে ধাপে বা ক্রমান্বয়ে অধীনস্থ কর্মী পর্যন্ত চলে আসে। সামরিক কর্মকর্তাদের মতো তাদের আদেশ অধীনস্থরা বিনা দ্বিধায় মানতে বাধ্য থাকে। প্রতিষ্ঠানে লাইন ম্যানেজারের দায়িত্ব হলো-

• প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা বিধান করা;

• সর্বোচ্চ দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে কার্য পরিচালনা করা; লাইন ম্যানেজারকে পরামর্শ ও উপদেশ দেওয়া;

• লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক চেষ্টা করা;

• বিশেষায়িত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট স্টাফ ম্যানেজারের পরামর্শ ও সহযোগিতা নেওয়া;

• স্টাফ ম্যানেজারের মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করা; প্রতিষ্ঠান পরিচালনাগত যাবতীয় কাজ তদারকি করা;

• স্টাফ ম্যানেজারের কাছ থেকে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করা প্রভৃতি।

▪️স্টাফ ম্যানেজার (Staff Manager) : লাইন ম্যানেজারকে সহযোগিতা করার জন্য যে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে স্টাফ ম্যানেজার বলে। স্টাফ ম্যানেজারের দায়িত্ব হলো-

• প্রতিষ্ঠানের জটিল ও সূক্ষ্ম কারিগরি (Technical) বিষয়ে লাইন ম্যানেজারকে সর্বাত্মক সহায়তা করা; 

• লাইন ম্যানেজারের কাজের ভার লাঘব করার চেষ্টা করা;

• গবেষণা, পরিকল্পনা, গণসংযোগ, শিল্প সম্পর্ক, কারিগরি কার্যক্রম প্রভৃতি পরিচালনায় সহায়তা করা;

• পরামর্শ ও উপদেশ মানতে লাইন ম্যানেজারকে চাপ না দেওয়া বা বাধ্য না করা ; 

• সর্বোচ্চ মেধা কাজে লাগিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা;

• লাইন ম্যানেজার ও অন্যান্য কর্মীদের বিশেষায়িত জ্ঞানে ও কাজে দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করা প্রভৃতি ।

সুতরাং বলা যায়, লাইন ম্যানেজার হলেন প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী। তার নির্দিষ্ট কোনো কারিগরি ও সূক্ষ্ম কাজে সহায়তার জন্য নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি হলেন স্টাফ ম্যানেজার। এই উভয় শ্রেণির ম্যানেজারই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট থাকলেও এদের দায়িত্বে ভিন্নতা রয়েছে। উপরিউক্ত দায়িত্বসমূহ তাদেরকে পালন করতে হয়।

Content added By

হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা হলো কর্মী ব্যবস্থাপনার উন্নত রূপ। কর্মী ব্যবস্থাপক ও হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের কাজের পরিধি, বিষয়বস্তু ও ধরনে বেশ পার্থক্য রয়েছে। নিচে এদের পার্থক্য বর্ণনা করা হলো-

