শিক্ষণ ফল: এ অধ্যায় পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা-
প্রাক-বিপ্লব ফ্রান্সের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা বর্ণনা করতে পারবে।
ফরাসি বিপ্লব সংঘটনে দার্শনিকগণের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে পারবে।
ফরাসি বিপ্লবের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করতে পারবে।
বিশ্বে ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল মূল্যায়ন করতে পারবে।
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের গণমুখী সংস্কারসমূহ ব্যাখ্যা করতে পারবে।
ফরাসি বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে।
প্রধান শব্দ (Key words):
রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, তেই, কাপিতার্শিয়, গ্যাবেল, স্টেটস জেনারেল, ভলতেয়ার, শালর্স মন্তেস্কু, ঝাঁ ঝাক রুশো, কঁফেসিয়, টেনিস্কোর্টের শপথ, কমিউন, রোবসপিয়ের, সামন্তপ্রথা, সক্রিয় নাগরিক, নিষ্ক্রিয় নাগরিক, টুইলারিস রাজপ্রাসাদ, সন্ত্রাসের রাজত্ব, গিলোটিন, কর্সিকা, প্রিফেক্ট।
ফরাসি বিপ্লব শুধু ইউরোপের নয়, বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে বেশ বড় ধরনের মোড় পরিবর্তনকারী ঐতিহাসিক ঘটনা। এই বিপ্লব নানা পরিকল্পনা, সংস্কার সাধন ও ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে ফরাসি রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে আধুনিকতায় উন্নীত করেছে। ফ্রান্স থেকে রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সামন্ততন্ত্রকে ভেঙে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ধারা চালু করেছে। মানুষের মনোজগতে ফরাসি বিপ্লব অসামান্য প্রভাব ফেলতে পেরেছে। ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব, ব্যাপ্তি ও গভীরতা বেশ বিস্ময়কর। সে কারণে এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতির মানুষ ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস পঠন পাঠনে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে।
ফরাসি বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বিশ্বের একজন মহান সেনাপতি, যিনি অতি সাধারণ অবস্থা থেকে নিজ যোগ্যতা বলে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। কিন্তু শেষ জীবনে তাকে একটি দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্বের একজন মহান সেনাপতি, যিনি অতি সাধারণ অবস্থা থেকে নিজ যোগ্যতা বলে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। কিন্তু শেষ জীবনে তাকে একটি দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল।
মি. টমাস একজন বিখ্যাত বীর। তিনি বলেছিলেন, "আমিই বিপ্লব"।
ফরাসি বিপ্লব কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ফরাসি পুরাতন সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই এর প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। পুরাতন সমাজব্যবস্থা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনে উন্নতির কোনো স্বাদ এনে দিতে ব্যর্থ হয়। শোষণ, নির্যাতন, বঞ্চনা ও হতাশায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিমজ্জিত ছিল। সামন্ত সমাজের পক্ষে জনগণকে শোষণ ও দারিদ্র্য ছাড়া আর কিছুই দেওয়ার ছিল না। ফলে অর্থনীতি পঙ্গু হতে থাকে। সেই অবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষে দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবী লেখক সাহিত্যিকগণ জনগণকে সচেতন করার জন্যে তাদের লেখনী চালিয়ে যান। ফ্রান্সে গির্জাকে জনকল্যাণে ব্যবহারের দৃষ্টিভঙ্গি। ফরাসি বিপ্লব এ সবই পরিষ দীর্ঘ দিনের চেষ্টা ব্যর্থ হতে থাকে। এ সবই পুরাতন রাজনীতি, সমাজ ও করেছে। কীভাবে করছে-তা জানা দরকার। সে সম্পর্কে জানতে হলে পূর্ববর্তী ফরাসি সমাজ, অর্থনীতি, রাজন এবং নতুন চিন্তার উন্মেষ কীভাবে ঘটেছিল তা জানা অপরিহার্য।
(ক) সামাজিক অবস্থা
ফ্রান্সসহ ইউরোপের তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থাকে 'পূর্বতন সমাজ' বলা হয়ে থাকে। বিপ্লব এই পুরাতন ব্যবস্থাকে জে নতুন সমাজ সৃষ্টিতে অবদান রেখেছিল। পুরাতন ফরাসি সমাজ তিনটি প্রধান সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। পুরাত ব্যবস্থায় যাজকদেরকে প্রথম সম্প্রদায়, (First Estate) অভিজাতদের দ্বিতীয় সম্প্রদায় (Second Estate) কৃষক, বুর্জোয়া, বণিক, শিক্ষক, শ্রমিকসহ সমাজের অপর গোষ্ঠীসমূহকে তৃতীয় সম্প্রদায় (Third Estate) ক হতো। ফ্রান্সের জনসংখ্যার ৯৬ শতাংশই ছিল তৃতীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। বাকি মাত্র ৪ শতাংশ ছিল যাজক। অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত। তবে দেশের সিংহভাগ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত যাজক ও অভিজাতরা। তারা সকলে ছিল প্রায় সকল ধরনের কর প্রদান থেকে মুক্ত। গুরুত্বপূর্ণ পদ, সামরিক অফিসারসহ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, বিচা বিভাগীয় এবং রাজস্ব ব্যবস্থার সাথে অভিজাত সম্প্রদায় গভীরভাবে জড়িত ছিল। এদেরকে অধিকার গ্রা (Privileged) এবং তৃতীয় সম্প্রদায়কে অধিকারহীন (Non-privileged) বলে অভিহিত করা হতো।
