অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আমলাতন্ত্রের ধারণাটির উৎপত্তি ঘটেছিল ফরাসি দেশে।
আমলাতন্ত্রের দুটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-
১. স্থায়িত্ব : আমলারা প্রশাসনের স্থায়ী অংশ। একবার কাজে নিযুক্ত হলে এবং কোনো গুরুতর অভিযোগে পদচ্যুত না হলে একটি নির্দিষ্ট বয়ঃসীমা পর্যন্ত আমলারা স্বপদে অধিষ্ঠিত থাকেন।
২. নিরপেক্ষতা: আমলারা আইনের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে। ফলে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক মতামত বা পছন্দ-অপছন্দ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে না। অবশ্য মার্কসবাদী লেখকদের মতে, আমলাদের নিরপেক্ষতার ধারণা সম্পূর্ণ তত্ত্বগত, বাস্তবে নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র বলে কিছু নেই।
তত্ত্বগতভাবে বাংলাদেশের আমলারা সেবকতুল্য। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করছে না বরং প্রভুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এজন্য প্রকৃতপক্ষে দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবকাঠামো অনেকাংশে দায়ী। - সময় এবং সুযোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের অতি বিকশিত রূপটা আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য থেকে আমলাদেরকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সাংবিধানিকভাবে আমলাদের নিয়োগদান করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাতির সেবক হিসেবে গড়ে তুলে সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর অধীনে তাদেরকে বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু এ সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে তারা প্রকৃতপক্ষে জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন না, বরং প্রভুসুলভ মনোভাব তাদের কাজকর্মে প্রতিভাত হচ্ছে
আমলাতন্ত্রের অর্থই হলো আমলাদের শাসন। আমলাতন্ত্রের মূল ত্রুটি হলো আমলারা তাদের কাজকর্মের জন্য জনসাধারণের প্রতিনিধিদের নিকট দায়িত্বশীল থাকে না। অধ্যাপক মিল তাই আমলাতন্ত্রকে গণতন্ত্রবিরোধী বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আমলারা যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে না থেকে কাজ করেন তাহলে আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে না। গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে হলে জনপ্রতিনিধিদের নিকট আমলাদের জবাবদিহিতা সুনিশ্চিত করতে হবে। আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিক অধীনস্থতার অর্থ হলো আইনসভা, রাজনৈতিক শাসন কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক দল ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ। সাধারণত আমলা নিয়োগের পদ্ধতি আইনসভা আইনের মাধ্যমে ঠিক করে নেয়। তবে সরাসরি নিয়োগ বা নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষমতা আইনসভার হাতে থাকলে আমলাদের নিয়ন্ত্রণ সহজসাধ্য হয়। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের আর একটি মাধ্যম হলো সংসদীয় কমিটি গঠন। যেমন- হিসাব রক্ষাসংক্রান্ত কমিটি। তাছাড়া আইনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আমলাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীন করা যায়। সাধারণত আইনের সাহায্যে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় আমলাদের
বিচার আইনগত নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায়। এ্যালান বলের মতে, যেহেতু দুর্নীতি ও নৈপুণ্যের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় হয় না সেজন্য আমলাদের বিচারের জন্য পৃথক আদালত থাকা বাঞ্ছনীয়। আমলাদের ওপর এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে আমলারা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে এবং জনপ্রতিনিধিদের নিকট দায়িত্বশীল হবে। ফলে আমলাতন্ত্র অর্থবহ হয়ে উঠবে।
Related Question
View AllBureaucracy' শব্দের প্রতিশব্দ 'আমলাতন্ত্র'।
আমলাতন্ত্রের এক বড় ত্রুটি হলো লালফিতায় দৌরাত্ম্য। কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বের নজিরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে অতি আনুষ্ঠানিকতা পালনকে লালফিতার দৌরাত্ম্য বলা হয়। পদসোপান ভিত্তিতে কাগজপত্রের অনুমোদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, যা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। এর ফলে প্রশাসনিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়।
আমলাতন্ত্র একটি পেশাদার, দক্ষ ও নিরপেক্ষ বাহিনী। তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে তারা এই পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে থাকেন। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের মমতাজ আলীর কার্যক্রমেও এরূপ দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দেখা যায়। মমতাজ আলী তার কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করেন এবং সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন অনুসারে তার কাজ করেন। এটি আমলাতন্ত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মমতাজ আলী সাহেব তার। দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে তিনি তার কর্মকাণ্ডে যে সক্ষমতা প্রদর্শন। করেছেন, তা আমলাতন্ত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমলাতন্ত্রের পদের ধারাক্রম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। এখানে আমলাতন্ত্রের কার্যপ্রণালি এবং প্রক্রিয়া দেখা যায়।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আমলাদেরকে বহুবিধ কার্যাবলি সম্পাদন করতে হয়। উন্নয়মূলক কাজেও মমতাজ আলীদের মতো আমলারা মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। অনেক সময় তাদের ভূমিকা দেশের উন্নয়নের ধারক ও বাহকের ন্যায়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়।
আমলারা রাষ্ট্রের জনগুরুত্বপূর্ণ সব কাজের তদারকিতে নিয়োজিত থাকেন। প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণ, নীতির বাস্তবায়ন তথা কাজ সম্পন্ন করা, সরকারি সম্পদের হেফাজত করা, বিচারসংশ্লিষ্ট কাজ ইত্যাদি আমলাদের রুটিনওয়ার্ক। সরকারের যাবতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিকল্পনা করা, সম্ভাব্যতা যাচাই করা, সমীক্ষা করা, বাজেট প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদনের সুপারিশ করা, কাজ বাস্তবায়ন করা, তদারকি করা ইত্যাদি আমলাদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সূচনা ও বাস্তবায়ন করার মূল দায়িত্ব এ আমলাদের ওপরই ন্যস্ত থাকে।
আমলাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা যত বেশি হবে, এসব ক্ষেত্রে সফলতা তত দ্রুত আসবে। কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নের অগ্রভাগে থাকেন এ আমলারা। এছাড়া সামাজিক পরিবর্তন, অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ইত্যাদি অবস্থাগত ক্ষেত্রেও আমলাদের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। তবে আমলাতন্ত্রের অতি আনুষ্ঠানিকতা, লালফিতার দৌরাত্ম্য স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অদক্ষতা, অবহেলা এবং অ-পেশাদারি আচরণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু এটি আমলাতন্ত্রের নীতির পরিপন্থী। আমলাতন্ত্রে কখনো এরূপ প্রত্যাশা করা হয় না। কিন্তু জনাব আলী সাহেবের মতো দক্ষ, সৎ ও কর্মনিষ্ঠ আমলারাই দেশের উন্নয়নের ধারক ও বাহক, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
অধ্যাপক অগ আমলাতন্ত্রকে পেশাদার দক্ষ বাহিনী বলে অভিহিত করেন।
কোনো সংগঠন পরিচালনার জন্য স্থায়ী বেতনভুক্ত দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে আমলা বলা হয়। আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র বলতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী বেতনভুক্ত কর্মীবাহিনীকে বোঝায়। আমলারা সুশৃঙ্খলভাবে পরস্পর পদের ক্রম অনুযায়ী সংযুক্ত এবং রাজনীতি নিরপেক্ষ থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ম্যাক্স ওয়েবারকে আমলাতন্ত্রের জনক বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!