মহান আল্লাহ তায়ালা মানব জাতিকে নারী ও পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ উভয়েই সমমর্যাদার' অধিকারী। কোথাও শুধু পুরুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বলা হয়নি। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীতে নারী জাতিকে অত্যন্ত অবজ্ঞার চোখে দেখা হতো। তাদের জান ও ইজ্জতের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। তাদেরকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা নারীদের শুধু ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাদেরকে দাসী হিসেবে গণ্য করেছে। একমাত্র ইসলাম ধর্মই নারীকে তার যথাযথ স্থানে সমাসীন করে তাদের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ইসলামে নারীর মর্যাদা অনেক। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
ইসলামে নারীর অধিকার: ইসলামে নারীর বহুবিধ অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। যেমন-
১. মাতা হিসেবে: মাতা হিসেবে একজন নারীর মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারিণী হলেন মা। একজন মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, "আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেন এবং দু'বছর পর্যন্ত স্তন্য পান করান।" এছাড়াও মাতার মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে রসুলের একাধিক হাদিস বিদ্যমান। যথা: "জননীর পদতলে সন্তানের বেহেশত।" এছাড়াও তিনি বলেন, "আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পরে সবচেয়ে অধিক সম্মান, মর্যাদা ও সদ্ব্যবহার পাবার যোগ্য হলেন মাতা।" এভাবেই ইসলাম মাতা হিসেবে একজন নারীকে পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।
২. স্ত্রী হিসেবে: স্ত্রী হিসেবে একজন নারীর মর্যাদা অতি উচ্চে। স্ত্রীকে স্বামীর সমমর্যাদা প্রদান করেছে ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, স্ত্রীদের ওপর স্বামীর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমন স্বামীদের প্রতি স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে। রসুল (স) তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণে স্ত্রীদের অধিকার নিশ্চিত করে বলেন, “তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে।”
৩. কন্যা হিসেবে কন্যা হিসেবে একজন নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে একমাত্র ইসলাম ধর্মই। ইসলামের পূর্বে কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। ইসলাম এই প্রথা বাতিল করেছে। মহানবী (স) বলেন, "যার কন্যা সন্তান জন্ম নেয়, কিন্তু তাকে জীবন্ত কবর দেয় না, লাঞ্ছিত করে না এবং পুত্র সন্তানকে তার থেকে বেশি ভালোবাসে না, আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।" এ থেকে একজন কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা কতটুকু তা অনুধাবন করা যায়।
৪. দাসী হিসেবে দাসী হিসেবে একজন নারীর যে অধিকার প্রাপ্য তা নিশ্চিত করেছে একমাত্র ইসলাম। রসুল (স) বিদায় হজের ভাষণে বলেন, "তোমরা তোমাদের দাস-দাসীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো, তোমরা যা খাবে, তোমাদের দাস-দাসীদেরকেও তা খাওয়াবে এবং তোমরা যা পরবে তাদেরকেও অনুরূপ পরাবে।"
৫. সম-অধিকার প্রদান: ইসলাম নারীকে পুরুষের সমান অধিকার প্রদান করেছে। তাদেরকে কোনোভাবে অবহেলিত করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা- "হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাক এবং সেখান থেকে তোমরা দুজনে ইচ্ছামতো পানাহার কর।" এই আয়াতে নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে।
৬ . বিবাহের ক্ষেত্রে: ইসলাম নারীদের বিবাহের ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বাধীনতা প্রদান করেছে। এক্ষেত্রে তাদেরকে কোনোভাবেই জোরজবরদস্তি করা যাবে না। তাদের ইচ্ছা ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হবে না। ইজাব-কবুলে তাদের মতামতের মূল্য দেওয়া হয়েছে।
