hsc

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস (অধ্যায়-৩)

ইতিহাস ২য় পত্র - ইতিহাস - এইচএসসি | NCTB BOOK

1.8k

তৃতীয় অধ্যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস

The First World War and The Treaty of Versailles and League of Nations

উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson 1856-1924) (১৮৫৬-১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ঐতিহাসিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শান্তি নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার শাসনকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রথম দিকে নিরপেক্ষ থাকলেও জার্মানির ক্রমাগত সাবমেরিন আক্রমণের সমুচিত জবাব দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে যুদ্ধে যোগ দেয়। তিনি গণতান্ত্রিক পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিত্রশক্তিকে সৈন্য, অর্থ ও ঋণ দিয়ে সাহায্য করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ মিত্রপক্ষের দেশসমূহের মনোবল চাঙ্গা করে এবং যুদ্ধে জয় পেতে সহায়তা করে, যার বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে চৌদ্দ দফা উত্থাপন, প্যারিস শাস্তি সম্মেলনে যোগদান, ভার্সাই সন্ধিতে অংশগ্রহণ ও লীগ অব নেশনস গঠনের প্রস্তাব তার উল্লেখযোগ্য অবদান। এসব পদক্ষেপ তার ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে। তিনি লীগ অব নেশনসের ধারণার উদ্ভাবক হলেও তার দেশকে এ সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণে সম্মত করতে ব্যর্থ হন। তার সময়ে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন নারীরা ভোটাধিকার পায়। লীগ অব নেশনস ধারণার জন্য তিনি ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল সব জাতির প্রতি ন্যায়বিচার, সব জাতির স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কাজ করা।'

উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson 1856-1924) (১৮৫৬-১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ঐতিহাসিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ছিলেন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শান্তি নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তার শাসনকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রথম দিকে নিরপেক্ষ থাকলেও জার্মানির ক্রমাগত সাবমেরিন আক্রমণের সমুচিত জবাব দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে যুদ্ধে যোগ দেয়। তিনি গণতান্ত্রিক পৃথিবী প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিত্রশক্তিকে সৈন্য, অর্থ ও ঋণ দিয়ে সাহায্য করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ মিত্রপক্ষের দেশসমূহের মনোবল চাঙ্গা করে এবং যুদ্ধে জয় পেতে সহায়তা করে, যার কৃতিত্বের দাবিদার তিনি।

বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে চৌদ্দ দফা উত্থাপন, প্যারিস শাস্তি সম্মেলনে যোগদান, ভার্সাই সন্ধিতে অংশগ্রহণ ও লীগ অব নেশনস গঠনের প্রস্তাব তার উল্লেখযোগ্য অবদান। এসব পদক্ষেপ তার ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে। তিনি লীগ অব নেশনসের ধারণার উদ্ভাবক হলেও তার দেশকে এ সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণে সম্মত করতে ব্যর্থ হন। তার সময়ে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন নারীরা ভোটাধিকার পায়। লীগ অব নেশনস ধারণার জন্য তিনি ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল সব জাতির প্রতি ন্যায়বিচার, সব জাতির স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কাজ করা।'

১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সংঘটিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জড়িয়ে পড়ে। এর পূর্বে কখনো এত ব্যাপকভাবে কোনো যুদ্ধ হয়নি। বিভিন্ন দেশ, জাতি ও জনগোষ্ঠী এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আওতায় আসে। এর ভয়াবহতা প্রায় সমগ্র পৃথিবীকে স্পর্শ করে। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে অস্ট্রিয়া-সার্বিয়ার সংঘাত বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়। এ যুদ্ধে একদিকে থাকে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, তুরস্কের ওসমানীয় সাম্রাজ্য, যা অক্ষশক্তিরূপে পরিচিত আর অন্যদিকে থাকে রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন (কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ), ইতালি, জাপান, বেলজিয়াম, সার্বিয়া, মন্টিনেগ্রো, যা মিত্রশক্তিরূপে পরিচিত। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বের কয়েক দশক ধরে ইউরোপের বিভিন্ন ঘটনার চরম পরিণতি হলো প্রথম মহাযুদ্ধ, ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে সার্ব আততায়ী কর্তৃক অস্ট্রীয় যুবরাজের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যার সূত্রপাত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

সিলেট বিভাগের উজিরপুর থানার গ্রামগুলো দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে। ফলে উজিরপুরে ভবিষ্যতে আর যেন কোনো সংঘর্ষ না হয় সেজন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়।

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

সিলেট বিভাগের উজিরপুর থানার গ্রামগুলো দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটে। ফলে উজিরপুরে ভবিষ্যতে আর যেন কোনো সংঘর্ষ না হয় সেজন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়।

উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নের উত্তর দাও:

'ক' ও 'খ' পক্ষের বিবাদ শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে 'খ' পরাজিত হয়। একটি বৈঠকের মাধ্যমে 'ক' পক্ষ 'খ' পক্ষকে একটি অন্যায় চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপ্তি, ধ্বংসযজ্ঞ ও হতাহতের সংখ্যা অতীতের সকল যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণকে অতিক্রম করে গেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই ইউরোপের প্রায় সব দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি আটলান্টিকের ওপারের যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার কিছু দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিস্তৃতি ঘটে। প্রকৃতপক্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মূলে ছিল একাধিক কারণ।

পরোক্ষ কারণসমূহ

(ক) উগ্র জাতীয়তাবাদ: প্রথম মহাযুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত ইউরোপীয় জাতিসমূহের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদের উনোষ। ইতালি ও জার্মানিতে জাতীয়তাবাদের সাফল্যের ফলে রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব শক্তির সঞ্চার করে। উগ্র জাতীয়তাবাদ হয়ে দাঁড়ায় একটি জাতির গৌরবের প্রতীক এবং প্রতিটি জাতি অপর জাতির তুলনায় অনেক সম্মান ও গৌরব দাবি করতে থাকে। ফলে জার্মানি ও ইংল্যান্ডের মধ্যে তীব্র নৌ ও সামরিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। তাছাড়া এর ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও বলকান অঞ্চলে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে রাজ্যলাভের জন্য তীব্র সংগ্রামের সূত্রপাত হয়। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রাংকো-প্রুশিয়া যুদ্ধে ফ্রান্সের আলসেস ও লোরেন প্রদেশদ্বয় জার্মানি দখল করে নিলে ফ্রান্সের যে জাতীয় সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় তা ফরাসিরা ভুলতে পারেনি। এ কারণেই তারা জার্মানদের চরম শত্রুতে পরিণত হয়। অস্ট্রিয়ার কাছ থেকে টিয়েস্ট ও টেন্টিনো অঞ্চলের ইতালীয় ভাষাভাষী জনগণকে ইতালির সাথে সংযুক্ত করার ব্যাপারে ইতালির জনগণ আকুল হয়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইউরোপের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলে ছিল জাতীয়তাবাদের বাড়াবাড়ি, যা শেষ পর্যন্ত মহাযুদ্ধে পরিণত হয়।

(খ) পরস্পরবিরোধী শক্তিজোট ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের উগ্র সমরবাদ ও পরস্পরবিরোধী সামরিক জোটও প্রথম মহাযুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল। এর মূলে ছিল বিসমার্কের ফ্রান্সবিরোধী মনোভাব। বিসমার্ক উপলব্ধি করেন, ফ্রাংকো-প্রশিয়া যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি ফ্রান্স কখনো বিস্মৃত হতে পারেনি; এ কারণে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ আক্রমণ থেকে জার্মানির নিরাপত্তার জন্য বিসমার্ক সামরিক শক্তিজোটের সূত্রপাত করেন। ডেভিড টমসন বলেছেন, "প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, এই যুদ্ধ ছিল অযাচিত ও অভাবিত। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে যে ঘটনাবলির সূচনা হয়, এই যুদ্ধ ছিল তার চূড়ান্ত পরিণাম।" (The most important thing about the first world war is that it was unsought, un-intended end product of a long sequence of events which began in 1871.) ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার সম্রাটরা ত্রিশক্তি সম্রাট জোট গঠন করেন। বলকান অঞ্চলে রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে স্বার্থ-সংঘাতের দ্বন্দ্বে জার্মানি অস্ট্রিয়ার পক্ষাবলম্বন করায় রাশিয়া ত্রিশক্তি সম্রাট জোট থেকে বেরিয়ে যায়। ফ্রান্স ও ইতালির মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলে ইতালি ফ্রান্স-ভীতি থেকে মুক্ত হতে জার্মানি-অস্ট্রিয়ার জোটভুক্ত হয়। ফলে এ তিন শক্তির সম্মিলিত সামরিক জোটই ত্রিশক্তি চুক্তি (Triple Alliance) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তার নাম হয় ত্রিশক্তি আঁতাত। এসব শক্তিজোটের শর্তগুলো ছিল গোপন। শান্তিরক্ষার পরিবর্তে এ শক্তিজোটগুলো অবিশ্বাস ও ভীতির সঞ্চার করে এবং প্রতিটি রাষ্ট্র এক ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কায় সময় কাটাতে থাকে। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে এ দুই শক্তিজোট পরস্পরের সম্মুখীন হয়। মরকোর ব্যাপারে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নিকট অপদস্থ হয় জার্মানি ও তার মিত্ররা, অস্ট্রিয়া ও ইতালি তা বিস্মৃত হয়নি। কিন্তু ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে বলকান সংকটে অস্ট্রো-জার্মান গোষ্ঠী জয়লাভ করে এবং রাশিয়া অপদস্থ হয়। এ রকম ঘাত-প্রতিঘাত বৃহত্তর যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করে।

(গ) সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা এ যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা। তখন ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ-সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করলে সকল রাষ্ট্রই সমরাস্ত্রে সজ্জিত হতে থাকে। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির সৈন্যসংখ্যা ছিল ৮,৭০,০০০। তখন ফ্রান্স বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরির মেয়াদ ৩ বছর করে। রাশিয়াও নিজ দেশে সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করে। ব্রিটেনও তখন নৌবাহিনীর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করে। এ রকম সামরিক পটভূমিকায় ইঙ্গ-জার্মান নৌ প্রতিদ্বন্দ্বিতা মহাযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

(ঘ) পুঁজিবাদের বিকাশ ঊনবিংশ শতকে ইউরোপে ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে অর্থনৈতিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়। যার ফলে সমগ্র ইউরোপে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ লাভঘটে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্রিটেন আরেক পুঁজিবাদী আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। ইউরোপের প্রায় সকল পুঁজিবাদী দেশই পণ্যের বাজার দখলের জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। পুঁজিবাদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে ত্বরান্বিত করে।

( ঙ) উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের চরম বিকাশের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের
প্রসার ও উপনিবেশ বিস্তার নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ব্রিটেন ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ঔপনিবেশিক শক্তি। উপনিবেশগুলো ছিল তার শক্তি ও সমৃদ্ধির প্রধান উৎস। জার্মানি নব্য পুঁজিবাদী দেশ হওয়ায় তার কোনো উপনিবেশ ছিল না। ফলে নতুন উপনিবেশ স্থাপনের জন্য জার্মানি উদগ্রীব হয়ে ওঠে। উপনিবেশের সম্প্রসারণ ও নতুন উপনিবেশ স্থাপনের জন্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা নেয়।

(চ) বিভিন্ন শক্তির উদ্দেশ্য সিদ্ধি" বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপীয় শক্তি বিভিন্ন উদ্দেশ্য সিদ্ধির লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছিল এবং যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছিল।

জার্মানির উদ্দেশ্য ছিল:

১। পোল্যান্ডের কিছু অংশ দখল করা।
২। মরক্কোসহ আফ্রিকায় কিছু উপনিবেশ দখলের ইচ্ছা তার ছিল। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে জার্মানি ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর আগাদিতে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠায়। ফ্রান্সের প্রতিরোধের মুখে ইউরোপ যুদ্ধ থেকে রক্ষা পায়।