 কর্মী ব্যবস্থাপকহিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপক
কর্মী সংগ্রহ, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ কাজের সাথে জড়িত নির্বাহীকে কর্মী ব্যবস্থাপক বলে।সঠিক কর্মী সংগ্রহ, তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দান, তাদেরকে সৃজনশীল জ্ঞানসমৃদ্ধ কর্মীতে রূপান্তর এবং প্রেষণা দানের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত নির্বাহীকে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপক বলে।
এর কাজ মূলত লোকবল পরিচালনা করা।কর্মীদের জ্ঞান, দক্ষতা, সামর্থ্য, ঝোঁক, সৃজনশীলতা প্রভৃতি হলো এর কাজের বিষয়বস্তু ।
কর্মী ব্যবস্থাপক কর্মীদেরকে অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবে গণ্য করেহিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপক কর্মীদেরকে পরিপূর্ণ । মানুষ হিসেবে গণ্য করে তাদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়কেই গুরুত্ব দেয়।
কর্মীদেরকে ব্যবস্থাপক ব্যয়কেন্দ্রিক মনে করে। এজন্য তাদের সাথে ব্যয়  নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।এরূপ ব্যবস্থাপক কর্মীদেরকে মুনাফাকেন্দ্রিক হিসেবে বিবেচনা করে। এজন্য তাদের উন্নয়নে পুঁজি  বিনিয়োগ করে সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
কর্মী ব্যবস্থাপক কর্মীদেরকে উৎপাদনের একটি উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন।এরা কর্মীদেরকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেন। তাদেরকে সামাজিক পুঁজি ও মানবমূলধন বলেও গণ্য করেন।
কর্মী ব্যবস্থাপকের কাজের আওতা  অনেক সীমিত।হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের কাজের আওতা অনেক বিস্তৃত।
কর্মীদের উন্নতিকল্পে মধ্যস্থতাকারী (Activity) হিসেবে কাজ করে।হিউম্যান রিসোর্সকে প্রতিশ্রুতিশীল করে গড়ে তোলা ও তাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করে।

তাই বলা যায়, হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা হলো কর্মী ব্যবস্থাপনার আধুনিক রূপ। তাই কর্মী ব্যবস্থাপকের চেয়ে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের কার্য পরিধি অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি, আর্থিক সামর্থ্য ও কার্য পরিধির ভিন্নতার কারণে একেক প্রতিষ্ঠানে একেক ধরনের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

Content added By

হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো কার্য বর্ণনা (Job description), কার্য নির্দিষ্টকরণ (Job Specification) এবং ব্যক্তি নির্দিষ্টকরণের (Person Specification) ফাইল তৈরি করা হয়। নিচে এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

চিত্র: কার্য বর্ণনা

🔳 জব ডেসক্রিপশন (Job description) : জব ডেসক্রিপশন এর বাংলা অর্থ হলো কার্য বর্ণনা। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট পদ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য এতে বর্ণনা করা হয়। কাজের ধরন ও প্রকৃতি, ক্ষেত্র ও অবস্থান, শর্ত ও সুযোগ-সুবিধা, ঝুঁকিগত অবস্থা প্রভৃতি বিষয় এতে উল্লেখ থাকে । একজন হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের Job description-এ নিচের বিষয়গুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকে—

▪️চাকরির ধরন (Employment type ) : এতে চাকরি স্থায়ী (Permanent ) নাকি চুক্তিভিত্তিক (Contractual) কিংবা নৈমিত্তিক (Casual) তা উল্লেখ থাকে। চাকরির প্রকৃতি (Job nature) : চাকরি পূর্ণ সময়ের (Full Time) নাকি খণ্ডকালীন (Part Time); চাকরিতে দাপ্তরিক কাজ (Desk Job) নাকি ফিল্ড পর্যায়ে কাজ (Field Job) করতে হবে তার বর্ণনা থাকে ।

▪️কার্যক্ষেত্র (Job location) : কোথায়, কোন জেলায় কাজ করতে হবে; প্রধান অফিসে (Head Office) নাকি শাখা (Branch) বা আঞ্চলিক (Regional / Zonal) অফিসে; নির্দিষ্ট কার্যক্ষেত্রে গিয়ে ( On site ) নাকি যেকোনো জায়গায় থেকেই ( Off site) কাজ করা যাবে; গ্রাম এলাকায় নাকি শহর এলাকায় এসব বিষয়ে এখানে বর্ণনা দেওয়া থাকে।

▪️ভূমিকা ( Role) : কর্মক্ষেত্রে কি শুধু দলের সদস্য (Team Member) হিসেবে নির্দেশ মেনে চললেই হবে নাকি নেতার (Leadership) ভূমিকা/দায়িত্ব পালন করতে হবে; নেতৃত্ব ও নির্দেশনার মাধ্যমে অন্যদের দিয়ে কাজ করাতে হবে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা থাকে।

