প্রদত্ত বাক্য "অনাদি অনন্তকাল ধরে আমি চিরদিন তোমাকে স্মরণ করবো।" -এ বাহুল্য দোষ (redundancy) বিদ্যমান। 'অনাদি অনন্তকাল ধরে' এবং 'চিরদিন' উভয় পদই একই অর্থ, অর্থাৎ 'সবসময়' বা 'অনন্তকাল ধরে', প্রকাশ করে। একই বাক্যে সমার্থক দুটি বাচনভঙ্গি ব্যবহার করলে তা বাক্যের সৌন্দর্য ও প্রাঞ্জলতা নষ্ট করে এবং বাক্যকে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ করে তোলে। এটি এক প্রকার শব্দের অপচয়।
বাক্যকে শুদ্ধ ও সুসংহত করার জন্য এই ধরনের পুনরাবৃত্তি পরিহার করা উচিত। এক্ষেত্রে, যেকোনো একটি পদ বর্জন করে বাক্যটিকে সংক্ষিপ্ত ও সুস্পষ্ট করা সম্ভব। শুদ্ধরূপটি হতে পারে:
"আমি চিরদিন তোমাকে স্মরণ করবো।" (এটি অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত ও প্রচলিত।)
"অনাদি অনন্তকাল ধরে আমি তোমাকে স্মরণ করবো।" (এটিও ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ, তবে 'চিরদিন' ব্যবহার বাক্যকে অধিকতর সাবলীল করে।)
সাধারণত, বাংলা ব্যাকরণে বাক্য গঠনের ক্ষেত্রে বাহুল্য দোষ পরিহার করে অর্থকে সুনির্দিষ্ট ও সরল রাখা বাঞ্ছনীয়। সংশোধিত বাক্যটি এই নীতি অনুসরণ করে অর্থকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে এবং বাক্যকে আরও মার্জিত করেছে।
ভাষা হচ্ছে বহমান নদীর মতো, যা নিরন্তর বয়ে চলেছে নানা যৌক্তিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। তাই বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ তথা অপপ্রয়োগ থেকে মুক্ত থাকার জন্য দরকার ভাষার উপর পরিপূর্ণ জ্ঞান। ইংরেজ সময়কালের বা পাকিস্তানি শাসনামলের মুদ্রা যেমন একালে অচল, তেমনি ইংরেজ-পাকিস্তানি আমল তো বটেই, এমন কি আশি বা নব্বই দশকের কিছু কিছু বানানও আজকাল পরিত্যক্ত হয়েছে।
বাংলা পৃথিবীর একটি মর্যাদাসম্পন্ন ভাষা। ২১ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়: অথচ খোদ বাংলাদেশেই সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন যেমন হয়নি, মর্যাদাও তেমন দেওয়া হয় না। সবচেয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা যায় বানান ও উচ্চারণে, যা রীতিমতো পীড়াদায়ক। সাহিত্যকর্মের বাইরে পোস্টারে, বিজ্ঞাপনে, সাইনবোর্ডে, সংবাদপত্রের পাতায়, বেতার-টেলিভিশনে এই ভুলের ছড়াছড়ি। বাংলা ভাষায় ভুলের সীমাহীন যে নৈরাজ্য চলছে, তাতে কেবল ভাষার প্রতি অবহেলাই প্রকাশ পায় না, ভাষার নিয়ম-শৃঙ্খলা সম্পর্কে বিপুল অজ্ঞতাও প্রকট হয়ে দেখা দেয়।
ভাষাজ্ঞান এবং বানান পরিবর্তনের চলমান ধারার সাথে সংলগ্ন থাকতে পারলে, ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ ঘটানো সম্ভবপর হবে। উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা হলোঃ
