পারস্যের কবি হাফিজের সাথে পত্রালাপ হতো বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের।
মধ্যযুগে বাংলার স্থানীয় অঞ্চলপ্রধান ও জমিদারদের মধ্যে যারা সম্রাট আকবর এবং জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে মুঘলবিরোধী প্রতিরোধ গড়েছিলেন তারা ইতিহাসে 'বারোভূঁইয়া' নামে পরিচিত।
সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫ সাল) সমগ্র বাংলার ওপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। সে সময় বাংলার বড় বড় জমিদারগণ মুঘলদের অধীনতা মেনে নেননি। তারা নিজ নিজ জমিদারিতে স্বাধীন ছিলেন। যখনই মুঘলরা বাংলা দখল করতে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে তখনই এসব জমিদার একজোট হয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এ জমিদারগণ 'বারোভূঁইয়া' নামে পরিচিত। এ 'বারো' বলতে বারো জনের সংখ্যা বোঝায় না। মূলত অনির্দিষ্ট সংখ্যক জমিদারদের বোঝাতেই এ 'বারো' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বারোভূঁইয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ঈসা খান, মুসা খান, ওসমান খান, চাঁদ রায়, লক্ষণ মাণিক্য প্রমুখ।
উদ্দীপকে পাঠ্যবইয়ে বর্ণিত সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির কথা আলোকপাত করা হয়েছে। তার বঙ্গ বিজয় একটি চমকপ্রদ ঘটনা।
বখতিয়ার খলজি বিহার বিজয়ের পরের বছর অধিক সংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করে নবদ্বীপ বা নদীয়া আক্রমণ করেন। এ সময় বাংলার রাজা লক্ষণ সেন নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন। গৌড় ছিল তার রাজধানী, আর নদীয়া ছিল তার দ্বিতীয় রাজধানী। বিহার হতে বাংলায় প্রবেশ করতে হলে তেলিয়াগড় ও শিকড়িগড় এই দুই গিরিপথ দিয়ে আসতে হতো। এ গিরিপথ দু'টো ছিল বেশ সুরক্ষিত। তিনি প্রচলিত পথে অগ্রসর না হয়ে অরণ্যময় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়াতে তার সৈন্যদল খণ্ড খণ্ড ভাবে অগ্রসর হয়। তিনি এত ক্ষিপ্রগতিতে পথ অতিক্রম করেছিলেন যে, মাত্র ১৭/১৮ জন সৈনিক তাকে অনুসরণ করতে পেরেছিল। আর মূল সেনাবাহিনীর বাকি অংশ তার পশ্চাতে ছিল। মধ্যাহ্নভোজের সময় খলজি বণিকের ছদ্মবেশে নগরীর দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছান। রাজা লক্ষণ সেন তাদেরকে অশ্ব ব্যবসায়ী মনে করে নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দেন। কিন্তু এ ক্ষুদ্র দল রাজপ্রাসাদের সম্মুখে এসে হঠাৎ তরবারি উন্মুক্ত করে প্রাসাদ রক্ষীদের হত্যা করে। এতে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে প্রাসাদ অরক্ষিত রেখে সবাই প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায়। এমতাবস্থায় শত্রুর আক্রমণ হতে আত্মরক্ষার কোনো উপায় না দেখে রাজা লক্ষণ সেন পেছনের দরজা দিয়ে সপরিবারে পূর্ববঙ্গের মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে আশ্রয়গ্রহণ করেন। এর ফলে বিনা বাধায় নদীয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে আসে।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে, একজন ভাগ্যান্বেষী সৈনিকের বাংলা ও বিহার বিজয়ের কাহিনি ইতিহাসে আজও সমাদৃত, যা উপরে আলোচিত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বাংলা ও বিহার বিজয়ের কাহিনির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। উল্লিখিত আলোচনা শেষে তাই বলা যায়, বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয় ছিল এক অনন্যসাধারণ ঘটনা। তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব বহন করে তার বঙ্গ বিজয়ের কৌশল পদ্ধতি এবং এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, যুদ্ধ ক্ষেত্রে শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন উত্তম বুদ্ধিমত্তা বা কৌশল।
হ্যাঁ, উক্ত সৈনিক অর্থাৎ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির হাত ধরেই বাংলায় তুর্কি তথা মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়।
শিহাবউদ্দিন ঘোরি (মুহাম্মদ ঘোরি, ১১৭৩-১২০৬ সালে) ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করলেও তা উত্তর ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ সময় বাংলার শাসন ক্ষমতায় সেন শাসকরা ছিল। তখন দূরত্ব, দুর্গমতা এবং বাংলার শাসকদের শক্তিশালী অবস্থানের কারণে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ১২০৪ সালে কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাপতি বখতিয়ার খলজি বাংলা জয় করে যে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন তাই ছিল বাংলায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম' মুসলিম শাসন। সমকালীন ইতিহাসবিদ মিনহাজ উস সিরাজ রচিত 'তবকাত-ই-নাসিরী' গ্রন্থও এ তথ্যকে সমর্থন করে। বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের পূর্বে বঙ্গভূমিতে আরব বণিক, ইসলাম প্রচারক ও সুফি-সাধকদের আগমন ঘটেছিল। তাদের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। তবে তারা মুসলিম শাসন কায়েম করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে বখতিয়ার খলজি বাংলার উত্তর ও উত্তর- পশ্চিমাংশে সেন শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুসলমান শাসনের সূচনা করেন।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের পূর্বে এ অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটলেও তিনিই সর্বপ্রথম বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