▪️কাজের শর্ত (Working conditions) : কার্য ঘণ্টা (Working hour) কত হবে, কাজ কখন কোন শিফট (Shift)-এ করতে হবে তা উল্লেখ থাকে।

▪️ সুযোগ-সুবিধা (Job benifits) : কাজে যোগদান ও সুষ্ঠুরূপে দায়িত্ব পালন করলে কী ধরনের আর্থিক- অনার্থিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে তা উল্লেখ থাকে।

▪️অন্যান্য (Others) : এছাড়াও প্রতিষ্ঠানভেদে আরও অনেক বিষয় যেমন : কাজে ঝুঁকি, বিশেষ নিয়মকানুন (Protocol) প্রভৃতির বর্ণনা থাকতে পারে।

🔳জব স্পেসিফিকেশন (Job specification) : ইংরেজি জব স্পেসিফিকেশন এর বাংলা অর্থ হলো কার্য নির্দিষ্টকরণ। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট পদে দায়িত্ব পালন করতে হলে একজন ব্যক্তিকে কী কী কাজ করতে হবে তা এখানে বর্ণনা করা থাকে। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের জব ডেসক্রিপশনে যে বিষয়গুলো থাকে তা হলো—

■ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করা;

■ হিউম্যান রিসোর্সের কার্যকর ব্যবহার এবং সর্বাধিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা;

■ মানবীয় গুণাবলিকে মূল্যায়ন করা;

■ ব্যক্তিক চাহিদা নির্দিষ্ট এবং তা পূরণ করা; 

■ সাংগঠনিক উদ্দেশ্যের সাথে ব্যক্তিক উদ্দেশ্যের মতভেদ দূর করা ;

▪️প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে উচ্চ মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং তা অক্ষুণ্ণ রাখা;

■ প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কর্মী প্রদান এবং তাদেরকে ভালোভাবে প্রেষণা দান; 

■ কর্মীদের মধ্যে কার্যসন্তুষ্টি বাড়ানো এবং তা বহাল রাখা;

▪️সেবা বা কাজের পরিবেশকে মানসম্পন্ন পর্যায়ে উন্নয়ন এবং তা ধরে রাখা;

■ নৈতিক এবং সামাজিকভাবে সমাজের দায়বদ্ধতা তৈরি করা;

■ কর্মীদের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে গড়ে তোলা;

■ বর্তমান কাজে আরও ভালো করার জন্য কর্মীদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো;

■ ব্যবসায়িক লেনদেনে কর্মীদেরকে আরও বেশি নির্ভুল ও স্বচ্ছভাবে গড়ে তোলা; কর্মীদের মধ্যে আন্তঃদলীয় সংহতি, দলগত কাজ এবং দলীয় অনুপ্রেরণা জাগ্রত করা প্রভৃতি ।

🔳 পার্সন স্পেসিফিকেশন (Person specification) : ইংরেজি পার্সন স্পেসিফিকেশন এর বাংলা অর্থ হলো ব্যক্তি নির্দিষ্টকরণ। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট পদে দায়িত্ব পালনে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে কোন ধরনের এবং কী কী যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে তার বর্ণনা এতে দেওয়া হয়। এতে প্রার্থীর জন্য কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক অবস্থা, অভ্যাস প্রভৃতির উল্লেখ থাকে । হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের পার্সন স্পেসিফিকেশনে যে বিষয়গুলো থাকে তা হলো-

চিত্র: পার্সন স্পেসিফিকেশন

■ শিক্ষাগত যোগ্যতা (Educational qualification) : নির্ধারিত পদের জন্য কোন পর্যায়ের ও কোন ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে তা উল্লেখ থাকে।

■ অভিজ্ঞতা (Experience) : ঘোষণাকৃত পদে কাজের জন্য কেমন অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বা কত বছরের অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ লোক প্রয়োজন তা বলা থাকে ।