ব্রিটেনের উদ্দেশ্য ছিল:

১। তার ঔপনিবেশিক আধিপত্য ধরে রাখা।
২। জার্মানির উঠতি নৌবাহিনী, যা ব্রিটেনের সাথে প্রতিযোগিতার জন্য সৃষ্ট, তাকে আর বাড়তে না দেওয়া

অস্ট্রো-হাঙ্গেরির উদ্দেশ্য ছিল:

১। স্লাভ জাতিগত এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। যার ফলস্বরূপ অস্ট্রো-হাঙ্গেরি হার্জেগোভিনা নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করে। অস্ট্রো-হাঙ্গেরি তুরস্কের বসনিয়া-
২। বলকান এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাও তার উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু তার প্রধান বাধা ছিল সার্বিয়া। কারণ বসনিয়ার জনসংখ্যার অধিকাংশ ছিল স্লাভ এবং সার্বিয়া আগে থেকেই বসনিয়াকে নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করতে চেয়েছিল। অস্ট্রিয়ার জন্য উদ্দেশ্য সফল না হওয়ায় সার্বিয়া অস্ট্রিয়ার বিরোধী হয়ে ওঠে।

রাশিয়ার উদ্দেশ্য ছিল:

১। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ।
২। তুরস্ক ও মেসোপটেমীয় অঞ্চলে জার্মানি ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরি যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে উদ্দেশ্য রাশিয়ার ছিল।

সুসম্পর্ক থাকায় এজন্য স্লাভ জাতির সাথে সুসম্পর্ক থাকায় সার্বিয়ার সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক মধুর হয়ে ওঠে।

ফ্রান্সের উদ্দেশ্য ছিল:

১। তার উপনিবেশগুলোতে জার্মানির প্রবেশ ঠেকানো।
২। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধে হারানো আলসে ও লোরেন জার্মানির কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করা।

ইতালির উদ্দেশ্য ছিল: ইতালি একটি দুর্বল পুঁজিবাদী দেশ হলেও তারও উদ্দেশ্য ছিল বলকান এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

জাপানের উদ্দেশ্য ছিল: এশিয়ায় তার প্রভাব বৃদ্ধি করা।
আমেরিকার উদ্দেশ্য ছিল:

১। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্র ব্যবসা।
২। নীতিগতভাবে আমেরিকা জার্মানবিরোধী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছিল।
অতএব, বিভিন্ন দেশের পরস্পরবিরোধী উদ্দেশ্য ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ।

প্রত্যক্ষ কারণসমূহ

অস্ট্রিয়ার যুবরাজের হত্যা: ইউরোপে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যখন উত্তেজনা বিরাজমান, তখন ১৯১৪
খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জুন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্কডিউক ফ্রান্সিস ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী সোফিয়া বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে প্রকাশ্য দিবালোকে এক সার্ব আততায়ীর হাতে নিহত হন। ইতিপূর্বে অস্ট্রিয়া-সার্বিয়ার পারস্পরিক শত্রুতা চরম আকার ধারণ করে। এ হত্যাকাণ্ডের ফলে ইউরোপে এক প্রচণ্ড উত্তেজনা সৃষ্টি হয়; যা ক্রমে সমগ্র ইউরোপ তথা বিশ্বকে গ্রাস করে। এ হত্যাকাণ্ড অস্ট্রিয়ার অভ্যন্তরে ভীষণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং সে সর্বতোভাবে সার্বিয়াকে এ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে ২৩শে জুলাই একটি চরমপত্র প্রদান করে। এর দাবিগুলো ছিল- সার্বিয়াকে অস্ট্রিয়াবিরোধী সকল প্রচারণা বন্ধ করতে হবে, সকল গোপন সমিতি দমন করতে হবে এবং অস্ট্রিয়ার যুবরাজের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার বিষয়ে অস্ট্রীয় অফিসারদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সার্বিয়া শেষ দাবিটা ছাড়া সব দাবি মেনে নিতে স্বীকৃত হয়। কিন্তু অস্ট্রিয়া এতে সন্তুষ্ট হয়নি। তারা সার্বিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সৈন্য সমাবেশের নির্দেশ দেয়। জার্মানি এ কাজে অস্ট্রিয়াকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানায়। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন সার্বিয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও জার্মান সীমান্তে তার সৈন্য সমাবেশ করতে থাকে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ডের যোগদানের কারণ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধপূর্ব সময়ে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ উপনিবেশের অধিকারী ছিল ইংল্যান্ড। নৌশক্তিতে বলীয়ান হওয়ায় বিশ্বের সবগুলো সমুদ্র ইংল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ফলে উপনিবেশসমূহে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারে তার কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু ইউরোপের নতুন পরাশক্তি জার্মানি নৌশক্তি অর্জনের আশায় বিশাল বিশাল নৌবহর গঠন করতে শুরু করলে ইংল্যান্ডের সমুদ্র বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তুরস্কের সাথে জার্মানির বন্ধুত্ব স্থাপিত হলে নিকট প্রাচ্যে ইংল্যান্ডের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দের লন্ডন চুক্তির দ্বারা জার্মানি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে নিশ্চয়তা প্রদান করেছিল যে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বেলজিয়ামকে রক্ষা করা হবে। কিন্তু লন্ডন চুক্তি ও আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি উপেক্ষা করে জার্মানি বেলজিয়ামের উপর দিয়ে ফ্রান্স আক্রমণ করায় ইংল্যান্ড আতঙ্কবোধ করে। এছাড়া ফ্রান্স ও রাশিয়ার সাথে ইংল্যান্ড ত্রিশক্তি আঁতাত জোটে চুক্তিবদ্ধ ছিল। ফলে ৫ই আগস্ট, ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

তুরস্কের যোগদানের কারণ তুরস্ককে কেন্দ্র করে পূর্ব ইউরোপের বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছিল উসমানীয় খিলাফত তথা অটোমান সাম্রাজ্য। রাশিয়া ছিল খিলাফতের চিরশত্রু। বলকান অঞ্চলে রাশিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করলে তুরস্ক নিজ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দেয়। আটলান্টিকের পশ্চিম তীরের দেশটি ছিল সব দিক থেকেই নিরাপদ। মার্কিনিদের সমরাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। যুদ্ধসামগ্রী বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে থাকে। জার্মানি মার্কিন রসদ ও অস্ত্রবোঝাই জাহাজগুলো যাতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সে যেতে না পারে সেজন্য সাবমেরিন আক্রমণ দ্বারা জাহাজগুলোকে আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবিয়ে দিতে থাকে। বিশেষ করে ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে লুসিটানিয়া নামক মার্কিন যাত্রীবাহী জাহাজ জার্মানির নৌবাহিনী ধ্বংস করলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না- এ মর্মে জার্মানি প্রতিশ্রুতি দিলেও ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে জার্মানি ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের চারদিকে সাবমেরিন বলয় তৈরি করে এবং ঘোষণা দেয় যে, এ বলয় ভেদ করে কোনো মার্কিন জাহাজ ঢুকলে এর ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার জার্মানি নেবে না। এরূপ ঘটনায় মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেটরগণ জার্মানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট উইলসনের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষ নীতি ত্যাগ করে ৬ই এপ্রিল, ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

যুদ্ধের বিস্তৃতি: ৩০শে জুলাই জার্মানি রাশিয়াকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে সৈন্য সমাবেশ বন্ধ করার জন্য চরমপত্র প্রদান করে। রাশিয়া এর কোনো উত্তর না দিলে জার্মানি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ৩রা আগস্ট জার্মানি বেলজিয়ামের সীমান্ত লঙ্ঘন করে সৈন্য পাঠালে ইংল্যান্ড ফ্রান্স ও রাশিয়ার পক্ষাবলম্বন করে ৪ঠা আগস্ট জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর ফলে সারা বিশ্বে শুরু হয় প্রথম মহাযুদ্ধ।

ত্রিশক্তি চুক্তি ও ত্রিশক্তি আঁতাত

ত্রিশক্তি চুক্তি ও ত্রিশক্তি আঁতাত হলো ইউরোপের দুটি বিরোধী শিবিরের পরস্পরবিরোধী মৈত্রী চুক্তি। জাতীয়তাবাদকে অবহেলা ও জাতীয়তাবাদ দমনের মধ্যে যেমন যুদ্ধের বীজ নিহিত থাকে, তেমনি উগ্র জাতীয়তাবোধও যুদ্ধের মনোবৃত্তি সৃষ্টিতে সহায়তা করে। উনবিংশ শতকের শেষভাগে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নানাবিধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ-দ্বন্দ্ব এবং সংগ্রামশীল জাতীয়তাবাদের উন্মেষ দেখা দিয়েছিল, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসকারী রূপ রচনার পটভূমি তৈরি করেছিল। উগ্র জাতীয়তাবোধ জার্মানিতে বেশি আত্মপ্রকাশ করেছিল।

জার্মানির নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বিসমার্ক অস্ট্রিয়া ও ইতালির সঙ্গে ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে যে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেন, তা ত্রিশক্তি চুক্তি নামে পরিচিত। চুক্তি অনুসারে জার্মানি,। ইতালি ও অস্ট্রিয়া। পরস্পর রস্পরের আত্মরক্ষার জন্য সামরিক সাহায্যদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ তিনটি দেশ হয় অক্ষশক্তিভুক্ত দেশ। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তুরস্ক ও রুমানিয়া এবং পরবর্তী সময়ে বুলগেরিয়া এ 'ত্রিশক্তি চুক্তির' জোটে যোগ দেয়।
জার্মানির এ যুদ্ধ প্রস্তুতি ইউরোপের অন্য রাষ্ট্রগুলোকে আতঙ্কিত করে তোলে। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে বিসমার্কের পদত্যাগের পর রাশিয়া জার্মানির সাথে সম্পাদিত রি-ইন্স্যুরেন্স চুক্তি ভঙ্গ করে ফ্রান্সের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হলো। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাদের ঔপনিবেশিক বিরোধ মিটিয়ে ফেলে 'আঁতাত কার্ডিয়াল' নামে একটি মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করল। এ সময় ইংল্যান্ড জাপানের সাথেও একটি মিত্রতা চুক্তি করল। ১৯০৭খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড, রাশিয়া ও ফ্রান্স এ তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক আত্মরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়, তা ত্রিশক্তি আঁতাত বা ট্রিপল আঁতাত নামে পরিচিত। ট্রিপল আঁতাত ছিল ট্রিপল অ্যালায়েন্স বা ত্রিশক্তি চুক্তির প্রত্যুত্তর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ তিনটি দেশ হয় মিত্রশক্তিভুক্ত দেশ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added || updated By

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রধান ঘটনাগুলোকে বছর হিসাবে ভাগ করে বর্ণনা করা যুক্তিযুক্ত হবে। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধ ঘোষণার সময় জার্মানিই ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী। জার্মানির অগ্রগতি প্রতিহত করার মতো ক্ষমতা মিত্রশক্তির ছিল না। লিজের যুদ্ধে জার্মান বাহিনী বেলজিয়ামকে পরাজিত করে। ইঙ্গ-ফরাসি বাহিনীর প্রতিরোধ সত্ত্বেও জার্মান বাহিনী ফ্রান্সের উপকণ্ঠে এসে পৌছে। এ সময় মিত্রপক্ষের সেনাপতি জেনারেল ফচের তৎপরতা ও দক্ষতায় জার্মান বাহিনী মার্ন নদীর তীর থেকে পিছু হটে। মিত্রপক্ষ মার্নের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পায়। অপরদিকে জার্মানি ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধ দ্রুত অবসানের সুযোগ হারায়। এইনি নদীর তীরে জার্মান বাহিনী ঘাঁটি স্থাপন করলে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়।