৭. সামরিক ক্ষেত্রে ইসলাম সামরিক ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। নারীরা যুদ্ধের ময়দানে অংশগ্রহণ করতে পারবে। নারীরা যুদ্ধে পুরুষদের সেবা ও চিকিৎসার জন্য যেতে পারবে। ইসলামের অনেক যুদ্ধে মুসলিম নারীরা। অংশগ্রহণ করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
৮. আইনগত মর্যাদা: আইনের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ সমান। ইসলামে উভয়ের জন্যই ভালো কাজের পুরস্কারের ব্যবস্থা এবং অন্যায় কাজের জন্য শাস্তি রয়েছে। নারীদেরকে এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
পরিশেষে এ কথাই প্রমাণিত হয়, চির অবহেলিত নারী সমাজকে ইসলামই প্রথম যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেছে। তাদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করেছে। তাদেরকে দিয়েছে সার্বিক মুক্তি। বন্দি-শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে। এককথায়, ইসলাম নারীদেরকে যে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে তা দেওয়া হয়নি।
Related Question
View All'কুরআন' আরবি শব্দ, কারউন ধাতু থেকে এসেছে। শাব্দিক অর্থ পড়া, তিলাওয়াত করা। কুরআনের অপর নাম আল ফুরকান অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার প্রভেদকারী। আর এতে সর্বপ্রকার জ্ঞান-বিজ্ঞানের রহস্যাবলি সন্নিবেশিত আছে বলে একে আল-হাকীম বা জ্ঞানভাণ্ডার বলেও আখ্যায়িত করা হয়।
কুরআন মহান আল্লাহর কালাম। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) যেমন বিশ্বের সকল মানুষের নিকট আল্লাহর প্রেরিত মুক্তিদূত, তেমনি পবিত্র কুরআনও সর্বকালীন মানুষের মুক্তির মহাসনদ। পবিত্র কুরআনের শিক্ষা পূর্ণ পরিণত, যুক্তিসঙ্গত ও পরীক্ষিত, সত্য, অদ্বিতীয়, সকল যুগের উপযোগী এবং মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধানকারী। পবিত্র কুরআনের বিধান সর্বকালে গ্রহণীয় এবং সকলের জন্য একান্ত করণীয়। তাই পবিত্র কুরআন শুধু একখানা গ্রন্থ নয়; বরং কালজয়ী বিশ্বগ্রন্থ, এর আবেদনও বিশ্বজনীন। কুরআনের ভাষায় এটা বিশ্বমানবের জন্য বিবৃতি এবং মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত ও উপদেশ।
কুরআনের মূল আলোচ্য বিষয়: কুরআনের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে-
১. তাওহীদ, ২. রিসালাত, ৩. আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস, ৪. দুনিয়া ও আখিরাতের সুসংবাদ ও সতর্কবাণী, ৫. পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং যুদ্ধ ও সন্ধি সম্পর্কিত বিধান, ৬. হিদায়াত ও হিকমতের মূল্যবান উপদেশ, ৭. বুনিয়াদি ইবাদত, ৮. পূর্ববর্তী নবীদের কাহিনি থেকে উপদেশ, ৯. পরকাল, হাশর, জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কে বর্ণনা।
সুতরাং বলা যায়, কুরআনের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে মানুষ। আর মানুষকে নিয়েই উপর্যুক্ত বিষয়গুলো আবর্তিত হয়।
কুরআনের বৈশিষ্ট্যসমূহ: নিম্নে কুরআনের কতিপয় বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো:
১. আল কুরআন মহান আল্লাহ তা'আলার কালাম।
২. এটি অবতীর্ণ হয়েছে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর ওপর।
৩. এটি সত্য-মিথ্যার পার্থক্য সৃষ্টিকারী গ্রন্থ।
৪. আল কুরআন মূর্খতার পরিবর্তে জ্ঞান এবং অত্যাচারের পরিবর্তে সুবিচার শিক্ষা দেয়।
৫. এ গ্রন্থ সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং যাবতীয় মন্দ কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
৬. এর একটি শব্দও পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার ক্ষমতা কারো নেই।
৭. এ গ্রন্থ ভাষার অলঙ্কারে, ভাবের উচ্ছ্বাসে, শব্দ চয়নে, এক কথায় সব ব্যাপারেই অদ্বিতীয়।
৮. পবিত্র কুরআন এমন এক গ্রন্থ, যার পূর্ণ ইতিহাস সংরক্ষিত।
৯. এটি সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ।
১০. পবিত্র কুরআন একমাত্র গ্রন্থ, যা নুকতাসহকারে মুখস্থ করে রাখা সম্ভব।
