দীনবন্ধু মিত্র রচিত 'নীলদর্পণ' নাটকটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য সৃষ্টি, যার সাহিত্য-মূল্যের চেয়ে সামাজিক মূল্য বহুগুণে বেশি বলে বিবেচিত। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ব্রিটিশ নীলকর সাহেবদের দ্বারা বাংলার কৃষকদের উপর চালানো অমানবিক অত্যাচার, শোষণ ও নিপীড়নের বাস্তব চিত্র এই নাটকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে তৎকালীন সমাজের এক ভয়াবহ অধ্যায় উন্মোচিত হয়, যা সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় এবং নীলকরদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নাটকটির মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক অসঙ্গতি ও ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। এর মঞ্চায়ন ও প্রকাশনার ফলে শিক্ষিত সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ পর্যন্ত নীল বিদ্রোহের পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এটি শুধু একটি নাটক ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ সামাজিক দলিল ও প্রতিবাদের ভাষা। এর ফলস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার নীল কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয় এবং নীলচাষ বন্ধের পথ সুগম হয়। যদিও নাটকটির সাহিত্যগুণ যেমন- কাহিনি, চরিত্রায়ণ, সংলাপ ইত্যাদির মাধ্যমে এটি একটি সফল নাট্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত, কিন্তু এর তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব এবং জনজাগরণে এর ভূমিকা এর সাহিত্যিক অর্জনকে ছাপিয়ে গেছে। তাই এটি মূলত একটি সামাজিক জাগরণমূলক রচনা হিসেবেই অধিক পরিচিত ও সমাদৃত।
উত্তরঃ
একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা কবিতার জন্য আত্মত্যাগ, ভাষা প্রেম ও জাতীয়তাবাদের এক অবিস্মরণীয় প্রেরণা।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দিন, যা শুধু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নয়, বাংলা সাহিত্যের বিশেষ করে কবিতার জগতেও এক অন্তহীন প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার্থে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউর সহ আরও অনেকে। এই আত্মত্যাগ বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা কবিতার জন্য প্রেরণার উৎস হওয়ার মূল কারণগুলো হলো:
ভাষা প্রেম ও জাতীয়তাবাদের জাগরণ: একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির মনে ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং স্বতন্ত্র জাতিসত্তার যে বীজ বপন করে, তা কবিদের মননকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। মাতৃভাষার প্রতি এই অবিচল টান অসংখ্য কবিতায় মূর্ত হয়েছে।
প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রতীক: অন্যায় ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রথম সফল প্রতিরোধ ছিল ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের চেতনা কবিদের লেখনীতে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ভাষা জুগিয়েছে, যা পরবর্তীকালে স্বাধীনতা সংগ্রামেও প্রেরণা জুগিয়েছে।
শহীদদের আত্মদান ও শোকগাঁথা: ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার ঘটনা বাংলা কবিতায় শোক, আত্মত্যাগ এবং বীরত্বের নতুন উপাখ্যান তৈরি করেছে। শহীদদের আত্মদানকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অসংখ্য মর্মস্পর্শী কবিতা, যা বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছে।
নবজাগরণ ও আধুনিকতার উন্মোচন: একুশে ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপটে রচিত কবিতাগুলো কেবল বিষয়বস্তুতেই নয়, আঙ্গিক ও প্রকাশভঙ্গিতেও নতুনত্বের ছোঁয়া আনে। এটি বাংলা কবিতায় আধুনিকতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর 'কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি', আলাউদ্দিন আল আজাদের 'স্মৃতিস্তম্ভ' এবং আব্দুল গাফফার চৌধুরীর 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' এর মতো কালজয়ী সৃষ্টিগুলো একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই রচিত। এই কবিতাগুলো আজও বাঙালির প্রাণে একুশের মর্মবাণী পৌঁছে দেয় এবং মাতৃভাষা ও দেশের প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করে চলেছে, যা এর অন্তহীন প্রেরণার সাক্ষ্য বহন করে।
প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। এর ভাষা ও বিষয়বস্তু দুর্বোধ্য এবং এর কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ সাধক। এতে বিধৃত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্বকথা। এ সময়ের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতা ও ধর্মনির্ভরতা। ধর্মের বিষয়টি সমাজজীবনের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রিত করেছে, তাই সাহিত্যে ধর্মের কথা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রাচীন যুগের সময়কাল-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
৬৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর মতে
৯৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুকুমার সেনের মতে
৯০০-১৩৫০ খ্রি.