ফ্রান্সে বিপ্লবের আগে যাজকের সংখ্যা ছিল এক লাখ ত্রিশ হাজার এবং অভিজাত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস সংখ্যা ছিল তিন লাখ পঞ্চাশ হাজারের মতো। ধর্মযাজকদের মধ্যেও কিছু স্তর এবং প্রকারভেদ ছিল। 'কালো'। 'সাদা' পোশাকধারী- প্রধান এ দুই ভাগে এদেরকে বিভক্ত করা হতো। পুরাতন ব্যবস্থার শেষের দিকে কারে পোশাকধারী যাজকের সংখ্যা ৬০ হাজারে নেমে আসে এ কারণে যে, এদের ওপর প্রভাবশালী অভিজাতদের খবরদারিত্ব বেড়ে যায়। ঊর্ধ্বতন যাজকরা অভিজাতদের মতই অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন। বিশং মঠাধ্যক্ষ এবং ক্যাননের সংখ্যাও ছিল প্রায় ১০ হাজারের মতো। দেশের সর্বোচ্চ যাজকদের বিশপ বলা হতো। বিপ্লষের আগে ফ্রান্সে ১৩৯ জন বিশপ ছিলেন। নিম্নতর যাজকদের মধ্যে যেমন ক্যুরে ও ভিকার নামে যারা পরিচিত ছিলেন তারা তৃতীয় সম্প্রদায়ের মতোই অধিকারহীন ছিলেন। অভিজাতদেরকে গোত্র, সামরিক, নৌ এবং আমলা ইত্যাদি অভিধায় বিভক্ত করা হয়েছিল। গোত্রভুক্ত অভিজ্ঞাতের সংখ্যা ছিল এক লাখ দশ হাজারের মতো। অপরাপর অভিজাতের সংখ্যা ছিল আড়াই লাখ।
পূর্বতন ব্যবস্থায় কৃষকদের অবস্থা এক রকম ছিল না। তাদের মধ্যেও ছিল নানা স্তরভেদ। কেউ স্বাধীন কৃষক, কেট ক্ষেতমজুর বা বর্গাচাষি ছিল। তবে ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলে এবং কিছুটা উত্তরাঞ্চলে প্রায় সামান্য জমির মালিক, কেউ প্রজা, ক্ষেতমজুর। ১০ লাখের মতো কৃষক মেনমর্টাবেল (কৃষক মারা গেলে জমিও হারান) প্রথার কারণে উত্তরাধিকারীদের হাতে জমির মালিকানা হস্তান্তর করতে পারত না। বিভিন্ন প্রদেশে জমির মালিকানায় তারতম্য ছিল। কোথাও ২০ শতাংশ, কোথাওবা ৭০ শতাংশ জমি কৃষকের হাতে ছিল। গড়ে দেশের ৩৫ শতাংশ জমির মালিক ছিল কৃষক। তবে কৃষকদেরকেই সব ধরনের করের বোঝা বহন করতে হতো। এ কারণে ফ্রান্সের পুরাতন সমাজ ব্যবস্থায় একটি নির্দয় ও জটিল কর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। 'তৃতীয় সম্প্রদায়ই' এই কর প্রদান করত।

(খ) অথনৈতিক ব্যবস্থা
আঠারো শতকে ফ্রান্স ছিল মূলত একটি কৃষিপ্রধান দেশ। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের পূর্বমুহূর্তে ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যা ছিল দুই কোটি পঞ্চাশ লাখ। এর মধ্যে দুই কোটি দশ লাখ যুক্ত ছিল কৃষি কাজের সাথে। তবে সেই সময়ে ফ্রান্সে কয়েকটি শহর বেশ দ্রুত শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণের ফলে ব্যাপক জনবসতিতে ভরে ওঠে। বিপ্লবের প্রাক্কালে প্যারিতে ছয় লাখ, লিওতে এক লাখ পয়ত্রিশ হাজার এবং মার্সেলে নব্বই হাজার ফরাসি নাগরিক বসবাস করত। ফ্রান্সের জাতীয় অর্থনীতিতে শিল্পের চেয়ে কৃষির অবদানই ছিল বেশি। ১৭৮৯-এ ফ্রান্সের জাতীয় আয় কৃষি থেকে লাভ করেছে ১,৮২৬ মিলিয়ন লিভ্রা এবং শিল্প থেকে মাত্র ৫২৫ মিলিয়ন লিভ্রা। বিপ্লব-পূর্ব ফ্রান্সে দুই পদ্ধতির কর ব্যবস্থা চালু ছিল-(১) প্রত্যক্ষ কর ও (২) পরোক্ষ কর। প্রত্যক্ষ করসমূহ হচ্ছে- (১) তেই তেই (Taille)-মোট আয়ের দেয় কর; (২) কাপিতাশিয় (Capitation)-মাথাপিছু নয় বরং উৎপাদনভিত্তিক দেয় কর; (৩) ভাঁতিয়্যাম (Vingtieme)-স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ওপর প্রদেয় আয়কর। পনেরতম লুই ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে এই করটি প্রবচ করেন। অভিজাতদের একটি অংশ আংশিকভাবে এই কর প্রদান করলেও যাজক সম্প্রদায় এ কর দেওয়া থের সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে যায়।