■ দক্ষতা (Skill) : বিশেষ কোনো দক্ষতার প্রয়োজন হলে তাও উল্লেখ থাকে।

 ■বয়স (Age): কমপক্ষে বা সর্বোচ্চ কত বছর বয়স হতে হবে তা নির্দিষ্ট করা থাকে ।

■লিঙ্গ (Gender): ঘোষিত পদের জন্য পুরুষদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে নাকি মহিলাদেরকে, নাকি যে কেউ সুযোগ পাবে তা বলা থাকে।

■পেশাগত যোগ্যতা (Professional qualification) : শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি কোনো পেশাগত যোগ্যতারও প্রয়োজন হলে তা উল্লেখ থাকে। যেমন: সিএ (Chartered Accountant) বা (সিসি); কর্মী ব্যবস্থাপনার পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রি প্রভৃতি।

■শারীরিক অবস্থা (Physical condition) : কাজের ধরন অনুযায়ী কর্মীর উচ্চতা, ওজন, দৃষ্টিশক্তি প্রভৃতির ন্যূনতম অবস্থা উল্লেখ থাকে।

■ব্যক্তিক বিষয় (Human attributes) : প্রার্থীর অন্যান্য সাধারণ যোগ্যতার উল্লেখ থাকে। যেমন : ক্ষেত্র অনুযায়ী মিলে চলার যোগ্যতা, কঠোর পরিশ্রমী, সুদর্শন, নম্র ভাষী প্রভৃতি। 

   ওপরে বর্ণিত বিষয়গুলো একজন হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের জন্য প্রযোজ্য। আর একজন হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপক লাইন ব্যবস্থাপকও হতে পারেন। আবার লাইন ব্যবস্থাপকের সহযোগী হিসেবে উল্লিখিত বিষয় সম্বলিত ব্যক্তিকে স্টাফ ম্যানেজার হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। মূলত এগুলোই হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপক এবং লাইন ও স্টাফ ম্যানেজারের Job description, Job specification এবং Person specification এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিষয়।

Content added By

প্রতিষ্ঠানকে সফলতার দিকে ধাবিত করতে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে এমন অনেক বিষয় আছে, যা একে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে সহায়তা বা বাধার সৃষ্টি করে। এগুলো হলো-

(ক) অভ্যন্তরীণ উপাদান (Internal factors) : প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অভ্যন্তরীণ উপাদানসমূহ সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করে । এগুলো হলো—

= প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য (Organizational goals): হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে হিউম্যান রিসোর্সের চাহিদা নির্ধারণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করা সহ নির্বাচন, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ প্রভৃতি পরিচালিত হয়। আর এ কারণেই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অনুযায়ী হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার প্রকৃতি নির্ধারণ করতে হয়।

■ কাৰ্যসমূহ (Tasks): একটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পাদিত হয়। কাজের এরূপ বিভিন্নতার কারণে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা প্রভাবিত হতে পারে। এজন্য প্রতিষ্ঠানের কার্য প্রকৃতি বিবেচনা করে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বর্তমানে জনশক্তিকে সামাজিক পুঁজি বা মানব পুঁজি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এতে শ্রমজীবী জনগণের ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি সামনে চলে আসছে। এজন্য সৃজনশীল ও চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা গঠনের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে চলেছে।

■ সংগঠন কাঠামো (Organizational structure): প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামো এবং সংগঠনের প্রকৃতি হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। এ কাঠামো যত জটিল হবে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে তত বেশি সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা সংগঠন কাঠামোর ভিত্তিতে হয়ে থাকে। এ কাঠামোর ভিত্তিতে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক সময়ে সংগ্রহ ও সঠিক কাজে নিয়োগ করার ওপর হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার সফলতা নির্ভর করে।

