উদ্দীপকে মি. শাহিনের বক্তব্যটি হলো সংজ্ঞা এবং তার স্ত্রীর বক্তব্যটি হলো বর্ণনা। নিচে সংজ্ঞা ও বর্ণনার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হলো-
সংজ্ঞার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে 'পদ'। আর বর্ণনার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে 'বস্তু'। অর্থাৎ একটি পদকে সংজ্ঞায়িত করা হয়; অন্যদিকে কোনো বস্তুর স্বরূপকে বর্ণনা করা হয়। সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সংজ্ঞেয় ও সংজ্ঞার্থের ব্যক্তর্থকে সমপরিমাণ হতে হয়। কিন্তু বর্ণনার ক্ষেত্রে এরূপ কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ বর্ণনার ক্ষেত্রে প্রকৃত বিষয় ও তার বর্ণনার পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে। সংজ্ঞা সর্বদা সুনির্দিষ্ট হয় অর্থাৎ একটি পদের সংজ্ঞা স্থান- কাল-পাত্রভেদে একই রকম থাকে। কিন্তু বর্ণনার বিষয় বিভিন্ন রূপ হতে পারে অর্থাৎ একটি বিষয়ের বর্ণনা স্থান- কাল-পাত্রভেদে বিভিন্ন রকমের হতে পারে।
সংজ্ঞা হচ্ছে একটি সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়া; অর্থাৎ সংজ্ঞার মাধ্যমে একটি পদের সম্পূর্ণ স্বরূপকে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে বর্ণনার কোনো নির্দিষ্ট বিস্তৃতি নেই; যেমন: মানুষের সংজ্ঞা একটি বাক্যের মাধ্যমে দেওয়া গেলেও এর বর্ণনায় একাধিক বাক্য ব্যবহৃত হতে পারে। সংজ্ঞা কেবল সামান্য বা শ্রেণিবাচক পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। কিন্তু বর্ণনা সামান্য, বিশিষ্ট বা একক সব ধরনের বস্তুর ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যায়। সংজ্ঞা সংক্ষিপ্ত হলেও তা হচ্ছে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রক্রিয়া। অন্যদিকে বর্ণনার আকার বিস্তৃত হলেও তা হচ্ছে একটি অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়া। সংজ্ঞার মাধ্যমে একটি বিষয়ের তাত্ত্বিক রূপ ব্যক্ত হয়; এজন্য এটি হচ্ছে একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া। পক্ষান্তরে বর্ণনা হলো একটি লৌকিক প্রক্রিয়া। কারণ এর ব্যবহার কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কোনো পদের সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে কতিপয় নিয়ম পালন করতে হয়; এজন্য সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে সংজ্ঞা প্রদানকারীর এসব নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হয়। কিন্তু বর্ণনার ক্ষেত্রে এরূপ কোনো নিয়ম পালন করতে হয় না; এজন্য যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো বিষয়ের বর্ণনা প্রদান করতে পারে। উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, উদ্দীপকে মি. শাহিন ও তার স্ত্রীর বক্তব্যের অর্থাৎ সংজ্ঞা ও বর্ণনার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের উভয়ের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।
Related Question
View Allযেকোনো পদের অর্থকে সুনির্দিষ্ট ও যথার্থভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে বিষয়বস্তু সম্পর্কিত ধারণাকে নির্ভুল ও সুস্পষ্ট করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে সংজ্ঞা।
যৌক্তিক সংজ্ঞার একটি বিশেষ উদ্দেশ্য হলো পদের তাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে, শব্দ বা পদকে তাত্ত্বিক বা বৈজ্ঞানিক দিক থেকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। কোনো শব্দ বা পদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে ঐ শব্দ বা পদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও অর্থপূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়, যাকে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়ন বলে। উদাহরণস্বরূপ, যখন পদার্থবিজ্ঞানীরা গতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, গতি হচ্ছে ভর এবং ত্বরণের ফল, তখন সংজ্ঞাটি হয়তো শব্দের সঞ্চয় বৃদ্ধি করে না বা কোনো শব্দের দ্ব্যর্থকতা অপসারণ করে না। তবে এ সংজ্ঞার মাধ্যমে গতি শব্দটি নিউটনের বলবিদ্যার প্রকাশিত রূপ হিসেবে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উদ্দীপকে সংজ্ঞার নিয়ম কানুন বলতে সংজ্ঞার যে নিয়মাবলিকে বোঝানো হয়েছে তা নিম্নে ব্যাখ্যা করা হলো-