ঈদ, নবী, পরী, পীর, পূর্ব, বীমা, রানী, লীগ, শহীদ শব্দগুলোর বানান কিন্তু অশুদ্ধ। শুদ্ধ বানানগুলো অশুদ্ধ মনে হওয়ার কারণ হচ্ছে এ বানানগুলো বিভিন্ন সরলীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংস্কার করে গৃহীত হয়েছে। পুরনো বানানগুলো যেহেতু দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল, তাই সেগুলো এখনো চোখকে বিভ্রান্ত করতে চায়। এ নিয়ে যে দ্বিধা, তা দূর হতে পারে শুধু একটি নিয়ম জানা থাকলে। এ শব্দগুলোর শুদ্ধরূপের নিয়মটি হলো:
যে শব্দটি তৎসম নয় অর্থাৎ সংস্কৃত নয়, সে শব্দটির বানানে কোথাও ঈ-কার, উ-কার দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে সর্বদাই ই- কার, উ- কার বসবে। যেমন- ইদ, নবি, পরি, পির, পুব, বিমা, রানি, লিগ, শহিদ ইত্যাদি। এখানে ই-কার, উ-কার বসার কারণ হলো যে, এ শব্দগুলোর কোনোটিই সংস্কৃত নয়। পূর্বে এ বানানগুলোতে ঈ-কার, উ-কার বসতো, বর্তমানে বানান পরিমার্জন করে সরল করা হয়েছে।
নিচে প্রয়োগ-অপপ্রয়োগের বিস্তারিত বর্ণনা উদাহরণসহ আলোচনা করা হলো:
১. ই-কার / ঈ- কার এর প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ: ১৯৮৮ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বাংলা বানানের নিয়মের একটি খসড়া প্রস্তুত করে এবং ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম প্রণয়ন করে। উভয় নিয়মেই যাবতীয় অতৎসম (অর্ধ-তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি) শব্দে কেবল হ্রস্বধ্বনি (ই, ই- কার, উ. উ- কার) ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। নিম্নে এর কিছু ব্যবহার তুলে ধরা হলো :
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
ঈদ
ইদ
এজেন্সী
এজেন্সি
একাডেমী
একাডেমি
কাজী
কাজি
কলোনী
কলোনি
কোরবানী
কোরবানি
কেরানী
কেরানি
কোম্পানী
কোম্পানি
গ্যালারী
গ্যালারি
গরীব
গরিব
গীটার
গিটার
চাকরী
চাকরি
জরুরী
জরুরি
জানুয়ারী
জানুয়ারি
টিউশনী
টিউশনি
ডায়েরী
ডায়েরি
ডিগ্রী
ডিগ্রি
তসবী
তসবি
দরদী
দরদি
নবী
নবি
নানী
নানি
নেভী
নেভি
নার্সারী
নার্সারি
বীমা
বিমা
ভাবী
ভাবি
মামী
মামি
রেফারী
রেফারি
লীগ
লিগ
লটারী
লটারি
লাইব্রেরী
লাইব্রেরি
শাশুড়ী
শাশুড়ি
ল্যাবরেটরী
ল্যাবরেটরি
শহীদ
শহিদ
সতীন
সতিন
সরকারী
সরকারি
সীলমোহর
সিলমোহর
সেক্রেটারী
সেক্রেটারি
হাজী
হাজি
ই-কার যুক্ত শব্দ:
অগ্নিবীণা
অধিকারিণী
টিপ্পনী
তপস্বিনী
প্রাণিবিদ্যা
প্রতিদ্বন্দ্বিতা
প্রণয়িনী
প্রতিযোগিতা
প্রাণিবাচক
পুনর্মিলনী
ভবিষ্যদ্বাণী
মন্ত্রিপরিষদ
শিঞ্জিনী
সহযোগিতা
সহপাঠিনী
