জীবনানন্দ দাশকে 'আধুনিক নাগরিক কবি' বলা হয়। তাকে বিশ শতকের অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি হিসেবে গণ্য করা হয়। তার কবিতায় নাগরিক জীবন ও সভ্যতার গভীরে লুকিয়ে থাকা বিচ্ছিন্নতা, বিষণ্ণতা, একাকীত্ব এবং আধুনিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা অত্যন্ত সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রকৃতির অনুষঙ্গকে ব্যবহার করে তিনি নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা ও হাহাকার ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তাকে এই উপাধি এনে দিয়েছে।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে: ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, রূপসী বাংলা ইত্যাদি। 'বনলতা সেন' কাব্যগ্রন্থটি তাকে বিপুল খ্যাতি এনে দেয়। তার কবিতার ভাষা স্বতন্ত্র এবং চিত্রকল্পগুলো গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে।
তিরিশের দশকের তথাকথিত জনবিচ্ছিন্ন, রবীন্দ্র বলয় ছিন্নকারী ও উত্তরকালের কবিদের উপর সর্বাপেক্ষা প্রভাববিস্তারকারী কবি জীবনানন্দ দাশগুপ্ত। তাঁর রচনায় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যময় প্রকৃতি কাব্যময় হয়ে উঠেছে। আধুনিক নাগরিক জীবনের হতাশা, নিঃসঙ্গতা, বিষাদ ও সংশয়ের চিত্র তাঁর কবিতায় দীপ্যমান। সাধু ও চলিত ভাষার মিশেল হলো তাঁর কাব্য ভাষার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। বিশ শতকের ষাটের দশকের বাঙালির জাতিসত্ত্বা আন্দোলনে ও ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর নিসর্গবিষয়ক কবিতা এদেশের সংগ্রামী জনতাকে অনুপ্রাণিত করেছে।
জীবনানন্দ দাশ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯ সালে বরিশালের এক ব্রাহ্ম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। (আদি নিবাস: গাঁওপাড়া গ্রাম, বিক্রমপুর)। ডাকনাম- মিলু।
তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশ (একজন মহিলা কবি)।
১৯১৯ সালে ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় তাঁর প্রথম কবিতা 'বর্ষা আবাহন' প্রকাশিত হয়।
তিনি ১৯৪৭ সালে 'দৈনিক স্বরাজ' পত্রিকার সাহিত বিভাগের সম্পাদক ছিলেন।
তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মৃত্যুবরণ করলে তিনি 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' নামে একটি কবিতা লেখেন। এটি 'বঙ্গবাণী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
তিনি ১৪ অক্টোবর, ১৯৫৪ সালে বালিগঞ্জে ট্রামের দিতে পড়ে আহত হন, পরে ২২ অক্টোবর শম্ভুগঞ্জ পৃষ্ঠা হাসপাতালে মারা যান।
জীবনানন্দ দাশকে রূপসী বাংলার কবি, ধূসরতার কবি, তিমির হননের কবি, নির্জনতার কবি, চিত্ররূপময় কবি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ধূসর পাণ্ডুলিপি'র কবিতা পাঠ করে বলেছেন 'চিত্ররূপময় কবিতা'; বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দকে দাশকে 'নির্জনতম কবি' এবং অন্নদাশঙ্কর রায় 'শুদ্ধতম কবি' বলে আখ্যায়িত করেন।
জীবনানন্দ দাশের ওপর গবেষণা করেন ক্লিনটন বি. সিলি।
জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থগুলো:
'ঝরাপালক' (১৯২৭; বাংলা: ১৩৩৪): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্য। এ কাব্য রচনায় তিনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে অনুকরণ করেছেন। এ কাব্যের মাধ্যমে নামের শেষে 'দাশগুপ্ত' এর পরিবর্তে 'দাশ' ব্যবহার করেন। এ কাব্যগ্রন্থে মোট ৩৫টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত আছে।
'ধূসর পাণ্ডুলিপি' (১৯৩৬): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা 'মৃত্যুর আগে'। এটি বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা' সাহিত্য পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়। এ কবিতাটি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেব বসুকে লেখা এক চিঠিতে 'চিত্ররূপময়' বলে মন্তব্য করেন। কবিতাটির সাথে W. B Yeats এর The Falling of the Leaves's কবিতার মিল আছে।