পরোক্ষ করসমূহ ছিল মূলত নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রীর ওপর; যেমন, (১) গ্যাবেল (Gabelle)-লবণকর-ভয়াবহ ৫ কর কৃষকদেরকে প্রায় নিঃস্ব করে ফেলে। ফ্রান্সে আইন করা হয়েছিল যে, দুধের শিশু থেকে মৃত্যু পথযাত্রীকেও রি মূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ লবণ ক্রয় করতেই হবে, তবে স্থানভেদে তাতেও তারতম্য ছিল; (২) কর্তি (Corvee) দি পারিশ্রমিকে বাধ্যতামূলক শ্রমদান। সামন্ত প্রভুদের ব্যক্তিগত জমিতে সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে কৃষকদেরকে দির পারিশ্রমিকে বাধ্যতামূলকভাবে এ ধরনের শ্রম প্রদান করতে হতো; (৩) এ্যাদ (Aide)-ভোগ্যবস্তুর ওয় কৃষকদেরকে কর দানে বাধ্য করা; (৪) বানালিতে (Banalite)-সামন্ত প্রভুর কৃষিজ যন্ত্রপাতি বাধ্যতামূলক। ব্যবহার করা এবং এর বিনিময়ে উৎপাদিত ফসলের এক-দশমাংশ চার্জ দিতে বাধ্য থাকা।
ফ্রান্সে ১৭২৫-এ প্রত্যক্ষ কর থেকে খাজনা আদায় হয়েছিল ৮৭.৫ মিলিয়ন লিভ্রা। ফলে দেখা যাচ্ছে ফ্রান্সে পরেছ করের আয় প্রত্যক্ষ থেকে ক্রমেই বেড়ে চলছিল।
(গ) রাজনৈতিক অবস্থা
পুরাতন ব্যবস্থায় ফ্রান্সের রাজতন্ত্র স্বৈরতান্ত্রিক রূপ ধারণ করে। রাজতন্ত্র ধর্মযাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়কে হয়ে রেখে দেশের শতকরা ৯৬ জন মানুষকে নির্মমভাবে শোষণ করতে থাকে। ধর্ম যাজকরা রাজাকে দেবতার প্রতিনিধি বলে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা লাভ করত। এর ফলে রাজার একরে ক্ষমতা রাষ্ট্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষত চতুর্দশ লুই (১৬৪৩-১৭১৫ খ্রি.) রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফ্রান্সে সুসংগঠিত

করতে সক্ষম হন। তিনি ছিলেন চরম স্বৈরাচারী এবং দর্প করে বলতেন, "আমিই রাষ্ট্র" (I am the state)। দেশের আইন প্রণয়ন, প্রশাসন পরিচালনা ও বিচার কার্যে রাজার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। সেনাবাহিনীর সর্বময় ক্ষমতা রাজার হাতে থাকায় যুদ্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা রাজার ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় হয়ে পড়ে। পনেরতম লুই (১৭১৫-১৭৭৪ খ্রি.) এবং ষোড়শ লুই (১৭৭৪-১৭৮৯ খ্রি.) ফ্রান্সের রাজতন্ত্রকে আরো নিরঙ্কুশ করার ধারা অব্যাহত রাখেন। তবে

শেষ দিকে ফরাসি রাজতন্ত্রে গভীর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। রাজতন্ত্রের সীমাহীন ক্ষমতার কারণেই ১৬১৪ সাল থেকে ফ্রান্সের স্টেটস-জেনারেল নামক সর্বোচ্চ প্রতিনিধি পরিষদ অকার্যকর হয়েছিল।
মাঝে মাঝে ধনীদের নিয়ে রাজাগণ বসতেন, সভা করতেন। অধিকাংশ প্রদেশেই স্থানীয় প্রতিনিধিদের তেমন কোনো গুরুত্ব দেওয়া হতো না। প্যারির পার্লামেন্ট এবং রাজকীয় বিচারালয়গুলো স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কারণে কোনো স্বাধীন মতামত প্রদান করতে পারত না। রাজার হাতে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ন্যস্ত থাকায় দেশের স্থানীয় শাসন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় শাসনে (১) রাজ পরিষদ, এবং (২) ছয় জনের একটি মন্ত্রিসভা কার্যকর ছিল। সর্বত্রই ব্যক্তিস্বার্থ, স্বেচ্ছাচার, দুর্নীতি ও অমিতব্যয়িতার বিস্তার ঘটার ফলে পুরাতন ব্যবস্থা মানুষের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। ফ্রান্সে অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হতে থাকে। ১৭৭০-এর পর থেকে এই অবনতি আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। জাতীয় ঋণ ১৭৭৪-এ দেড় বিলিয়ন থেকে ১৭৮৮-এ সাড়ে চার বিলিয়ন লিভ্রায় উন্নীত হয়। ১৭৭৪ সালে বাজেট ঘাটতি ছিল ২৮ মিলিয়ন লিভ্রা, ১৭৮৮ সালে তা বেড়ে ১২৬ মিলিয়ন লিভ্রায় দাঁড়ায় (ব্যয় ছিল ৬২৯ মিলিয়ন লিভ্রা, আয় ছিল ৫০৩ মিলিয়ন লিভ্রা)। রাজ পরিবারের ব্যয়ও বেড়ে যায়। রাজার জন্য ছিল ১৮৫৭টি ঘোড়া, ১৪০০ জন চাকর-চাকরানি। বিভিন্ন প্রদেশে আরও ১২০০টি ঘোড়া রাজার শিকারের জন্য প্রস্তুত রাখা হতো। রাজার মৃগয়া গমনের জন্য ছিল ২১৭টি গাড়ির বহর। ষোলতম লুইয়ের স্ত্রী রাণি মারিয়া আতোঁয়াতী প্রায়ই নতুন নতুন প্রাসাদ তৈরির বায়না ধরতেন।

এদিকে ১৭৮৮ সালে ফ্রান্সে ব্যাপক শস্যহানি ঘটে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষগ অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হয়। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পায়, পশুর মড়ক লেগে কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে। শহরগুলোতে কাজের সন্ধানে বেকারদের ভিড় জমতে থাকে। ১৭৮৮-এর তুলনায় ১৭৮৯-তে বিক্ষোভ পাঁচ গুণ রে যায়। এসব বিদ্রোহ নির্মমভাবে দমন করা হয়। ফ্রান্স কার্যতই একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি এসে দাঁড় পরিবর্তনের বস্তুগত সকল উপাদানই তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে তৈরি হয়েছিল। এর সাথে বিপ্লবের জন্য যে যা চেতনাগত প্রস্তুতির দরকার তাও ফ্রান্সে তৈরি হয়েছিল। ফ্রান্সের দার্শনিক, কবি সাহিত্যিকসহ বুদ্ধিজীবী ম - পরিবর্তন তথা বিপ্লবের নতুন চেতনা তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
