Blog
Created: Sep 08, 2025, 06:45 PM Updated: Sep 08, 2025, 06:45 PM
0
1633

বেগম রোকেয়া: নারী জাগরণের অগ্রদূত

বাংলার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা সমাজকে নতুন দিশা দিয়েছেন। বেগম রোকেয়া সেইসব পথপ্রদর্শকদের একজন, যিনি নারীশিক্ষা, নারী-স্বাধীনতা এবং মুসলিম সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি শুধু একজন লেখিকা নন, ছিলেন এক সাহসী সমাজসংস্কারক এবং চিন্তাবিদ, যাঁর প্রভাব আজও বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে দৃশ্যমান।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

বেগম রোকেয়ার পূর্ণ নাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে। তাঁর পিতা জাহীরুদ্দীন ছিলেন একজন জমিদার এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। সে সময় মুসলিম সমাজে নারীদের শিক্ষা গ্রহণ নিষিদ্ধের মতো ছিল। তবুও রোকেয়া তাঁর ভাইদের কাছ থেকে চুপিচুপি বাংলা ও ইংরেজি শেখেন।

নারী শিক্ষার পথিকৃৎ

রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, "একজন নারী যদি শিক্ষিত না হন, তাহলে পুরো জাতি অশিক্ষিত থেকে যায়।" সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি জীবনের বড় একটি সময় নারী শিক্ষার প্রসারে উৎসর্গ করেন।

১৯১১ সালে কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল মুসলিম নারীদের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, কারণ সে সময় নারী শিক্ষা ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। সমাজের বহু বাধা সত্ত্বেও তিনি এই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখেন এবং ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী নারী শিক্ষার কেন্দ্র গড়ে তোলেন।

সাহিত্য ও সমাজচিন্তা

রোকেয়া কেবল শিক্ষিকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক শক্তিশালী লেখিকা। তাঁর লেখনিতে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও নারীর অধিকারহীনতা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

সুলতানার স্বপ্ন (1905): এটি একটি কাল্পনিক উপন্যাস যেখানে নারীরা শাসন করে এবং পুরুষরা ঘরবন্দী থাকে। এটি ছিল নারী স্বাধীনতা নিয়ে লেখা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি (sci-fi)।

অবরোধবাসিনী (1931): এখানে তিনি মুসলিম সমাজে নারীদের গৃহবন্দী জীবনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।

পিপাসা, মতিচূর, নারীর অধিকার ইত্যাদি রচনায় তিনি নারী-স্বাধীনতা, যৌক্তিকতা এবং শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছেন।

ধর্ম ও নারীবাদ

রোকেয়া ইসলাম ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কিন্তু ধর্মের নামে নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিবাদী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসলাম নারীকে শিক্ষা ও সম্মানের অধিকার দিয়েছে, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তা নারীদের থেকে কৌশলে কেড়ে নিয়েছে।

বেগম রোকেয়ার মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর, তাঁর জন্মদিনেই মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর কাজ, তাঁর চিন্তা এবং তাঁর আদর্শ আজও অম্লান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুল এখনো চলছে এবং তিনি নারীর ক্ষমতায়নে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।

আজকের প্রেক্ষাপটে রোকেয়ার প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমানে যখন নারী নির্যাতন, বৈষম্য, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা এখনও বিদ্যমান, তখন বেগম রোকেয়ার জীবন ও দর্শন নতুন করে অনুপ্রেরণা দেয়। নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হলে তাঁর মতো শিক্ষিত, সাহসী ও সচেতন নারীর প্রয়োজন।

উপসংহার

বেগম রোকেয়া ছিলেন এক আলোকবর্তিকা, যিনি নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোতে এনেছেন। তাঁর লেখা, চিন্তা এবং কাজ আমাদের এখনো নতুন পথ দেখায়। আজ যখন আমরা নারী শিক্ষার অগ্রগতি দেখি, তখন আমাদের মনে রাখতে হয় — এই সংগ্রামের বীজ রোপণ করেছিলেন সেই বেগম রোকেয়া।

0 1.6k

Author

Job
70 Followers

I use this platform to connect, share knowledge, and explore new ideas.

All Comments

Promotion

Are you sure to start over?

Loading...