১১. কুরআন এমনই এক গ্রন্থ, যার অর্থ ও ব্যাখ্যা পৃথিবীর প্রায় সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
১২. কুরআন যত পাঠ করা হয় তত ভালো লাগে।
১৩. এটি গবেষণালব্ধ ও তথ্যজ্ঞান সংবলিত এক মহাগ্রন্থ।
১৪. পবিত্র কুরআন হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ স্বয়ং নিয়েছেন।
১৫. পবিত্র কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ, যাতে মানব জীবনের সকল অবস্থা ও সকল স্তরের সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান আছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, মানব জীবনের সার্বিক দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এই মহাগ্রন্থে। এর প্রতিটি আয়াত ও সূরায় মানুষের সুন্দর, পবিত্র, সুশৃঙ্খল ও মঙ্গলময় ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনব্যবস্থার লক্ষ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
'সিহাহ সিত্তাহ' আরবি শব্দ। 'সিহাহ' অর্থ বিশুদ্ধ এবং 'সিত্তাহ' শব্দের অর্থ ছয়। সুতরাং 'সিহাহ সিত্তাহ' অর্থ ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থ। ইলমে হাদিসের পরিভাষায়, বিশুদ্ধ ছয়খানা হাদিসগ্রন্থকে 'সিহাহ সিত্তাহ' বলা হয়। হিজরি প্রথম শতকের প্রারম্ভে প্রখ্যাত উমাইয়া খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আযীয সরকারিভাবে হাদিস লেখার নির্দেশ দেন। এ সময় প্রথম বিশুদ্ধ হাদিস 'মুয়াত্তা' সংকলন করেন ইমাম মালেক (র)। হিজরি তৃতীয় শতক হাদিস সংকলনের স্বর্ণযুগ। এ সময় ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়। এগুলোকে একত্রে 'সিহাহ সিত্তাহ' বা ছয়টি
বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ নামে অভিহিত করা হয়।
সিহাহ সিত্তাহর সংকলকবৃন্দ
| হাদিস গ্রন্থ | সংকলকের নাম ও জীবনীকাল | হাদিসের সংখ্যা |
| ১. বুখারী শরীফ | আবু আবদুল্লাহ ইবনে ইসমাঈল আল বুখারী (১৯৪-২৫৬ হিঃ) | ৭৩৯৭টি |
| ২. মুসলিম শরীফ | আবুল হোসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২০৪-২৬১ হিঃ) | ৪০০০টি |
| ৩. তিরমিযী শরীফ | আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা (২০৯-২৭৯ হিঃ) | ৩৮১১টি |
| ৪. আবু দাউদ শরীফ | আবু দাউদ সুলাইমান ইবনে আশআমা ইবনে ইসহাক (২০২-২৭৫ হিঃ) | ৪৮০০টি |
| ৫. নাসাঈ শরীফ | আবু আবদুর রহমান আহমদ ইবনে শুয়াইব (২১৪-৩০৩ হিঃ) | ৪৪৮২টি |
| ৬. ইবনে মাযাহ শরীফ | আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযীদ (২০৯-২৭৩ হি:) | ৪৩৩৮টি |
রোজা ইসলামের মৌল ইবাদতের মধ্যে এবং ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। ইবাদত হিসেবে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে রোজার স্থান অনেক ঊর্ধ্বে। প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ ধনী-গরিব প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর জন্য রোজা আবশ্যকীয় (ফরজ) একটি ইবাদত। প্রকৃত তাকওয়া অর্জন, আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনে রোজা একটি অপরিহার্য ইবাদত।
তাকওয়া অর্জনে রমযানের গুরুত্ব:
- রোজার মাধ্যমে মানুষ তাকওয়া বা পরহেজগারি হাসেল করতে সক্ষম হয় এবং রোজার মাসে প্রতিটি লোক গুনাহ ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে। ফলে রোজার পূর্ণ এক মাস সমাজে বিরাজ করে তাকওয়ার পবিত্র পরিবেশ। কুরআন পাকে এরশাদ হয়েছে, "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।" মহানবী (স) বলেন, 'রমজান মাসে অপবিত্র শয়তানদেরকে শৃঙ্খলিত করা হয়।'
- রোজা মানুষকে সংযমী হতে শিক্ষা দেয়। কাম, ক্রোধ, লোভ-লালসা ইত্যাদি রিপুর তাড়নায় মানুষ বিপথগামী হয়। রোজা মানুষের এ সকল কুপ্রবৃত্তি দমন করে। এ কারণেই মহানবী (স) বলেন, 'রোজা ঢালস্বরূপ'।
- রোজা বঞ্চিত ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়াপরবশ হওয়ার শিক্ষা দেয়। মহানবী (স) এ প্রসঙ্গে বলেন, "এ মাসে যারা দাস-দাসীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করে তথা তাদের বোঝা হালকা করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং দোজখের আগুন হতে রক্ষা করেন।"
