বর্তমান বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন বিজ্ঞানের এক অনন্য আশীর্বাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তি। এটি এমন এক উন্নত ব্যবস্থা যা রাসায়নিক শক্তিকে সরাসরি বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। প্রথাগত দহন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে এখানে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যেখানে উপজাত হিসেবে নির্গত হয় কেবল বিশুদ্ধ পানি এবং সামান্য তাপ। এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের পৃথিবীর জ্বালানি সংকটের প্রধান সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এটি শতভাগ পরিবেশবান্ধব এবং কার্বন নিঃসরণমুক্ত। আমাদের আগামী দিনের যাতায়াত ব্যবস্থা থেকে শুরু করে কলকারখানা পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল এক অভাবনীয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
ভবিষ্যতের যাতায়াত ব্যবস্থায় হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের ভূমিকা হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। যদিও বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভি (EV) জনপ্রিয় হচ্ছে, তবে ব্যাটারি চালিত যানবাহনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন—দীর্ঘ সময় ধরে চার্জ দেওয়া এবং ব্যাটারির অত্যধিক ওজন। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের ক্ষেত্রে এই সমস্যাগুলো নেই বললেই চলে। একটি হাইড্রোজেন চালিত গাড়ি বা বাস মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই রিফুয়েলিং বা জ্বালানি পূর্ণ করে নিতে পারে, যা প্রচলিত পেট্রোল পাম্পের মতোই সহজ। এছাড়া দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ট্রাক, জাহাজ এমনকি উড়োজাহাজের জন্য হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ব্যাটারির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও হালকা। ফলে গ্লোবাল লজিস্টিক এবং কার্গো সেক্টর ভবিষ্যতে সম্পূর্ণভাবে হাইড্রোজেনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে, যা বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
কেবল যানবাহনেই নয়, বরং শিল্প-কারখানা এবং বৃহদাকার পাওয়ার গ্রিড ব্যবস্থাপনায় হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বর্তমানে স্টিল বা সিমেন্ট কারখানার মতো ভারী শিল্পগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কার্বন উৎপন্ন হয়, কারণ সেখানে উচ্চ তাপমাত্রার জন্য কয়লা বা প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে এই জায়গাটি দখল করে নেবে গ্রিন হাইড্রোজেন। নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন—সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানি থেকে যে হাইড্রোজেন উৎপন্ন করা হয়, তা ফুয়েল সেলের মাধ্যমে ব্যবহার করলে শিল্পের চাকা ঘুরবে কোনো দূষণ ছাড়াই। এছাড়া আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের ব্যাকআপ পাওয়ার হিসেবেও এই প্রযুক্তি লিথিয়াম ব্যাটারি বা ডিজেল জেনারেটরের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই ও নিরাপদ বিকল্প হয়ে দাঁড়াবে।
তবে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ভিত্তিক একটি পৃথিবী গড়ে তোলার পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যার সমাধান নিয়ে বিজ্ঞানীরা বর্তমানে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। হাইড্রোজেনের উৎপাদন খরচ কমানো এবং এটি নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করা এখন বড় লক্ষ্য। বিশেষ করে 'গ্রিন হাইড্রোজেন' উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও সাশ্রয়ী করার প্রচেষ্টা চলছে। উন্নত দেশগুলো ইতিমধ্যেই হাইড্রোজেন ইকোনমি বা হাইড্রোজেন অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে। যখন এই প্রযুক্তির ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে, তখন খনিজ তেলের ওপর নির্ভরশীল ভূ-রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং প্রতিটি দেশ জ্বালানি আমদানির পরিবর্তে নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবে।
আপনি আমাকে যেকোনো প্রশ্ন করতে পারেন, যেমনঃ
Are you sure to start over?