রেহান ও সুফল খুবই ভালো বন্ধু। তারা দুজন এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করেছে। রেহানের পঠিত বিষয়ের মূল আলোচনা হলো সমাজ ও সমাজ সম্পর্কিত সব বিষয়। পক্ষান্তরে, সুফলের পঠিত বিষয় মূলত রাষ্ট্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করে।
গণমাধ্যম আধুনিককালে ব্যক্তির সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রণের এক শক্তিশালী মাধ্যম।
গণমাধ্যম বলতে বোঝানো হয় সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইত্যাদিকে। এসব মাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ, বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন অনুষ্ঠান শিশুদেরকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। এর ফলে শিশু-কিশোররা নিজেদেরকে সমাজ-সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে শেখে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিকশিত হয়।
উদ্দীপকের আশুর পঠিত বিষয়ের সাথে অর্থাৎ- সমাজবিজ্ঞানের সাথে বিজ্ঞানের ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে।
আমরা জানি, সমাজবিজ্ঞান ঠিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো নয়, তবে এটি গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পদ্ধতি ও কলাকৌশল প্রয়োগ করে। বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য প্রজ্ঞা, ধীশক্তি, নির্দেশনা বা ধারণার জন্ম দেওয়া নয়, বরং জ্ঞানের উদ্ভাবন। সেদিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, সমাজবিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। এক্ষেত্রে প্রথমে গবেষণার বিষয় নির্ধারণ করা হয়। তারপর নির্ধারিত বিষয়ের ওপর প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সংগৃহীত তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস, অনুসিদ্ধান্ত প্রণয়ন এবং তা যাচাইয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় এবং এর ভিত্তিতে একটি সাধারণ সূত্রে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। অর্থাৎ সমাজবিজ্ঞান বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যসমূহের বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক জ্ঞান অন্বেষণের প্রচেষ্টা চালায়। এদিক থেকে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
উদ্দীপকের আশু বলে, সমাজের গতি-প্রকৃতি জানতে হলে একটি বিষয় অধ্যয়ন করতে হয় এবং এ বিষয়টি পদ্ধতিগত দিক থেকে বিজ্ঞানের মর্যাদা পেয়েছে। আশুর এ বক্তব্যে সমাজবিজ্ঞানের প্রকৃতি ফুটে উঠেছে। আর সমাজবিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক মিল বা সাদৃশ্য যা উপরের আলোচনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, আশুর পঠিত বিষয় সমাজবিজ্ঞানের সাথে বিজ্ঞানের মিল বা সম্পর্ক রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞান বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান দান করে। সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের সমাজ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা প্রয়োজন। আর সমাজবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে এ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা যায়। সমাজের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার কারা কতটা এবং কীভাবে ভোগ করছে, আর কারাইবা সমাজের সম্পদ ও সুযোগ- সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তা সমাজবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে জানা যায়।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল ও কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের কৃষির বৈশিষ্ট্য, সম্পর্ক, কাঠামো ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়নের সমস্যা দূরীকরণে সমাজবিজ্ঞান পথ নির্দেশ করে। বাংলাদেশে দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জন অসন্তোষ, সম্পদহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য সমাধান সূত্র নির্ণয়ে সমাজবিজ্ঞান বিশেষ ভূমিকা পালন করে। সমাজ যেহেতু প্রধানত স্তৱায়িত, তাই সমাজ উন্নয়নে কোন শ্রেণির বা অর্থনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর কী ভূমিকা থাকে তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে আলোচনা করে।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সমাজকে জানতে ও বুঝতে হলে সমাজবিজ্ঞান পাঠের বিকল্প নেই। কারণ একমাত্র সমাজবিজ্ঞানই সমাজকে নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করে।
যুক্তি বিকাশের ধারাবাহিকতায় মানুষের অগ্রসর চিন্তার ফসল হচ্ছে একেশ্বরবাদ।
যুক্তির ধারাবাহিকতায় বহু ঈশ্বরের ক্ষমতা একজন ঈশ্বরের ওপর আরোপ করা হয়। এখানে মনে করা হয়, সকল প্রাকৃতিক ও সামাজিক ঘটনার সর্বোচ্চ এবং সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে সর্বশক্তিমান একক সত্তা।
রেহান ও সুফলের পঠিত বিষয় দুটি হলো যথাক্রমে সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান।
রেহানের বিষয়টিতে সমাজ ও মানুষ সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান সন্নিবেশিত হয়েছে যা সমাজবিজ্ঞানকে নির্দেশ করে। আর সুফলের পঠিত বিষয়টি মূলত রাষ্ট্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করে যা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আমরা জানি, সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো সমাজবিজ্ঞানের একটি বিশেষীকৃত শাখা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হলো সমগ্র মানবজীবনের কেবল রাজনৈতিক দিকটির আলোচনা, অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞান হলো একটি মৌলিক সামাজিক বিজ্ঞান যার উপজীব্য বিষয় হলো মানুষের সমাজজীবনের সামগ্রিকরূপ। সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান ছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্বরূপ অনুধাবন প্রায় অসম্ভব। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু অনেক ও বিভিন্ন হলেও এর কেন্দ্রীয় বিষয় হলো রাষ্ট্র আর এই রাষ্ট্র প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল সামাজিক সংগঠন।সেই সূত্র ধরেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়। বর্তমানে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বা মডেল রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হতে দেখা যায় তেমনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানও সমাজবিজ্ঞানের উপাদান সরবরাহ করে। উদাহরণস্বরূপ, সমাজবিজ্ঞান রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় কার্যাবলি সম্পর্কিত জ্ঞান সংগ্রহ করে।
সুতরাং আমরা বলতে পারি যে, সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।