চর্যাপদ: বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য/কবিতা সংকলন চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন। ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে ১৯০৭ সালে 'চর্যাচর্য বিনিশ্চয়' নামক পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের সাথে 'ডাকার্ণব' ও 'দোহাকোষ' নামে আরও দুটি বই নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে আবিষ্কৃত হয়। ১৯১৬ সালে সবগুলো বই একসাথে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে প্রকাশ করেন।
বাংলার পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মালম্বী। তাদের আমলে চর্যাগীতিগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পদগুলো রচিত। পাল বংশের পরে আসে সেন বংশ। সেন বংশ হিন্দুধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যসংস্কার রাজধর্ম হিসাবে গ্রহণ করে। ফলে বৌদ্ধ সিদ্ধচার্যেরা এদেশ হতে বিতাড়িত হয় এবং নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন বাংলাদেশের বাহিরে নেপালে পাওয়া গেছে।
ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
চর্যাপদের শব্দগুলো অপরিচিত, শব্দ ব্যবহারের রীতি বর্তমানের রীতি থেকে ভিন্ন --এর কবিতাগুলো পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে 'সন্ধ্যা ভাষা'ও বলে। চর্যাপদের কবিতাগুলো গাওয়া হত। তাই এগুলো একইসাথে গান ও কবিতা।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার 'বাঙলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ' (Origin and Development of Bengali language) নামক গ্রন্থে ধ্বনি তত্ত্ব ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পদসংকলনটি আদি বাংলা ভাষায় রচিত। কেউ কেউ একে মৈথিলি, উড়িয়া বা আসামি ভাষা বলে দাবি করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, সেকালের বাংলা, উড়িয়া বা আসামি ভাষার পার্থক্য ছিল সামান্যই। উল্লেখ্য যে, চর্যাপদ উড়িষ্যা, বিহার, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের নিজ নিজ ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসাবে বিবেচিত।
এতে মোট ৫১ টি পদ'রয়েছে। কয়েক পাতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সর্বমোট সাড়ে ৪৬টি পদ পাওয়া গেছে। ২৩ নং পদটি খণ্ডিত আকারে উদ্ধার করা হয়েছে অর্থাৎ এর শেষাংশ পাওয়া যায়নি। ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদগুলো পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের মোট পদকর্তা ২৪। অনেকের মতে, আদি চর্যাকার লুইপা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রাচীনতম চর্যাকার শবরপা এবং আধুনিকতম সরহ বা ভুসুকু। কাহ্নপা সর্বাধিক ১৩ টি পদ রচনা করেন।
রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ চর্যাপদ এর অংশবিশেষ
চর্যাপদের কবি / পদকর্তা-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
২৩ জন
ড. সুকুমার সেনের মতে
২৪ জন
পদকর্তা: লুই, শবর, ককুরী, বিরুআ, গুণ্ডারী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, আজদেব, ঢেণ্টণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তন্ত্রী ও লাড়ীডোম্বী। পদকর্তাদের নামের শেষে সম্মানসূচক 'পা' যোগ করা হয়। যেমন: লুই থেকে লুইপা, শবর থেকে শবরপা।
কাহ্ন : ১৩ টি পদ রচনা করেন।
ভুসুকু : ৮ টি পদ রচনা করেন।
সরহ : ৪ টি পদ রচনা করেন।
লুই, শান্তি ও শবরী: ২ টি করে পদ রচনা করেন।
বাকিরা : ১ টি করে পদ রচনা করেন।
লাড়ীডোম্বী : কোন পদ পাওয়া যায়নি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫০টি এবং প্রাপ্ত পদ সাড়ে ছেচল্লিশটি।
ড. সুকুমার সেনের 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫১টি।
লুইপা। তিনি ২টি পদ রচনা করেন। যথা: ১, ২৯। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের বাঙালি কবি হিসেবে পরিচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, তিনি শবরপার শিষ্য ছিলেন। লুইপাকে আদি চর্যাকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