এ বছর রুশ বাহিনী পূর্ব ইউরোপ আক্রমণ করতে এসে ট্যাটেনবার্গের যুদ্ধে পরাজিত হয়। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে রাশিয়ার অগ্রগতি জার্মানির সহায়তায় রুদ্ধ হয়। রুশ বাহিনী অস্ট্রিয়া ত্যাগে বাধ্য হয়।

১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে ইতালি যুদ্ধে অংশ নিলে যুদ্ধের গতিপ্রবাহে পরিবর্তন ঘটে। তুরস্কও জার্মানির অনুরোধে মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তুরস্ক দার্দনিলিজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে মিত্রবাহিনীর যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যায়। দাদনিলিজ উদ্ধারের জন্য রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স অর্থাৎ মিত্রবাহিনী আক্রমণ করে পরাজিত হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ইংল্যান্ড বাগদাদ দখলে সমর্থ হয়। এ বছরই জার্মানি ইংল্যান্ডের সামুদ্রিক প্রাধান্য ও বাণিজ্যিক স্বার্থ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে সাবমেরিনের আক্রমণ দ্বারা ইংরেজদের যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস করতে শুরু করে। এ বছর জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার আক্রমণে সার্বিয়া সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। এভাবে সব যুদ্ধেই মিত্রশক্তির পরাজয় ঘটে।

১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের নিকট ভার্দুনের যুদ্ধে জার্মান ও ইঙ্গ-ফরাসি বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হলে উভয় পক্ষে যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়। সোমের যুদ্ধে জার্মান বাহিনী ইঙ্গ-ফরাসি আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। এ বছর পুনরায় রাশিয়া অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করলেও জার্মানির সামরিক সহযোগিতায় অস্ট্রিয়াকে পুরোপুরি পদানত করা সম্ভব হয়নি। রুমানিয়া অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিলে অস্ট্রিয়া-জার্মানির যৌথ আক্রমণে রুমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্ট যৌথ বাহিনী কর্তৃক অধিকৃত হয়।

১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো জাটল্যান্ডের জলযুদ্ধ। যুদ্ধের প্রথম দিকে ইংরেজ বাহিনী জয়লাভ করলেও চূড়ান্ত জলযুদ্ধে তারা পরাজিত হয়। উভয় পক্ষের ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি ছিল যে যুদ্ধে জয়লাভ করেও জার্মান বাহিনী ব্রিটিশ নৌশক্তির সাথে আর যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে সক্ষম হয়নি।

১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লবের দ্বারা বিপ্লবী সরকার গঠিত হলে এর প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে। বলশেভিক যুদ্ধনীতির পক্ষপাতী ছিল না। ফলে রাশিয়া ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তি দ্বারা জার্মানির সাথে যুদ্ধ মিটিয়ে ফেলে। রাশিয়ার সাথে যুদ্ধাবসানের ফলে জার্মানি পূর্ব ইউরোপ থেকে সৈন্য বাহিনীকে পশ্চিম ইউরোপে নিয়োজিত করার সুযোগ পায়। এ সময় মিত্রশক্তির সামরিক অবস্থা নাজুক হয়ে পড়লে আমেরিকা মিত্রপক্ষের সহায়তায় যুদ্ধে অংশ নেয়। এতে যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হয়। জার্মান সাবমেরিনের আক্রমণে মার্কিন জাহাজ ও বাণিজ্যের প্রভূত ক্ষতি হয়েছিল। ফলে জার্মানিকে পরাজিত করা আমেরিকার স্বার্থের দিক দিয়ে যথেষ্ট প্রয়োজন ছিল। আমেরিকার অংশগ্রহণে মিত্রপক্ষের সৈন্যদের মনোবল চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ফলে যুদ্ধের চিত্র পাল্টাতে শুরু করে।

১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে জার্মানি মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে অ্যামিয়েন্সের যুদ্ধে প্রবল শক্তিতে আঘাত হানে। উভয় পক্ষের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং বহু সৈন্য প্রাণ হারায়। জেনারেল ফচের সুদক্ষ পরিচালনায় ইউরোপ ও এশিয়ায় জার্মান বাহিনী পরাজিত হতে শুরু করে। তুরস্ক ও অস্ট্রিয়া মিত্রপক্ষের নিকট পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মানি একাই লড়তে থাকে। ইত্যবসরে জার্মানিতে রুশ বিপ্লবের অনুরূপ আন্দোলন শুরুর আশঙ্কা দেখা দেয়। জার্মান নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সর্বত্র সংকটাপন্ন অবস্থার ফলে জার্মানি যুদ্ধাবসানের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই নভেম্বর মিত্রপক্ষের সাথে জার্মানির অস্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়। দীর্ঘ চার বছর সাড়ে চার মাসের যুদ্ধের বীভৎস অভিজ্ঞতার পর ইউরোপে শাস্তি ফিরে এলো।

জার্মানির পরাজয়ের কারণ

জার্মানি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সমরশক্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। শিল্পবিপ্লবের অর্জিত আয় দ্বারা অতিদ্রুত সফলতার সাথে সমরশক্তিতে সমৃদ্ধ হয়। জার্মান বুদ্ধিজীবী ও সমরনায়করা জার্মানদের মধ্যে এরকম এক জাতীয়তাবাদী ধারণা জন্ম দিতে সক্ষম হন যে, বিশ্বে জার্মানরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। এ বোধ থেকেই জার্মানি শ্রেষ্ঠ সমরশক্তি অর্জনে অনুপ্রাণিত হয়। এর পরও জার্মানি ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় বরণ করে।
জার্মানির পরাজয়ের কারণ নিচে আলোচিত হলো:

ক. জার্মানির ভূরাজনৈতিক অবস্থা: ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত জার্মানির ভৌগোলিক সীমা ছিল সীমিত।
শুধু দক্ষিণে মিত্র দেশ ছিল ইতালি, বাকি তিনদিকেই শত্রু দ্বারা বেষ্টিত ছিল। আক্রমণে সিদ্ধহস্ত হলেও পাল্টা আক্রমণে আত্মরক্ষা করার মতো যথেষ্ট পশ্চাদ্‌ভূমি জার্মানির ছিল না। তাই সংগত কারণেই জার্মানিকে পরাজয় বরণ করতে হয়।

খ. দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধ যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা জার্মানির পরাজয়ের অন্যতম কারণ। জার্মানির সমরশক্তি
স্বল্পকালব্যাপী যুদ্ধের জন্য ছিল উপযুক্ত। কেননা, ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মতো উপনিবেশ জার্মানির ছিল না। উপনিবেশ না থাকায় জার্মানি ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মতো উপনিবেশ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করতে পারেনি। তাই জার্মানি সৈন্যসংখ্যা হতাহতের পর শূন্যতা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে অসমর্থ হওয়ায় জার্মানি পরাজিত হয়।।

গ. নৌশক্তির দুর্বলতা: ইউরোপের নৌশক্তিতে সর্বদাই ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল। ফ্রান্সের নৌশক্তি প্রথম
বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের নৌশক্তির সাথে যুক্ত হওয়ায় ঈঙ্গ-ফ্রাংকো নৌশক্তি অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে আবির্ভূত হয়। ভূমধ্যসাগরে জার্মান নৌশক্তির রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা ঈঙ্গ-ফ্রাংকো নৌশক্তি ভেঙে দিলে জার্মানির পক্ষে নৌ-যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি, যা তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

ঘ. রণাঙ্গনের সংখ্যাধিক্য: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধক্ষেত্র ছিল একাধিক। জার্মানিকে একই সময়ে পূর্ব সীমান্তে
রাশিয়া এবং পশ্চিম সীমান্তে ইঙ্গ-ফ্রাংকো বাহিনীর মোকাবিলা করতে হয়। ফলে কোনো এক রণাঙ্গনে জার্মানি পূর্ণ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারেনি। আবার কূটনৈতিক ব্যর্থতার জন্য রাশিয়াকে ত্রিশক্তি আঁতাত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারা পরাজয়ের অন্যতম কারণ। যদিও ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে বলশেভিক বিপ্লবের পর রাশিয়া যুদ্ধ ত্যাগ করলে জার্মানির জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করে মিত্রপক্ষে যোগদান করলে জার্মানির যুদ্ধে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৫. ফ্রান্সের যুদ্ধংদেহী মনোভাব: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ফ্রান্স ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির নিকট যুদ্ধে পরাজিত হয়। এ
পরাজয়ের গ্লানি ফরাসিদের মনে প্রতিশোধের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। কাজেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই ফরাসি সৈন্য ও জনতা যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে যুদ্ধ শুরু করলে জার্মান সৈন্যরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

চ. আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যদিও আমেরিকা তার নিরপেক্ষতার কথা ঘোষণা করেছিল, কিন্তু বাস্তবে আমেরিকা কখনো নিরপেক্ষ ছিল না। তার সামরিক ও আর্থিক সমর্থন ছিল ব্রিটেন জোটের প্রতি। এছাড়া আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের পর যুদ্ধের মোড় পুরোপুরি ঘুরে যায় এবং জার্মানির পরাজয় নির্ধারিত হয়ে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By

প্রথম মহাযুদ্ধের শুরুতে উভয় পক্ষ এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি। উভয় পক্ষই তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ শুরু করে। বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এ মহাযুদ্ধের ফলাফলও ছিল সুদূরপ্রসারী।

১। ইউরোপে রাজবংশের অবসান: প্রথম মহাযুদ্ধের ফলে ইউরোপে চারটি রাজবংশ উৎখাত হয়।
অস্ট্রিয়ার হ্যাপস্বর্গ রাজবংশ, প্রুশিয়ার হোহেন জোলার্ন রাজবংশ, রাশিয়ার রোমানভ রাজবংশ এবং তুরস্কের ওসমানীয় রাজবংশ। এসব দেশে স্থাপিত হয় প্রজাতান্ত্রিক সরকার। সেখানে জাতীয়তাবাদী শক্তির বিজয় সূচিত হয় এবং জাতিতে জাতিতে বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির পথ উন্মুক্ত হয়।
২। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ: এ যুদ্ধের ভয়াবহতা, নিষ্ঠুরতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পৃথিবীতে এ পর্যন্ত সংঘটিত সকল যুদ্ধকে অতিক্রম করে। যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি আর আহতের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। অনাহারে, অপুষ্টিতে মৃত্যুবরণ করেছে ৭০ লাখ মানুষ। অগণিত লোক পঙ্গুত্ব বরণ করে। শত্রু অধিকৃত ৩টি মহাদেশের ৩৪টি দেশকে অপরিমিত ক্ষয়ক্ষতি ও অবর্ণনীয় দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়। : যুদ্ধক্ষেত্রের ধ্বংসলীলা, যুদ্ধরত সৈন্যদের বর্বরতা, সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব, তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া জাতীয় ঋণের বোঝা সবকিছুই ছিল এ যুদ্ধের বিভীষিকাময় ফল।
৩। অর্থ ও সম্পত্তিনাশের পরিমাণ: এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ সর্বগ্রাসী যুদ্ধে ২৭ হাজার কোটি ডলার খরচ হয়। এ বিপুল অর্থের অপচয়ের ফলে পরবর্তীকালে পৃথিবীর অর্থসংকট প্রকট হয়ে দেখা দেয়। কোটি কোটি ডলার উভয় পক্ষের দেশগুলোকে খরচ করতে হয় আত্মরক্ষা ও আক্রমণের জন্য। ফলে সব দেশেরই জাতীয় ঋণের পরিমাণ অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধরত দেশগুলো একে অপরের অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, ব্রিজ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। ৪ বছরের যুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষের মধ্যে মনোবৈকল্যের সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীকালে নানা সামাজিক সমস্যার উদ্রেক করে।

