বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-গণ আন্দোলন
ভূমিকা:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠিত প্রতিবাদ। কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। একাধিক ঘটনার মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, তৎকালীন সরকারের পতনের মাধ্যমে এই আন্দোলন তার চূড়ান্ত সফলতা লাভ করে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট তিন দফা বড় ধরনের কোটা সংস্কারের আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আন্দোলনের পেছনের কারণ:
বাংলাদেশে কোটাব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭২ সালে। তখন সরকারি চাকরির জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০%, নারী ১০%, জেলা ১০%, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ৫%, এবং প্রতিবন্ধী ১% নির্ধারণ করা হয়। এতে মোট কোটার পরিমাণ ছিল ৫৬%, যা মেধাভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছিল। চাকরিপ্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ কারণেই কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, ৪ মার্চ ২০১৮)
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পটভূমি:
২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর, শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রভাবে সরকার সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কোটা ব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেয়। তখন শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতৃত্বে এ সংগ্রাম চালিয়েছিল এবং সরকার সেই দাবিকে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ওই ২০১৮ সালের কোটা বাতিল সংক্রান্ত নির্দেশনা অবৈধ ঘোষণা করে। এ সিদ্ধান্তের পর নতুন করে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার।
শিক্ষার্থীদের ভূমিকা:
সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। আন্দোলনের শুরু হয় ঢাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন এই আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়করা। রাজু ভাস্কর্য, অপরাজেয় বাংলা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, শাহবাগ চত্বরসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি ছিল আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। সরকারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশনার পরেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নির্যাতন:
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দেয়া ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্দোলন তীব্রতর হয়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে অংশ নেন। কিন্তু তাদের ওপর পুলিশি নিপীড়ন চালানো হয়। সারা দেশে অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয় এবং কেউ কেউ প্রাণ হারান।
শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি:
৬ জুলাই, শিক্ষার্থীরা সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পরীক্ষা বর্জন, ধর্মঘট ও সড়ক–মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি নামে ‘বাংলা ব্লকেড’ শুরু করে। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ গুলিতে হত্যা করে। ১৯ জুলাই আন্দোলনের একটি অংশ ৯ দফা দাবি নিয়ে ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। অন্যদিকে, ২২ জুলাই সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবি জানিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ স্থগিত করে। ৩০ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ নামে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ মিছিল করে।
ছাত্র আন্দোলন থেকে গণ–আন্দোলনে রূপান্তর:
কোটা সংস্কার থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশের তরুণ, যুবক–যুবতী, নারী–পুরুষ, বৃদ্ধ–বৃদ্ধা সহ নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করে।
এক দফার অসহযোগ আন্দোলন:
অবশেষে আন্দোলন এক দফার দাবিতে অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে পরিণত হয়, যার লক্ষ্য ছিল সরকারের পতন।
ফ্যাসিবাদের পতন:
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এই এক দফার দাবির প্রেক্ষিতে দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও, ৪ আগস্ট সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের কারণে তা ৫ আগস্টে এগিয়ে আনা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকামুখী হন। গণ–অভ্যুত্থানের চাপের মুখে ৫ আগস্ট দুপুরে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশের বাইরে চলে যান।
উপসংহার:
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায়। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের গ্লানি কাটিয়ে, এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশা ও প্রত্যাশার সূচনা হয়। সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় একটি বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার পথচলা।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!