Related Question
View Allরাজা গণেশ দিনাজপুরের ভাতুলিয়া অঞ্চলের রাজা ছিলেন।
ইলিয়াস শাহ সমগ্র বাংলাকে একত্রিত করে এর প্রকৃত স্বাধীনতা সূচনা করেন। তাই তাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রবক্তা বলা হয়।
ইলিয়াস শাহ ফিরোজাবাদের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে উত্তর ও উত্তর পশ্চিম বাংলার অধিপতি হন। তারপর তিনি সোনারগাঁও, সাতগাঁও, বিহার, উড়িষ্যা, আসাম ইত্যাদি জয় করে বৃহত্তর বাংলার সৃষ্টি করেছিলেন। এ সময় থেকেই বাংলার সকল অঞ্চলের অধিবাসী 'বাঙালি' বলে পরিচিত হয়। আর এ কারণেই ইলিয়াস শাহকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বলা হয়।
উদ্দীপকে বিজয়ী সেনাপতির যুদ্ধ কৌশলের প্রতিফলন পাঠ্যবইয়ের ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির কর্মে প্রতিফলিত হয়েছে।
বখতিয়ার খলজি বিহার বিজয় করার পর নদীয়া আক্রমণ করার মনোস্থির করেন। রাজা লক্ষণ সেন তখন নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন। বিহার হতে বাংলায় প্রবেশ করতে হলে তেলিয়াগড় ও শিকড়িগড় এই দুই গিরিপথ দিয়ে আসতে হতো। কিন্তু এ গিরিপথ দুটি সুরক্ষিত থাকায় বখতিয়ার খলজি এ পথে না এসে ঝাড়খণ্ডের অরণ্যময় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়াতে তার সৈন্যদল খণ্ড খণ্ড ভাবে অগ্রসর হয়। মাত্র ১৭/১৮ জন সৈনিক নিয়ে বখতিয়ার খলজি মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে নদীয়া বিজয় করেন।
উদ্দীপকেও দেখা যায়, রোমান যোদ্ধারা একইভাবে উপদলে বিভক্ত হয়ে জঙ্গল পথে বিপক্ষদলের প্রাসাদ আক্রমণের পরিকল্পনা করে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের বিজয়ী সেনাপতির কৌশলের প্রতিফলন পাঠ্যবইয়ের বখতিয়ার খলজির যুদ্ধকৌশলে প্রতিফলিত হয়েছে।
উদ্দীপকে বখতিয়ার খলজির যুদ্ধকৌশল প্রতিফলিত হয়েছে। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি প্রথম জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও ভাগ্য ও কর্মশক্তির সংমিশ্রণ তাকে সফলতা এনে দেয় বলে আমি মনে করি।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক দশত-ই-মার্গের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ১১৯৫ খ্রিষ্টাব্দে নিজ জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে জীবিকার অন্বেষণে গজনিতে আসেন। এখানে তিনি শিহাবউদ্দিন ঘোরীর সৈন্য বিভাগে চাকরিপ্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। গজনিতে ব্যর্থ হয়ে তিনি দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের দরবারে গিয়েও চাকরি পেতে ব্যর্থ হন। এরপর বদাউনের শাসনকর্তা মালিক হিজবরউদ্দিন তাকে মাসিক বেতনে সৈন্য বিভাগে নিযুক্ত করেন। কিন্তু উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার এ ধরনের সামান্য বেতনে সন্তুষ্ট না হয়ে বদাউন ত্যাগ করে অযোধ্যায় যান। সেখানকার শাসনকর্তা তার সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ভাগবত ও ভিউলি নামক দুটি পরগনার জায়গীর দান করেন। বিহার জয় করে বখতিয়ার খলজি অনেক ধনরত্নের মালিক হন। এরপর তিনি রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে নদীয়া দখল করেন। তারপর তিনি লক্ষ্মণাবতী অধিকার করে সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন।
তাই বলা যায়, প্রাথমিক জীবনে ব্যর্থ হলেও বখতিয়ার খলজি ভাগ্য ও কর্মের সমন্বয়ে পরবর্তীতে সফলতা লাভ করেন।
বাংলায় মুসলমান শাসকদের মধ্যে গিয়াসউদ্দিন ইওজ খলজি নৌবাহিনীর গোড়াপত্তন করেন।
বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হওয়াতে বাংলাকে 'বুলগাকপুর' বলা হয়েছিল।
বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনা থেকে অর্থাৎ ১২০৪ সাল থেকে ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত সময়কাল ছিল খুবই গোলযোগপূর্ণ। বাংলার শাসকগণ দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীন হতে চাইলে দিল্লির আক্রমণের মুখে তা ব্যর্থ হয়। ফলে মুসলমান শাসনের এ সময় ছিল বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলাময়। তাই ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানী বাংলাকে 'বুলগাকপুর' অর্থাৎ বিদ্রোহের নগরী বলে আখ্যায়িত করেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!