৪। মানচিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন ও জাতীয়তাবাদের জয় এ যুদ্ধে অনেক সাম্রাজ্য ভেঙে গিয়ে অনেক নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। জার্মানিকে সম্পূর্ণ সংকুচিত করা হয়। অস্ট্রিয়া ও তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্য তাদের বিশাল আয়তন থেকে ছোট আয়তনের রাষ্ট্রে পরিণত হয়। জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইউরোপকে পুনর্গঠিত করা হয়। বহু জাতির সমন্বয়ে গঠিত সাম্রাজ্যগুলো থেকে বিছিন্ন করে এক ভাষাভাষী ও এক জাতির ভিত্তিতে কয়েকটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করা হয়। রুশ সাম্রাজ্য থেকে আলাদা করে ফিনল্যান্ড, অ্যাস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া গঠন করা হয়। পোলদের একত্রিত করে নতুনভাবে পোল্যান্ড গঠন করা হয়। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি থেকে বিচ্ছিন্ন করে চেকোস্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি গঠন করা হয়। তাছাড়া আলসেস-লোরেন ফ্রান্সকে, ট্রান্সসিলভেনিয়া রুমানিয়াকে, স্লেজভিগ ডেনমার্ককে এবং ক্রিয়েন্ট ইতালিকে দেওয়া হয়। এতে ইউরোপে জাতীয়তাবাদের জয় হয় এবং তা শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

৫। স্বাধীনতা আন্দোলন ও গণতন্ত্রের প্রসার এ যুদ্ধের পরপরই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনগণের মধ্যে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য প্রেরণা জাগে। ভারতবর্ষ, মিশর ও পূর্ব আফ্রিকা প্রভৃতি অঞ্চলের জনগণ স্বাধীনতার জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠে। এ যুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রেরও বিস্তার হয়। রাশিয়ায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন অবশেষে সাম্যবাদ তথা বলশেভিক বিপ্লবে রূপ নেয়।

৬। আমেরিকার মর্যাদা বৃদ্ধি: প্রথম মহাযুদ্ধের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, কিন্তু আমেরিকা উৎপাদনের ক্ষেত্রে অগ্রসর হয়ে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী দেশে পরিণত হয়। বিশ্বের অন্য দৈশগুলোকে সাহায্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে সে বিরাট প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। এ যুদ্ধের ফলে আমেরিকার হাতে বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব চলে আসে। আমেরিকার মর্যাদা ও প্রভাব সারা বিশ্বে বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য কেন্দ্র অর্থাৎ মোড়লে পরিণত হয়।

৭। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি: এ যুদ্ধের ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞান, যাতায়াত, শিক্ষাদীক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নিখুঁত মারণাস্ত্র আবিষ্কার ও প্রতিপক্ষের মারণাস্ত্র থেকে রক্ষা পেতে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হয়। বিশেষ করে এ যুদ্ধের প্রয়োজনে চিকিৎসাশাস্ত্র, বিমান চলাচল ও বিমান আক্রমণের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়।

৮। নারী মুক্তি: সামাজিক দিক থেকে দেখা যায় যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে সাধারণভাবে নারী ও শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি ঘটে। যুদ্ধের সময় পুরুষরা যুদ্ধে যোগ দিলে গৃহবধূরা গৃহকোণ ছেড়ে অফিসে, বিদ্যালয়ে, ক্ষেতে, খামারে, কারখানায় কাজ করতে বাধ্য হয়। যুদ্ধ শেষ হলে আর নারীরা গৃহের বদ্ধ জীবনে ফিরে যায়নি। ইউরোপে তারা পুরুষের পাশাপাশি মাথা উঁচু করে চলতে আরম্ভ করে।

৯। শ্রমিক জাগরণ: ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণি যুদ্ধের সময় তাদের শক্তির কথা বুঝতে পারে। তারা বুঝতে পারে যে, শ্রমিক কলে, কারখানায় কাজ করলে তবেই যুদ্ধের মারণাস্ত্র নির্মিত হয়; সাধারণ লোকের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্য উৎপন্ন হয়। শ্রমিকের শ্রমের দ্বারাই রাষ্ট্রের সম্পদ উৎপন্ন হয়। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকের দাবিদাওয়া সম্পর্কে তাদের সচেতন করে। রুশ বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণি লাভবান হলে, অন্যান্য দেশেও শ্রমিকের মঙ্গলের জন্য রাষ্ট্রকে আইন রচনা করতে হয়। শ্রম ও শ্রমিকের মর্যাদা বাড়ে।

১০। জনমত ও সংবাদপত্রের প্রভাব বৃদ্ধি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে জনমতের প্রভাব বিশেষভাবে পড়ে। অতীতে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সাধারণ লোকের আগ্রহ কম ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর লোকজন বৈদেশিক নীতির গুরুত্ব বুঝতে পারে। সংবাদপত্রের প্রসারের ফলে লোকজন বৈদেশিক ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়। এজন্য গোপন কূটনীতির (Secret diplomacy) স্থলে খোলা কূটনীতি চালু হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপকতা, ভয়াবহতা, ধ্বংস, বিপুল অর্থ ও লোকক্ষয় এবং অন্যান্য দিক দিয়ে এর বৈশিষ্ট্য ছিল অনন্য। ফলাফলের দিক দিয়েও এর সাথে পূর্বের কোনো যুদ্ধের তুলনা চলে না। পৃথিবীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন সূচনার জন্য এর অবদান ছিল অপরিসীম। তাই বলা যায়, এ যুদ্ধ বিশ্বমানবতার ক্ষতির সাথে কিছু উপকারও করে। তবু এ যুদ্ধ ছিল বিশ্বের মানুষের জন্য এক বিরাট অভিশাপ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By

প্রথম মহাযুদ্ধের পর বিজয়ী মিত্রশক্তি পরাজিত জার্মানি ও তার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ডাকে। তারা ইউরোপের স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তাবিধানের জন্য ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই জানুয়ারি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এক সম্মেলনে মিলিত হয়। এ শান্তি সম্মেলনে বিশ্বের ৩২টি দেশের প্রতিনিধিরা যোগ দেন। যেসব দেশ এ সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠায়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। শান্তি বৈঠকের প্রধান সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় তিন প্রধানের উপর। তারা ছিলেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্লেমেনস্যু, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। শান্তি স্থাপনের জন্য তারা চৌদ্দ দফার মাধ্যমে যে আদর্শবাদী পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন তা অন্যান্য মিত্রশক্তি (বিশেষত ফ্রান্স) মানতে রাজি ছিল না। ফলে প্রেসিডেন্ট উইলসন অনেক ক্ষেত্রে আপস করতে বাধ্য হন। ফলে শান্তিচুক্তিতে আদর্শবাদের পরিবর্তে প্রতিশোধ নেওয়ার ও সংকীর্ণ জাতীয় স্বার্থ রক্ষার ইচ্ছা প্রাধান্য পায়।

সন্ধির প্রেক্ষাপট'

ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র- এ চার শক্তি ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে সন্ধির প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
ফ্রান্স: ফান্স ও জার্মানির মধ্যে শত্রুতা ছিল বহু পুরনো। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রাংকো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে পরাজিত ফ্রান্স সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে প্রত্যাশিত সুযোগ পেয়ে ফ্রান্সের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় জার্মানিকে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পঙ্গু করে দেওয়া। ফ্রান্সের প্রতিনিধি জর্জ ক্লেমেনস্যু এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কঠোর মনোভাবাপন্ন ক্লেমেনস্যুর বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল এবং তিনি অংশগ্রহণকারী অন্য নেতৃবৃন্দের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ব্রিটেন: ব্রিটেনের উদ্দেশ্য ছিল একটি আগ্রাসী সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে জার্মানির পুনরুত্থানকে অক্ষম করে তোলা এবং ইউরোপে তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ তার জনগণের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে এ সম্মেলনে এসেছিলেন। চারিত্রিক গুণাবলি, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং ইউরোপীয় সমস্যা সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। ইউরোপীয় রাজনীতিতে ব্রিটেনের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের জন্য তিনি তার মেধা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়েছিলেন।
ইতালি: ইতালির উদ্দেশ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তার যোগদানের পুরস্কারস্বরূপ বলকান এলাকা ও আফ্রিকায় জার্মানির অধিকাংশ উপনিবেশ লাভ করা। ইতালির প্রতিনিধি ভিত্তোরি ওরলান্দো প্রকাশ্যে তার দেশের স্বার্থ আদায়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের উদ্দেশ্য ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ভিত্তিতে ইউরোপের পুনর্গঠন এবং বিজয়ী ও বিজিতের স্বার্থরক্ষা হয় এমন একটি সন্ধি রচনা করা। সর্বোপরি, একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তোলা। তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী। শত্রুর প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণের পরিবর্তে তিনি ন্যায় ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দীর্ঘস্থায়ী শাস্তি স্থাপনের পক্ষপাতী ছিলেন। তবে ইউরোপীয় জটিল রাজনীতি ও সমস্যা সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা না থাকায় উচ্চ আদর্শবাদ ইউরোপীয় স্বার্থের দ্বন্দ্বে কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এ চার প্রধান শক্তি ব্যতীত অন্য কূটনৈতিক প্রতিনিধিগণ দূর থেকে অনেকে সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট উইলসনের আদর্শের ঘোর বিরোধী ছিলেন। জাপানি প্রতিনিধিরা ইউরোপের চেয়ে দূরপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন।
প্যারিস শান্তি সম্মেলনে পাঁচটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এগুলো ছিল জার্মানির সঙ্গে ভার্সাই চুক্তি, অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সেন্ট জারমেইনের চুক্তি, হাঙ্গেরির সঙ্গে ট্রিয়াননের সন্ধি, বুলগেরিয়ার সঙ্গে নিউলির চুক্তি এবং তুরস্কের সঙ্গে সেভার্সের চুক্তি। এ চুক্তিগুলোর মধ্যে ভার্সাই চুক্তি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

ভার্সাই সন্ধির প্রধান ধারাসমূহ'

ভৌগোলিক শর্তাবলি-

১। জার্মানি ফ্রান্সকে আলসেস ও লোরেন প্রদেশ,
২। বেলজিয়ামকে ইউপেন, মরিসনেট ও ম্যামেড়ি নামক জেলাগুলো,
৩। ডেনমার্ককে স্লেজভিগ প্রদেশ ও'
৪। মেমেল অঞ্চল লিথুয়ানিয়াকে ছেড়ে দেয়।
এছাড়া জার্মানি পোল্যান্ডের স্বাধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং পূর্ব সীমান্তে পোজেন ও পশ্চিম প্রুশিয়া অঞ্চল ছেড়ে দেয়। স্বাধীন পোল্যান্ড যাতে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এ জন্য জার্মানির মধ্য দিয়ে একটি যোগাযোগকারী রাস্তা (Corridor) পোল্যান্ডকে জার্মানি দিতে বাধ্য হয়। জার্মান বন্দর ডানজিগ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গ্রহণ করে এবং জাতিপুঞ্জ এ বন্দর পোল্যান্ডকে ব্যবহার করতে দেয়। জার্মানির পূর্ব সীমান্তে সাইলেশিয়া প্রদেশকে গণভোটের মাধ্যমে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। একাংশ জার্মানির সঙ্গে যুক্ত থাকে, অপর অংশ চেকোশ্লোভাকিয়া ও তৃতীয় অংশ পোল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়। এসবের ফলে জার্মানি ইউরোপে - ২,৫০০ বর্গমাইল পরিমাণ-অঞ্চল হারায় এবং জার্মানির লোকসংখ্যা ৬০ লাখ কমে যায়।