ফরাসি বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই
ফরাসি সমাজে বিপ্লবের বেশ আগে থেকেই জ্ঞানদীপ্ত দার্শনিকদের জ্ঞানচর্চা মধ্যযুগীয় ভাবধারার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে একটি আধুনিক সমাজ গড়ার জন্য মানুষকে উজ্জীবিত করতে থাকে। তাঁদের চিন্তাধারা ফ্রান্সের সমা ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তারাই মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্র পরিত্যাগ করে আধুনিক সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার চেতনাকে ধা করে এমন ফরাসি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ার যুক্তি তুলে ধরেন। এখন সেসব মনীষীদের মধ্য থেকে কয়েক জনের চিন্তাৎস সাথে আমরা পরিচিত হবো।
মহামতি ভলত্যেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮ খ্রি.)
ফ্রাঁসোয়া ম্যারি আঁরুয়েকে সবাই মহামতি ভলত্যেয়ার হিসেবেই জানেন। ভিক্টর হুগো ভলত্যেয়ারকে আখ্যায়িত করেছিলেন 'মানুষের চেয়েও বড় কিছু বলে'। কবি, নাট্যকার, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক ইত্যাদি সব নামেই তাঁকে চেনা যায়, জানা যায়, ডাকা হয়। তাঁর রচনাবলির প্রধান বৈশিষ্ট্যহচ্ছে- তিনি গির্জা ও রাষ্ট্রের ত্রুটি-বিচ্যুতিকে অত্যন্ত তির্যক ভাষায় ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করেছেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রাক-বিপ্লব যুগের শোষণনীতি, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং গোড়ামির নিন্দা করেন। স্বাধীনচেতা ভলত্যেয়ার সাবলীল ভাষায় লেখনি পরিচালনা করে ফরাসি জাতিকে রিপ্লবী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁকে মানবজাতির বিবেক আখ্যা দেয়া হয়। কারণ প্রতিষ্ঠিত ঘুণেধরা সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নির্ভীকভাবে তিনি তাঁর লেখা পরিচালনা করতেন। ভলত্যেয়ার নিজে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলন না। তিনি মনে করতেন সরকার একটি প্রয়োজনীয় দুষ্টক্ষত (Necessary evil)। তিনি বলতেন, "সহস্র ইঁদুর দ্বারা শাসিত না হয়ে একটি সিংহের শাসন অধিক কাম্য।" জনমঙ্গলকর স্বেচ্ছাচারিতাকে (Benevolent desposition) তিনি দেশের শাসন ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত মনে করতেন। গির্জার অন্যায়কে তিনি যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন তাতে কেউ কেউ তাঁর

ধর্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হন। বস্তুত তিনি ধর্মের নামে ধর্মযাজকদের অজ্ঞতা, মূর্খতা এবং বাড়াবাড়িকেই সমালোচনা করেছিলেন। ধর্মের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো বক্তব্য ছিল না। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে "ঈশ্বর না থাকলে তাঁকে বানাতে হতো, কিন্তু প্রকৃতি বলছে ঈশ্বর আছে।" তবে ভলত্যেয়ারের ঈশ্বর হচ্ছেন পৃথিবী সৃষ্টির প্রজ্ঞানতা, প্রকৃতিতে যা কিছু ঘটে তা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটে বলেই তিনি মনে করতেন। ভলত্যেয়ারের মতে, সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্যে ধর্মের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ফ্রান্সের ধর্মযাজকদের ভোগ-বিলাসিতা এবং রাজতন্ত্রের একনিষ্ঠ রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াকে তিনি ধর্মের মূল বাণীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মনে করতেন। তাই তিনি এটিকে মোটেও পছন্দ করতেন না। তিনি ফ্রান্সের অভিজাত সম্প্রদায় এবং তাদের প্রভু স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনকে মোটেই পছন্দ করেননি। মানুষের মধ্যে প্রেম ও ভালোবাসার অভাব তাঁকে পীড়া দিত। তিনি নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের কঠোর সমালোচক ছিলেন। এ কারণে তাঁকে কয়েকবার কারাবরণ করতে হয়েছিল। বাস্তিল দুর্গেই তাঁর স্থান হয়েছিল দু'বার। ব্যক্তির স্বাধীনতা, জনগণের দুঃখ- দুর্দশা দূর ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়েই ভলত্যেয়ার মানুষকে সচেতন করেছেন। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে গির্জা বিরোধী রচনা লিখে তিনি যেভাবে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তা-ই ফরাসি বিপ্লবী যুগে বেশ বড় ধরনের অবদান রেখেছিল। তবে তিনি রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ সম্পূর্ণরূপে চাননি। তিনি রাজতন্ত্রকে সাংবিধানিকভাবে দেশ চালানোর পথেই চলতে বলেছেন। কেননা রাজতন্ত্রে রাজার কথাই আইন, সংবিধান বলে কিছু মানা হতো না। ভলত্যেয়ার মনে করেন যে, আইন ছাড়া চলতে গিয়ে রাজারা স্বৈরাচার হয়ে ওঠেন। রাষ্ট্র তাদেরকে আইনের মধ্যে চলতে হবে। এটিই নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। ইংল্যান্ডের রাজনীতি তাঁকে এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ইংল্যান্ডের প্রতিযোগী রাষ্ট্র হিসেবে তিনি ফ্রান্সকে ইংল্যান্ডের মতোই উন্নত একটি দেশরূপে দেখতে চেয়েছিলেন। ফ্রান্সকে তিনি মূর্খের দেশ নয়, বরং জ্ঞানী, গুণী ও প্রজ্ঞান মানুষদের দ্বারা শাসিত হওয়ার দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাবলি হচ্ছে- কাঁদিদ, চতুর্দশ লুইয়ের শতাব্দী, সিয়েকল দ্য লুই কার্তজ, জাতির আত্মার সারমর্ম বিষয়ক রচনাবলি, অধিবিদ্যা, দার্শনিক অভিধান Oedipe, Letters Philosophiques, Element of Essays on Universal History, Zoology ইত্যাদি। তাঁর এসব রচনাবলি ফরাসি জনগণকে ধর্ম বিশ্বাস, জীবন ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
শার্লস মন্তেস্কু (১৬৮৯-১৭৫৫ খ্রি.)
মূলত দার্শনিক হলেও শার্লস মন্তেস্কু সংবিধান এবং রাজনীতি বিষয়ক রচনাবলি সে যুগে পাঠকদের ভীষণভাবে উজ্জীবিত করেছিল। তিনি রাজার সীমাহীন ক্ষমতা এবং ক্যাথলিক গির্জার আচরণের সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সংসদীয় পদ্ধতির প্রশংসা এবং অনুরূপ ব্যবস্থা ফ্রান্সে চালু করার ওপর জোর প্রদান করেন। মন্তেঙ্কু নিজেকে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের একজন সমর্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত 'The Spirit of the Laws' গ্রন্থটি তাঁর জন্য ব্যাপক স্বীকৃতি বয়ে আনে। মাত্র ১৮ মাসে বইটির ২২টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ২০ বছর শ্রম দিয়ে

লেখা এ গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন দেশের সংবিধানের চরিত্র, আইনের উদঘাটন এবং বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর Persian Letters অর্থাৎ 'পারস্যের পত্রমালা' The Greatness and Decadence of the Romans উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এসব গ্রন্থ তাঁকে দেশে-বিদেশে পরিচিত করে তোলে। লেখনী দ্বারা মন্তেঙ্কু ফ্রান্সের জনসাধারণের একটি অংশকে রাজনীতি ও সমাজ সচেতন মানবগোষ্ঠী রূপে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন।
ঝাঁ ঝাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮ খ্রি.)
রুশো জাতিতে ফরাসি হলেও জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে। তিনি শিক্ষক, সচিব ও সংগীত সমালোচক হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন। তবে লেখক এবং দার্শনিক হিসেবে তাঁর অবদান অতুলনীয়। সমাজ দর্শন, সংগীত, শিক্ষা, রাষ্ট্রতত্ত্ব, সাহিত্য এবং উদ্ভিদবিদ্যা- জ্ঞান জগতের এসব শাখায় তিনি

বিস্ময়কর স্বাক্ষর রেখে যেতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বুদ্ধির চেয়েও মানুষের অনুভূতিকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান। করেছেন। মানুষ সম্পর্কে তাঁর চিন্তায় অসাধারণ মৌলিকত্ব লক্ষ্য করা যায়। তিনিই প্রথম উল্লেখ করেছেন যে, মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে কিন্তু সে সর্বত্রই শৃঙ্খলাবদ্ধ (Man is born free, but everywhere he is chain.)। তিনি সকল মানুষের সমানধিকারে বিশ্বাসী ছিলেন। রুশো বলেছেন যে, আদিম সমাজে সাম্য ছিল, তাই সেখানে অন্যায় ও দুর্নীতি ছিল না। বুশো লিখেছেন, "কোনো মানুষ সে পরিমাণে ধনী হবে না, যা হলে সে অন্য মানুষকে ক্রয় করতে চাইবে, আবার কোনো মানুষ সমাজে ততখানি দরিদ্র থাকবে না, যতখানি হলে সে মানুষটি নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হবে।" রুশো সে ধরনেরই একটি সাম্যনীতি দ্বারা পরিচালিত সমাজ চেয়েছিলেন। তাঁর লেখা এমিল (Emile) গ্রন্থটি শিক্ষাবিষয়ক এবং কঁফেসিয় (Confession) গ্রন্থটি আত্মজীবনীমূলক রচনা। তবে তার বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে The Social Contract এবং Discourse on the Origin of Inequality, সমাজ ও রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোচনায় বুশো সমতা ও কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। এতে বিপ্লবের মেজাজ এবং সুর যেন বেজে ওঠেছিল। তাঁর রচনাবলিতেই ফরাসি বিপ্লবের আগমনী বার্তা যেন লেখা হয়েছিল। তাই কোনো কোনো ইতিহাসবেত্তা রুশোকেই The chief