প্রথম নিয়ম : কোন পদের সংজ্ঞা দিতে হলে সেই পদটির সম্পূর্ণ জাত্যর্থকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, জাত্যর্থের অতিরিক্ত কিংবা জাত্যর্থের অংশমাত্র উল্লেখ করা চলবেনা। অর্থাৎ, এ নিয়ম অনুসারে কোনো পদের সংজ্ঞা দেওয়ার সময় শুধু নিকট জাতি ও বিভেদক লক্ষণের উল্লেখ করতে হবে, এর বেশিও নয় কমও নয়।
দ্বিতীয় নিয়ম: যে পদের সংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে সে পদের ব্যক্তর্থ সংজ্ঞা বর্ণিত পদের ব্যক্তর্থের সমান হতে হবে, কম বা বেশি হলে চলবেনা। যেমন: মানুষ হয় বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন প্রাণী; এখানে মানুষ। এর ব্যক্তর্থ এবং বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন প্রাণীর ব্যক্তর্থ এক ও অভিন্ন।
তৃতীয় নিয়ম: যে পদের সংজ্ঞা দেওয়া হবে সংজ্ঞায় সেই একই পদ বা সেই পদের সমার্থক কোনো শব্দের উল্লেখ করা যাবে না। যেমন: 'বিচারক' হলেন সেই ব্যক্তি যিনি বিচার করেন, এক্ষেত্রে বিচারক। এর সমার্থক শব্দ 'যিনি বিচার করেন।'
চতুর্থ নিয়ম: যে পদের সংজ্ঞা দেওয়া হবে সংজ্ঞাটি সেই অপেক্ষা স্পষ্ট ও সহজবোধ্য হতে হবে এবং সংজ্ঞাটি কিছুতেই কোনো রূপকের মাধ্যমে বা দুর্বোধ্য ভাষায় ব্যক্ত করা যাবে না। অর্থাৎ পদের অর্থকে সুস্পষ্ট ও প্রাঞ্জল করে তুলতে হবে যেক্ষেত্রে রূপক বা অলংকারিক শব্দ কিংবা দুর্বোধ্য ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ।
পঞ্চম নিয়ম: সর্বক্ষেত্রে পদের সংজ্ঞা সদখৃক বা ইতিবাচক হতে হবে কোনাক্রমেই নঞর্থক বা নেতিবাচক হতে পারবেনা। কারণ নৈতিকবাচক সংজ্ঞায় পদটি কী নর- তাই শুধু বলা হয়।
উপর্যুক্ত নিয়ম কানুনগুলো মেনে সংজ্ঞা দিলে তা হবে সুস্পষ্ট, সহজ এবং যথার্থ। তাই সংজ্ঞা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো আমাদের অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।
যৌক্তিক সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে কতিপয় নিয়ম পালন করতে হয়, যেগুলোর যথার্থ ও সঠিক প্রয়োগে সংজ্ঞা শুদ্ধ হয়। আবার এই নিয়মগুলোর অপপ্রয়োগ বা লঙ্ঘনে সংজ্ঞা ত্রুটিপূর্ণ হয়ে বিভিন্ন অনুপপত্তি সংঘটিত করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো পদের সংজ্ঞায় জাত্যর্থের অতিরিক্ত কোনো গুণের উল্লেখ করা হলে এবং এই অতিরিক্ত গুণটি যদি সংশ্লিষ্ট পদের অবিচ্ছেদ্য অবান্তর লক্ষণ হয়, তাহলে প্রদত্ত সংজ্ঞাটিতে আপতিক বা অবান্তর লক্ষণজনিত সংজ্ঞানুপপত্তি ঘটবে; যেমন: 'মানুষ হয় বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন দ্বিপদ জীব।' এখানে 'দ্বিপদ' গুণটি হচ্ছে মানুষ পদের অবিচ্ছেদ্য অবান্তর লক্ষণ, যা মানুষের সংজ্ঞায় অতিরিক্ত হিসেবে যুক্ত হওয়ায় সংজ্ঞাটিতে অবান্তর লক্ষণজনিত সংজ্ঞানুপপত্তি ঘটেছে। বস্তুত 'অবিচ্ছেদ্য' হচ্ছে এমন বিষয়, যা একটি শ্রেণির সকলের মধ্যেই সমানভাবে বিদ্যমান থাকে। আর 'অবান্তর লক্ষণ' হচ্ছে এমন গুণ, যা সেই শ্রেণির জন্য অপরিহার্য নয়। এরূপ গুণ সংজ্ঞায় ব্যবহৃত হলে সংজ্ঞা ভ্রান্ত হতে বাধ্য; যেমন: উপরের দৃষ্টান্ত অনুসারে মানুষের জন্য তার দুই পা থাকা অপরিহার্য নয়। কারণ দুই পা না থাকলে মানুষকে মানুষ বলা যাবে না, এমন নয়। অর্থাৎ পা ছাড়াও মানুষ মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারে। কাজেই সংজ্ঞায় দ্বিপদ গুণের সংযুক্তি একটি অবান্তর বিষয়মাত্র। অতএব বলা যায়, সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুনগুলো যেমন প্রয়োজন, তেমনি এ নিয়মগুলোর অপপ্রয়োগ এড়িয়ে সংজ্ঞাকে অনুপপত্তির আশঙ্কামুক্ত করাও অপরিহার্য। তা না হলে সংজ্ঞা ভ্রান্ত হয়, যা থেকে উদ্ভদ্ধ ঘটে অনুপপত্তির।
সংজ্ঞার উপাদান দুটি- সংজ্ঞেয় ও সংজ্ঞার্থ।
কোনো পদের সংজ্ঞায় স্বাধীনভাবে একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করে ইচ্ছানুযায়ী ঐ শব্দের অর্থ প্রদান করাকে আরোপক সংজ্ঞা বলে। এরূপ সংজ্ঞায় যেকোনো ব্যক্তি তার পছন্দ অনুযায়ী নতুন শব্দ আরোপ করে স্বাধীনভাবে ঐ শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতে পারেন। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির উদ্দেশ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শব্দের অর্থ প্রদান করা হয়ে থাকে। বস্তুত আরোপক সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সত্যতা বা মিথ্যাত্ব আরোপ করা যায় না। এ জন্য এ ধরনের সংজ্ঞাকে তথ্যমূলক নয়, বরং নির্দেশনী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!