বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। এই দিন থেকেই বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও বঞ্চনার শৃঙ্খল ছিন্ন করে স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু করে। রাতের আঁধারে পাকিস্তানি সেনাদের চালানো হত্যাযজ্ঞের প্রতিক্রিয়ায় বাঙালিরা আর পিছিয়ে যায়নি। তাই এই দিনটিই আমাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে জাতীয় জীবনে চির অম্লান হয়ে আছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনা হঠাৎ করেই হয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আন্দোলন—
১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙালি জাতি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন
ভাষার অধিকারের জন্য প্রাণ দেয় শহীদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অগণিত ছাত্র-জনতা।
এই আন্দোলন বাঙালি জাতিকে আত্মপরিচয়ের বোধ জাগিয়ে দেয়।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ।
পাকিস্তানি শাসকেরা এই দাবিকে ভয় পেয়েছিল এবং দমন-পীড়ন চালায়।
১৯৭০ সালের নির্বাচন
আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়।
শুরু হয় রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ষড়যন্ত্র।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত ছিল বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রাত।
পাকিস্তানি সেনারা "অপারেশন সার্চলাইট" চালিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে গণহত্যা শুরু করে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, ছাত্রাবাস, গ্রামাঞ্চল, এমনকি সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়।
হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।
২৫শে মার্চের হত্যাযজ্ঞের পর ভোরে শুরু হয় নতুন ইতিহাস—
চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
ঘোষণা শোনার পর সারাদেশে প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়।
রাজপথে, গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় সাধারণ মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়।
২৬শে মার্চ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়।
মুক্তিকামী মানুষ ভারত সীমান্তে গিয়ে সংগঠিত হতে থাকে।
পরবর্তীতে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার, মুক্তিবাহিনী, এবং সশস্ত্র সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো।
এই দিনের গুরুত্ব বহুমুখী—
স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক সূচনা – ২৬শে মার্চ থেকে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
জাতীয় ঐক্যের প্রতীক – বাঙালিরা ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি নির্বিশেষে এক কণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দেয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ভিত্তি – এই দিন থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে হাঁটে।
ত্যাগ ও আত্মদানের স্মারক – এই দিনের রক্তদানে আমরা অর্জন করি স্বাধীনতার লড়াইয়ের অদম্য শক্তি।
২৬শে মার্চ থেকে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধ টানা নয় মাস চলে।
প্রায় ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও ২ লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়।
এই অর্জন শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়, বরং জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা।
১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ আমাদের জাতির স্বাধীনতার প্রথম প্রভাত। এটি কেবল একটি দিন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের চিহ্ন, আত্মত্যাগের প্রতীক এবং মুক্তির সনদ। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কোনো দান নয়—এটি রক্ত, ঘাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত। তাই প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব হবে ২৬শে মার্চের চেতনা বুকে ধারণ করে স্বাধীনতার মান রক্ষা করা।
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?