তিমির রাত্রি-‘এশা’র আযান শুনি দূর মসজিদে ।
প্রিয়-হারা কার কান্নার মত এ-বুকে আসিয়া বিঁধে
আমির-উল-মুমেনিন,
তোমার স্মৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন ।
তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি-রে গগনে মরুর শশী ?
ও-আযান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?
মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্বান ?
আবার লুটায়ে পড়ি।
“সেদিন গিয়াছে”-শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি।
উমর! ফারুক! আখেরী নবীর ওগো দক্ষিণ-বাহু!
আহ্বান নয় - রূপ ধরে এস - গ্রাসে অন্ধতা - রাহু!
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন!
সত্যের আলো নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ!
শুধু আঙ্গুলি হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের
ধরি আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি!
ইসলাম-সে তো পরশ-মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি ?
পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি ।
আজ বুঝি—কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর-
মোর পরে যদি নবী হত কেউ, হত সে এক উমর।'
************************************************
অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধূলার তখতে বসি
খেজুর পাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি
সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক‘নুয়ে,
ঊর্ধ্বের যারা-পড়েছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভুয়ে ।
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ
করেছে সালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ ।
সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে ।
হেরি পশ্চাতে চাহি-
তুমি চলিয়াছ রোদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি
জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি
বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি।
দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা বলেছে শত্রু শেষে-
উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে!
হায় রে, আধেক ধরার মালিক আমির-উল-মুমেনিন
শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন
সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু খানা শুকনো ‘খবুজ' রুটি
একটি মশকে একটুকু পানি খোমা দু তিন মুঠি ।
প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি
চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি!
মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে,
সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে ।
কিছুদুর যেতে উট হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, “ভাই
পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই
উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে,
তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে।”
..ভৃত্য দস্ত চুমি
কাঁদিয়া কহিল, ‘উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?
উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি
আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি ?
খলিফা হাসিয়া বলে,
“তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে ।
রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, ‘উমর! ওরে
করে নি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে।'
উমর ফারুক
কী দিব জওয়াব কী করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই ।
আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু। মোর অধিকার নাই ।
আরাম সুখের, - মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা ।
ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কেবা ।
ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষেরে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী ।
জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্প বৃষ্টি হইল কিনা,
কী গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দি' বিশ্ববীণা ।
জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব-
অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, ‘জয় জয় হে মানব ৷'
************************************************
তুমি নিৰ্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনি ক' কারে ভয়,
সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয় ।
মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান,
তাই মহাবীর খালেদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান,
সিপাহ-সালারে, ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা,
বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না ।
************************************************
মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি,
মনে পড়ে তব মহত্ত্ব-কথা-সেদিন সে বিভাবরী
নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে
মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুধাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে
কাঁদিতেছে আর দুঃখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে হায়,
উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকূলে চায় ৷
শুনিয়া সকল-কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে
বায়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে,
বলিলে, ‘এ সব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের' পরে,
আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে।'
কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা,
বলিলে, বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা !
রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?
মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার
প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি'- চলিলে নিশীথ রাতে
পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে!
এত যে কোমল প্ৰাণ,
করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি কো অপমান!
মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে
মেরেছ দোর্রা, মরেছে পুত্র তোমার চোখের পরে
ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি-
‘অপরাধ করে তোরি মত স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী।'
আবু শাহমার গোরে
কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে ।
খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে,
‘কোথায় খলিফা’ কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে,
একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে,
রোদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে ।
হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট!
অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ,
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই ।
(সংক্ষেপিত)
Related Question
View All'উমর ফারুক' কবিতাটি 'জিঞ্জীর' কাব্য থেকে সংকলিত হয়েছে।
হজরত উমর (রা)-কে 'আমিরুল মুমেনিন' বলার কারণ হলো তিনি ছিলেন সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণকারী, বিশ্বাসীদের নেতা।
উমর ফারুক কবিতার হজরত উমর ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। তাঁর জীবনাদর্শ ও সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সবার কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ। তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিশ্বাসী। ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তিনি যেমন ছিলেন কঠোর, তেমনই মানুষের প্রতি করুণায় তিনি ছিলেন কোমলপ্রাণ। তিনি কখনই কোনো বিশ্বাস ভঙ্গ করেননি। মূলত তাঁর আদর্শবান ব্যক্তিত্বের কারণেই তাঁকে 'আমিরুল মুমেনিন' বলা হয়েছে।
একজন আদর্শ ন্যায়বান শাসকের চরিত্রের দিক থেকে চেয়ারম্যান আব্বাস আলী হজরত উমরের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
একজন শাসক মানে শুধু অন্যের ওপর কর্তৃত্ব করা নয়। একজন আদর্শ শাসক হতে হলে তাকে অনেক বিষয়ে খেয়াল রাখতে হয়। শাসক যদি শাসিতদের দুঃখে সমান দুঃখী না হন তাহলে তিনি কখনো প্রজাবান্ধব শাসক হতে পারবেন না।
'উমর ফারুক' কবিতায় হজরত উমর (রা)-এর জীবনাদর্শ, চরিত্র-মাহাত্ম্য, মানসিকতা এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। উমর ফারুক ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তিনি নিজ পুত্রকে শাস্তি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। তিনি প্রজাদের দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে অনুভব করতেন। অন্যদিকে উদ্দীপকের চেয়ারম্যান আব্বাস আলী বন্যায় তার এলাকা দুর্দশাগ্রস্ত হলেও তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন। উপরন্তু তার ঘরে বন্যার ত্রাণসামগ্রী চুরি করে রাখতে দেখা যায়। এভাবেই একজন ন্যায়বান ও আদর্শ শাসকের চরিত্রের দিক থেকে চেয়ারম্যান আব্বাস আলী হজরত উমরের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
আব্বাস আলী চেয়ারম্যানকে উমরের মতো আদর্শ মানুষ হতে হলে একজন প্রকৃত শাসকের যেসব গুণ রয়েছে সেগুলো তাকে ধারণ করতে হবে।
শাসক ও শাসিতের মধ্যে যদি সমঝোতার সম্পর্ক না থাকে তাহলে তিনি ভালো শাসক হতে পারেন না। একজন প্রকৃত শাসক সব সময় শাসিতদের দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন। শাসিতদের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজন ভেবে কাজ করে যান।
'উমর ফারুক' কবিতায় কবি হজরত উমরের জীবনাদর্শ, চরিত্র-মাহাত্ম্য, মানবিকতা এবং সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। খলিফা উমর (রা) ছিলেন একজন মহৎ ব্যক্তিত্ব। তাঁর চরিত্রে একাধারে বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা ও সাম্যবাদী আদর্শের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। বিশাল মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েও তিনি অতি সহজ, সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। প্রজাদের প্রয়োজনে তিনি ছিলেন নিবেদিত। অন্যদিকে উদ্দীপকের আব্বাস আলী চেয়ারম্যানের চরিত্র ভিন্ন। তিনি গ্রামবাসীর বিশেষ প্রয়োজনের সময়ও শুধু নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখেছেন।
চেয়ারম্যান আব্বাস আলীকে উমরের মতো হতে হলে তার মধ্যে মানবিক দিক জাগ্রত করতে হবে। তার চরিত্রে হজরত উমরের মতো বীরত্ব, কোমলতা, নিষ্ঠা, সাম্যবাদিতা ও অন্যান্য আদর্শের সমন্বয় ঘটাতে হবে। সর্বোপরি গ্রামবাসীর দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলে তবেই আব্বাস আলী চেয়ারম্যান হজরত উমরের মতো আদর্শ মানুষ হতে পারবেন।
'আমির-উল-মুমেনিন' শব্দের অর্থ হলো- বিশ্বাসীদের নেতা।
"সাইমুম-ঝড়ে পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক'নুয়ে" বলতে কবি খলিফা উমরের ঘর নুয়ে পড়লেও তিনি যে আদর্শচ্যুত হয়ে পড়েননি তা বুঝিয়েছেন।
অর্ধ-পৃথিবীর শাসনকর্তা হজরত উমর (রা) ছিলেন ন্যায়ের প্রতি কুসুম-কোমল আর অন্যায়ের প্রতি বজ্রসম কঠিন। তাঁর দরবার ছিল সাধারণ কুটিরের মতো। মরুভূমির সাইমুম ঝড়ে তা ভূলুণ্ঠিত হলেও তাঁর ব্যক্তিত্ব সামান্য আদর্শচ্যুত কিংবা দুর্বল হয়নি বা নুয়ে পড়েনি। এখানে উমরের দৃঢ়চেতা মানসিকতাকে কবি রূপকাকারে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!