- রোজা মানুষকে সহিষ্ণুতা, একাগ্রতা এবং ইনসাফের শিক্ষা দেয়। মহানবী (স) বলেন, "রমজান সবরের মাস, আর সবরের প্রতিদান জান্নাত।"
- রোজা রাখলে মানবমনে খোদাভীতি জাগ্রত হয়। রোজা সংযম ও আত্মশুদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে রোজা মানুষের সুকোমল চরিত্র গঠনে সাহায্য করে।
রোজা মানুষকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি দেয়, কুপ্রবৃত্তিকে ধুয়ে মুছে আত্মাকে দহন করে, সকল গুনাহ ক্ষমা করে জান্নাতের পথ প্রশস্ত করে সমাজজীবনে পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতিশীলতা সৃষ্টি করে, ঐক্য ও সাম্য প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা যোগায়।
ইসলাম যে পাঁচটি মূল ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সেগুলোর মধ্যে যাকাত একটি অন্যতম স্তম্ভ। যাকাত একটি আর্থিক ইবাদত। যাকাত দেওয়ার মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং পবিত্র হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে, দারিদ্র্য নিরসনে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। যাকাত সবার ওপর ফরজ নয় বরং শর্তসাপেক্ষে তা ধনী মুসলমানদের উপর ফরজ হয়ে থাকে। নিম্নে যাকাতের পরিচয়সহ এর ব্যয়ের খাতগুলো বর্ণনা করা হলো:
যাকাতেয় আভিধানিক অর্থ: 'যাকাত' আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ১. বৃদ্ধি পাওয়া; ২. পবিত্র করা বা হওয়া; ৩. প্রাচুর্য; ৪. প্রশংসা ইত্যাদি।
যাকাতের পারিভাষিক অর্থ: ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায় যাকাত হলো আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনা স্বার্থে শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত মালের নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে প্রদান করা। ইবনে কুদামা বলেন- এটা এমন অধিকার যা সম্পদের ওপর ধার্য করা হয়। মোটকথা, নিসাব পরিমাণ সম্পদ কোনো ব্যক্তির কাছে পূর্ণ একবছর থাকলে তাকে শরীয়ত কর্তৃক যে নির্ধারিত অংশ নির্দিষ্ট খাতে প্রদান করতে হয়, তা-ই যাকাত।
যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ: যাকাত ব্যয়ের ৮টি খাত পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবায় বর্ণিত হয়েছে। যাকাতের সেই ৮টি খাত নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ফকির: ফকির বলা হয় এমন ব্যক্তিকে যার সামান্য সম্পদ থাকে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
২.মিসকিন: মিসকিন হলো এমন ব্যক্তি যার কোনো সম্পদ নেই, একেবারে নিঃস্ব।
৩. যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী: যারা যাকাত আদায় করার জন্য রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক নিয়োজিত আছেন তাদেরকেও যাকাত প্রদান করা যাবে।
৪. যাদের মন জয় করা আবশ্যক: এ ধরনের লোকদের মধ্যে নও মুসলিম অন্যতম। তাদের মন জয় করার জন্য যাকাত প্রদান করা যাবে।
৫. দাসমুক্তির জন্য: কোনো ক্রীতদাসকে মুক্ত করার জন্য যাকাত দেওয়া যাবে।
৬. ঋণ মুক্তির জন্য: ঋণী ব্যক্তিকে তার ঋণ পরিশোধের জন্য যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।
৭. আল্লাহর রাস্তায়: অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের জন্য মুজাহিদদের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য যাকাত প্রদান করা যাবে।
৮. নিঃস্ব মুসাফির: সফরে এসে কোনো মুসাফির নিঃস্ব হলে তাকেও যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।
যাকাত একটি আর্থিক ইবাদত। যাকাত দেবার মাধ্যমে আত্মিক পবিত্রতাসহ সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং যাকাত প্রদানের ফলে সমাজ থেকে দারিদ্র্যের অবসান ঘটে। আর উল্লিখিত ৮ শ্রেণি ব্যতীত অন্য কাউকে যাকাতের মাল দেওয়া হলে সে যাকাত আদায় হবে না।