'বনলতা সেন' (১৯৪২): ৩০টি কবিতার সমন্বয়ে রচিত এ কাব্য। ভারতীয় পুরাণের অন্তর্ভুক্ত বিষয় যেমন বিদিশা, শ্রাবস্তী উঠে এসেছে, তেমনি বেতের ফলের মতো বা পাখির নীড়ের মতো চোখ ইত্যাদি উপমাগুলোর সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন এ কাব্যে। প্রেম ও প্রকৃতি, খণ্ড জীবন ও হতাশা, ক্লান্তি ও অবসাদ, ইতিহাসের বিশাল অনুভূতি ও বর্তমানের ছিন্নভিন্ন অস্তিত্ব, সব কিছুর সমাহার ঘটিয়েছেন তিনি এ কাব্যে। এ কাব্যের 'বনলতা সেন' কবিতাটি তিনি এডগার এলেন পোর 'টু হেলেন' কবিতার অনুকরণে রচনা করেন। এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা: আমি যদি হতাম, হায় চিল, শঙ্খমালা, শিকার, সুদর্শনা, সুরঞ্জনা, সুচেতনা প্রভৃতি।
'রূপসী বাংলা' (১৯৫৭): কবির মৃত্যুর পর এ কাব্যের পূর্ণাঙ্গ পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়। তিনি এ গ্রন্থটির প্রচ্ছদে নাম রেখেছিলেন 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা'। কিন্তু ১৯৫৭ সালে প্রকাশের সময় এর নামকরণ করা হয় 'রূপসী বাংলা'। কবির ছোটবোন সুচরিতা দাশের সহায়তায় লেখার খাতা থেকে প্রেসকপি তৈরি করেছিলেন কবি ভূমেন্দ্র গুহ। ৬২টি কবিতা সম্বলিত এ কাব্যের বিষয় বাংলার গ্রাম, প্রকৃতি, নদী-নালা, পশু-পাখি, উৎসব ও অনুষ্ঠান। কবিতাগুলো সনেট আকারে লিখিত হলেও কবি তাঁর প্রিয় অক্ষরবৃত্ত ছন্দের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। এটি তাঁর স্বদেশপ্রীতি ও নিসর্গময়তার পরিচায়ক কাব্য। এ কাব্যের অন্যতম কবিতা 'এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে'। এ কাব্যের অন্তর্গত 'আবার আসিব ফিরে' কবিতা ।
'মাল্যবান' (১৯৭৩): উপন্যাসটি কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। দাম্পত্য জীবনের নিষ্ঠুর কাহিনি, সম্পর্কের জটিলতা, পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতাবোধের এক নিষ্ঠুর উপাখ্যানকে ঘিরে এ উপন্যাস রচিত।
'সুতীর্থ' (১৯৭৪), 'কল্যাণী' (১৯৯৯)। [সবকটি উপন্যাস কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত]
জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধঃ
'কবিতার কথা' (১৯৫৫): এ প্রবন্ধের বিখ্যাত উক্তি, 'সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।'
জীবনানন্দ দাস (১৮৯৯-১৯৫৪) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান আধুনিক কবি। তাঁকে 'রূপসী বাংলার কবি' বা 'নির্জনতার কবি' নামেও অভিহিত করা হয়। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, মৃত্যুচেতনা এবং ঐতিহাসিকতা এক বিশেষ শৈলীতে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬), বনলতা সেন (১৯৪২), মহাপৃথিবী (১৯৪৪), সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮), রূপসী বাংলা (১৯৫৭, মরণোত্তর প্রকাশিত) এবং বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১, মরণোত্তর প্রকাশিত)। বাংলা কাব্যে তাঁর অবদান অপরিসীম, যা তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি। তিনি বাংলা কবিতায় এক নতুন দিক উন্মোচন করেন এবং তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও মৃত্যুচেতনা বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাঁকে "রূপসী বাংলার কবি" নামেও অভিহিত করা হয়। তাঁর স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও চিত্রকল্প বাংলা কবিতায় এক নতুন দিগন্ত এনে দেয়।
'ধূসর পাণ্ডুলিপি' (১৯৩৬) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থে কবির নিসর্গপ্রীতি, বিষণ্ণতা, একাকীত্ববোধ এবং গভীর জীবনদর্শন এক বিশেষ কাব্যিক ভঙ্গিমায় মূর্ত হয়েছে। এটি বাংলা কবিতায় আধুনিকতার উন্মোচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং জীবনানন্দ দাশের স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও জীবনদৃষ্টির পরিচয় বহন করে।