উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে
মূলভাব: চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্ব ও দৃঢ়তা মানুষকে অবিশ্বাসী করে তোলে। প্রকৃত গুণী বা উত্তম ব্যক্তি তাঁর স্বভাবের দৃঢ়তার কারণে অধম বা খারাপ চরিত্রের সংস্পর্শে এলেও প্রভাবিত হন না, কিন্তু মধ্যম মানের ব্যক্তি আত্মরক্ষার জন্য খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে চলেন।
সম্প্রসারিত ভাব: এই গভীর অর্থবহ পঙক্তিটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'কণিকা' কাব্যগ্রন্থ থেকে গৃহীত। এটি মূলত মানুষের চারিত্রিক স্তরভেদ এবং আত্মত্মবিশ্বাসের পার্থক্যের ইঙ্গিত বহন করে। মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সমাজে তিন প্রকারের মানুষ দেখা যায়: উত্তম, মধ্যম ও অধম। উত্তম চরিত্র যিনি স্বীয় গুণ, জ্ঞান ও নৈতিকতায় সুপ্রতিষ্ঠিত, তাঁর আত্মত্মবিশ্বাস অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি জানেন যে অধম বা খারাপ লোকের সংস্পর্শ তাঁর চারিত্রিক আদর্শকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারবে না। অন্ধকার যেমন প্রদীপের আলোকে গ্রাস করতে পারে না, তেমনই উত্তম ব্যক্তিও তাঁর চারিত্রিক ঔজ্জ্বল্যে খারাপ সঙ্গের কলুষতাকে জয় করেন। তিনি বরং অধমকে প্রভাবিত করে তাকে সৎ পথে আনার সাহস রাখেন। তাই তাঁরা নিশ্চিন্তে অধমের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারেন। অধম চরিত্র এরা হলো দুর্বল নৈতিকতা ও খারাপ স্বভাবের মানুষ। এদের সংস্পর্শে আসাই উত্তম ও মধ্যম উভয়ের জন্য বিপজ্জনক। মধ্যম চরিত্র: সাধারণ বা দুর্বল আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিরা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এঁদের নৈতিক ভিত্তি ততটা মজবুত নয়। এঁরা ভয়ে থাকেন যে অধমের সঙ্গদোষে হয়তো এঁদের নিজেদের মান-মর্যাদা ও চরিত্রও কলুষিত হয়ে যাবে। তাই নিজেদের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে এঁরা সর্বদা খারাপ সঙ্গ এড়িয়ে চলেন বা তফাতে চলেন। এই সতর্কতা তাঁদের আত্মরক্ষার কৌশল মাত্র, চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক নয়।
তাই বলা যায়, চারিত্রিক দৃঢ়তাই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। যে নিজের অবস্থানে নিশ্চিত ও অবিচল, তিনি জগৎকে ভয় পান না। এই উক্তিটি আমাদের উত্তম আদর্শে বলীয়ান হয়ে চলার এবং আত্মবিশ্বাসী হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়।
Related Question
View Allসমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয় এবং সমাজে শত্রু-মিত্র উভয়ের সাথেই কোন না কোনভাবে মেলামেশা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটি হল শিক্ষা। মানুষের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার মানদণ্ডটি অতীব জরুরি। কেননা, অশিক্ষিত বন্ধুর যত আন্তরিকতাই থাক না কেন, সে যে কোন মুহূর্তে নিজের অজ্ঞতাবশত অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বলা হয়, মূর্খ ব্যক্তি পশুর সমান। ভালোমন্দ বিচার করার যথাযথ ক্ষমতা তার নেই। অনেক সময় বন্ধুর ভালোর জন্য কিছু করলেও তার অজ্ঞতার কারণে তা বন্ধুর ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এজন্য তাকে দোষও দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, শত্রুকে আমরা সাধারণত অনিষ্টের কারণ হিসেবেই বিবেচনা করি। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, একজন মুর্খ বন্ধু অজ্ঞতাবশত যা করতে পারে, একজন শিক্ষিত শত্রু সজ্ঞানে তেমনটি করতে পারে না। জ্ঞানের নির্মল পরশ অন্তত তাকে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে। যদি অনিষ্ট সে করে তবে সেটা হবে তার দুরাচার। আর মানুষ সব সময়ই শত্রুর দুরাচার সম্পর্কে সজাগ থাকে। ফলে শত্রুর এ চেষ্টা সফল নাও হতে পারে। কিন্তু বন্ধুর ব্যাপারে কোন সন্দেহ না থাকায় মানুষ এতটা সতর্ক থাকে না। অথচ এ অসতর্কতার ফাঁকে মূর্খ বন্ধুর অজ্ঞতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই বন্ধু নির্বাচনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, জ্ঞান আলো এবং মূর্খতা অন্ধকারের সমতুল্য। আলোতে অনেক বিপদেও নিরাপদ থাকা যায়, অন্যদিকে অন্ধকারে সর্বদাই বিপদের আশঙ্কা থাকে
"ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন, কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন।"
এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "যতদিন ছিলে" কবিতার একটি অংশ।
**ভাব-সম্প্রসারণ:**
এই উদ্ধৃতিটি একটি গভীর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। এখানে 'ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন' বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, ব্যক্তিগত চিন্তা, অনুভূতি বা ভাবনাগুলোকে শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক বা আবেগগতভাবে না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। 'নিলীন' শব্দের মাধ্যমে এখানে অভ্যন্তরীণ চিন্তা বা অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র অন্তরেও লুকিয়ে থাকলে চলবে না। অন্যদিকে, 'কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন' বাক্যে বলা হচ্ছে যে, আমাদের দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও স্বাধীনতা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত। কর্মক্ষেত্রে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং যে কাজ করতে পারি, তা যেন আমাদের স্বাধীনতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে হয়। এখানে স্বাধীনতার সাথে সক্ষমতার সম্মিলন প্রস্ফুটিত হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তি নিজের দক্ষতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা পায়। সংক্ষেপে, এই উদ্ধৃতিটি আমাদেরকে উৎসাহিত করে যে, আমাদের অভ্যন্তরীণ ভাবনা বা চিন্তাকে শুধু মনে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব জীবনের কাজে লাগিয়ে কার্যকরীভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রমাণ করতে হবে।
আমরা সবসময় ভাবের গহনায়, অনুভূতির গভীরতায় হারিয়ে থাকি, যেখানে কোনো এক নিস্তব্ধতা বা মাধুর্য লুকিয়ে থাকে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে, বাস্তব জীবনে সেই ভাবনার পরিবর্তে আমাদের প্রমাণিত করতে হয় আমাদের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার। সেখানে ভাবের বন্দি হয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমরা যদি শুধু ভাবনায় নিমজ্জিত থাকি, তবে বাস্তবতার চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।
এখানে "ভাবের ললিত ক্রোড়ে" বলতে বোঝানো হচ্ছে যে আমরা আমাদের ভাবনাগুলোকে এতটাই গুরুত্ব দিই যে সেগুলো আমাদের কর্মক্ষমতা বা স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে আমাদের শক্তি এবং স্বাধীনতা আমাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। আমাদের উচিত আমাদের ভাবনার সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করা, যাতে আমাদের সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পায়।
এইভাবে, কবি আমাদের শেখাতে চাইছেন যে ভাবনা ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ভাবনার সৌন্দর্য বা গভীরতা তার স্থানেই মূল্যবান, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বাধীনতার প্রয়োগই আসল বিষয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!