মদিনা সনদ বা কিতাব-উর-রসুল ইসলামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হযরতের মদিনা পৌঁছার পর তিনি সেখানে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হন এবং শতধা বিভক্ত ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক ও আগত মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য, শান্তি ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করেন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তিনি একটি সনদ প্রণয়ন করেন যা ইসলামের ইতিহাসে 'মদিনা সনদ' নামে পরিচিত। ইবনে হিশাম তাঁর 'সীরাত' গ্রন্থে একে 'কিতাব-উর-রসুল' ও M. Watt তাঁর গ্রন্থে একে 'The Charter of Medina' বলে আখ্যায়িত করেন। নিম্নে মদিনা সনদের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো:
সনদের বৈশিষ্ট্য: মহানবী (স) কর্তৃক প্রদত্ত মদিনা সনদের ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে এর নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়:
প্রথমত, মদিনা সনদে নিজ নিজ ধর্ম পালনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে সকল ধর্মাবলম্বী লোক একটি উম্মাহ করবে এবং তারা স্ব স্ব ধর্ম পালন করবে। এছাড়া উম্মাহভুক্ত অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিচারকার্যও স্ব স্ব ধর্মগ্রন্থ অনুসারে করার নীতি গৃহীত হয়।
দ্বিতীয়ত, সনদে গোত্রীয় প্রাধান্য রহিত করা হয়নি। তবে সংস্কার সাধন করে গোত্রীয় প্রাধান্যকে বৃহত্তর মুসলিম জাতির উপযোগী করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয় এবং সামগ্রিকভাবে সকল গোত্রের উপর মহানবীর প্রাধান্য স্বীকৃত হয়।
তৃতীয়ত, সনদের মাধ্যমে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে গাঢ় ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ভ্রাতৃত্ববোধ একটি উজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।
চতুর্থত, সনদে সামগ্রিকভাবে আল্লাহকে জিম্মা প্রদান করা হয়েছে এবং রাষ্ট্র হিসেবে মদিনা একটি সাধারণতন্ত্রের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে।
পঞ্চমত, সনদে মদিনার সকল ইহুদিদের সমঅধিকার দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের বিষয়ে পুনঃপুন উল্লেখ করে মুসলমানদের সতর্কও করে দেওয়া হয়। কারণ, প্রথম থেকেই তাদের উদ্দেশ্য ছিল দুরভিসন্ধিমূলক। পাশাপাশি মক্কার কুরাইশদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ষষ্ঠত, সর্বোপরি এ সনদে মহানবীর মর্যাদা একাধারে প্রশাসক, বিচারক, সেনাপতি, আইন প্রণয়নকারী ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে চূড়ান্তভাবে স্বীকৃত হয়। অর্থাৎ 'Supreme Leadership of the Prophet'-এর স্বীকৃতি পাওয়া যায় এই সনদে। এছাড়া এর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। যেমন-
১. সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব।
২. মুসলিম সম্প্রদায় একটি অখণ্ড জাতি হিসেবে স্বীকৃত।
৩. মদিনার নিরাপত্তায় সকলের যৌথ দায়িত্ব।
৪. সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা দান।
৫. মুসলিম-অমুসলিম সম্মিলিত একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি।
৬. অপরাধীকে কেউ আশ্রয় দেবে না
৭. নিজ অপরাধের জন্য নিজেই দায়ী হবে।
৮. প্রতিশোধ হবে সমমাত্রিক। তবে প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমাই শ্রেয়।
পরিশেষে বলা যায়, মদিনা সনদ হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে ম্যাগনাকার্টাস্বরূপ। বস্তুত মদিনার রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও নাগরিক জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে মদিনা সনদ। ধর্ম প্রচারক ছাড়াও মহানবী (স) বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতা, এ সনদে তাই প্রমাণিত হয়েছে। W. Muir তাই বলেন, 'It reveals the men (The Prophet) in his real greatness a mastermind, not only of his own age, but of all ages." (The Life of Muhammad, P-4)
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!