চিত্র : সংগঠন কাঠামো

■ কর্মীদের ভিন্নতা (Diversification of employees): কর্মীদের জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বয়স, সম্প্রদায়, মূল্যবোধ প্রভৃতিতে ভিন্নতা থাকে। অর্ধশতাব্দী পূর্বে শ্রম শক্তিতে এত বৈচিত্র্য ছিল না। কিন্তু যোগাযোগ ও প্রযুক্তির সুবাদে বিশ্ব ছোট হয়ে এসব পার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে। মহিলা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরাও বর্তমানে শ্রম বাজারে বিশেষ স্থান দখল করছে। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এগুলোও বিবেচনায় নিতে হয়।

■ অভ্যন্তরীণ চাহিদা (Internal demand): প্রতিষ্ঠানের ভিতরে হিউম্যান রিসোর্সের চাহিদা ও সরবরাহ হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্সের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ধারণ করে চাহিদা অনুযায়ী হিউম্যান রিসোর্স প্রাপ্তির সম্ভাব্য ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে হয়।

■ পুরস্কৃতকরণ পদ্ধতি ( Reward system): কর্মীরা শ্রমের বিনিময়ে যে আর্থিক ও অনার্থিক সুবিধা পেয়ে থাকে তাকে পুরস্কার বলে। বেতন, মজুরি, বোনাস, চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা প্রভৃতি পুরস্কারের অন্তর্ভুক্ত। এটি হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ কাজ। হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে ন্যায্য ও নিরপেক্ষভাবে এবং সমতার ভিত্তিতে এ পুরস্কৃতকরণ কার্যক্রম চালাতে হয়। শ্রমিকদের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিরূপণ, কাজ ও দায়িত্বের প্রকৃতি প্রভৃতি এ পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে।

 ■ হিউম্যান রিসোর্স নীতি (Human resource policy): হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনার হাতিয়ার হিসেবে হিউম্যান রিসোর্স নীতির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এ নীতির কার্যকর প্রয়োগ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। হিউম্যান রিসোর্সের কাম্য ব্যবহারের হিউম্যান রিসোর্স নীতির প্রভাব রয়েছে।

(খ) বাহ্যিক উপাদান (External factors): প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক পরিবেশের অনেক উপাদান হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। এ ধরনের উপাদানগুলো—

■ সরকারি প্রভাব (Government influence): সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। এক সময় সরকারি নিয়ন্ত্রণে দেশীয় শিল্প বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে দেশীয় শিল্প ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। দেশের রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি, ঋণনীতি, শিল্প ও বাণিজ্য নীতি প্রভৃতিতে পরিবর্তন আসায় এগুলোতে সরকারের প্রভাব কমে যাচ্ছে। ফলে শিল্প ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। শিল্পোন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোও এখন ব্যাংক, বিমা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, বিমান পরিবহন, সড়ক পরিবহন প্রভৃতি জনকল্যাণমূলক ও সেবা খাত থেকে রাষ্ট্রীয় খাতকে গুটিয়ে নিচ্ছে এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি আনুকূল্যবিহীন অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখী হয়ে অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াই করতে হচ্ছে। ফলে টিকে থাকতে ও উন্নতির লক্ষ্যে বাড়াতে হচ্ছে দক্ষতা, সেবা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব । CUSTOMER,

■সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান (Social and cultural factors): হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে সাংস্কৃতিক সামাজিক পরিবেশের উপাদানসমূহ যথেষ্টভাবে প্রভাবিত করে। সাধারণত মূল্যবোধ, নৈতিকতা, রীতিনীতি, রুচি, চাহিদা, ধর্মীয় প্রভাব, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রভৃতি মানুষের কর্মস্পৃহাকে প্রভাবিত করে। তাই হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে হিউম্যান রিসোর্সের এসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং রীতিনীতি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

