গিলোটিন হলো অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রচলিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার একটি যন্ত্র। মানুষ দোষী সাব্যস্ত হলে তার মুন্ডচ্ছেদ করাই ছিল গিলোটিনের কাজ। ডা. যোসেফ ইগনেস গিলোটিন এই যন্ত্রটির নকশা তৈরি করায় তার নামানুসারে এই যন্ত্রটিকে গিলোটিন নাম দেওয়া হয়। এককথায় বলতে গেলে, একসাথে অনেক মানুষকে হত্যা করার যন্ত্রের নাম গিলোটিন।
ষোড়শ লুই (Sixteen Louis 1754-1793) (১৭৫৪-১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি বুরবোঁ রাজবংশের স্বৈরাচারী রাজা ছিলেন। তিনি অলস, ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও ব্যক্তিত্বহীন ছিলেন। তিনি সুন্দরী ও অহংকারী পত্নী অস্ট্রিয়ার রাজকুমারী মেরি আঁতোয়ানেত দ্বারা পরিচালিত হতেন। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তিনি ব্যর্থ ছিলেন। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও ভূমিদাস প্রথার বিলুপ্তি, টেইলি কর প্রত্যাহার, অক্যাথলিকদের প্রতি সহনশীল নীতি অবলম্বনে তিনি সফলতার পরিচয় দেন। তার সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ফরাসি বিপ্লব, যার জন্য তাকে অধিক দায়ী করা হয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চলমান ত্রুটিপূর্ণ প্রথার সংস্কারসাধনে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে এ বিপ্লবের সম্মুখীন হতে হয়। এ বিপ্লবের প্রথম দিকে ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই জুলাই বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটে, যা স্বৈরতন্ত্রের পতনকেই নির্দেশ করে।
১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জানুয়ারি হাজার হাজার জনতার সম্মুখে তাকে গিলোটিনে শিরশ্ছেদ করা হয়। তার মৃত্যুর মাধ্যমে ফ্রান্সে হাজার বছরের চলমান রাজতন্ত্র শাসনের অবসান ঘটে।'
রানি মেরি আঁতোয়ানেত (Queen Marie Antoinette 1755-1793) (১৭৫৫-১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ): বুরবোঁ রাজবংশের রাজা ষোড়শ লুই-এর স্ত্রী। সুন্দরী, অহংকারী ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ মেরি আঁতোয়ানেত-এর জন্ম হয়েছিল অস্ট্রিয়ার হ্যাবসবার্গ রাজবংশে। তার পূর্ণনাম হলো মেরি আঁতোয়ানেত জোসেফা জোহান্না। ষোড়শ লুই-এর সঙ্গে বিয়ের পর তিনি ফ্রান্সের কুইন কনসর্ট হন। প্রথমে ফরাসি জনগণের প্রিয় হলেও পরে তার অমিতব্যয়িতা, বিলাসব্যসন ও উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য অপ্রিয় হয়ে ওঠেন। দেশের অভ্যন্তরে অনাবৃষ্টির কারণে গমের উৎপাদন কম হয়, যার ফলে রুটির দাম কমানোর জন্য শহরে ভুখা মিছিল বের হলে রানি তাদের রুটির পরিবর্তে কেক খাওয়ার পরামর্শ দেন, যা চরম স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।
কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, তার জন্যই ফ্রান্স ফকির হয়ে গিয়েছিল ও বিপ্লব সূচিত হয়েছিল। বিপ্লবে ষোড়শ লুই-এর শিরশ্ছেদের পর তার বিচার ও মৃত্যুদণ্ড হয়।
ফরাসি বিপ্লব ইউরোপসহ পৃথিবীর ইতিহাসের যুগান্তকারী ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সনাতন ফরাসি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য, রাজনৈতিক অধিকারে প্রবঞ্চনা, স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের উৎপীড়ন ও নির্যাতন, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির অগণতান্ত্রিক ও শোষণমুখী মানসিকতা সুদীর্ঘকাল জনমনে যে অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিল, তারই ফল হচ্ছে ফরাসি বিপ্লব। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত এ বিপ্লব ফ্রান্সের ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে প্রভাবিত করেছিল সারা ইউরোপকে, যা অনেক স্থানে পুরাতন সমাজ ও শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেয় এবং এক নতুন যুগের সূচনা করে, যে যুগের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের সমতা। আধুনিক ঐতিহাসিকরা এ নিপ্লবকে যুগ থেকে যুগান্তরে উত্তরণের নিরবচ্ছিন্ন বিপ্লবী প্রবাহ বলে চিহ্নিত করেন। কোনো একটি বিশেষ কারণে কিংবা কতিপয় লোক বা দলের কোনো ষড়যন্ত্রের কারণে এ বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। কেন ফরাসি বিপ্লব একটি আন্তর্জাতিক বিপ্লবের রূপ পরিগ্রহ করেছিল, কেন বিপ্লবী ফ্রান্সের সাথে ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল, তা জানতে হলে সনাতন ইউরোপের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য অবস্থা জানা প্রয়োজন।
ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে ইউরোপের প্রায় সকল দেশে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল। ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকারের দাবিদার শাসকগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য ছিল নির্যাতন, নিপীড়ন ও উৎপীড়ন। সরকার ও প্রশাসন ছিল মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর কুক্ষিগত। মানুষের অধিকার ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা বিপ্লবপূর্ব ইউরোপে অনুপস্থিত ছিল।
ফরাসি বিপ্লব -প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