prophet of the revolution বা 'বিপ্লবের প্রধান প্রবক্তা' বলে অভিহিত করেছিলেন। ফ্রান্সে দিদেরো, ম্যাবলি, কঁদরসে প্রমুখ মনীষী বিপ্লবের প্রাক্কালে বুদ্ধিবিভাসার যে যুগের সূচনা করেছিলেন তা সমাজের সচেতন মহলকে আলোড়িত করেছিল। তাঁরা ফ্রান্সের নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র থেকে মানুষের মুক্তির মধ্য দিয়েই উক্ত সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবন গড়ে তোলার সম্ভাবনার বাস্তবায়ন ঘটতে পারে বলে মনে করেন। ফরাসি বুদ্ধিবিভাসার আন্দোলনই ফরাসি বিপ্লবের চেতনা গড়ে তোলে। অপরদিকে পুরাতন ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, সেই ব্যবস্থার অযোগ্যতা ও অপ্রয়োজনীয়তাই প্রমাণ করেছে; ফরাসি সমাজ নতুন অর্থাৎ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটাতে প্রস্তুতি নিতে থাকে, এর জন্য সমাজে বিপ্লবের বস্তুগত (Objective) শর্ত পূরণ হতে থাকে। অন্যদিকে অর্থাৎ সামন্ত সমাজ ব্যবস্থা অচল হতে থাকে, উন্নত সমাজের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বুদ্ধিবিভাসার আন্দোলন বিপ্লবের বিষয়গত (Subjective) তথা চেতনাগত শর্ত বা বাস্তবতা তৈরি করে। ফলে ফ্রান্সে বিপ্লব অবধারিতভাবেই সংঘটিত হতে যাচ্ছিল যে, এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। ১৭৮৯-এ সেই বিপ্লবই শুরু হয়।
ফরাসি বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই
অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য রাজার প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের। সেই অর্থ পেতে হলে কর ধার্য করা ব্যতীত রাজার কাছে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। অর্থ সচিব নেকার রাজাকে স্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন ডেকে কর আদায়ের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন। সুযোগ বুঝে তৃতীয় সম্প্রদায় তাদের সদস্য সংখ্যা যাজক

ও অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে সমান করার দাবি জানালে ১৭৮৮-এর ডিসেম্বরে রাজা তা মেনে নিতে বাধ্য হন। ১৭৮৯-এর ৫মে স্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন ডাকা হয়। ১৭৫ বছর পর ফ্রান্সে এই সংসদ ভার্সাই নগরীতে নতুন করে শুরু করার ঘোষণা দেয়া হয়। এতে যাজক সম্প্রদায়ের ৩০০, অভিজাতদের ৩০০ এবং তৃতীয় সম্প্রদায়ের একা ৬০০ প্রতিনিধি থাকার বিধান স্বীকৃত হয়। এপ্রিলের শেষ দিকে স্টেটস-জেনারেলের নির্বাচনে যাজকদের জন্য নির্ধারিত ৩০০ জনের মধ্যে ২৯১ জন, অভিজাতদের ৩০০ জনের মধ্যে ২৭০ জন এবং তৃতীয় সম্প্রদায়ের ৬০০ জনের মধ্যে ৫৭৮ জন সদস্য নির্বাচিত হলে মোট ১১৩৯ জন সদস্য উক্ত অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়। মৃত্যুবরণ, দাঙ্গাহাঙ্গামা ও অন্যান্য কারণে বাকি ৬১টি আসনের প্রতিনিধি উক্ত সময়ে নির্বাচিত হতে পারেননি। রাজা এবং অর্থসচিব নেকার উভয়েই স্টেটস-জেনারেলের কাছে কর আদায়ের প্রস্তাব রাখেন। সংসদে তৃতীয় সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজা শুধু ধর্ম যাজক এবং অভিজাত প্রতিনিধিদের সাথেই মিলিত হলে তৃতীয় সম্প্রদায় অপমানিত বোধ করেন। ১৭ জুন তাঁরা নিজেদেরকে 'সমগ্র জনগণের প্রতিনিধি' এবং স্টেটস-জেনারেলকে 'জাতীয় সভা' বলে ঘোষণা করে। এ নিয়ে রাজা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। ২০ জুন প্রতিনিধিরা সভাকক্ষে ঢুকতে না পেরে 'টেনিস কোর্টে' সমবেত হয়ে একটি শপথ গ্রহণ করেন। উক্ত শপথে বলা ছিল যে, যতদিন

একটি সংবিধান রচিত না হবে ততদিন তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা একত্রে থাকবে। এ শপথকে 'টেনিস কোর্টের শপথ' বলা হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে যাজক ও অভিজাত প্রতিনিধিদের একটি অংশ নৈতিকভাবে তৃতীয় সম্প্রদায়ের শপথকে সমর্থন প্রদান করেন। রাজা অবস্থা বেগতিক দেখে কিছু কিছু শর্ত মেনে নিলেও যড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে থাকেন। ১২ জুলাই রাজা অর্থসচিব নেকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এতে প্যারিতে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ইতোমধ্যে প্যারিতে পৌরসভা (কমিউন) এবং জাতীয় রক্ষিবাহিনী তথা National Guard তৈরি করা হয়। প্যারির মেয়র নিযুক্ত হলেন বেইলি (Baily) এবং রক্ষীবাহিনীর অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হলেন লাফায়েত। রাজা বাধ্য হলেন এসব নিযুক্তি মেনে নিতে। ফলে প্যারির প্রশাসনিক দায়িত্ব বুর্জোয়া তথা তৃতীয় সম্প্রদায়ের হাতে চলে যায়। প্যারিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রাজা বিদেশি সৈন্যবাহিনীর সহায়তায় প্যারির ওপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে যাচ্ছেন। ১৪ জুলাই তাই উত্তেজিত জনতা সকাল বেলা বাস্তিল দুর্গ অভিমুখে যাত্রা করে। শহরের কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখলের পর সশস্ত্রভাবে জনতা বাস্তিল দুর্গ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। বিকেল চারটায় বাস্তিল দুর্গের পতন হয়। রাজাকে প্যারির