■ আইনগত উপাদান ( Legal factors ) : হিউম্যান রিসোর্স সংক্রান্ত সরকারি বিধি-বিধান ও বিভিন্ন আইন হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। দেশের শ্রম ও শিল্প সম্পর্ক আইন বিশেষ করে শিল্প বিরোধ, ট্রেড ইউনিয়ন, যৌথ দরকষাকষি সংক্রান্ত বিধি-বিধান হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে পূর্ণ সচেতন করে তোলে। এছাড়াও চুক্তি আইন, কোম্পানি আইন, কারখানা আইন, পণ্য বিক্রয় আইন, পরিবহন আইন, অংশীদারি আইন প্রভৃতি।

■ রাজনৈতিক উপাদান (Political factors): রাজনৈতিক পরিবেশের অন্তর্ভুক্ত হলো— দেশের আইন- শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক দলসমূহের অবস্থা, ধর্মঘট, হরতাল, অবরোধ, তালাবদ্ধ প্রভৃতি। এগুলো হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। আর এ কারণেই দেশের রাজনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করেই হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

■ অর্থনৈতিক পরিবেশ (Economic factors): দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পদ্ধতি ও অবস্থা হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার ওপর প্রভাব ফেলে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার প্রভৃতি হিউম্যান রিসোর্স চাহিদা ও সরবরাহকে প্রভাবিত করে। আর এ কারণেই প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সুষ্ঠু পরিচালনায় দেশের আর্থিক অবস্থার পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

■ প্ৰযুক্তিগত উপাদান (Technological factors): বিশ্বায়ন এবং প্রতিষ্ঠানে কারিগরি ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিককালে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবহারের নব দিগন্তের সূচনা করছে। এখন প্রয়োজন হলো যুগের চাহিদা অনুযায়ী হিউম্যান রিসোর্সকে উন্নয়ন করা। আর এ কারণেই আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা কম্পিউটার, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা আজকের হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার জন্য অপরিহার্য। বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এবং প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠানকে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা আবশ্যক।

   উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, বিশ্বায়ন এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রভাব হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপককে ব্যবস্থাপকীয় কাজ পরিচালনা করতে হবে।

Content added By

বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হিসেবে গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু সাংগঠনিক লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে এর অবদান অপরিসীম। আমাদের দেশে হিউম্যান রিসোর্স বিভাগটি একদিকে অবহেলিত, অন্যদিকে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। নিচে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হলো-

→ পৃথক হিউম্যান রিসোর্স বিভাগের অভাব (Lack of separate human resource department) : যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যই হিউম্যান রিসোর্স একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর সুষ্ঠু ব্যবহারের ওপর প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করে। তাই হিউম্যান রিসোর্সের সুষ্ঠু ব্যবহার ও পরিচালনার জন্য আলাদা হিউম্যান রিসোর্স বিভাগ প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো পৃথক বিভাগ নেই। তাই হিউম্যান রিসোর্স পরিচালনায় অদক্ষতা রয়ে যাচ্ছে।

→ দক্ষ হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপকের অভাব (Lack of efficient human resource manager): বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বেশিরভাগেরই পেশাগত দক্ষতা কম। এমনকি অনেকের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতাও নেই। এমতাবস্থায় হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থা বিদ্যমান। এছাড়া দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর হিউম্যান রিসোর্স বা মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর যে শিক্ষা দেওয়া হয় তা আধুনিক উপায়ে হিউম্যান রিসোর্স পরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয়। এর ফলে দক্ষ হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপক গড়ে ওঠছে না এবং প্রতিষ্ঠানে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

→ প্রেষণার অভাব (Lack of motivation ) : কর্মীদের কাজে উৎসাহিত করার জন্য প্রেষণা প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি। প্রেষণা প্রতিষ্ঠানের সকলকে কাজে উৎসাহিত করে এবং কার্য সন্তুষ্টি বাড়ায়। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের প্রেষণা দানের ভালো ব্যবস্থা নেই। ফলে কর্মীদেরকে দিয়ে সুষ্ঠুভাবে কাজ করানো যায় না। এটি হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার জন্য বড় সমস্যা।