স্থায়িত্ব
ঈ-কার যুক্ত শব্দ:
অঙ্গীকার
অন্তরীণ
অলীক
অধীন
আভীর
আশীর্বাদ
ঈপ্সা
ঈপ্সিত
ঈর্ষা
ঈষৎ
উড্ডীন
উদীচী
উড়িয়া/উড়ীয়া
উন্মীলন
একান্নবর্তী
কালীন
কৃষিজীবী
কীর্তি
কীর্তন
কিরীট
ক্ষীণজীবী
ক্ষুৎপীড়িত
গরীয়সী
গীতিকা
গরীয়ান
গীতাঞ্জলি
গীষ্পতি
গ্রীষ্ম
চীন
চীর
টীকা
তীক্ষ্ণ
তরণী
তীব্র
দিলীপ
দীপ্ত
দধীচি
দ্বিতীয়
দ্বীপ (দ্বিপ-হস্তী)
নিপীড়িত
নিমীলিত
নিরীহ
নিশীথিনী
নীচ
নিবীত
নীরব
নীরন্ধ্র
পীড়া
পরীক্ষা
প্রতীক
প্রতীচ্য
পীযুষ
পিপীলিকা
প্রতীক্ষা
প্রতীতি
প্রতীয়মান
প্রীত
প্রবীণ
বল্মীক
বাণী
বিপরীত
বীথি
বীভৎস
ব্রীহি
বীচি
বিবাদী
বীর
বেণী
ব্যতীত
ভীত
ভীম
ভাগীরথী
ভীষণ
মরীচিকা
শীকর
শীতাতপ
শরীর
শ্রীপদ
শীঘ্র
শীর্ণ
শারীরিক
সুশ্রী
সম্মুখীন
সমীপ
সমীচীন
সরীসৃপ
সমীহ
সীমন্ত
২.অপপ্রয়োগের কারণ যখন বিশেষণ দ্বিত্ব: বিশেষণ জাতীয় পদের সঙ্গে যদি পুনরায় বিশেষণবাচক উপসর্গ বা প্রত্যয় যোগ করা হয়, তাহলে যেসব শব্দ গঠিত হয় তা ব্যাকরণ সম্মত নয়। তথাকথিত এই দূষিত শব্দগুলো অপপ্রয়োগের ফলে সৃষ্ট। যেমন-
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
সকাতর
কাতর
সবিনয়পূর্বক
বিনয়পূর্বক
সকৃতজ্ঞ
কৃতজ্ঞ
সানন্দিত
সানন্দ
সলজ্জিত
লজ্জিত/সলজ্জ
সচেষ্টিত
চেষ্টিত/সচেষ্ট
সচিত্রিত
চিত্রিত/ সচিত্র
সশঙ্কিত
শঙ্কিত/সশঙ্ক
৩. অপপ্রয়োগের কারণ যখন বিশেষ্য / দ্বিত্ব: কোনো বিশেষ্য পদের সাথে আবার/-তা/ অথবা -ত্ব / প্রত্যয় যুক্ত করা হলে, যে শব্দটি গঠিত হয় তা ভুল শব্দ। এ জাতীয় শব্দের প্রয়োগ ব্যাকরণসম্মত নয় বলে এগুলো অপপ্রয়োগ। যেমন-
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অপকর্ষতা
অপকর্ষ
অপ্রতুলতা
অপ্রতুল
আব্রুতা
আব্রু
প্রসারতা
প্রসার
মৌনতা
মৌন
উৎকর্ষতা
উৎকর্ষ/উৎকৃষ্টতা
৪. বিশেষণের সাথে দুইবার প্রত্যয় যোগ করার কারণে অপপ্রয়োগ: সাধারণত বিশেষণ পদের শেষে /-য/ অথবা /-তা/ প্রত্যয় যোগ করা হলে, বিশেষণ পদটি বিশেষ্য পদে রূপান্তরিত হয়; পুনরায় ওই বিশেষ পদের সাথে যদি আবার প্রত্যয় যোগ করা হয়, তাহলে অপপ্রয়োগ ঘটে। যেমন: 'দরিদ্র' একটি বিশেষণ পদ। 'দরিদ্র' শব্দের সঙ্গে /-য/প্রত্যয় যোগ করলে গঠিত হয় (দরিদ্র + য) দারিদ্র্য। 'দারিদ্র্য' একটি বিশেষ্য পদ। এবার 'দারিদ্র্য'র সাথে যদি /-তা/ যোগ করা হয়, তাহলে গঠিত হয় (দারিদ্র্য+তা) দারিদ্র্যতা। 'দারিদ্র্যতা' গঠনে একই সঙ্গে /-য/ এবং /-তা/প্রত্যয় যুক্ত হওয়ার কারণে এটি অশুদ্ধ শব্দ। অপপ্রয়োগ ঘটেছে, এমন কিছু তথাকথিত শব্দের বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
যেমন-
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
আতিশয্যতা
আতিশয্য
ঐক্যতা