ঘটনাবলি এবং বাস্তিল দুর্গ বিপ্লবীদের হস্তগত হওয়ার সংবাদ অবগত করা হলে তিনি স্বগত উচ্চারণ করেন "এটা বোধ হয় হাঙ্গামা"। পাশেই দণ্ডায়মান সভাসদ বললেন, "Mais, C'est une revolt! Non. Sire, C'est une r`evolution" 'না, রাজা মহাশয়, এ বিদ্রোহ নয়, মহাশয় এ হচ্ছে বিপ্লব।" প্রকৃতপক্ষে, ফ্রান্সে বাস্তিল দুর্গ পতনের পর থেকে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, তা দ্রুতই সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ফ্রান্সে ৪ আগস্টের 'কৃষি বিপ্লবে'র পর থেকে সামন্ত ব্যবস্থার জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ সাধন, ২৬ আগস্ট ১৭৮৯-এ গৃহীত মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (Declaration of the Rights of Man and of the citizen)-এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান এবং ১৭৮৯ থেকে ১৭৯১ পর্যন্ত সময় জাতীয় সংবিধান পরিষদের কার্যাবলি রাজতন্ত্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে দুর্বল করতে থাকে। ফ্রান্স এভাবেই বিপ্লবের এক নতুন পথ রচনা করে। ১৭৮৯ থেকে ১৭৯৫ সাল পর্যন্ত সময়ে ফরাসি বিপ্লব যেসব কার্য সাধন ও বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে চলছিল নিম্নে তা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
জাতীয় সাংবিধানিক সভার কার্যাবলি (১৭৮৯-৯১)
জাতীয় সভা (National Assembly) ফ্রান্সের জন্য একটি সংবিধান রচনার কাজ শুরু করে। তখন থেকে জাতীয় সভাকে সাংবিধানিক সভা (Constituent Assembly) বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এ সভা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিক্ষাসংস্কৃতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে ফ্রান্সের পুরাতন ব্যবস্থা ভেঙে যায়, নতুন বুর্জোয়া আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা দৃঢ় হতে থাকে। নিম্নে এ সংস্কারগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।
৪ আগস্টের 'কৃষি বিপ্লব': সামন্ত প্রথার বিলোপ
বাস্তিল দুর্গের পতনের খবর দ্রুত ফ্রান্সের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছাতে থাকে। গ্রামের দরিদ্র ও নিগৃহীত কৃষক বিপ্লবের খবর শুনে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। অভিজাত জমিদার শ্রেণির নির্মম শোষণে কৃষকরা তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাবাপন্ন ছিল। সুতরাং প্যারিতে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে এই খবর শুনে কৃষকরা অভিজাত-জমিদারদের ওপর চড়াও হয়। ক্রুদ্ধ কৃষকরা জমিদারদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে থাকে, নায়েবদেরকে মারধর করতে থাকে, জমিদারদের কাছ থেকে ইতোপূর্বে নেওয়া জমির বন্দোবস্ত বিষয়ক চুক্তিপত্রের কাগজ, দলিলপত্র পুড়িয়ে ফেলতে থাকে, জমির আ'লগুলো ভেঙে ফেলে দেয়। কৃষকরা আইন শৃঙ্খলার প্রতি তোয়াক্কা করার প্রয়োজনীয়তা ভুলে যায়। এ ছিল পুঞ্জিভূত ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ। চারদিকে অরাজকতা বেড়ে উঠলে জমির মালিক ও ধনী ব্যক্তিরা প্রাণ রক্ষার্থে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে শহরে চলে আসে। দেশের এ পরিস্থিতি জাতীয় সভায় আলোচনায় দারুণভাবে প্রভাব ফেলে।
১৭৮৯ সালের ৪ আগস্ট তারিখের অধিবেশনে সোলমন নামক জনৈক সদস্য গ্রামে-গঞ্জে সংঘটিত কৃষকদের বিদ্রোহ সম্পর্কে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিপ্লবের অন্যতম নেতা রোবসপিয়ের প্রস্তাব করেন যে, অভিজাতদের উচিত স্বেচ্ছায় তাদের স্বত্ব ত্যাগ করা। পরিস্থিতি জমিদারদের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ায় জমির মালিকানা ত্যাগ করা ব্যতীত অভিজাত এবং ধর্মযাজকদের জন্য অপর কোনো পথ খোলা নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ ধরনের অভিমত আরও অনেক সদস্য প্রকাশ করলে সংবিধান সভার অধিবেশনটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঐ রাতে সভায় অভাবনীয় ঘটনা ঘটে যায়। ১১ আগস্ট সভায় একটি আদেশনামা (Decree) জারি করে বলা