চিত্র : প্রেষণার অভাব

→ প্রতিকূল কার্য পরিবেশ (Unfavorable work environment) : বাংলাদেশের অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানেই কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অপরিচ্ছন্ন কার্য বিন্যাস, যন্ত্র বিন্যাস প্রভৃতিতে সমস্যা রয়েছে। এর ফলে কর্মীরা মনোযোগের সাথে কাজ করতে পারে না। এটি হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমস্যা।

→ উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অভাব (Lack of proper training center): বাংলাদেশে হিউম্যান রিসোর্স বা ব্যবস্থাপকদের সুষ্ঠুভাবে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। এর ফলে নির্বাহী থেকে শুরু করে শ্রমিক পর্যন্ত সবাইকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় না। তাই দেশে যথেষ্ট পরিমাণে দক্ষ হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপক ও পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী গড়ে ওঠেনি।

→ শ্রমিক অসন্তোষ (Labour unrest): বাংলাদেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মধ্যে কোথাও কোথাও অশুভ শক্তির প্রভাব রয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ নিজেদের স্বার্থ অর্জনের জন্য শ্রমিকদের প্ররোচিত করে। এছাড়াও মালিকপক্ষের সাথে বিরোধ, সুযোগ-সুবিধাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন, শ্রমিকদের প্রতি অন্যায় আচরণ ও খারাপ শিল্প সম্পর্কের কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানে সবসময় শ্রমিক অসন্তোষ লেগেই থাকে। ফলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়।

→ সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব (Lack of proper policy): বাংলাদেশে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব রয়েছে। নীতিমালা হলো কতিপয় নির্দেশিকা যাতে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত থাকে। এ দিকনির্দেশনা থাকলে প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্সকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সহজ হয়। ফলে কার্য সম্পাদনে সৃষ্ট সমস্যা দ্রুত সমাধান করা যায় ।

→ জবাবদিহিতার অভাব (Lack of accountability): বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানেই কার্যে ব্যর্থতার জন্য কঠোর জবাবদিহিতা নেই । ফলে ব্যবস্থাপক ও কর্মী উভয়ের মধ্যে কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়। এটি হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য একটি সমস্যা।

→ শাসনের মনোভাব ( Rulling attitude): বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকগণ কর্মীদের প্রতি সহনশীল মনোভাব পোষণ না করে শাসনের মনোভাব পোষণ করেন। অর্থাৎ, কর্মীদেরকে সবসময় তারা শাসন করতে চান। এতে কর্মীদের মধ্যে বিরূপ স্বীকারোক্তি। মনোভাব সৃষ্টি হয়। ফলে, হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় ।

চিত্র পরস্পরকে দোষারোপ

→ দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি (Corruption and nepotism): বাংলাদেশে কর্মী নির্বাচন, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, বদলি প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনেক সময়ই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দেখা যায়। কর্মী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে সুষ্ঠু হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

→ প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা মূল্যায়ন (Evaluation of training effectiveness) : আমাদের দেশে বৃহদায়তন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মাঝে মাঝে নির্বাহী ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। তবে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে বাংলাদেশের হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থায় তেমন উন্নতি হচ্ছে না।

চিত্র: প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা

→ বিশেষায়ণের অভাব (Lack of specialization): হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার কার্যাবলি দক্ষতার সাথে সম্পাদনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারদর্শিদের নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব হচ্ছে না। অদক্ষ ব্যবস্থাপকগণও এ কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। ফলে বিশেষায়ণের অভাবে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

→ আধুনিক কৌশল ও পদ্ধতি প্রয়োগে অনীহা (Apathy in application of modern technology and system): উন্নত দেশগুলোতে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞানসম্মত কলাকৌশল প্রয়োগ করে ব্যবস্থাপনায় উন্নতির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ ধরনের উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার কার্যাবলিতে আধুনিকতার তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না।