সামরিক শর্তাবলি

ভার্সাই সন্ধির পঞ্চম অধ্যায়ে সামরিক শর্তগুলো উল্লেখ করা হয়। এসব শর্ত মোতাবেক জার্মানির সামরিক শক্তি ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
১। জার্মানির স্থল, জল ও বিমানবাহিনীকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২। জার্মান সেনাপতিদের বরখাস্ত করা হয়।
৩। জার্মানিতে বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা ও সামরিক বিভাগে যোগ দেওয়ার নিয়ম বিলোপ করা হয়।
৪। হেলিগোল্যান্ডের নৌঘাঁটি বিলুপ্ত করা হয়।
৫। ভবিষ্যতে জার্মানিকে সমরাস্ত্র তৈরি করতে নিষেধ করা হয়।
৬। জার্মান যুদ্ধজাহাজগুলোকে ইংল্যান্ডের হাতে তুলে দিতে বলা হয়।
৭। রাইন নদীর পশ্চিম তীরের ত্রিশ মাইলের মধ্যে সকল জার্মান দুর্গ ও সামরিক ঘাঁটি ভেঙে ফেলার আদেশ দেওয়া হয়। সামরিক শর্তগুলো কার্যকর করার জন্য জার্মানিতে মিত্রপক্ষের সেনাদল মোতায়েন করা হয়।

অর্থনৈতিক শর্তাবলি

জার্মানিকে যুদ্ধের জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় এবং যুদ্ধের জন্য মিত্রশক্তির যে ক্ষতি হয়েছিল তা পূরণের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়।

১। ফ্রান্সের কয়লাখনিগুলোর ক্ষতি করার জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে জার্মানির কয়লাসমৃদ্ধ অঞ্চল সার উপত্যকা পনের বছরের জন্য ফ্রান্সের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, পনের বছর পর গণভোটের মাধ্যমে সার জেলার ভাগ্য স্থির হবে।
২। মিত্রশক্তিকে কয়লা, কাঠ প্রভৃতি দিতে জার্মানিকে বাধ্য করা হয়।
৩। মিত্রশক্তিকে অর্থের দ্বারাও ক্ষতিপূরণ দিতে জার্মানিকে বাধ্য করা হয়। তবে কী পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ বাবদ দিতে হবে তা ঠিক করা সম্ভব হয়নি। বলা হয়, এ বিষয়ে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

৪। আরও বলা হয়, জার্মানির বাজারে মিত্রদেশসমূহের উৎপন্ন পণ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ঔপনিবেশিক ও অন্যান্য শর্ত

দূরপ্রাচ্যে জার্মানির উপনিবেশগুলো জাপানকে দেওয়া হয়। জার্মানির অন্যান্য উপনিবেশ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গ্রহণ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে ম্যান্ডেট হিসেবে শাসন করতে দেয়। জার্মান সম্রাট ও তার সেনাপতিদের যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে তাদের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি বজায় রাখার জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়। আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, শ্রমিক শ্রেণির কল্যাণের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংঘ গঠন করা হবে।

ভার্সাই চুক্তির ত্রুটি

ভার্সাই চুক্তি ছিল' একটি আরোপিত চুক্তি। জার্মানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাচনাক্রমে এ চুক্তির শর্তগুলো নির্ধারিত হয়নি এবং জার্মান প্রতিনিধিদের প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করা হয়। অর্থাৎ ভার্সাই চুক্তি একতরফাভাবে জার্মানির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথমত: চুক্তিতে জার্মানিকে যুদ্ধাপরাধী ঘোষণা করা হয়, অথচ অন্যান্য দেশ এ যুদ্ধের জন্য কম দায়ী ছিল না।
দ্বিতীয়ত: ভার্সাই চুক্তি দ্বারা জার্মানির সৈন্য বাহিনী ও অস্ত্র কমিয়ে ফেলা হয়, অথচ বিজয়ী দেশগুলো তাদের সৈন্য বাহিনী ও যুদ্ধাস্ত্র অক্ষুণ্ণ রাখে।
তৃতীয়ত: মিত্রশক্তি তাদের উপনিবেশগুলো অক্ষুণ্ণ রেখে জার্মান উপনিবেশগুলো কেড়ে নেয়।
চতুর্থত: সকল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ নীতি অনুসরণ করা হলেও জার্মানির ক্ষেত্রে তা ভঙ্গ করা হয়। সার অঞ্চলের জার্মান অধিবাসীদের ফ্রান্সের, স্লেজভিগের জার্মানদের ডেনমার্কের, বেলজিয়াম সীমান্তের কয়েকটি জেলার জার্মানদের বেলজিয়ামের, পশ্চিম প্রুশিয়া ও ডানজিগের জার্মান অধিবাসীদের পোল্যান্ডের অধীনে এবং সুদেতেন জেলার জার্মান অধিবাসীদের চেকোস্লোভাকিয়ার অধীনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এভাবে বহু জার্মানকে পিতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য দেশে সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হয়। জার্মানি থেকে অস্ট্রিয়াকে আলাদা করে রাখা হয়।

পঞ্চমত: জার্মানির কয়লা, লোহা প্রভৃতি খনিজ সম্পদ গ্রহণ করে এবং জার্মানির উপনিবেশগুলো কেড়ে নিয়ে দেশটিকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পঙ্গু করা হয়, অথচ তাকেই আবার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়। এ ব্যবস্থা ছিল অন্যায় ও অযৌক্তিক।

ষষ্ঠত: বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়। কিন্তু জার্মানিকে এ সংগঠনের সদস্যপদ দেওয়া হয়নি। প্রেসিডেন্ট উইলসনের চৌদ্দ দফায় ঘোষিত ন্যায়নীতির ভিত্তিতে সন্ধি স্বাক্ষরিত হবে- এ আশ্বাসে জার্মানি যুদ্ধ বন্ধ করেছিল। কিন্তু ভার্সাই সন্ধিতে চৌদ্দ দফা অগ্রাহ্য করে মিত্রশক্তি জার্মানির উপর কঠোর ও অবাস্তব কতগুলো শর্ত চাপিয়ে দেয়, কেননা জার্মানিকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে রাখাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, ভার্সাই চুক্তির এ কঠোরতার মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল।

সপ্তমত: নৈতিকতা ও বাস্তবতার দিক দিয়ে ভার্সাই চুক্তির ত্রুটি অস্বীকার করা যায় না। ঐতিহাসিক রাইকার (Riker)-এর মতে ন্যায়-নীতির ভিত্তির উপর ভার্সাই সন্ধির শর্তাদি রচিত হয়নি।" (The moral defects of the treaty are no more gloring than the practical.)
উইলসনের চৌদ্দ দফা মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের ১৪ দফা ইউরোপের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্তে ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট উইলসন তার কংগ্রেসের ভাষণে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে ১৪ দফাসংবলিত যে দাবি উত্থাপন করেন ইতিহাসে তা চৌদ্দ দফা নামে পরিচিত। এ চৌদ্দ দফা দাবির উপর ভিত্তি করে জার্মানি যুদ্ধবিরতির আবেদন করলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

লোকার্নো চুক্তি: লীগ অব নেশনস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিরোধ নিষ্পত্তিকারী চুক্তি হচ্ছে লোকার্নো চুক্তি। ভার্সাই সন্ধি কর্তৃক নির্ধারিত জার্মানি ও বেলজিয়াম এবং ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যবর্তী সীমারেখার নিরাপত্তার জন্য ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ইতিহাসে তা 'লোকার্নো চুক্তি' নামে পরিচিত। এ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে জার্মানি লীগ অব নেশনসের স্থায়ী সদস্য পদ লাভ করে।

ভার্সাই সন্ধিতে জার্মানির প্রতি অমানবিকতা

ভার্সাই সন্ধি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর মাধ্যমে জার্মানির উপর যেভাবে একতরফা দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাতে একে শান্তি সম্মেলন না বলে অক্ষশক্তির বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল বলাই শ্রেয়; যেখানে জার্মানিকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধী হিসেবে।

প্রথমত: ভার্সাই সন্ধির ঔপনিবেশিক শর্তসমূহের প্রয়োগে জাতিপুঞ্জের ম্যান্ডেট ব্যবস্থা ও যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির পুরস্কারস্বরূপ জার্মানির প্রায় এক মিলিয়ন বর্গমাইলের অধিক ঔপনিবেশিক এলাকা কেড়ে নেওয়া হয়। অথচ মিত্রশক্তিসমূহ নিজেদের উপনিবেশগুলো ত্যাগ করেনি।

দ্বিতীয়ত: উইলসনের চৌদ্দ দফায় জার্মানি মিত্রশক্তিকে অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ দেবে এমন শর্ত ছিল না। কিন্তু মিত্রপক্ষ ক্ষতিপূরণ সংগ্রহের নামে একদিকে জার্মানির প্রধান প্রধান খনিজ সম্পদ অঞ্চলগুলো কেড়ে নিয়েছিল, অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু জার্মানিকে নগদ ক্ষতিপূরণ প্রদানে বাধ্য করেছিল, যা জার্মান অর্থনীতির উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। পরাজিত জার্মানি সম্পর্কে বিজয়ী শক্তিবর্গের মনোভাব সম্পর্কে এজন্যই বলা হয়েছে, "To starve the goose and yet expect it to pay golden eggs." অর্থাৎ, মিত্রশক্তি চেয়েছিল হাঁসকে উপবাসী রেখে তার কাছ থেকে সোনার ডিম আদায় করতে। আসলে মিত্রশক্তি ভার্সাই চুক্তির সাহায্যে জার্মানিকে স্থায়ীভাবে দমন করে রাখার প্রয়াসই পেয়েছিল।"

তৃতীয়ত: ভার্সাই সন্ধির সামরিক শর্তসমূহের প্রয়োগে জার্মানিকে সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত্র করে ফ্রান্সের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মিত্রপক্ষ তাদের অস্ত্র ত্যাগ করেনি।
চতুর্থত: উইলসনের চৌদ্দ দফার মূল সুর ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। কিন্তু ভার্সাই সন্ধিতে অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের নীতি গৃহীত হলেও জার্মানির ক্ষেত্রে তা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করা হয়। সাত মিলিয়ন জার্মানকে মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তাছাড়া জার্মান ভাষাভাষী অস্ট্রিয়ানদের জার্মানির সাথে সংযুক্ত হতে না দিয়ে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিকে অস্বীকার করা হয়।

পঞ্চমত: জার্মান প্রতিনিধিদলের নেতাকে চুক্তির শর্তসমূহ আলোচনার অধিকার না দিয়ে চরম অগণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় দেওয়া হয়। জার্মান প্রতিনিধিদলের নেতা ফনব্রুক রান্টসাউকে সশস্ত্র প্রহরায় সম্মেলনস্থলে আনা-নেওয়া করা এবং স্বাক্ষরকারীদ্বয়কে মিত্রপক্ষের সাথে এক টেবিলে বসার সুযোগ না দিয়ে জার্মান জাতির প্রতি অবিচার ও অবমাননা করা হয়। মার্শাল ফসের মতে, "এটা শান্তি নয়, এটা বিশ বছরের জন্য যুদ্ধবিরতি।"১০ বস্তুত, এসব অমানবিকতার মাধ্যমে ভার্সাই সন্ধিতে বপন করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ। এ জন্যই ভার্সাই চুক্তি সম্পর্কে ঐতিহাসিক Riker মন্তব্য করেছেন, "Its greatest condemnation is that it contained within it the germs of a second world war." ১১

ভার্সাই সন্ধিতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার'২

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের চৌদ্দ দফা প্রস্তাব মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল, যার মূলবাণী ছিল বিভিন্ন জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। কিন্তু ইউরোপীয় প্রধান নেতৃত্বর্গ উইলসনের চৌদ্দ দফাকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধকালীন স্বাক্ষরিত গোপন চুক্তি অনুযায়ী জার্মানিকে দুর্বল করা ও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির মানসিকতার পরিচয় দিয়ে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জুন যে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তাতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিকে চরমভাবে অবহেলা করা হয়।
সাধারণভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বলতে কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব চিন্তা ও চেতনার স্বীকৃতি এবং নিজেদের অধিকার নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগকে বোঝায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বের অনেক জাতি এই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই

জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত বিখ্যাত চৌদ্দ দফায় বিভিন্ন জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা তুলে ধরেছিলেন। এই চৌদ্দ দফার ভিত্তিতে জার্মানি আত্মসমর্পণ ও যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষর করেছিল। স্বাভাবিক কারণে প্রত্যাশা ছিল, চৌদ্দ দফার মূলনীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা হবে। মানবতার কল্যাণে প্রেসিডেন্ট উইলসন তার আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের মূলনীতি নিয়ে হাজির হলেও গোপন চুক্তি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রসমূহ নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য পরাজিত শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তার মানবতাবাদী আদর্শসমূহের বিরোধিতা করে।

উইলসনের চৌদ্দ দফার নবম দফায় পরিচিত জাতীয় সীমারেখা অনুসারে ইতালির সীমানা পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়েছিল। যার অর্থ হচ্ছে ইতালির সীমারেখা পুনর্নির্ধারণের সময় বিভিন্ন জাতির মানুষের উপস্থিতিকে বিবেচনা করা। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন মিত্রপক্ষে ইতালির অংশগ্রহণের পুরস্কারস্বরূপ সে অ্যাড্রিয়াটিক, বলকান ও নিকট প্রাচ্যে তার স্বার্থ ও প্রভাবের প্রসারণ দাবি করে। ভার্সাই চুক্তিতে ইতালির এই দাবিকে কিছুটা হলেও স্বীকৃতি দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন এলাকার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে অস্বীকার করা হয়। যেমন-

১। সার অঞ্চলের জার্মান অধিবাসীদের জাতিপুঞ্জের ম্যান্ডেট ব্যবস্থার নামে ফ্রান্সের অধীনে,
২। স্লেজভিগের জার্মানদের ডেনমার্কের অধীনে,
৩। ডানজিগের জার্মানদের পোল্যান্ডের অধীনে দিয়ে অন্য দেশের সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হয়।
১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে আপার সাইলেশিয়ায় যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে শতকরা ষাট ভাগ লোক জার্মানির সাথে সংযুক্ত হতে চেয়েছিল। ভার্সাই সন্ধিতে উপনিবেশগুলোর ব্যাপারে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করা হয়নি। উপনিবেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার স্বীকার করা হয়নি। জার্মান উপনিবেশগুলো মিত্রশক্তি বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করেছিল।

১। চীনে অবস্থিত জার্মান উপনিবেশ কিয়চো ও সানটুং জাপানের হস্তগত হয়।
২। নিউজিল্যান্ড সামোয়ায় জার্মান অধিকৃত স্থানগুলো দখল করে।
৩। প্রশান্ত মহাসাগরে বিষুব রেখার দক্ষিণে জার্মান উপনিবেশগুলো অস্ট্রিয়ার কুক্ষিগত হয়।
৪। দক্ষিণ আফ্রিকান সরকার দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা এবং ব্রিটেন জার্মান-পূর্ব আফ্রিকা দখল করে।
৫। জার্মান উপনিবেশ টোগো ও ক্যামেরুন জাতিপুঞ্জ নামে ব্রিটেন ও ফ্রান্স অধিকার করে।
এসব ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ন্যায়নীতি বা আদর্শের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয়নি। এতে স্থানীয় জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছারও কোনো প্রতিফলন ছিল না।
ভার্সাই সন্ধিতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের অনেক অস্বীকৃতির মাঝেও কিছু স্বীকৃতি খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন-

১। পোলগণের অধিকৃত এলাকা নিয়ে স্বাধীন পোল্যান্ড রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছিল। একই সাথে নবগঠিত পোল্যান্ডকে সমুদ্রের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল।
২। চেকোস্লোভাকিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া প্রভৃতি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছিল।
৩। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়ার কিছু বাস্তব অসুবিধাও ছিল। এতে সংখ্যালঘুদের বহু ক্ষেত্রে সীমানা অতিক্রম করে অন্য স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হতো। ফলে সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করত। বস্তুত ভার্সাই সন্ধিতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবিকে ততটা স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, যতটা মিত্রশক্তির স্বার্থের অনুকূলে এবং জার্মানির স্বার্থের প্রতিকূলে ছিল।

ভার্সাই সন্ধির মূল্যায়ন

প্যারিস শান্তি সম্মেলনে স্বাক্ষরিত চুক্তিসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে ভার্সাই সন্ধি। তবে এ চুক্তির সমালোচনার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে, যুদ্ধের ক্ষত শুকানোর আগেই এ সম্মেলন আহ্বান করা হয়েছিল। ফলে সম্মেলনে আগত প্রতিনিধিবর্গের ক্ষেত্রে তাদের দেশের জনমতকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। সংকীর্ণ কাঠামোর মধ্যে কাজ করেও তারা অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক চিন্তার পরিচয় দিয়েছেন। যেমন-জাতিপুঞ্জের জন্ম, নিরস্ত্রীকরণের ধারণা প্রভৃতি। প্যারিসের বিক্ষুব্ধ জনমত সম্মেলনের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছিল, এ কারণে প্যারিসকে সম্মেলনের স্থান নির্ধারণ করে মিত্রপক্ষ বিজ্ঞতার পরিচয় দেয়নি। জাতিপুঞ্জকে ভার্সাই সন্ধির সাথে সংযুক্ত করা উচিত হয়নি। এর ফলে জার্মানরা প্রথম থেকে সংগঠনটিকে বিজয়ী মিত্রশক্তির হাতিয়ার বলে মনে করতে থাকে, যা জাতিপুঞ্জের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। উইলসনীয় আদর্শবাদের পরিবর্তে শক্তি সাম্যের ধারণাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। কাইজারের জার্মানি ছিল আগ্রাসী, কিন্তু শাস্তি দেওয়া হয় প্রজাতান্ত্রিক জার্মানিকে।

ভার্সাই সন্ধির শর্তাবলির প্রয়োগ জার্মানির জাতীয় জীবনে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও ভার্সাই সন্ধির অবমাননাকর পরিণতি থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে হিটলার ক্ষমতা দখল করেন। এর পরবর্তী ইতিহাস ভার্সাই সন্ধির শর্তসমূহ ভঙ্গের ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সূচনার ইতিহাস। অধ্যাপক ই. এইচ. কারের মতে, "ভার্সাই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির উপর যে সকল দাসত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয় কালক্রমে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সেগুলো হয় চুক্তি দ্বারা অথবা সময় অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে অথবা জার্মানির প্রত্যাখ্যানের কারণে একে একে রদ হয়ে যায়। "১৩

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By

জাতিপুঞ্জ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্যাপকতা ও বীভৎসতা মানুষের মনে স্বভাবতই শান্তির স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। যুগে যুগে সমগ্র বিশ্বে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। এ কথা সত্য যে যুদ্ধের মাধ্যমে বহু আন্তর্জাতিক বিবাদ-বিসম্বাদের সমাধান হয়েছে। সাথে সাথে এ কথাও সত্য, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা মানুষকে ভীত ও আতঙ্কগ্রস্ত করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভবিষ্যতে এরূপ হত্যাযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি আর যেন না ঘটে এবং মানুষের কল্যাণ ও শান্তি আর যেন বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে পোপ পঞ্চাশ বেনেডিক্ট আপস ও আলোচনার দ্বারা আন্তর্জাতিক বিরোধ মেটানোর জন্য আবেদন করেন। ফলে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রেরণা নতুন করে দেখা দেয়। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে League of Nations বা জাতিপুঞ্জ স্থাপিত হয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রচেষ্টা নতুন কিছু নয়। ফ্রান্সে নেপোলিয়নের পতনের পর ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে 'পবিত্র চুক্তি' ও 'ইউরোপীয় সংঘ' স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যুদ্ধ পরিহার করা সম্ভব হয়নি। তথাপি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে আরও বেশি উপলব্ধি হতে থাকে; যার প্রথম ও প্রধান উদ্যোক্তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসন। উইলসন তার ঘোষিত ১৪ দফার শেষ দফায় পৃথিবীতে যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের উপর জোর দেন। সে মতে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্যারিসে যে শান্তি সম্মেলন হয়, তাতে ১৯ সদস্যের এক কমিটিকে এ সংস্থার গঠনতন্ত্র রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর নাম হয় লীগ কভেনেন্ট (League Covenent)। এ গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮শে জুন জাতিপুঞ্জ গঠন করা হয় এবং ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি লীগের সাধারণ পরিষদের প্রথম সভায় তা অনুমোদন পায়। পূর্বগামী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে লীগের মূলনীতি ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। সেগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের শক্তিসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু জাতিপুঞ্জের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং মানুষের কল্যাণ সাধন করা। জনমানুষের প্রত্যাশা ছিল, লীগ শুধু আন্তর্জাতিক বিবাদ-বিসম্বাদের নিষ্পত্তি করবে না, বরং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সহযোগিতা দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

জাতিপুঞ্জের গঠন

লীগের চুক্তিপত্র মূলত একটি দলিলবিশেষ। এতে মোট ২৬টি ধারা সন্নিবেশিত ছিল। প্রধানত। ৪টি সাংগঠনিক সংস্থা বা বিভাগ নিয়ে এটি গঠিত ছিল। একটি সাধারণ পরিষদ (Assembly), একটি কার্যকরী কাউন্সিল, একটি আন্তর্জাতিক স্থায়ী আদালত এবং একটি সেক্রেটারিয়েট বা কার্যসংসদ।। প্রত্যেক বিভাগের কার্য নির্ধারিত ছিল। লীগের সাধারণ সভায় লীগের সকল সদস্য যোগ দিতে পারত। বছরে অন্তত একবার অধিবেশন বা সভা আহ্বানের নিয়ম ছিল। প্রতি সদস্যের একটি করে ভোট ছিল। সাধারণ পরিষদের কোনো কার্যকরী ক্ষমতা ছিল না, শুধু আলোচনা করতে ও পরামর্শ দিতে পারত। এর ৫ জন স্থায়ী এবং ৪ জন অস্থায়ী সদস্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য। ফ্রান্স, ইতালি ও জাপান ছিল স্থায়ী সদস্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র লীগে যোগদান না করায় স্থায়ী সদস্যসংখ্যা হয় ৪। লীগের এখতিয়ারভুক্ত যাবতীয় বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার্যকরী কাউন্সিলকে দেওয়া হয়েছিল। তবে গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। লীগের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য একটি সচিবালয় ছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেল।। প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন এরিক ড্রামন। এ পদে তার নিয়োগের বিষয়ে লীগের গঠনতন্ত্রেই উল্লেখ করা হয়েছিল। নিয়ম করা হয়, কাউন্সিল সাধারণ সভার মতামত নিয়ে পরবর্তী সেক্রেটারি জেনারেল নিয়োগ দেবে। জেনেভা শহরে জাতিপুঞ্জের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়।

নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে আন্তর্জাতিক স্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়। আদালতের বিচারপতিদের ৯ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়ার বিধান করা হয়।
লীগ গঠনের পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শ্রম ও শ্রমিক সম্পর্কিত নানাবিধ সমস্যার উদ্ভব হলে একটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংঘ স্থাপন করা হয়। এর সদর দপ্তর হয় জেনেভায়। শ্রম সংঘও (ILO) জাতিপুঞ্জের একটি সাংগঠনিক বিভাগ। প্রত্যেক সদস্য দেশ এ সংস্থার সদস্য হতে পারত।

লীগের উদ্দেশ্য১৪

জাতিপুঞ্জের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করে আন্তর্জাতিক শাস্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা। গঠনতন্ত্রের ১০-১৬ নং ধারায় এ সম্পর্কে বিধান রাখা হয়েছিল।

জাতিপুঞ্জের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করে আন্তর্জাতিক শাস্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা। গঠনতন্ত্রের ১০-১৬ নং ধারায় এ সম্পর্কে বিধান রাখা হয়েছিল।

