ফাতেমি বংশের উত্থানে ভূমিকা পালনকারী আবু আব্দুল্লাহ আশ-শিয়ীর করুণ পরিণতি সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন হলেও নৈতিক দিক থেকে যৌক্তিক নয়।
উত্তর আফ্রিকার ফাতেমি খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিয়া মতবাদ প্রচারক আবু আব্দুল্লাহ আশ-শিয়ী কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। তার কৃতিত্ব ও নৈপুণ্যে তিনি আগলাবি বংশের ধ্বংসস্তূপের ওপর ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদীর নেতৃত্বে ফাতেমি খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তিনিই পরবর্তীতে ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদী কর্তৃক নির্মমভাবে নিহত হন। যে হত্যাকাণ্ড নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে অযৌক্তিক হলেও ফাতেমি বংশের স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন ছিল।
উদ্দীপকে দেখা যায় "X" নামক একজন মতাদর্শ প্রচারক সফলভাবে প্রচারকার্য পরিচালনা করে তার নেতাকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করেন। যিনি পরবর্তীতে তার নেতার মাধ্যমে নির্মমভাবে নিহত হন। অনুরূপ ঘটনা ফাতেমি বংশের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। শিয়া মতবাদ প্রচারক আবু আব্দুল্লাহ আগলাবিদের রাজধানী দখল করে তথায় আগলাবি বংশের ধ্বংসস্তূপের ওপর ফাতেমি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা রাখেন। কিন্তু এই সফলতা সত্ত্বেও আবু আব্দুল্লাহর পরিণতি ভালো হয়নি। তিনি স্বীয় ত্যাগ ও তৎপরতায় যাকে খলিফা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন সেই ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদীর হাতেই তাকে জীবন দিতে হয়। ওবায়দুল্লাহ তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। তার এ হত্যাকান্ড ছিল অত্যন্ত জঘন্য কাজ। কিন্তু নব প্রতিষ্ঠিত ফাতেমি বংশের স্থায়িত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য এ হত্যাকাণ্ড প্রয়োজন ছিল। কেননা আবু আব্দুল্লাহর প্রভাব এতো বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, যেকোনো মুহূর্তে তার ইশারায় ফাতেমি বংশের পতন ঘটতে পারত।
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, আবু আব্দুল্লাহর হত্যাকান্ড ছিল ইতিহাসের অন্যতম নির্মম ঘটনা। কিন্তু তৎকালীন বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে ফাতেমি বংশের স্বার্থে এ হত্যাকাণ্ডের যথার্থতা ছিল।
Related Question
View Allজওহর ছিলেন ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের সেনাপতি এবং আল কাহিরা (কায়রো) নগরীর গোড়াপত্তনকারী।
ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের শাসনামলে মিসরে প্রতিষ্ঠিত রাজধানী 'আল-কাহিরা' নামে পরিচিত।
আল-কাহিরা অর্থ 'বিজয়ী শহর'। চতুর্থ ফাতেমি খলিফা আল-মুইজের সেনাপতি জওহর ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মিসর জয় করেন এবং খলিফার নির্দেশে কায়রোকে রাজধানীর উপযোগী করে নির্মাণ করেন। সরকারিভাবে কায়রোর নামকরণ করা হয় 'আল-কাহিরা' বা বিজয়ী শহর। ৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে 'আল-কাহিরা' বা কায়রো রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে।
উদ্দীপকে বর্ণিত মুর্তজার ক্ষমতা গ্রহণের সাথে ফাতেমি খলিফা আল-হাকিমের ক্ষমতায় আরোহণের সাদৃশ্য রয়েছে।
ফাতেমি খলিফা আল-আজিজের মৃত্যুর পর পুত্র আল-হাকিম মাত্র ১১ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ (৯৯৬ খ্রি.) করেন। তিনি নাবালক হওয়ায় পিতার আমলের প্রাদেশিক শাসনকর্তা বারজোয়ান তার প্রতিনিধি হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। কিন্তু বারজোয়ান ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে আল-হাকিম গুপ্তচরের সাহায্যে তাকে হত্যা করে নিজে সকল ক্ষমতা গ্রহণ করেন। একই পরিস্থিতি উদ্দীপকে বর্ণিত মুর্তজার ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়।
