ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকাল (১৭৫৭-১৮৫৮)
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে একটি বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে ভারতবর্ষে আসে, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মসলা, সুতির কাপড় এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর ব্যবসা করা। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে এবং ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০০ বছর ধরে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শাসন করে।
পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭): ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রথম ধাপ ছিল পলাশীর যুদ্ধ। এই যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে কোম্পানি বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে পরাজিত করে। এই বিজয়ের পর কোম্পানি বাংলা, বিহার এবং ওড়িশার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪): পলাশীর যুদ্ধের পর বক্সারের যুদ্ধে কোম্পানি মুঘল সম্রাট শাহ আলম II, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মীর কাসিমের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে। এই যুদ্ধের পর তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা, বিহার এবং ওড়িশার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করে।
দ্বৈত শাসন: ১৭৬৫ থেকে ১৭৭২ সাল পর্যন্ত বাংলায় কোম্পানি দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা চালু করে। এই ব্যবস্থায় নবাবের হাতে প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকলেও রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ ক্ষমতা ছিল কোম্পানির হাতে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হয় এবং ১৭৭০ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
রাজস্ব নীতি: কোম্পানি বিভিন্ন ভূমি রাজস্ব নীতি চালু করে, যেমন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩), রায়তওয়ারি ব্যবস্থা এবং মহলওয়ারি ব্যবস্থা। এসব নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির জন্য সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করা, যার ফলে কৃষকরা শোষিত হয় এবং দেশের সম্পদ ব্রিটেনে পাচার হতে থাকে।
অর্থনৈতিক শোষণ: কোম্পানির শাসনকালে ভারতবর্ষের হস্তশিল্প ও কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। ব্রিটিশ পণ্য ভারতীয় বাজারে ছেয়ে যায় এবং ভারত কাঁচামাল রপ্তানিকারক ও ব্রিটিশ পণ্যের বাজারে পরিণত হয়।
কোম্পানি নিজেদের শাসন পোক্ত করার জন্য কিছু প্রশাসনিক ও সামাজিক পরিবর্তনও আনে।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা: তারা আইন প্রণয়ন, বিচার ব্যবস্থা এবং পুলিশি ব্যবস্থার মতো আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে।
শিক্ষা ব্যবস্থা: তাদের শাসনকালে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন হয়, যা পরবর্তীকালে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটাতে সাহায্য করে।
১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে আর ভারতবর্ষের শাসনভার চালানো সম্ভব নয়। তাই ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি আইন পাস করে কোম্পানির শাসন শেষ করা হয় এবং সরাসরি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অধীনে ভারতবর্ষের শাসনভার তুলে নেওয়া হয়। এই সময় থেকে ভারতবর্ষের ইতিহাস 'ব্রিটিশ রাজ' নামে পরিচিত হয়।
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?