উত্তরঃ
‘Divide and Rule’ বা ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারত উপমহাদেশে নিজেদের শাসন দীর্ঘায়িত করা। এই নীতির মাধ্যমে ব্রিটিশরা স্থানীয় জনগণের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, সম্প্রদায় এবং ভাষার ভিত্তিতে বিভেদ তৈরি করে তাদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে দুর্বল করতে চেয়েছিল। এই কৌশলটি ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যার ফলে তারা প্রায় দুই শত বছর ধরে ভারতবর্ষ শাসন করতে সক্ষম হয়।
উদ্দীপকে জার্মানির রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে বিভক্ত হয়ে দুটি পৃথক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া এবং পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ দুর্বল হওয়ার পর তাদের একত্রীকরণের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও জার্মানির এই বিভাজন ব্রিটিশদের ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতির প্রত্যক্ষ ফলাফল ছিল না, এটি রাজনৈতিক আদর্শ ও শক্তির ভারসাম্যের কারণে সৃষ্ট বিভক্তির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ঘটনাটি আমাদেরকে বোঝাতে সাহায্য করে যে কীভাবে একটি জাতি বা অঞ্চল বিভক্ত হলে তা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাহ্যিক শক্তির প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। ব্রিটিশরা ঠিক এই দুর্বলতাকেই পুঁজি করে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারে ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি প্রয়োগ করেছিল, যা জার্মানির বিভক্তির মতো প্রাকৃতিক বা আদর্শিক বিভাজন থেকে ভিন্ন হলেও, এর ফলাফল হিসেবে সৃষ্ট বিভেদ ও দুর্বলতা সাম্রাজ্যবাদী শাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করত।
ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে ক্ষমতা দখলের পর বুঝতে পারে যে, এত বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় একটি দেশকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে যদি না তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা যায়। তাই তারা সচেতনভাবে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল এই নীতির একটি বড় উদাহরণ, যেখানে বাংলাকে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ নামে দুটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়েছিল। ব্রিটিশরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গকে সমর্থন দিয়েছিল এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়াও, তারা বিভিন্ন ছোট ছোট রাজ্য ও জমিদারদের মধ্যে বিরোধ উসকে দিয়ে এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করত। মুসলিম লীগ গঠনের পেছনেও ব্রিটিশদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিল, যা পরবর্তীতে ভারত বিভাজনের পথ সুগম করে।
সুতরাং, জার্মানির বিভাজন যেখানে ভূ-রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারণে সংঘটিত হয়েছিল, সেখানে ব্রিটিশদের ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি ছিল একটি উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক কৌশল। ব্রিটিশরা নিজেদের শাসন ক্ষমতাকে অটুট রাখার জন্য পরিকল্পিতভাবে ভারতীয় জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের শক্তিকে খর্ব করে দিয়েছিল। উদ্দীপকের ঘটনাটি পরোক্ষভাবে এই বিভাজনের ক্ষমতা এবং এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়, যা ব্রিটিশদের ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতির কার্যকারিতা এবং ঐতিহাসিক পরিণতিকে আরও গভীরভাবে অনুধাবনে সহায়তা করে। এই নীতি কেবল শাসন ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই নয়, বরং একটি জাতিকে দীর্ঘকাল ধরে পরাধীন করে রাখার ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল।