বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যাদের অবদান ও আত্মত্যাগ জাতিকে গর্বিত করে। তেমনি এক অমর বীর হচ্ছেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সাতজনকে "বীর শ্রেষ্ঠ" উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। মতিউর রহমান সেই গর্বিত সাতজনের একজন, এবং বায়ুসেনা থেকে একমাত্র বীর শ্রেষ্ঠ।
জন্ম: ২৯ নভেম্বর ১৯৪১
জন্মস্থান: ঢাকার কালীগঞ্জ, নরসিংদী
পিতা: মােজাহার রহমান
মাতা: আয়েশা খাতুন
মতিউর রহমানের শৈশব কেটেছে ঢাকায়। তিনি তেজগাঁও এভিনিউস্থ মুসলিম মডার্ন স্কুল এবং পরে ঢাকার বিখ্যাত নৌবাহিনী স্কুলে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর মধ্যে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও কর্তব্যপরায়ণতা লক্ষ্য করা যেত।
১৯৬১ সালে মতিউর রহমান পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে (PAF) ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে একজন দক্ষ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি পাকিস্তানের করাচিতে নিযুক্ত ছিলেন, যেখানে তার পরিবারও বসবাস করত।
১৯৭১ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ ও দমন নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়, তখন মতিউর রহমান ছিলেন করাচিতে। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য পুড়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্য হওয়ায় তিনি প্রকাশ্যে কিছু করতে পারছিলেন না।
তবে নিজের অবস্থান থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য কিছু করার তীব্র ইচ্ছা তাঁকে এক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
২০ আগস্ট ১৯৭১ — এটি ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। সেদিন করাচির মাসরুর বিমান ঘাঁটিতে থাকা একটি T-33 জেট প্রশিক্ষণ বিমান অপহরণ করে তিনি ভারত অভিমুখে রওনা দেন। সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানি বাঙালি ট্রেইনি পাইলট রশীদ মিনহাস, যিনি অপহরণ ঠেকানোর চেষ্টা করেন। বিমানটি পাকিস্তান সীমান্তের কাছে ক্র্যাশ করে। মতিউর রহমান শহীদ হন।
পাকিস্তান সরকার তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেনি; বরং করাচির এক অজ্ঞাত কবরস্থানে দাফন করা হয়।
স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ সরকার মতিউর রহমানকে "বীরশ্রেষ্ঠ" উপাধিতে ভূষিত করে — দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান।
২০০৬ সালে তাঁর মরদেহ পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আনা হয়। সশ্রদ্ধ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি, জহুরুল হক (ঢাকা)-এ সমাহিত করা হয়।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান কেবল একজন বীর যোদ্ধা নন, তিনি দেশের জন্য ভালোবাসার এক অনন্য প্রতীক। তাঁর আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, নিজের শপথের ঊর্ধ্বে যে কেবল দেশের প্রতি ভালবাসা যায়, তা-ই মানুষের আসল পরিচয়।
আজকের প্রজন্মের উচিত, তাঁর মতো আত্মত্যাগী বীরদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া — যেন আমরা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আরও সুন্দর ও গর্বিত করতে পারি।
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?