সুতরাং, হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে সুষ্ঠু ও স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত করতে হলে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। হিউম্যান রিসোর্সই হলো প্রতিষ্ঠানের চালিকাশক্তি। তাই তাদেরকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না।

🔳 বাংলাদেশে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জসমূহ (Challanges of Human Resource Management in Bangladesh)

বর্তমানে বিশ্বায়নের সুবাদে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং পরিবহনের মাধ্যমে আন্তঃদেশীয় অর্থনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিগত দূরত্ব ঘুচিয়ে কাছাকাছি চলে আসছে। এ পর্যায়ে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে যথাযথভাবে খাপ খাওয়ানোর জন্য উপযোগী জ্ঞান, দক্ষতা, ভিন্ন সংস্কৃতির কর্মী ও হিউম্যান রিসোর্সের কার্যকর মিশ্রণ জরুরি হয়ে ওঠেছে। এর ফলে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে তা হলো-

→ হিউম্যান রিসোর্স উন্নয়নের চাপ (Pressure to develop the human resource): বিশ্বায়নে হিউম্যান রিসোর্স উন্নয়নে কখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়, কখনো বা সুফল বয়ে নিয়ে আসে। উন্নত জীবন ও অধিক বেতনের আশায় অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মেধাবী হিউম্যান রিসোর্স উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমায়। ফলে সে দেশের হিউম্যান রিসোর্সের উন্নয়ন হয়। তবে বঞ্চিত হয় কম পুঁজির অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ। আবার বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শাখা বিস্তারের কারণে সেসব দেশে উন্নত ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির প্রবেশ ঘটে। এতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের হিউম্যান রিসোর্স উন্নয়নের ওপর চাপ চলে আসে, যা এক ধরনের চ্যালেঞ্জ।

→ কর্মশক্তি বৈচিত্র্য (Work force diversity): বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় যেমন অবাধে সারা পৃথিবীতে পুঁজির বিচরণ ঘটে তেমনটি ঘটে হিউম্যান রিসোর্সের ক্ষেত্রেও। বৈশ্বিক শিল্প বাণিজ্যে নানা ধর্ম-সংস্কৃতি-চিন্তা- আদর্শের চলক একসাথে জড়ো হয়। হিউম্যান রিসোর্সের দল, উপদল, গোত্র ভেদে তাদের চাহিদা, রুচি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় পার্থক্য দেখা দেয়। এতসব মতভিন্নতাকে সুসংগঠিত করে সহযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তুলে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন নিশ্চিতভাবে হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনার জন্য একটি চালেঞ্জিং কাজ। ভিন্ন সামাজিকতা ও সংস্কৃতির এসব বৈচিত্র্যপূর্ণ কর্মীদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সামাজিকতা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়।

→ ক্ষমতায়ন (Empowerment) : হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়ার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হলে কর্মীদের অংশগ্রহণ, সঠিকভাবে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব হস্তান্তরের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো প্রকার বৈষম্য না করে অর্থাৎ ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ, গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতমূলক অথবা নেতিবাচক মনোভাব না দেখিয়ে শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মীদের কাজের দায়িত্ব ও পদোন্নতি দিতে হবে। পাশাপাশি হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বায়নের সাথে তাল মেলানোর জন্য সাম্প্রতিক জ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, কর্মপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানের কর্মীবাহিনীকে সঠিক সময় এবং উপায়ে সরবরাহ করতে হবে। তবে এতে সফল হওয়া অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

→ ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য (Language and cultural diversity): বিশ্বায়নের ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শ্রমশক্তি একত্রে কাজ করে। এতে বিভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতি- ধর্মের এক অপূর্ব সম্মিলন ঘটে। এ জাতীয় বৈচিত্র্যতাকে মোকাবেলা করার জন্য হিউম্যান রিসোর্স ব্যবস্থাপনাকে উদার হতে হবে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাকে বিভিন্ন দেশ ও ভাষা- সংস্কৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হবে।