ঐক্য/একতা
কার্পণ্যতা
কার্পণ্য
গাম্ভীর্যতা
গাম্ভীর্য
চাঞ্জল্যতা
চাঞ্জল্য
চাতুর্যতা
চাতুর্য/চতুরতা
চাপল্যতা
চাপল্য
দারিদ্র্যতা
দারিদ্র্য/দরিদ্রতা
বাহুল্যতা
বাহুল্য
দৈন্যতা
দৈন্য/ দীনতা
ভারসাম্যতা
ভারসাম্য
সখ্যতা
সখ্য
সৌজন্যতা
সৌজন্য
সৌহার্দ্যতা
সৌহার্দ্য
৫. সমার্থক শব্দের বাহুল্যজনিত কারণে অপপ্রয়োগ: কখনও কখনও বাংলায় কোনো কোনো শব্দে সমার্থবোধক একাধিক শব্দের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। এ ধরনের প্রয়োগের ফলে শব্দ ব্যাকরণগতভাবে দূষিত হয়ে পড়ে। সমার্থক শব্দের বাহুল্যজনিত কারণে সৃষ্ট অপপ্রয়োগের উদাহরণ হলো-
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশ্রুজল
অশ্রু
আরক্তিম
আরক্ত/রক্তিম
আয়ত্তাধীন
আয়ত্ত/অধীন
শুধুমাত্র
শুধু / মাত্র
কদাপিও
কদাপি
কেবলমাত্র
কেবল / মাত্র
সমূলসহ
সমূল / মূলসহ
বিবিধপ্রকার
বিবিধ
সময়কাল
সময় / কাল
সুস্বাগত
স্বাগত
৬. সন্ধিজাত শব্দে বানান ভুলের জন্য অপপ্রয়োগ: সন্ধিজাতশব্দে পাশাপাশি দুই বা তার চেয়ে বেশি ধ্বনি মিলিত হয়ে একটি ধ্বনিতে পরিণত হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে ধ্বনিটি কী হবে, তা সন্ধির সূত্র অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। এক্ষেত্রে কোনো রকম স্বাধীনতা গ্রহণ করা চলে না। আমরা অনেকেই সন্ধিজাত শব্দের বানান লেখার সময় বানানে স্বেচ্ছাচার করে থাকি, যার ফলে শব্দে অপপ্রয়োগ ঘটে থাকে। যেমন-
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অদ্যবধি
অদ্যাবধি
উপরোক্ত
উপর্যুক্ত
তরুছায়া
তরুচ্ছায়া
দুরাবস্থ
দুরবস্থা
দুরাদৃষ্ট
দুরদৃষ্ট
প্রাত:রাশ
প্রাতরাশ
বক্ষোপরি
বক্ষ-উপরি
বিপদোদ্ধার
বিপদুদ্ধার
মুখছবি
মুখচ্ছবি
৭. সমাসঘটিত শব্দে অপপ্রয়োগ: ব্যাসবাক্য থেকে সমস্তপদ যখন গঠিত হয়, তা সমাসের নিয়ম অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রূপ লাভ করে। শব্দ গঠন অনুযায়ী ব্যাসবাক্য থেকে কখনও কখনও তা ভিন্নরূপ লাভ করে। যেমন: মহান যে মানব = 'মহানমানব' নয়- 'মহামানব'; জায়া ও পতি = ‘জায়াপতি’ নয়- 'দম্পতি'।
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অহোরাত্রি
অহোরাত্র
অহর্নিশি
অহর্নিশ
দিবারাত্রি
দিবারাত্র
নীরোগী
নীরোগ
নিজ্ঞানী
নির্জ্ঞান
নির্বিরোধী
নির্বিরোধ
নিরভিমানী
নিরভিমানী
নিরপরাধী
নিরপরাধ
নির্দোষী
নির্দোষ
দিনরাত্র
দিনরাত্রি/দিবারাত্র
মধ্যরাত্রি
মধ্যরাত্র
সুবুদ্ধিমান
সুবুদ্ধি
৮. প্রত্যয়ঘটিত অপপ্রয়োগ: প্রকৃতির সাথে প্রত্যয়যুক্ত হয়ে যখন শব্দ গঠিত হয়, তখন সংগত কারণেই তার বানানে কিছুটা বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। সচেতন না থাকলে এসব ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অধীনস্থ