পিতার মৃত্যুর পর মুর্তজা গৃহশিক্ষক আসিফের তত্ত্বাবধানে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু আসিফ লোভী ও ক্ষমতালিঙ্গু হয়ে উঠলে মুর্তজা তাকে গুপ্তচরের সহায়তায় হত্যা করে নিজে ক্ষমতা দখল করেন। খলিফা আল-হাকিমও তত্ত্বাবধায়ক বারজোয়ানের অতিরিক্ত লোভ এবং অপতৎপরতাকে বরদাশত করেননি। বারজোয়ান সেনাধ্যক্ষ ইবনে আমরকে পরাজিত ও হত্যা করে নিজেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করলে আল-হাকিম তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। গুপ্তঘাতক নিযুক্ত করে তিনি তাকে হত্যা করেন এবং নিজে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। সুতরাং উদ্দীপকের মুর্তজা এবং খলিফা আল-হাকিমের ক্ষমতা দখলের ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা।
উদ্দীপকের মুর্তজার মতোই খলিফা আল-হাকিমও রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে উদ্ভট, বিচিত্র ও খামখেয়ালিপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ইতিহাসে এমন অনেক শাসক রয়েছেন, যারা রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে কোনো যুক্তির বাধ-বিচার করেননি। নিজেদের ভালো লাগা এবং খামখেয়ালিপনায় তারা রাজ্য শাসন করেছেন। এমনই দুজন শাসক উদ্দীপকের মুর্তজা এবং ফাতেমি খলিফা আল-হাকিম।
আল-হাকিম জটিল চরিত্রের অধিকারী এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক অভিযোগ করেন। তিনি জিম্মিদের প্রতি কঠোর নীতি অবলম্বন করেন এবং বহু খ্যাতনামা লোককে হত্যা করেন। তিনি খ্রিষ্টানদের গির্জা ধ্বংস করে তাদেরকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার নির্দেশ দেন। ১০০১ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আদেশ জারি করেন যে, দিনে কোনো কাজকর্ম করা যাবে না; দোকান বন্ধ থাকবে এবং মানুষ আরাম করবে। অন্যদিকে রাতে অফিস-আদালতের কাজকর্ম চলবে এবং বেচাকেনা অব্যাহত থাকবে। তিনি একাকী থাকতে পছন্দ করতেন। রাত্রিবেলা ঘুরে ঘুরে প্রজাদের সুখ-দুঃখ অবলোকন করতেন। তিনি প্রায়ই মুকাত্তাম (কায়রোর নিকটে) পাহাড়ের ওপর একটি নির্জন গৃহে যেতেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি অনবদ্য অবদান রাখেন। তিনি আব্বাসীয়দের অনুকরণে বায়তুল হিকমার আদলে মিসরে দারুল হিকমা নামক বিজ্ঞানাগার নির্মাণ করেন (১০০৫ খ্রি.)। উদ্দীপকের মুর্তজাও এ ধরনের উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য শাসন করেছেন। তিনিও আল-হাকিমের মতো রাতে ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক কাজ-কর্ম করার এবং দিনে বিশ্রাম নেওয়ার নির্দেশ জারি করেন। তিনি নির্জনতা পছন্দ করতেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগী ছিলেন।
উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, মূর্তজার মতোই খলিফা আল-হাকিম উদ্ভট ও বিচিত্র সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য শাসন করেছেন।
ফাতেমি খলিফা আল-হাকিম ১০০৫ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোতে একটি বিখ্যাত বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ করেন। এটি দারুল হিকমা নামে পরিচিত। বাগদাদের বায়তুল হিকমার অনুকরণে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মিশরের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলী-ইবন-ইউসুফ এ জ্ঞানগৃহ নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এখানে শিয়া ধর্ম বিষয়ে আলোচনা ও গবেষণা হতো। এখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বহু অমূল্য গ্রন্থরাজি সংগৃহীত ছিল। দেশ-বিদেশের বহু প্রখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি এখানে হাজির হতেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রখ্যাত দার্শনিক ও পদার্থবিজ্ঞানী ইবনে হায়সাম।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!