উদ্দীপকে জনাব শিউলি আক্তারের শ্রেণিকরণ প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ। নিচে তা নিরূপণ করা হলো :
সাধারণত বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ করা হয়। কাজেই বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে এবং সাধারণ জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে মৌলিক, গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য সাদৃশ্যের ভিত্তিতে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করার মানসিক প্রক্রিয়াকে প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ বলে। প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা যায়, কোনো উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ রেখে বিজ্ঞানীরা যখন শ্রেণিকরণ করেন তখন তাকে বৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণ, সাধারণ শ্রেণিকরণ, তত্ত্বীয় শ্রেণিকরণ বা প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ বলা হয়। কোনো বিষয় সম্বন্ধে জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে সেই বিষয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য অনুসারে বস্তুকে শ্রেণিবদ্ধ করার নাম বৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণ, সাধারণ শ্রেণিকরণ বা প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ। বস্তুত প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণে বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য নিহিত থাকে বলে একে বৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণ বলা হয়। আবার এরূপ শ্রেণিকরণের মাধ্যমে শ্রেণিবদ্ধ বস্তুসমষ্টি সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান অর্জিত হয় বলে একে সাধারণ শ্রেণিকরণও বলা হয়। মূলত তত্ত্বগত জ্ঞান অর্জন এবং সেই তত্ত্বকে সুসংবদ্ধকরণই এরূপ শ্রেণিকরণের প্রধান কাজ। তাই একে তাত্ত্বিক শ্রেণিকরণ বলেও অভিহিত করা হয়। সর্বোপরি, এরূপ শ্রেণিকরণকে প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ বলা হয় এজন্য যে, এক্ষেত্রে শ্রেণিকরণের ভিত্তি হিসেবে সাদৃশ্যের বিষয়সমূহ প্রকৃতির মাঝেই নিহিত থাকে, যেগুলোকে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন হয় না। উদাহারণস্বরূপ, বস্তুজগতের মধ্যে প্রাণের উপস্থিতির সাদৃশ্যের ভিত্তিতে 'জীব' শ্রেণিটি গঠন করা হয়েছে এবং প্রাণের অনুপস্থিতির সাদৃশ্যের ভিত্তিতে 'জড়' শ্রেণিটি গঠন করা হয়েছে। এরূপ শ্রেণিকরণই হচ্ছে প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ। কারণ এক্ষেত্রে সাদৃশ্যের বিষয় হিসেবে প্রাণের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রকৃতি প্রদত্ত, মানবসৃষ্ট নয়। আর এরূপ শ্রেণিকরণ করা হয়েছে মূলত মানুষের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে।
Related Question
View Allবিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বিষয়বস্তুকে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে মানসিকভাবে একত্রিত করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে শ্রেণিকরণ।
শ্রেণিকরণের স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। যথা : (১) শ্রেণিকরণ এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া। (২) শ্রেণিকরণের ভিত্তি হলো সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য। (৩) শ্রেণিকরণ হলো শৃঙ্খলাবদ্ধকরণ বা সুবিন্যস্তকরণ। (৪) শ্রেণিকরণে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। (৫) শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যার সাথে জড়িত।
উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক রহমান সাহেব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাঁটতে এসে বিভিন্ন গাছপালা দেখেন। এর মধ্যে কিছু গাছে ফুল ফোটে, কিছু গাছে ফল ধরে, আবার কিছু গাছ ফুল-ফল ছাড়াই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির এ বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছপালা দেখেই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, উদ্যানে দুই শ্রেণির উদ্ভিদ রয়েছে। যার কিছু সপুষ্পক উদ্ভিদ এবং কিছু অপুষ্পক উদ্ভিদ। রহমান সাহেব তার ব্যবহারিক সুবিধা বা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই শ্রেণিকরণটি করেছেন।
সাধারণত ব্যবহারিক সুবিধা বা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গুরুত্বহীন ও বাহ্যিক সাদৃশ্যের ভিত্তিতে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করার মানসিক প্রক্রিয়াকে কৃত্রিম শ্রেণিকরণ বলে। বস্তুত কৃত্রিম শ্রেণিকরণে কোনোরূপ প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। এ জন্য একে অবৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণ বলা হয়। মূলত ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক সুবিধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এরূপ শ্রেণিকরণের প্রধান কাজ।
সর্বোপরি সব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রহমান সাহেবের শ্রেণিকরণটি কৃত্রিম।
প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের মধ্যকার পার্থক্যকে আমি যুক্তিসংগত বলে স্বীকার করি না। কারণ প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের পার্থক্যসমূহ গুণগত নয়, উদ্দেশ্যগত। এজন্য এদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো রেখা টানাও ঠিক নয়।
বস্তুত বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে এক অর্থে সব শ্রেণিকরণই প্রাকৃতিক, আবার অন্য অর্থে সব শ্রেণিকরণই কৃত্রিম। সব শ্রেণিকরণই প্রাকৃতিক হওয়ার কারণ হিসেবে বলা যায়, যেকোনো বিষয়ের শ্রেণিকরণ করতে গিয়ে প্রযোজ্য সাদৃশ্যের বিষয়গুলোকে আমরা আমাদের মনের উপর নির্ভরশীল বলে মনে করি। প্রকৃতপক্ষে সেগুলো প্রকৃতিতেই বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ এসব সাদৃশ্য মনবহির্ভূত এবং এগুলো বহির্জগতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে বিরাজ করে। আমাদের মন কেবল সাদৃশ্যের বিষয়গুলোকে নির্বাচন করে সেগুলোর ভিত্তিতে জাগতিক বস্তুসমষ্টি বা ঘটনাবলিকে শ্রেণিবদ্ধ করে মাত্র। অন্যদিকে সব শ্রেণিকরণকেই কৃত্রিম বলার কারণ হিসেবে বলা যায়, সব শ্রেণিকরণই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট। অর্থাৎ মানুষই নিজেদের প্রযোজন অনুযায়ী প্রকৃতিতে বিদ্যমান বস্তু বা ঘটনাবলিকে নির্বাচন করে সেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করে। কারণ প্রকৃতির এমন কোনো নিজস্ব শক্তি নেই, যার ফলে প্রকৃতির বস্তুসমষ্টি বা ঘটনাবলি নিজে নিজেই শ্রেণিবদ্ধ হতে পারে। এককথায়, প্রকৃতিতে বস্তু বা ঘটনাবলি যেভাবে থাকার সেভাবেই থাকে। এমনকি মানুষও তাদেরকে বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে এনে পাশাপাশি শ্রেণিবদ্ধ করে না; বরং এগুলোকে মানুষ শ্রেণিবদ্ধ করে মনে মনে। কাজেই শ্রেণিকরণটি ঘটে মানুষের মনে মনে, বাস্তবে নয়। আর এদিক থেকেই বলা যায়, সব শ্রেণিকরণই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট, সুতরাং তা কৃত্রিম।
তাই প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের মধ্যে পার্থক্যকে আমি যথার্থ বলে মনে করি না।
শ্রেণিকরণের ভিত্তি হচ্ছে সংজ্ঞা, কিন্তু মতান্তরে লক্ষণ।
শ্রেণিকরণের মাধ্যমে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়। তবে অনেক সময় কয়েকটি শ্রেণির মধ্যে একই গুণ বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। এ অবস্থায় সেই শ্রেণিগুলোকে আবার গুণের মাত্রা অনুসারে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। আর এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ক্রমিক শ্রেণিকরণ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!