ক. ১০ নং ধারায় বলা হয়, লীগের সদস্যদের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা হবে।
খ. ১১ নং ধারায় যৌথ নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করা হয়। এতে বলা হয়, লীগের কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে আক্রমণের বিরুদ্ধে লীগের অন্যান্য সদস্য যৌথভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
গ. ১২ নং ধারায় আন্তর্জাতিক বিরোধের নিষ্পত্তি লীগ কাউন্সিল বা আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের কথা বলা হয়। ১৩ নং ধারায় আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত সকলকে মেনে নিতে অনুরোধ জানানো হয়।
ঘ. ১৪ নং ধারায় আন্তর্জাতিক আলাদত গঠনপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যায ব্যাখ্যা করা হয়।
ঙ. ১৫ নং ধারায় লীগ কাউন্সিলের সকল সদস্যের সম্মতিক্রমে রাজনৈতিক বিরোধের সমাধানের কথা বলা হয়।
চ. ১৬ নং ধারায় বলা হয়, যেকোনো সদস্য রাষ্ট্র লীগের আদর্শ অগ্রাহ্য করলে তাকে আক্রমণকারী ঘোষণা করা হবে এবং তার বিরুদ্ধে অপর সদস্যরা অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করতে বাধ্য থাকবে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক শান্তির স্বার্থে জাতিপুঞ্জের গঠনতন্ত্রে নিরস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়।।

আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায় জাতিপুঞ্জের কার্যাবলি

জাতিপুঞ্জ আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান ও শান্তিরক্ষার ব্যাপারে সব সময়ই নীতিনিষ্ঠা ও আদর্শবাদিতার পরিচয় দিয়েছিল এমন কথা স্বীকার করা যায় না, বরং এ সময় জাতিপুঞ্জ অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব ও নীতি বিরোধিতার পরিচয় দিয়েছিল। যেমন: মেক্সিকোর বিরুদ্ধে নিকারাগুয়ার অভিযোগ, ব্রিটেন কর্তৃক বলপূর্বক চীনের উপর চুক্তির প্রশ্নের মীমাংসা, ইঙ্গ-মিশরীয় বিবাদের মীমাংসা প্রভৃতি বহু ক্ষেত্রেই জাতিপুঞ্জ পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। তবু জাতিপুঞ্জ আন্তর্জাতিক অশান্তি সৃষ্টিকারী বহু বিবাদ মীমাংসা করে অবশ্যম্ভাবী বহু যুদ্ধের আশঙ্কা নিবারণ করতে সমর্থ হয়েছিল।

সীমানা নির্ধারণ নিয়ে ইরাক-তুরস্ক বিবাদ উপস্থিত হলে জাতিপুঞ্জ কর্তৃক নিযুক্ত 'সীমানা নির্ধারণ কমিশন' কার্যরত থাকলে সে সময় তুরস্কের কুর্দিরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। জাতিপুঞ্জ কর্তৃক দ্বিতীয় কমিশন শান্তিপূর্ণ

উপায়ে সীমানা নির্ধারণ করে। গ্রিস-বুলগেরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক আক্রমণ ও সীমানা লঙ্ঘনজনিত বিবাদ চলতে থাকলে জাতিপুঞ্জ কর্তৃক কমিশন সুষ্ঠু তদন্তের পর শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিবাদের মীমাংসা করে। তাছাড়া পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরুর উপক্রম হলে জাতিপুঞ্জের চেষ্টায় আপস-মীমাংসা হয়।

১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে জাতিপুঞ্জ 'জেনেভা চুক্তি' নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রস্তুত করেছিল, যার মূলকথা ছিল, কোনো সামরিক সংঘাত শুরু হলে চার দিনের মধ্যে লীগের কাউন্সিল কে আক্রমণকারী তা স্থির করবে এবং অপরাপর সদস্য আক্রান্ত দেশকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু ইংল্যান্ড এটা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। জেনেভা চুক্তি ব্যর্থ হলেও শান্তি রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে এর যথেষ্ট মূল্য রয়েছে। তাছাড়া ভার্সাই সন্ধি কর্তৃক নির্ধারিত জার্মানি ও বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যবর্তী সীমারেখার নিরাপত্তা ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে 'লোকার্নো চুক্তি' দ্বারা স্বীকৃত হয়। এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর জাতিপুঞ্জের স্থায়ী সদস্য হিসেবে জার্মানিকে স্বীকার করে নেওয়া হয়। তাছাড়া জার্মানির সাথে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, চেকোস্লোভাকিয়া ও পোল্যান্ডের উদ্ভুত বিবাদের নিষ্পত্তি করার শর্তও এ চুক্তিতে স্বীকৃত হয়েছিল। জাতিপুঞ্জ বিবদমান পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যে স্বার্থ সংঘাত নির্মূল করতে না পারলেও যুদ্ধ পরিস্থিতি জাতিপুঞ্জের হস্তক্ষেপের জন্য প্রকাশ্য যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করতে পারেনি।

পরিশেষে, জাতিপুঞ্জের মাধ্যমেই শ্রম সমস্যার সমাধান, মহামারি থেকে রক্ষা ও আফিম ব্যবহার রোধ প্রভৃতি ব্যাপারে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা সম্ভব হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বৈঠকের আহ্বান, দাস ব্যবসা, আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত অস্ট্রিয়াকে উদ্ধারের ব্যাপারেও জাতিপুঞ্জের সফল প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করা যায় না।

১৯৩২-৩৩ খ্রিষ্টাব্দে জাতিপুঞ্জ বিশ্ব নিরস্ত্রীকরণ করণ সম্মেলন আহ্বান করে। এ সম্মেলনে জার্মানি ফ্রান্সের সমপর্যায়ের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দাবি জানালে প্রতিনিধিবর্গের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। ফলে জার্মানি সম্মেলন পরিত্যাগ করে শক্তি বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হয়। এ সময় থেকেই জাতিপুঞ্জের পতনের সূত্রপাত হয়।

বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে জাতিপুঞ্জের অবদান, সাফল্য ও গুরুত্ব

জাতিপুঞ্জ গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। গঠনের পর প্রথম দশকে জাতিপুঞ্জ শান্তিপূর্ণ উপায়ে অনেক বিরোধের নিষ্পত্তি করে এক নবযুগের সূচনা করেছিল। এ জন্য প্রথম দশককে জাতিপুঞ্জের স্বর্ণযুগ বলা হয়। নিরস্ত্রীকরণের উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘ এক দশক পৃথিবীকে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা থেকে রক্ষা করেছিল; যা ছিল এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। পৃথিবীর জনসমাজকে আন্তর্জাতিক সমবায়, সৌহার্দ ও সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছিল। আন্তর্জাতিক সমস্যা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে মানুষের মনোযোগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। জাতীয়তাবাদী মনোবৃত্তি আন্তর্জাতিকতার প্রয়োজনে কতটুকু দমন করা উচিত, সে শিক্ষা দিয়েছিল। জাতিপুঞ্জ তার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবতার কার্যাদির দ্বারা বিশ্বের কাছে এক চমৎকার ও অভিনব দৃষ্টান্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক নির্ধারণে সাধারণ মানুষই যে মূলভিত্তি, সে শিক্ষা পরবর্তী যুগের বিশ্বমানবতার কাছে লীগ রেখে গিয়েছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশে প্রচুর ঋণ দান করে অর্থনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করা ছিল লীগের একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। নারীসমাজের ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নে এবং দাসপ্রথা নিবারণে জাতিপুঞ্জের সাফল্য ছিল অনেক। লীগ যদিও বিশ্বকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হয়, তথাপি বিশ্বমানবতার কল্যাণে তার অবদান ও গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। লীগ ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে সর্বত্র রোগ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্য সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করেছিল। লীগ পূর্বাঞ্চলের কলেরা ও প্লেগের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে ম্যালেরিয়া কমিশন নামে অপর একটি স্বাস্থ্য সংস্থা গঠন করে বিশ্ব স্বাস্থ্য রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

যেসব সমস্যা সমাধান করে লীগ সাফল্য অর্জন করেছিল তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

ক. আলেন্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে সুইডেন-ফিনল্যান্ড বিরোধ নিষ্পত্তি,
খ. সাইলেশিয়া নিয়ে পোল্যান্ড-জার্মানির বিরোধ নিষ্পত্তি,
গ. করপুর নিয়ে গ্রিস-ইতালির বিরোধ নিষ্পত্তি এবং
ঘ. গ্রিস-বুলগেরিয়া সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি।

কিন্তু ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে থেকে জাতিপুঞ্জ ব্যর্থতার পরিচয় দিতে থাকে। মাঞ্চুরিয়াকে কেন্দ্র করে চীন ও জাপানের বিরোধ নিষ্পত্তিতে জাতিপুঞ্জ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। ঠিক একই রকম ইতালি-ইথিওপিয়ার মধ্যে যুদ্ধ সৃষ্টি হলে ইথিওপিয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও লীগ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সফলতার পরিচয় দেয়নি। ইংল্যান্ড-ফ্রান্স দেশের জনমতের চাপে ইতালিকে আক্রমণকারী সাব্যস্ত করে ইতালির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করে, ফলে ইতালি লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করে। এভাবে লীগের ব্যর্থতার ফলে যৌথ নিরাপত্তা নীতির অরসান হতে থাকে। জার্মানিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা হিটলারের উত্থান ও ইতালিতে মুসোলিনির উত্থান ঘটলে শান্তিময় পৃথিবী আবার অশান্ত হয়ে। হয়ে ওঠে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি হতে থাকে।

ব্যর্থতার কারণ

বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাকে দূর করে স্থায়ী শাস্তি। স্থাপনের মহান উদ্দেশ্য নিয়ে লীগ তার যাত্রা শুরু করেছিল। কয়েকটি ক্ষেত্রে লীগ সাফল্য লাভ করলেও সে তার মূল দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। অর্থাৎ বিশ্ব থেকে যুদ্ধভীতি দূর করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে লীগ সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। লীগের এই ব্যর্থতার ইতিহাস সত্যিই বেদনাদায়ক। জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতার কারণ ছিল অনেক। নিম্নলিখিত কারণগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ:

১। লীগের সদস্যপদ গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের অসম্মতি এবং বৃহৎ দুটি দেশ জার্মানি-রাশিয়াকে প্রথম দিকে সদস্যপদ না দেওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে এর গুরুত্ব অনেকটা কমে যায়। এটি লীগের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার একটি বড় কারণ। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে লোকার্নো চুক্তির দ্বারা জার্মানিকে এবং ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়াকে লীগের সদস্যপদ দেওয়া হয় বটে, কিন্তু ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি ও জাপান জাতিপুঞ্জ ত্যাগ করায় এ সংস্থা আবার গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। জাতিপুঞ্জের ইতিহাসে কোনো সময়ই পৃথিবীর সকল দেশ এর সদস্য ছিল না। এটি ছিল জাতিপুঞ্জের মারাত্মক দুর্বলতা।

২। সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লীগ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কোনো একটি রাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হতো না। এ নিয়ম আন্তর্জাতিকতার ক্ষেত্রে গুরুতর বাধার সৃষ্টি করে।
৩। জাতিপুঞ্জের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী না থাকায় জাতিপুঞ্জের সিদ্ধান্তগুলোকে যেকোনো রাষ্ট্র সুপারিশ হিসেবে মনে করত, যা ছিল লীগের একটি দুর্বল দিক।
৪। যেকোনো আন্তর্জাতিক সংগঠনের সফলতার শর্ত হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আন্তরিক সমর্থন ও সহায়তা, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অনেকের মধ্যে ছিল না।
৫। জাতিপুঞ্জের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো দেশেরই সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। কারণ এটি ছিল একটি পরীক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান। তাই একে শক্তিশালী করে তোলার জন্য কেউ আন্তরিকভাবে পদক্ষেপ নেয়নি। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জাতিপুঞ্জ গঠিত হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই জাতিপুঞ্জের কার্যাবলিকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। জাতিপুঞ্জই ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন, যা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বযুদ্ধ-বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলো পুনর্গঠনে লীগ সফল ভূমিকা রেখেছিল।
৬। আন্তর্জাতিক স্বার্থরক্ষার জন্য তখন কোনো দেশই জাতীয় স্বার্থ ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল না। তখন জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা দ্বারা রাষ্ট্রবর্গ অতিমাত্রায় প্রভাবিত ছিল। কারণ সত্যিকারের আন্তর্জাতিক মানসিকতা তখনো কোনো দেশের গড়ে ওঠেনি।
৭। জার্মানির প্রতি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তোষণনীতি লীগের দুর্বলতা দুর্বলতা ও ব্যর্থতার অপর প্রধান কারণ। যুক্তরাষ্ট্র লীগে যোগ না দেওয়ায় প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেন ও ফ্রান্সই লীগের উপর কর্তৃত্ব করত। ব্রিটেন ও ফ্রান্স কর্তৃক তোষণনীতির দরুন জার্মানি ও ইতালির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লীগের পক্ষে কঠোর কোনো ব্যবস্থা অবলম্বন করা সম্ভব হয়নি।
৮। লীগ চুক্তিপত্র ছিল গণতন্ত্রভিত্তিক একটি দলিল। কিন্তু ইউরোপে একনায়কত্বের উদ্ভব লীগের আদর্শ ও কর্মপন্থাকে নস্যাৎ করে দেয়। জার্মানি, ইতালি, জাপান ও স্পেনের আচরণ লীগের মৃত্যুঘণ্টা বাজায়।

লীগের পতনের মূলে কতগুলো মৌলিক দুর্বলতা ছিল:

প্রথমত: গঠনতান্ত্রিক দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, লীগের সনদে এমন কতগুলো ফাঁক ছিল, যার জন্য এর কার্যকারিতা বহুলাংশে ব্যাহত হয় এবং পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লীগের সনদে যুদ্ধকে বেআইনি বা নিষিদ্ধ করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত: সাংগঠনিক দিক দিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, জাতিপুঞ্জে ইউরোপীয় রাষ্ট্রবর্গেরই প্রাধান্য ছিল অথচ যুদ্ধ শেষে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইউরোপবহির্ভূত রাষ্ট্রগুলোর সাথে জড়িত হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত: রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ রাজনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থ ছিল পরস্পরবিরোধী, ফলে লীগের নিরপেক্ষ ন্যায্য নীতি কোনো রাষ্ট্রের মেনে চলা সম্ভব হয়নি। নানা কারণে লীগ ব্যর্থ হলেও লীগের প্রচারিত আন্তর্জাতিক উদ্দেশ্য ও আদর্শের প্রভাব স্থায়িত্ব লাভ করেছিল। জাতিপুঞ্জের সংক্ষিপ্ত জীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুই-ই ছিল। জাতিপুঞ্জের ব্যর্থতার জন্য তাকে সর্বতোভাবে দায়ী করা যায় না। তাছাড়া জাতিপুঞ্জকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলেও স্বীকার করা যায় না। এর ব্যর্থতা গঠনপ্রক্রিয়াকে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে। একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনকে ত্রুটিহীন করার জন্য যে সকল প্রক্রিয়া ও সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত ছিল, তার অভাব ছিল বলেই সেটা ব্যর্থ হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে জাতিপুঞ্জের আত্মপ্রকাশ পৃথিবীতে এই প্রথম। কাজেই সফলতার পাশাপাশি এর ব্যর্থতাও মেনে নিতে হবে। এর ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর UNO-র (সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের) উদ্ভব হয়েছিল।

প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা
Explanation of Key Words

ত্রিশক্তি চুক্তি (Triple Alliance): জার্মানির নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বিসমার্ক অস্ট্রিয়া ও ইতালির সঙ্গে ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে যে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেন, তা ত্রিশক্তি চুক্তি নামে পরিচিত। চুক্তি অনুসারে জার্মানি, ইতালি ও অস্ট্রিয়া পরস্পর পরস্পরের আত্মরক্ষার জন্য সামরিক সাহায্য দানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ তিনটি দেশ হয় অক্ষশক্তি ভুক্ত দেশ।

ত্রিশক্তি আঁতাত (Triple Entente): ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া এ তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে
পারস্পরিক আত্মরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে যে চুক্তি সম্পাদিত হয়, তা ত্রিশক্তি আঁতাত বা ট্রিপল আঁতাত নামে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ তিনটি দেশ হয় মিত্রশক্তিভুক্ত দেশ।

স্লাভ জাতি: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী হচ্ছে স্লাভ। মধ্য ইউরোপ, পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য এশিয়াজুড়ে স্লাভ জাতির বিচরণ। স্লাভরা ইন্দো-ইউরোপীয় স্লাভিক ভাষায় কথা বলে এবং এদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মোটামুটি একই। বর্তমান ইউরোপের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে এই স্লাভিক ভাষা ব্যবহারকারী স্লাভ জনগোষ্ঠী বিচরণ করে বেড়াচ্ছে। এশিয়া ও ইউরোপ মিলে প্রায় ৩৬ কোটি স্লাভ জনসংখ্যা রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্লাভ জনগোষ্ঠীর বাস রাশিয়ায় (প্রায় ১৩ কোটি)। এছাড়া ইউক্রেনে প্রায় ৬ কোটি, সার্বিয়ায় ১ কোটি এবং স্লোভাকিয়ায় ৫ লাখের মতো স্লাভবাস করে।

জাতীয়তাবাদ: নিজেকে কোনো জাতির অন্তর্ভুক্ত মনে করে সে জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির বিকাশ, অগ্রগতি, ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদির সঙ্গে একাতাবোধ করা এবং সংশ্লিষ্ট জাতির ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, স্বকীয়তা রক্ষা ও বিকাশে বিশ্বাসী হওয়ার মধ্য দিয়েই জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটে। বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী যদি তার জাতিকেই সর্বোৎকৃষ্ট মনে করে এবং সে অনুযায়ী অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে হেয় করে তবে তখন এরূপ জাতীয়তাবাদকে উগ্র জাতীয়তাবাদ বলা হয়। জার্মান জাতির উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়।

আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সাধারণভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বলতে কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব চিন্তা ও চেতনার স্বীকৃতি এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগকে বোঝায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বের অনেক জাতি এই আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত বিখ্যাত চৌদ্দ দফায় বিভিন্ন জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা তুলে ধরেন।

ব্রেস্ট-লিটভস্ক শান্তিচুক্তি: ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে সোভিয়েত রাশিয়া এবং জার্মানি ও তার মিত্রদের
মধ্যে এ চুক্তি সম্পাদিত হয়। রাশিয়ার পক্ষে এ চুক্তি ছিল আপাত অসম্মানজনক। এ চুক্তির শর্তানুযায়ী জার্মানি অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও বাল্টিক এলাকার উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব লাভ করে। ইউক্রেনও জার্মানির কর্তৃত্বাধীনে চলে যায়। আরও সাব্যস্ত হয় যে, রাশিয়া জার্মানিকে ক্ষতিপূরণ দেবে। রাশিয়া এ চুক্তি মানতে বাধ্য হয়েছিল এ কারণে যে, একদিকে জার আমলের পুরনো বাহিনী বিলুপ্ত করা হয়েছিল, অন্যদিকে লালফৌজের ছিল তখন অতি শৈশব অবস্থা। প্রতিকূল শর্তাবলি সত্ত্বেও ব্রেস্ট-লিটভস্ক শান্তিচুক্তি রাশিয়াকে দিয়েছিল এমন একটি অবসর, যার তখন ছিল খুবই প্রয়োজন। এই অবসরে রাশিয়া ভূস্বামী ও বুর্জোয়া প্রতিবিপ্লবীদের মূলোৎপাটন করা এবং বিদেশি হামলা প্রতিরোধ করার উপযোগী বাহিনী গঠন করতে সমর্থ হয়েছিল। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে এ চুক্তি বাতিল করে দেওয়া হয়।

জেনেভা চুক্তি: ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে জাতিপুঞ্জ জেনেভা চুক্তি নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তির মূলকথা হলো- কোনো সামরিক সংঘাত শুরু হলে চার দিনের মধ্যে লীগের কাউন্সিল কে আক্রমণকারী তা শনাক্ত করবে এবং অপরাপর সদস্য আক্রান্ত দেশকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু ইংল্যান্ড এ ধরনের শর্ত মানতে রাজি না হওয়ায় জেনেভা চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা হয়।

চৌদ্দ দফা: ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেসের নিকট বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন আন্তর্জাতিক শান্তির ভিত্তি হিসেবে তার বিখ্যাত চৌদ্দ দফা নীতির ব্যাখ্যা করেন। উইলসন তার বিখ্যাত চৌদ্দ দফা নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রভৃতির উপর জোর দেন। উইলসনের চৌদ্দ দফা মোতাবেক জাতিপুঞ্জের রূপরেখা দাঁড় করানো হয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO): শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্রে উন্নতি ও তাদের সুযোগ-সুবিধার সমতা বিধান করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা। সংক্ষেপে আইএলও নামে পরিচিত। ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে এপ্রিল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে এই সংস্থা জাতিসংঘের সহায়ক সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। আইএলওর সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে অবস্থিত।

আন্তর্জাতিক আদালত স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন
আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আইন বিষয়ে প্রামর্শ ও মতামত দেওয়ার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাতিপুঞ্জের অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে, অবস্থিত। এই আদালতের বিচারপতিদের ৯ বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। জাতিপুঞ্জের ১৪নং ধারায় আন্তর্জাতিক আদালতের গঠনপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হয়।.

বলকান অঞ্চল: বলকান তুর্কি ভাষার শব্দ, যার অর্থ পাহাড় বা পর্বত। পূর্ব ইউরোপের সার্বিয়া, হাঙ্গেরি, বসনিয়া, সারায়েভো নিয়ে বলকান অঞ্চল গঠিত। এ অঞ্চলটি একসময় তুরস্কের ওসমানীয় খেলাফতের অধীন ছিল। বলকান অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ ছিল স্লাভ জাতিগোষ্ঠীর, ধর্মে খ্রিষ্টান। উনিশ শতকের শেষার্ধে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাবে এসব দেশ তুরস্ক থেকে স্বাধীনতা লাভের আশায় আন্দোলন করে। ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দের বার্লিন চুক্তির দ্বারা এ অঞ্চলটি অস্ট্রিয়ার অধীন হয়।

আলসেস ও লোরেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সমগ্র জার্মানি দখল করে নিলে প্রশিয়া তথা জার্মানির খনিসমৃদ্ধ আলসেস ও লোরেন প্রদেশদ্বয় ফ্রান্সের অধীনে চলে যায়। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের ফ্রাংকো-প্রুশিয়া (জার্মানির একটি অংশ) যুদ্ধে ফ্রান্স পরাজিত হয় এবং জার্মানি তার খনিসমৃদ্ধ অঞ্চল পুনরায় ফিরে পায়। কিন্তু ভার্সাই সন্ধির ভৌগোলিক শর্তানুসারে প্রদেশ দুটি আবার জার্মানির কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে ফ্রান্সকে দেওয়া হয়।

ত্রিশক্তি সম্রাট জোট জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ায় সমসাময়িককালে রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল। জার্মানির বিসমার্ক ৩ দেশের রাজাদের একত্রিত করে যে জোট গঠন করলেন তার নাম ত্রিসম্রাট জোট, যা ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত হয়। জার্মান সম্রাট প্রথম উইলিয়াম (উপাধি 'কাইজার'), রুশ সম্রাট দ্বিতীয় আলেকজান্ডার (উপাধি 'জার') এবং অস্ট্রিয়ার সম্রাট ফ্রান্সিস জোসেফ মিলে এ মৈত্রী জোট গঠিত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভার্সাই সন্ধি ও লীগ অব নেশনস-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...