উত্তরঃ
জীবাশ্ম জ্বালানি (যেমন: কয়লা, খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস) দহন, কলকারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া, যানবাহনের ধোঁয়া এবং ব্যাপক হারে বন উজাড়করণের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2), মিথেন (CH4) সহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন বা অবমুক্ত হওয়াকে কার্বন নিঃসরণ বলা হয়। একে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান সূচক বা 'কার্বন ফুটপ্রিন্ট' (Carbon Footprint) বলা হয়।
বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিকর প্রভাব:
- বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া: কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর প্রভাব হলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। জীবাশ্ম জ্বালানি দহন ও শিল্পকারখানা থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2), মিথেন (CH4) এবং অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখে, যা গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ঋতুচক্রের স্বাভাবিকতা নষ্ট হচ্ছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জলবায়ুর ভারসাম্যহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- মেরু অঞ্চলের বরফ গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে অ্যান্টার্কটিকা, গ্রিনল্যান্ড এবং অন্যান্য হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো নিভূমি উপকূলীয় দেশের জন্য বড় হুমকি। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিজমি ও বসতভিটা প্লাবিত হওয়া এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ভবিষ্যতে লক্ষ লক্ষ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে পারে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করবে।
- চরম ভাবাপন্ন জলবায়ু: কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে বিভিন্ন ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ঘন ঘন অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশের সিডর, আইলা, আম্পান ও রেমালের মতো ঘূর্ণিঝড় এবং সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ এর বাস্তব উদাহরণ। এসব দুর্যোগ কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং জনজীবনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- মহাসাগরের অস্তা বৃদ্ধি: বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি বড় অংশ সমুদ্র শোষণ করে। এর ফলে সমুদ্রের পানিতে কার্বনিক অ্যাসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং পানির অম্লতা বেড়ে যায়। এতে প্রবাল প্রাচীর, ঝিনুক, সামুদ্রিক মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও প্রজনন ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, মৎস্যসম্পদ এবং উপকূলীয় অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করে।
- জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতা: কার্বন নিঃসরণজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন উজাড় এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে। এর ফলে খাদ্যশৃঙ্খল, পরাগায়ন এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জীববৈচিত্র্যের এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
- মানবস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব: অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ বায়ুদূষণ বৃদ্ধি করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিট স্ট্রোক এবং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো বাহকবাহিত রোগের বিস্তারও বেড়ে যাচ্ছে। শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের উপায়:
⇒ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিবর্তে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাসের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করলে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
⇒ কার্বন ট্যাক্স ও আইনি কড়াকড়ি: যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ করে, তাদের ওপর কার্বন ট্যাক্স আরোপ করতে হবে এবং পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তির নির্দেশনা অনুসরণ, নির্গমন পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে হবে
⇒ বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার: জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহনের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক যানবাহন, মেট্রোরেল, বৈদ্যুতিক বাস এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি সাইকেল ব্যবহার এবং হাঁটার উপযোগী নগর পরিকল্পনা গড়ে তুললে জ্বালানির ব্যবহার ও বায়ুদূষণ উভয়ই কমবে।
⇒ কার্বন সিঙ্ক (ঈধৎনড়হ ঝরহশ) বা বৃক্ষরোপণ: বৃক্ষ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন নিঃসরণ করে, ফলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ব্যাপক বৃক্ষরোপণ, সামাজিক বনায়ন, নগর বনায়ন এবং সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ বন উজাড় কঠোরভাবে বন্ধ করা জরুরি।
⇒ জ্বালানি সাশ্রয় ও সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার: শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, LED বাতি, পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি এবং সবুজ ভবন (এববহ ইঁরষফরহম) নির্মাণে উৎসাহ দিতে হবে। এতে জ্বালানির অপচয় কমবে এবং কার্বন নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি শিল্পকারখানায় আধুনিক ও কম-নিঃসরণ প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
⇒ জনসচেতনতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনকে উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি স্থানান্তর, জলবায়ু অর্থায়ন এবং গবেষণা সহযোগিতা জোরদার করতে হবে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কার্বন নিঃসরণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।