চর্যাপদের প্রথম পদটিঃ
কাআ (শরীর) তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল ॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই (বলে) গুরু পুচ্ছিঅ জাণ ॥
সঅল সহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মরিঅই ॥
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস ॥
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিত্তি বইঠা ॥
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা বা আলো-আঁধারির ভাষা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এর ভাষার নাম 'বঙ্গকামরূপী'। এটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।
উত্তরঃ
বিজয়গুপ্তর দেশ বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রাম। তিনি মনসামঙ্গল উপাখ্যান নিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে কাব্য রচনা করেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি বিজয়গুপ্ত। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, ঐতিহাসিকরা মনে করেন তাঁর জন্ম অধুনা বরিশাল জেলার গৈলা ইউনিয়নের পদমনাগ গ্রামে। এটি একটি জনশ্রুতি যা তাঁর কাব্যেও ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বিজয়গুপ্ত মূলত মনসামঙ্গল কাব্যের একজন প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর রচিত মনসামঙ্গল কাব্য 'পদ্মাপুরাণ' নামেও পরিচিত। এই কাব্যের মূল উপাখ্যান হলো দেবী মনসার মর্ত্যলোকে পূজা প্রচলন এবং চাঁদ সদাগরের সাথে তাঁর সংঘাত। তিনি মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে (১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বা ১৪৮৪ শকাব্দে কাব্য রচনা সমাপ্ত হয় বলে কাব্যে উল্লেখ আছে)।
মনসামঙ্গল কাব্যধারার পঞ্চকবিদের মধ্যে বিজয়গুপ্ত অন্যতম এবং তাঁর কাব্য সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় ও বিস্তারিত বলে বিবেচিত হয়। এই কাব্য মধ্যযুগের বাংলার সমাজ ও ধর্মীয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে, যেখানে লৌকিক দেব-দেবী এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের মধ্যে সংঘাত ও সমন্বয়ের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় কারণ তিনি বাংলা গদ্যকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ ও শৃঙ্খলা দান করেন। এর আগে বাংলা গদ্যে তেমন কোনো নিয়মশৃঙ্খলা ছিল না এবং এটি সাধু ভাষার কঠোরতা ও সংস্কৃতের প্রভাবযুক্ত ছিল।
তিনি বাংলা গদ্যে যেসব উল্লেখযোগ্য সংযোজন করেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো:
বিরামচিহ্নের প্রবর্তন ও সঠিক ব্যবহার: আধুনিক বাংলা গদ্যে কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি ইত্যাদি বিরামচিহ্নের ব্যবহার তিনিই প্রথম সুসংবদ্ধভাবে চালু করেন, যা গদ্যের অর্থ ও পঠনযোগ্যতা বৃদ্ধি করে।
সরল ও প্রাঞ্জল বাক্যবিন্যাস: বিদ্যাসাগর কঠিন ও জটিল বাক্যকে সহজ-সরল ও সুপাঠ্য বাক্যবিন্যাসে রূপান্তরিত করেন, যা সাধারণ পাঠকের জন্য গদ্যকে সহজলভ্য করে তোলে।
গদ্যের শৈল্পিকতা ও গতিশীলতা: তিনি বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতের প্রভাবমুক্ত করে এক নতুন শিল্পরূপ দেন। তাঁর গদ্য ছিল সাবলীল, গতিময় ও সুমধুর।
নির্দিষ্ট কাঠামো ও রূপ: তাঁর হাতেই বাংলা গদ্য প্রথম একটি নির্দিষ্ট কাঠামো ও শৈলী লাভ করে, যা পরবর্তী গদ্য লেখকদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়।
তাঁর রচিত 'বেতাল পঞ্চবিংশতি', 'শকুন্তলা', 'সীতার বনবাস' ইত্যাদি গ্রন্থগুলি বাংলা গদ্যের বিকাশে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
উত্তরঃ
মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি নাটক।
‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকটি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি নাটক। এটি ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয় এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। এর গুরুত্বগুলি নিম্নরূপ:
