উদ্দীপকের প্রশ্নবোধক স্থানে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ইঙ্গিত পেয়েছে ঐতিহাসিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাটি। এর কারণগুলো নিম্নরূপ-
১. উগ্র জাতীয়তাবাদ: প্রথম মহাযুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত ইউরোপীয় জাতিসমূহের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মেষ। এ উগ্র জাতীয়তাবাদের দরুন ইংল্যান্ড ও জার্মানির মধ্যে তীব্র নৌ ও সামরিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।
২. পরস্পরবিরোধী শক্তিজোট ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের উগ্র সমরবাদ ও পরস্পরবিরোধী সামরিক জোট গঠনও প্রথম মহাযুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল।
৩. সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা: ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা এ যুদ্ধের ক্ষেত্রকে প্রস্তুত করে তুলেছিল।
৪.পুঁজিবাদের বিকাশ শিল্প বিপ্লব ও পুঁজিবাদের বিকাশ ইউরোপকে ক্রমাগত অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদে ইন্ধন যোগায়।
৫. উপনিবেশবাদ: পুঁজিবাদের চরম্ বিকাশের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের প্রসার উপনিবেশ বিস্তার নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
সর্বোপরি, ১৯১৪ সালের ২৮ জুন সার্বিয়াতে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ ফ্রান্সিসকো ফার্দিনান্ডের সস্ত্রীক হত্যাকাণ্ডকে প্রত্যক্ষ কারণ দেখিয়ে ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। উদ্দীপকের প্রশ্নবোধক স্থানে ঐতিহাসিক এ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাটিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস
The First World War and The Treaty of Versailles and League of Nations
উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson 1856-1924) (১৮৫৬-১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ঐতিহাসিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শান্তি নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার শাসনকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রথম দিকে নিরপেক্ষ থাকলেও জার্মানির ক্রমাগত সাবমেরিন আক্রমণের সমুচিত জবাব দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে যুদ্ধে যোগ দেয়। তিনি গণতান্ত্রিক পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিত্রশক্তিকে সৈন্য, অর্থ ও ঋণ দিয়ে সাহায্য করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ মিত্রপক্ষের দেশসমূহের মনোবল চাঙ্গা করে এবং যুদ্ধে জয় পেতে সহায়তা করে, যার বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে চৌদ্দ দফা উত্থাপন, প্যারিস শাস্তি সম্মেলনে যোগদান, ভার্সাই সন্ধিতে অংশগ্রহণ ও লীগ অব নেশনস গঠনের প্রস্তাব তার উল্লেখযোগ্য অবদান। এসব পদক্ষেপ তার ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে। তিনি লীগ অব নেশনসের ধারণার উদ্ভাবক হলেও তার দেশকে এ সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণে সম্মত করতে ব্যর্থ হন। তার সময়ে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন নারীরা ভোটাধিকার পায়। লীগ অব নেশনস ধারণার জন্য তিনি ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল সব জাতির প্রতি ন্যায়বিচার, সব জাতির স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কাজ করা।'
উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson 1856-1924) (১৮৫৬-১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ঐতিহাসিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শান্তি নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার শাসনকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রথম দিকে নিরপেক্ষ থাকলেও জার্মানির ক্রমাগত সাবমেরিন আক্রমণের সমুচিত জবাব দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে যুদ্ধে যোগ দেয়। তিনি গণতান্ত্রিক পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিত্রশক্তিকে সৈন্য, অর্থ ও ঋণ দিয়ে সাহায্য করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ মিত্রপক্ষের দেশসমূহের মনোবল চাঙ্গা করে এবং যুদ্ধে জয় পেতে সহায়তা করে, যার কৃতিত্বের দাবিদার তিনি।
বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে চৌদ্দ দফা উত্থাপন, প্যারিস শাস্তি সম্মেলনে যোগদান, ভার্সাই সন্ধিতে অংশগ্রহণ ও লীগ অব নেশনস গঠনের প্রস্তাব তার উল্লেখযোগ্য অবদান। এসব পদক্ষেপ তার ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে। তিনি লীগ অব নেশনসের ধারণার উদ্ভাবক হলেও তার দেশকে এ সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণে সম্মত করতে ব্যর্থ হন। তার সময়ে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন নারীরা ভোটাধিকার পায়। লীগ অব নেশনস ধারণার জন্য তিনি ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল সব জাতির প্রতি ন্যায়বিচার, সব জাতির স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কাজ করা।'
