চিংড়ির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে পালন ঘের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে করণীয় বিষয়গুলো নিম্নরূপ-
- পুকুরে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে রাসায়নিক সার যেমন- ইউরিয়া, টিএসপি ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে।
- পানির পিএইচের সঠিক মাত্রা বজায় রাখতে হবে।
- ঘেরে আগাছা ও শেওলা বেড়ে গেলে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা যাবে না।
- পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যের প্রাচুর্যতা নিশ্চিত করা উচিত।
- প্রাকৃতিক খাদ্য কমে গেলে ১৫ দিন পর পর প্রয়োজনীয় মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে।
- সঠিক মাত্রায় সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে। কারণ অত্যধিক মাত্রায় খাদ্য প্রয়োগ করলে উক্ত খাদ্য পুকুরের তলায় জমে পঁচনের মাধ্যমে পোনাকে রোগাক্রান্ত করে তুলতে পারে।
- পুকুরে পর্যাপ্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে।
- পুকুরে পানি প্রবেশ করানোর সময় অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণী নিয়ন্ত্রণ ও রোধ করতে হবে।
সুস্থ্য সবল চিংড়ি উৎপাদনের জন্য পরিশোধিত পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এজন্য পানি পুনঃউত্তোলন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। এখানে নিম্নের বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা উচিত-
- প্রয়োজন অনুযায়ী পানি রিজার্ভারে উত্তোলন করতে হবে।
- পানি সংগ্রহের উৎস ভালো হতে হবে।
- ঘন নেটের মাধ্যমে ছেকে বা ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগের মাধ্যমে পানি শোধন করতে হবে।
- পানি শোধনের ৪-৫ দিন পর পালন ঘেরে দিতে হবে।
- মাটির নিচের পানি সরাসরি ঘেরে ব্যবহার করা যাবে না।
- ঘেরে জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
- একইভাবে পানি শোধনের জন্য পুনঃউত্তোলন করতে হবে এবং পানি রিজার্ভ করে রাখতে হবে।
অধিক উৎপাদনের জন্য চিংড়িকে চাপমুক্ত রাখা উচিত। কিন্তু শেওলা পরিষ্কার, জাল টানা, ঘের মেরামত প্রভৃতি কাজের জন্য চিংড়ি পীড়নের শিকার হয় ফলে চিংড়ির মৃত্যু হার বেড়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে করণীয় হলো-
- ঘেরের শেওলা নিয়মিত ও ধাপে ধাপে পরিষ্কার করতে হবে।
- শেওলা তুলে তা পুকুরের বা ঘেরের পানির আশে পাশে রাখা যাবে না।
- চিংড়ি ছোট থাকা অবস্থায় অধিক রোদ থাকলে এবং খোলস বদলানোর সময় শেওলা পরিষ্কার করা যাবে না।
- আংশিক আহরণের জন্য বড় ছিদ্রযুক্ত আটল, চাড় জাল ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে তা নাহলে ছোট চিংড়ি জালে আটকে আহত হবে।
- পানি পরিশোধনের পর বা ব্লিচিং পাউডার প্রয়োগের পর কিছুদিন হররা টানলে শেওলা কম জন্মে।
- মাটি ও পানির ওপর নির্ভর করে পরিমাণমত চুন (ডলোমাইট) ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণত প্রতি বিঘা (৩৩ শতাংশ) ২ কেজি হারে ডলোমাইট প্রয়োগ করা ভালো।
- পীড়ন প্রতিরোধী ঔষধ ২ গ্রাম/কেজি হারে খাদ্যে ব্যবহার করলে রেণু পোনার পীড়ন হ্রাস পায়।
- হাপা বা পয়েন্টে পানির গভীরতা কমপক্ষে ৪ ফুট হতে হবে এবং তলায় ৪ ইঞ্চি পরিমাণ ভালো কাদা থাকতে হবে। হাপার তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ছাউনি বা কঞ্চির আঁটি তৈরি করা যেতে পারে।
