বিশ্বের মানচিত্রে এমন কিছু নির্দিষ্ট জায়গা বা 'চোকপয়েন্ট' রয়েছে, যার ওপর পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতি গভীরভাবে নির্ভরশীল। এর মধ্যে অন্যতম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালী। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি এবং সাধারণ জ্ঞান অংশে ভালো করার জন্য এই প্রণালী সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিসিএস, প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ, ব্যাংক জব থেকে শুরু করে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় হরমুজ প্রণালীর অবস্থান এবং এর কৌশলগত গুরুত্ব থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসে। স্যাট একাডেমির আজকের এই আয়োজনে আমরা হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক এবং সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আপনার পরীক্ষাপ্রস্তুতিকে আরও একধাপ এগিয়ে নেবে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিবেচনা করলে হরমুজ প্রণালীর অবস্থান অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি জায়গায়। একটি প্রণালীর মূল কাজই হলো দুটি বড় জলভাগকে যুক্ত করা এবং দুটি স্থলভাগকে আলাদা করা। চাকরি ও ভর্তি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, হরমুজ প্রণালী কোন কোন জলভাগকে যুক্ত করেছে। এর সঠিক উত্তর হলো, হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে যুক্ত করেছে। ওমান উপসাগর পরবর্তীতে আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের সাথে গিয়ে মিশেছে। তাই অনেক সময় পরীক্ষার অপশনে ওমান উপসাগরের বদলে আরব সাগর দেওয়া থাকে, সেক্ষেত্রে আরব সাগরই সঠিক উত্তর হিসেবে ধরে নিতে হয়। অন্যদিকে স্থলভাগের কথা বললে, এই প্রণালীটি উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পৃথক করেছে। বিশেষ করে ইরানের সাথে ওমানের মুসান্দাম উপদ্বীপকে এই প্রণালী আলাদা করে রেখেছে, যা মানচিত্র পর্যালোচনায় স্পষ্ট দেখা যায়।
অর্থনৈতিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের 'তেলের ধমনী' বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ 'অয়েল চোকপয়েন্ট' বলা হয়। বিশ্বের মোট সাগরপথের তেল বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরাকের মতো শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রপ্তানির একমাত্র সমুদ্রপথ হলো এটি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই কোটির বেশি ব্যারেল তেল এই প্রণালী হয়ে এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। প্রণালীর সবচেয়ে সরু অংশের প্রশস্ততা মাত্র ৩৩ কিলোমিটার বা ২১ মাইল, এবং বড় বড় তেলবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ চ্যানেলটি উভয় দিকে মাত্র দুই মাইল প্রশস্ত। ফলে কোনো কারণে এই প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বা জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দামে মারাত্মক অস্থিতিশীলতা দেখা দেবে, যা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও হরমুজ প্রণালী আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এই জলপথে। একদিকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণের কারণে বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহ চেইন যখন মারাত্মকভাবে ব্যাহত, তখন হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর সাথে ইরানের বৈরী সম্পর্কের কারণে ইরান বিভিন্ন সময়ে এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার বা পশ্চিমা দেশের জাহাজ আটকে দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে থাকে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজ আটক ও তল্লাশির ঘটনাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাই সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি থেকে প্রশ্ন হলে এই প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা প্রবল।
পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালী কেবল একটি সাধারণ জলপথ নয়, এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা।
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?