বিপ্লবপূর্ব ফ্রান্সে সামাজিক স্থরবিন্যাসে তৃতীয় স্তরে থাকা শহুরে উচ্চ মধ্যবিত্তদের বুর্জোয়া বলা হতো। এদের মধ্যে ছিল সাধারণ দোকানদার, কারিগর, বুদ্ধিজীবী, চাকুরে ও ধনী বণিকসম্প্রদায়। তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজিত ছিল। আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও কোনো বংশ কৌলীন্য ছিল না। বুর্জোয়ারা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা- পাতি বুর্জোয়া, ধনী বুর্জোয়া ও মূলধনি বুর্জোয়া।
উদ্দীপকের চেয়ারম্যানের সাথে আমার পাঠ্যপুস্তকের ফরাসি রাজা ষোড়শ লুইয়ের কার্যক্রমের মিল রয়েছে।
ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই ছিলেন চরম স্বেরাচারী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বর রাজাকে নিযুক্ত করেছেন। রাজা তার কাজকর্মের জন্য ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারোর নিকট দায়ী নন। এ বিশ্বাস থেকেই তিনি বলতেন, "What I Desire is decree." অর্থাৎ আমি যা ইচ্ছা করি তা-ই আইন। এ বিশ্বাসের কারণেই ষোড়শ লুই হয়ে উঠেছিলেন চরম স্বৈরাচারী। স্বৈরাচারী মনোভাব দুর্বল চরিত্রের কারণে যখন ফ্রান্সের সংকটকাল শুরু হয়, তখন রাজা সাম্রাজ্যের জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতামত অগ্রাহ্য করেন, যা শেষ পর্যন্ত বুরবোঁ সাম্রাজ্যের পতন ডেকে নিয়ে আসে। উদ্দীপকের চেয়ারম্যান নিজেকে ইউনিয়নের সর্বেসর্বা মনে করতেন। তিনি মনে করেন, তিনি যা করেন তাই আইন। ইউনিয়ন চালানোর সময় ইউনিয়নের মেম্বার ও অন্যান্য জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতামত অগ্রাহ্য করতেন। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের চেয়ারম্যানের সাথে পাঠ্যবইয়ের ষোড়শ লুইয়ের কার্যক্রমের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
উক্ত ব্যক্তি অর্থাৎ ফরাসি রাজা ষোড়শ লুইয়ের কার্যক্রম ফরাসি বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল।
১৭৭৪ সালে ষোড়শ লুই যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন ফ্রান্সে বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে ছিল। কারণ ইতোমধ্যে ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে ফ্রান্সকে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে পরিণত করা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত দক্ষ শাসক। কিন্তু ষোড়শ লুইয়ের মধ্যে এমন দক্ষতা না থাকায় তার অসংলগ্ন কর্মকান্ড ফ্রান্সে বিপ্লবের সূচনা করে। তিনি তার আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন, "রাজা হচ্ছেন সর্বময় প্রভু, প্রজাদের সব কিছুর ওপর কর্তৃত্ব করার সব প্রাকৃতিক অধিকার তার রয়েছে।” তার এমন মন্তব্য প্রমাণ হয় যে, তিনি অত্যন্ত স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন শাসক ছিলেন। ক্ষমতা আরোহণ করে ষোড়শ লুই রাজকোষ প্রায় শূন্য দেখতে পান। কিন্তু অর্থ সংকট নিরসনে তিনি মন্ত্রীর যুক্তিযুক্ত সংস্কার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় ভুল করেন। অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং কর বিষয়ক প্রস্তাবে অভিজাতদের বিরোধিতা তার জন্য অসম্মানজনক ছিল। রাজা স্টেট জেনারেলের অধিবেশনে রাজকীয় আদব-কায়দা প্রথা নিয়ে কড়াকড়ি আরোপ করলে তৃতীয় সম্প্রদায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা অপমান বোধ করেন। পরবর্তীতে নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজা তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অধিবেশনে প্রবেশের অনুমতি দেননি। এর ফলস্বরূপ তৃতীয় সম্প্রদায়ের টেনিস কোটে শপথ ও পরবর্তীতে অধিবেশন কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের সূচনা হয়। পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকের চেয়ারম্যান একজন স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি ছিলেন, যা ফরাসি রাজা ষোড়শ লুইয়ের প্রতিচ্ছবি। আর ষোড়শ লুইয়ের স্বেচ্ছাচারী কর্মকান্ডের ফলে ফরাসি বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল।
উদ্দীপকে উল্লিখিত শাসকের সাথে আমার পাঠ্যবইয়ের শাসক ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিল রয়েছে। আধুনিক ফ্রান্সের ভিত্তি স্থাপনকারী নেপোলিয়ন বোনাপার্ট একজন চিত্তাকর্ষক, সমর নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। তিনি সামান্য সৈনিক থেকে যোগ্যতা বলে ধাপে ধাপে ফ্রান্সের সম্রাটের আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফ্রান্সকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে তার মেধা, প্রতিভা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রতিভা ছিল বিষ্ময়কর। নেপোলিয়ন ইউরোপব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া, প্রুশিয়া সুইডেন, ডেনমার্ক ও স্পেনে অভিযান পরিচালনা করে এসব দেশে ফ্রান্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। শাসক হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আইন, প্রশাসন, শিক্ষা, অর্থনীতি, ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি নানাবিধ জনহিতকর কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে নেপোলিয়ন ফ্রান্সকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেন। উদ্দীপকে দেখা যায়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের মধ্যে লর্ড ডালহৌসি ছিলেন অন্যতম। অনুরূপভাবে সম্রাট নেপোলিয়নও ফ্রান্সের সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত শাসকের সাথে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের সাদৃশ্য রয়েছে।