চিংড়ির প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়ার জন্য প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি ঘেরে সম্পুরক খাদ্য প্রয়োগ করা উচিত। ঘেরে উপস্থিত মোট চিংড়ির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে সম্পূরক খাদ্যের পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে। এক্ষেত্রে করণীয় বিষয়গুলো নিম্নরূপ-
- যথাযথ গুণসম্পন্ন সম্পূরক খাবার বাজার থেকে কিনে বা সঠিক উপাদান ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করেও ঘেরে সরবরাহ করা যায়।
- কোনো প্রকার রাসায়নিক উপাদান বা এন্টিবায়োটিক যেন না থাকে।
- সময়ের সাথে সাথে চিংড়ির সঠিক বৃদ্ধি না হলে নমুনা পর্যবেক্ষণ করে খাবারের পরিমাণ পুনঃনির্ধারণ করতে হবে।
- খাবারের অপচয় রোধ করার জন্য এক মাস বয়সী চিংড়িকে চাহিদা অনুযায়ী খাবার ট্রেতে ঝুলিয়ে দিতে হবে। প্রতি হেক্টরে ৪০-৬০ টি ট্রে ব্যবহার করা যায়।
- খোলস বদলানোর সময় সম্পূরক খাদ্যের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে।
- খাদ্যের অপচয় কমানোর জন্য দিনের মোট খাবারকে চার ভাগে ভাগ করে দিতে হবে। যেমন- ভোর, সকাল, বিকাল ও রাত ।
যেকোনো ধরনের জলজ আগাছা আধা নিবিড় চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। কারণ জলজ আগাছা জন্মালে ঘেরের পানির গুণগতমান সহনীয় পর্যায়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই ২-৩ দিন সময় নিয়ে ঘেরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। ঘেরে শতকরা ৩০-৪০ ভাগ আগাছা থাকলে তা গ্রহণযোগ্য তবে এর বেশি থাকলে তা ক্ষতিকর।
চিংড়ি চাষে নমুনায়ন ও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতি ১৫ দিনে একবার অথবা মাসে ২ বার চিংড়ির নমুনায়ন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। রোগ অথবা বৃদ্ধি সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। চিংড়ির নমুনায়নের সময় করণীয় বিষয়গুলো নিম্নের সারণিতে দেয়া হলো-
সারণি: চিংড়ির নমুনায়নের সময় পর্যবেক্ষণের বিষয় ও করণীয়
| পর্যবেক্ষণ বিষয় | করণীয় |
|---|---|
১. ওজন স্বাভাবিক আছে কিনা ২. পাকস্থলিতে পর্যাপ্ত খাবার আছে কিনা ৩. চিংড়ির দেহে রোগের চিহ্ন আছে কিনা অথবা খোলসে সাদা চাকা দাগ আছে কিনা ৪. অস্বাভাবিক চলাচল ৫. ফুলকা কালো হয়ে গেছে কিনা ৬. লেজ ফোলা বা পানি জমে থাকা ৭. মাংস এবং খোলসের মাঝে ফাঁকা আছে কিনা ৮. খোলস নরম/শক্ত কিনা | ১. মাসে কমপক্ষে ২ বার নমুনায়ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ২. পর্যাপ্ত পরিমাণ না থাকলে খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে অথবা খাবার না খাওয়ার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ৩. ভাইরাসের কারণে মুলত এরকম হতে পারে। ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করতে হবে ৪. চিংড়ি পাড়ের নিকট স্থির হয়ে থাকলে বুঝতে হবে কোনো অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পানির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ করে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ৫. স্বল্পমাত্রায় চুন প্রয়োগ করতে হবে। ঘেরে হররা/পালা টেনে নিতে হবে। ৬. চিংড়ি আক্রান্তের পরিমাণ বেশি হলে প্রতি বিঘায় ১.৫ কেজি পটাশ পানিতে গুলিয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে। ৭. খাবার প্রদানের হার বৃদ্ধি করতে হবে ৮. নরম খোলসবিশিষ্ট চিংড়ি সংখ্যায় বেশি হলে ঘেরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। |
Read more