অধীন
অসহ্যনীয়
অসহনীয়/অসহ্য
আবশ্যকীয়
আবশ্যক
একত্রিত
একত্র
চোষ্য
চূষ্য
লব্ধপ্রতিষ্ঠিত
লব্ধপ্রতিষ্ঠ
সাধ্যাতীত
অসাধ্য
সত্বা
সত্তা
স্বত্ত্ব
স্বত্ব
সম্ভ্রান্তশালী
সম্ভ্রমশালী/সম্ভ্রান্ত
সিঞ্চন
সেচন
সিঞ্চিত
সিক্ত
৯. উৎকর্ষবাচক- তর, তম প্রত্যয়ের অপপ্রয়োগ: উৎকর্ষবাচক শব্দ ব্যবহারে, আমরা কী রকম অজ্ঞানতার মধ্যে ডুবে আছি যেটি খুব অল্প কথায় ড. মাহবুবুল হক বিশ্লেষণ করেছেন। আমরা সরাসরি তাঁর বই থেকে একটি অংশ তুলে ধরছি: 'বাংলায় উৎকর্ষের সর্বাধিক্য বোঝাতে গুণবাচক শব্দের সঙ্গে /-ইষ্ঠ/ প্রত্যয় যুক্ত হয়। যেমন: কনিষ্ঠ, গরিষ্ঠ, জ্যেষ্ঠ, পাপিষ্ঠ্য, বলিষ্ঠ, লঘিষ্ঠ, শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি। এসব শব্দের সঙ্গে ভুলবশত অনেকে দুইয়ের মধ্যে একের উৎকর্ষবাচক/-তর/এবং বহুর মধ্যে একের উৎকর্ষবাচক/-তম/ প্রত্যয় যুক্ত করে থাকেন। যেমন: কনিষ্ঠর/ কনিষ্ঠতম, বলিষ্ঠতম/ বলিষ্ঠতম, শ্রেষ্ঠতম ইত্যাদি। এরকম প্রয়োগ অশুদ্ধ।
১০. বহুল প্রচলিত বানানের প্রভাবে অপপ্রয়োগ: বাংলা বানানে বহুলপ্রচলিত শব্দগুলি তুলনামূলক কম প্রচলিত শব্দের বানানের ওপর প্রবল প্রভাব ফেলে। ফলে অপপ্রয়োগ দেখা যায়। কিছু উদাহরণ দেয়া হলো: 'ভূগোল' বানানে উ-কার আছে কিন্তু এর প্রভাবে 'ভূবন' বানানে উ-কার দেওয়া হলো, যা অপপ্রয়োগ। 'স্বাধীনতা' বানানের প্রভাবে যদি লেখা হয় 'স্বাধীকার' তাহলে অপপ্রয়োগ হবে। শুদ্ধ শব্দটি হচ্ছে সাধীকার। এরূপ 'বিবাদ' শুদ্ধ, কিন্তু 'বিবাদমান' শুদ্ধ নয়, শুদ্ধ প্রয়োগ করতে হলে ব্যবহার করতে হবে 'বিবদমান'।
১১. সমাসঘটিত শব্দের বানানে অশুদ্ধি: 'সমাস' (সম্- √অস্ +অ) শব্দের অর্থই হচ্ছে সংক্ষেপণ, মিলন, একাধিক পদের একপদীকরণ।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, “পরস্পর অর্থ-সঙ্গতিবিশিষ্ট দুই বা বহু পদকে লইয়া একপদ করার নাম সমাস।”
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, “একাধিক শব্দ একত্র জুড়িয়া একটি বৃহৎ শব্দ সৃষ্টি করাকে সমাস বলে।”
বাংলা একাডেমি প্রণীত ও প্রকাশিত "প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ" গ্রন্থে সমাসের সংজ্ঞার্থ নিরূপিত হয়েছে এভাবে: "সমাস অভিধানের শব্দ নির্মাণের একটি প্রক্রিয়া যাতে দুই বা তার চেয়ে বেশি শব্দ যুক্ত হয়ে একটি অখণ্ড শব্দ তৈরি করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি সম্মিলিত ধারণা প্রকাশ করে।" সমাসবদ্ধ শব্দ তাই একত্রে লিখতে হয়- নতুবা অপপ্রয়োগ হবে। কিছু উদাহরণ হলো:
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