প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি: ‘কৃষ্ণকুমারী’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্র্যাজেডি নাটক। এর পূর্বে রচিত নাটকগুলোতে ট্র্যাজেডির গভীরতা ও শিল্পসম্মত প্রকাশ ছিল না। মধুসূদনের হাতেই বাংলা সাহিত্যে শেক্সপীয়রীয় ট্র্যাজেডির যথার্থ রূপায়ণ ঘটে।
ঐতিহাসিক পটভূমি: নাটকটি রাজস্থানের ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত। উদয়পুরের রানা ভীমসিংহের কন্যা কৃষ্ণকুমারীর আত্মাহুতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এটি আবর্তিত হয়েছে। এটি তৎকালীন রাজস্থানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা লিপ্সা এবং সামাজিক রীতিনীতি ফুটিয়ে তুলেছে।
চরিত্র চিত্রণ: নাটকের চরিত্রগুলি, বিশেষ করে কৃষ্ণকুমারী, ভীমসিংহ, জগৎসিংহ, মদনিকা প্রমুখের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সংঘাতের গভীরতা পাঠককে মুগ্ধ করে। কৃষ্ণকুমারীর আত্মত্যাগ নাটকটিকে মর্মস্পর্শী ট্র্যাজেডিতে পরিণত করেছে।
ভাষাগত উৎকর্ষ: মধুসূদন দত্তের কাব্যিক ভাষা ও প্রখর নাট্যশৈলী এই নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য। শক্তিশালী সংলাপ এবং নাটকের গতিশীলতা বাংলা নাট্যসাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সমাজ ও রাজনীতির প্রতিচ্ছবি: নাটকটি শুধু একটি প্রেম বা ট্র্যাজেডির গল্প নয়, এটি তৎকালীন সমাজের রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাজাদের দুর্বলতা এবং সম্মান রক্ষার নামে বলিদানের এক করুণ প্রতিচ্ছবি।
'কুহেলিকা' কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি বিখ্যাত উপন্যাস, যা ১৯৩১ সালে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে প্রেম, বিদ্রোহ, আত্মত্যাগ এবং তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করা হয়েছে। এটি নজরুলের বিপ্লবী চেতনা ও রোমান্টিক ভাবধারার এক অনবদ্য মিশ্রণ।
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ এবং দার্শনিক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যে কারণে তিনি 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে সমধিক পরিচিত। তার সাহিত্যে সাম্য, মানবতা এবং বিদ্রোহের বাণী প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সাহিত্যে (১৯৪৭-৯৩) প্রথম উল্লেখযােগ্য উপন্যাস হিসেবে আবু ইসহাক রচিত "সূর্য-দীঘল বাড়ী" কে গণ্য করা হয়। এটি ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয়।
উপন্যাসটি তৎকালীন পূর্ব বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ) গ্রামীণ সমাজের দরিদ্র মানুষের জীবন সংগ্রাম, দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা, কুসংস্কার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ এবং দেশভাগের ফলে সৃষ্ট আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় এর মূল প্রেক্ষাপট।
আবু ইসহাক এই উপন্যাসের মাধ্যমে সমাজের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন, যা তৎকালীন পূর্ব বাংলার সাহিত্যে এক নতুন ধারা উন্মোচন করেছিল। এর বিষয়বস্তু, ভাষা এবং উপস্থাপনা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি বাংলা সাহিত্যের একটি ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং পরবর্তীতে এটি চলচ্চিত্র রূপও লাভ করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।
চর্যাপদ হলো বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন এবং প্রাচীনতম বাংলা কাব্য। এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের এক ধরণের গান ও কবিতা সংকলন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস জানতে এবং প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে এটি মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার থেকে এর পুথি আবিষ্কার করেন। তাঁর সম্পাদনায় ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশিত হয়। চর্যাপদের ভাষা 'সন্ধ্যা ভাষা' নামে পরিচিত, যার অর্থ আংশিক আলো ও আংশিক অন্ধকারময় বা দ্ব্যর্থবোধক ভাষা।