উত্তরঃ
সামাজিক নিরাপত্তা হলো রাষ্ট্র বা সমাজ কর্তৃক প্রদত্ত এমন একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা মানুষকে বার্ধক্য, অসুস্থতা, বেকারত্ব ও অক্ষমতার মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে।
এটি নাগরিকের আয়ের ধারাবাহিকতা ও মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) মতে, এটি নাগরিকদের অনিবার্য যেকোনো অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুর্দশা থেকে রক্ষা করার একটি মানবিক অঙ্গীকার। মূলত, সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করা এবং সমাজের অনগ্রসর ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে সামাজিক নিরাপত্তার ভূমিকা অপরিসীম। সামাজিক নিরাপত্তা খাত হলো এমন খাত যার মাধ্যমে সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রথাগত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর (যেমন-বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, এবং ভিজিএফ/ভিজিডি) সাথে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবনচক্রভিত্তিক ও ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে কিছু নতুন এবং আধুনিক কর্মসূচি যুক্ত হয়েছে:
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি : স্বল্প ও প্রান্তিক আয়ের পরিবারগুলোকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা (যেমন প্রতি মাসে নির্দিষ্ট নগদ সহায়তা) দেওয়ার জন্য এই পরিবারভিত্তিক কার্ড চালু করা হয়েছে।
কৃষক কার্ড : কৃষকদের সহজ উপায়ে প্রণোদনা, কৃষি উপকরণ ও সহায়তা পৌঁছানোর লক্ষে এই নতুন কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
বেকার শ্রমিকদের সুরক্ষা কর্মসূচি : রপ্তানিমুখী ও অন্যান্য খাতের কর্মহীন বা দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ভিজিএফ (VGF) নতুন উইং : খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কর্মজীবী দরিদ্রদের জন্য সমন্বিত নীতির আওতায় নগদ অর্থ সহায়তার নতুন কর্মসূচি।
দারিদ্র্য বিমোচনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির গুরুত্ব
মৌলিক চাহিদা পূরণ ও তাৎক্ষণিক দারিদ্র্য হ্রাস: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে অতিদরিদ্র, প্রবীণ,
বিধবা, প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষের কাছে নগদ অর্থ ও খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে খাদ্য, পোশাক, ওষুধসহ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতা তৈরি হয় এবং চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়।
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা : শিক্ষা উপবৃত্তি, মা ও শিশু সহায়তা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য ও পুষ্টিভিত্তিক কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারের শিশু ও মায়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির সুযোগ বাড়ায়। এর ফলে শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া কমে, মানবসম্পদের গুণগত মান বৃদ্ধি পায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দারিদ্র্যের স্থায়ী চক্র থেকে বের করে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি : সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন ভাতা ও নগদ সহায়তা নারীদের কাছে সরাসরি পৌঁছালে তাঁদের নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা বাড়ে, যা নারীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক সংকটে ঝুঁকি মোকাবিলা : বন্যা, খরা, মহামারি, মূল্যস্ফীতি বা অন্যান্য অর্থনৈতিক সংকটে দরিদ্র পরিবারগুলোর আয় ও জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নগদ ও খাদ্য সহায়তা এসব পরিবারকে সংকট মোকাবিলা, প্রয়োজনীয় ভোগব্যয় বজায় রাখা এবং ঋণগ্রস্ততা বা সম্পদ বিক্রির মতো ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত এড়াতে সহায়তা করে।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও বৈষম্য হ্রাস : সমাজের অবহেলিত, প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূলধারায় যুক্ত করা সম্ভব হয়। এতে আয় ও সুযোগের বৈষম্য কিছুটা কমে এবং রাষ্ট্রীয় সেবা ও সম্পদে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পায়।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা সৃষ্টি : দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছালে তারা স্থানীয় বাজার থেকে খাদ্য, পোশাক, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা ক্রয় করে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ভোগ ও চাহিদা বৃদ্ধি পায়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে।
সার্বিকভাবে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সাময়িক সহায়তা প্রদান করে না; বরং খাদ্য ও আয় নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এর কার্যকারিতা বাড়াতে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।