আপন জন
আপনজন
ক্রয় ক্ষমতা
ক্রয়ক্ষমতা
জীবন ধারা
জীবনধারা
দৃঢ় প্রতিজ্ঞ
দৃঢ়প্রতিজ্ঞ
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী
ধর্ম ব্যবসায়ী
ধর্ম ব্যবসায়ী
বিপথ গামী
বিপথগামী
প্রচার মাধ্যম
প্রচার মাধ্যম
পূর্ব প্রস্তুতি
পূর্বপ্রস্তুতি
প্রবাস জীবন
প্রবাসজীবন
বাস্তব সম্মত
বাস্তবসম্মত
যুক্ত বিবৃতি
যুক্তবিবৃতি
যুদ্ধ বিধ্বস্ত
যুদ্ধবিধ্বস্ত
মৎস্য সম্পদ
মৎস্যসম্পদ
অশুদ্ধ
শুদ্ধ
অকাল প্রায়াত
অকালপ্রায়াত
অনন্য সাধারণ
অনন্যসাধারণ
অনুমান নির্ভর
অনুমাননির্ভর
জমিদার বাড়ি
জমিদারবাড়ি
জীবন সংগ্রাম
জীবনসংগ্রাম
জীবন সঙ্গিনী
জীবনসংগ্রাম
দল নিরপেক্ষে
দলনিরপেক্ষে
নীতি নির্ধারক
নীতিনির্ধারক
পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বেকার সমস্যা
বেকারসমস্যা
ব্যক্তি মালিকানা
ব্যক্তিমালিকানা
ভাব বিনিময়
ভাববিনিময়
শোক সংবাদ
শোকসংবাদ
শিক্ষা ব্যবস্থা
শিক্ষাব্যবস্থা
সমাজ সেবা
সমাজসেবা
সমুদ্র সৈকত
সমুদ্রসৈকত
সর্বজন শ্রদ্ধেয়
সর্বজনশ্রদ্ধেয়
সাহায্য সংস্থা
সাহায্যসংস্থা
১২. অর্থগত অপপ্রয়োগ: (সমোচ্চারিত ও প্রায়-সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দের অর্থপার্থক্যজনিত অপপ্রয়োগ)
প্রতিটি ভাষার শব্দ ভাণ্ডারে থাকে অজগ্র শব্দ, তবু থেকে যায় অনেক সীমাবদ্ধতা। ওই ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ তখন কখনও বানানে, কখনও উচ্চারণে কিছুটা রদবদল করে নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করে তার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করে। অনেক সময় এত সব করেও তার প্রয়োজন মেটে না; তার প্রয়োজন পড়ে আরও অজস্র শব্দ। তখন একই বানানে, একই উচ্চারণে তারা ভিন্ন অর্থের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। এই তিনটি উপায়ে গঠিত শব্দসমূহ সমোচ্চারিত ও প্রায়-সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ হিসেবে পরিচিত। যেমন:
ক. যুগল: দিন: দিবস, দীন: দরিদ্র পরিবর্তন কেবল বানানে, উচ্চারণে কোনো পার্থক্য নেই।
খ. যুগল চুড়ি: অলংকার বিশেষ, চুরি: চৌর্যবৃত্তি (একটি অপরাধকর্ম) [পরিবর্তন একই সঙ্গে বানানে ও উচ্চারণে]
গ. যুগল চাল চাউল, চাল কৌশল বানান বা উচ্চারণে কোনো পার্থক্য ঘটছে না, অথচ ভিন্ন অর্থবোধক নতুন শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে।। যেমন: আমাদের বাসায় আজ চাল নেই।
তোমার চাল ধরতে পারছি না।
বাংলা অভিধানে এমন অসংখ্য শব্দ রয়েছে যেগুলোর জন্য আমরা পদে পদে বিড়ম্বনার মুখোমুখি হই। বানান একই, অথচ অর্থের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।