১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জড়িয়ে পড়ে। এর পূর্বে কখনো এত ব্যাপকভাবে কোনো যুদ্ধ হয়নি। বিভিন্ন দেশ, জাতি ও জনগোষ্ঠী এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আওতায় আসে। এর ভয়াবহতা প্রায় সমগ্র পৃথিবীকে স্পর্শ করে। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে অস্ট্রিয়া-সার্বিয়ার সংঘাত বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়। এ যুদ্ধে একদিকে থাকে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, তুরস্কের ওসমানীয় সাম্রাজ্য, যা অক্ষশক্তিরূপে পরিচিত আর অন্যদিকে থাকে রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন (কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ), ইতালি, জাপান, বেলজিয়াম, সার্বিয়া, মন্টিনেগ্রো, যা মিত্রশক্তিরূপে পরিচিত। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বের কয়েক দশক ধরে ইউরোপের বিভিন্ন ঘটনার চরম পরিণতি হলো প্রথম মহাযুদ্ধ, ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে সার্ব আততায়ী কর্তৃক অস্ট্রীয় যুবরাজের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যার সূত্রপাত হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই
'লিজিয়ন অব অনার' হচ্ছে এক ধরনের উপাধি, যা ১৮০২ সালের ১৯ মে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট প্রবর্তন করেন। এটি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মাননা। লিজিয়ন অব অনার পাঁচ ভাগে বিভক্ত। যথা- ১. নাইট, ২. অফিসার, ৩. কমান্ডার, ৪. গ্র্যান্ড অফিসার ও ৫. গ্র্যান্ড ক্রস
উদ্দীপকের ঘটনাটি আমার পাঠ্যপুস্তকের ভার্সাই সন্ধির সাথে সংশ্লিষ্ট। সারায়েভো হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয় এবং প্রায় পুরো বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তিনটি মহাদেশের ৩৪টি দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। চার বছরের অধিককাল স্থায়ী এ যুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হলে বিজয়ী বিশ্বশক্তি জোট ১৯১৯ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে জার্মানিকে একটি চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করে। সন্ধি স্বাক্ষরের পূর্বে ভার্সাই সন্ধির খসড়া জার্মানিকে দেওয়া হয়নি। তাই পরবর্তীতে জার্মানিরা এ সন্ধিকে চাপিয়ে দেওয়া সন্ধি বলে অভিহিত করে এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে।
উদ্দীপকে দেখা যায়, একটি অনুষ্ঠান আয়োজনকে কেন্দ্র করে আড়পাড়া ও জামতৈল গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় এবং তা দ্রুত অন্যান্য গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ বিষয়টি মীমাংসার জন্য বসে একতরফাভাবে আড়পাড়াকে দায়ী করে এবং তার ওপর ক্ষয়ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দেয়, যা ভার্সাই সন্ধির ঘটনাকে ইঙ্গিত করে। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের ঘটনার সাথে ভার্সাই সন্ধির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
উক্ত ঘটনার অর্থাৎ ভার্সাই সন্ধির প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী-উক্তিটি যথার্থ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের ফলে মিত্রশক্তি ১৯১৯ সালের ২৮ জুন জার্মানির কাঁধে ভার্সাই সন্ধি চাপিয়ে দেয়। এ সন্ধিতে প্রথম। বিশ্বযুদ্ধের যাবতীয় ক্ষতিপূরণ জার্মানিকে দিতে বাধ্য করা হয়।। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে জার্মানির নিকট থেকে ১৩২ বিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রা আদায় করা হয়। জার্মানির সৈন্য সংখ্যা এক লাখে সীমিত করা হয়। যুদ্ধের সরঞ্জাম উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি নিষিদ্ধ করা
হয়। রাইন নদীর ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে সকল জার্মান দূর্গ। সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়। সন্ধি অনুযায়ী জার্মানি তার আলসাস লোরেন ও খনিসমৃদ্ধ সার অঞ্চল ১৫ বছরের জন্য ফ্রান্সকে ছেড়ে দেয়। জার্মানি ভার্সাই সন্ধির কঠোরতায় ন্যুব্জ হয়ে পড়েছি জার্মানবাসী ভেতরে ভেতরে ফুসছিল এ সন্ধির নাগপাশ থেকে মুরি পাওয়ার জন্য। এ সময় উগ্র জাতীয়তাবাদী হিটলাটের আবির্ভাব ঘটে হিটলার ভার্সাই সন্ধির নিষ্ঠুরতা থেকে জার্মানবাসীকে মুক্তি দেওয়ার জন্য এবং জার্মানির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য মিত্রশক্তির বিরূদ্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এভাবেই ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয় এবং বিশ্ব আবার বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়। পরিশেষে বলা যায়, ভার্সাই সন্ধির ক্ষতিকর প্রভাবই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার্মান দার্শনিক, পণ্ডিত ও ঐতিহাসিকগণ এ কথা প্রচার করতে থাকেন যে জার্মানগণ হচ্ছে বিশুদ্ধ আর্য এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি। ক্রমে এ জাতীয়তাবাদী ধারণা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, রাশিয়া প্রভৃতি দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জার্মান জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগ করে। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার জাতিগত বিদ্বেষ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ অবস্থাকে উগ্র জাতীয়তাবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।