ভূমিকা : বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি বহুল আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন। এটি মূলত সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংঘটিত স্বতঃস্ফূর্ত একটি আন্দোলন। এই আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত ২০১৮ সালে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতি যে বৈষম্য সৃষ্টি হয় তার প্রেক্ষিতেই মূলত আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে কোটার শতকরা হার কমিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনার দাবি ছাত্রদের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে আন্দোলনের ফলে তৎকালীন সরকার সমস্যার সাময়িক সমাধান দিলেও ২০২৪-এ হাইকোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করলে কোটা সংস্কার আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এতে শিক্ষার্থীরা কোটা ব্যবস্থার পুনর্গঠন বা সংস্কারের দাবি জানায়।
কোটা ব্যবস্থা ও এর পটভূমি : বাংলাদেশ কোটা ব্যবস্থা স্বাধীনতার পর থেকেই প্রচলিত ছিল। ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়। এর পাশাপাশি জেলা ও নারী কোটাও সংরক্ষণ করা হয়। এরপরে বিভিন্ন সংস্কার ও নতুন কোটার অন্তর্ভুক্তি মিলিয়ে এটি চূড়ান্ত একটি রূপ লাভ করে। যার গাণিতিক হিসাবটি ছিল এই রকম- ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, ১০ শতাংশ জেলা ভিত্তিক কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা এবং ১% প্রতিবন্ধী কোটা। সব কোটা যুক্ত করলে সকারি চাকরিতে ৫৬% আসন কোটাধারী প্রার্থীদের পক্ষে যায় অন্য দিকে মেধাবীরা বঞ্চিত হয়। এই বৈষম্য দূর করতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা মিলে আন্দোলন শুরু করে।
আন্দোলনের সূচনা : ১৯৭২ সাল থেকে চলে আসা কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ-এর নেতৃত্বে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে এই আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সারাদেশের স্কুল ও কলেজ ছড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন আন্দোলনের দাবি ছিল কোটা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা, কোটার শূন্যপদ মেধার ভিত্তিতে পূর্ণ করা এবং কোটাভুক্তদের একাধিক চাকরিতে আবেদন করার সুযোগ বন্ধ করা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন পরিপত্র আকারে জারি করে। শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে যায় এবং ছয় বছর আন্দোলনটি বন্ধ থাকে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৮ সালের অক্টোবরে জারি করা পরিপত্রটি বাতিল করলে ছাত্রসমাজ ফুঁসে ওঠে এবং নতুন করে কোটা সংস্কার আন্দোলন ২০২৪-এর সূত্রপাত হয়।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ থাকলেও ইতিহাসের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনগুলোর মতোই এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারী মুখ্য সমন্বয়করাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রাজু ভাস্কর্য, অপরাজেয় বাংলা, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, শহিদ মিনারসহ পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটিই ছিল এই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। এই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একাধিক সমন্বয়ককে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় : এ আন্দোলনে দেশের মানুষজন নতুন এক চিত্র প্রত্যক্ষ করে। অতীতে আন্দোলন-সংগ্রাম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ ২০২৪-এর আন্দোলনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তৎকালীন সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে না নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি দিয়ে আন্দোলন দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বুক চিতিয়ে রাজপথে এসে দাঁড়ায়। দেশের সকল মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে তারা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করে। তাদের মধ্য থেকে অনেকেই শহিদ হন।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও সিদ্ধান্ত : তৎকালীন সরকার এই আন্দোলনকে তেমন আমলে না নিলেও ক্রমেই এই আন্দোলন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। হাইকোর্ট কোটা বিষয়ক রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়া সাপেক্ষে ৭ আগস্ট রিভিউ শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে রেখেছিল। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের সর্বোচ্চ কৌসুলি তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল হাইকোর্টে জরুরি আবেদন করে শুনানির তারিখ এগিয়ে ২১ জুলাই নির্ধারণ করেন। উক্ত তারিখে উচ্চ আদালত থেকে, ৭% কোটা সংরক্ষণ করা হয়। যেখানে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৫%, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ১% এবং প্রতিবন্ধী কোটা ১% সংরক্ষণ করা হয়। উচ্চ আদালতের রায়ের পর শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের দাবি পূরণ হলেও ততদিনে সরকারের দমন-পীড়নের কারণে অনেক তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছে। যার ফলে আন্দোলনকারীরা নতুন করে নয় দফা দাবি পেশ করে।
উপসংহার : বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধতা ও সচেতনাতার অনন্য একটি দিক প্রকাশ করে। এই আন্দোলনটি কেবল চাকরির ক্ষেত্রে মেধার মূল্যায়ন বাড়ানোর দাবি তোলেনি বরং একটি বড়ো সামাজিক ও রাজনৈতিক উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমের তরুণ প্রজন্মের শক্তি ও তাদের মতামতের গুরুত্ব সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন হিসেবে আবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!