হয় "সামন্তপ্রথা ফ্রান্স থেকে অতঃপর লুপ্ত হলো।” কিন্তু তারপরও বেশ কিছু কর লুপ্ত হয় নি, সম্পত্তির ওপর জ্যেষ্ঠ পুত্রের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, মৎস্য চাষের অধিকার অব্যাহত থাকে, অভিজাতদেরকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এসব কারণে ৪ ও ১১ আগস্টের ঘোষণা দ্বারা সামন্তপ্রথা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে-এমন দাবি করাটি ঠিক হবে না। তবে সামন্তপ্রথা বিলুপ্তির ঘোষণার তাৎপর্যকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। ফ্রান্সের কৃষকরা নির্মম শোষণের হাত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে। সামন্তপ্রথার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি শিথিল হতে থাকে, ১৭৯৩ সালে জ্যাকোবিনরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সামন্ত ব্যবস্থার অবশেষে উচ্ছেদের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে ১৭৮৯ সাল থেকে ফ্রান্সে সামন্তপ্রথা বিলোপের যে সকল উদ্যোগ গৃহীত হয় তার ফলে কৃষি ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হয়- ফরাসি ইতিহাসে একে 'কৃষি বিপ্লব' নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, বিপ্লবের অঙ্গীকার ও মুক্তির দলিল
সংবিধান সভার দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ২৬ আগস্ট ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ব্যক্তি ও নাগরির অধিকারগুলো ঘোষণা করা হয়। (Declaration of the Rights of Man and Citizen)। এই ঘোষণাপত্রে মোট ১৭৫ অনুচ্ছেদে মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে যেসব মানবাধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করা হয় তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়-
১.মানুষ জন্মসূত্রে স্বাধীন এবং স্বাধীনতা ভোগের সমঅধিকারী।
২. ঘোষণাপত্রে বিবৃত হয়, মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার, সম্পত্তি অর্জন ও ভোগ করার অধিকার, জীবনের নিরাপত্ত রক্ষা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার অধিকার প্রকৃতিগতভাবেই স্বীকৃত।
৩.জনগণ হলো আইনের উৎস। তাই জনমতের বিরুদ্ধে আইন রচিত হতে পারে না।
8.রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র জাতি বা জনগণের মধ্যেই নিহিত থাকে। রাজা শুধুমাত্র রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন, অধিকারী নন।
৫.আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। কেউ কোনো বিশেষ মর্যাদা লাভ বা অধিকার ভোগ করতে পারে না।
৬. সম্পত্তি ভোগের অধিকার হলো একটি পবিত্র অধিকার। আইনের সাহায্য এবং ক্ষতিপূরণ ব্যতীত কারও সম্পত্তি দখল করা যাবে না।
৭. মতামত প্রকাশের ও ধর্মাচরণের স্বাধীনতা মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি লাভকরে।
৮. বেআইনিভাবে কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার কিংবা কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে না। যেহেতু আইনের চোখে সকল মানুষ সমান-তাই কোন বিশেষ ব্যক্তি বিশেষ মর্যাদা বা সুযোগ লাভ করতে পারেন না।
৯. ঘোষণাপত্রে সরকারি ক্ষমতার বিভাজন এবং ব্যক্তি স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার বলে ঘোষণা করা হয়।
ঘোষণাপত্রে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি প্রদান করা হলেও তবে কীভাবে এসব অধিকার সকল মানুষের জীবনে বাস্তবায়ন করা যাবে- সে সম্পর্কে অবশ্য ঘোষণাপত্রে কিছু বলা হয় নি। তাই ধনী ও দরিদের মধ্যে অধিকারের যেমন তারতম্য ঘটেছে, কার্যত ভূমিহীন কৃষকের ভূমি ও সম্পত্তি পাওয়ার সমানাধিকারের বিষয়টি অমীমাংসিতই থেকে যায়। তারপরও ফ্রান্সের রাজতন্ত্র এতদিন যেভাবে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতা ভোগ করত তা এ দলিলে রোধ করা হয়, মন্ত্রীরা আইন সভার কাছে মেয়াদ শেষে দায়িত্বভার বুঝে দিতে বাধ্য ছিল যে তাও বিধিবদ্ধ করা হয়, প্রাদেশিক শাসক এবং বিচারকগণ স্বাধীনভাবে সীমিত নির্বাচনের মাধ্যমে নিযুক্তি পাবেন- সেই নিয়ম প্রবর্তন করা হয়। ফ্রান্স মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে কতগুলো আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সুযোগ লাভকরে।
সংবিধান সভা সমগ্র ফ্রান্সকে সমান পরিধির ৮৩ টি ডিপার্টমেন্ট বা প্রদেশে ভাগ করে। এই প্রদেশগুলোকে ৫৪৭ টি জেলায় এবং প্রতিটি জেলাকে কয়েকটি ক্যান্টনে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি স্তরেই নির্বাচিত শাসনকর্তা নিয়োগ করার বিধান রাখা হয়। যে সকল নাগরিক অন্তত তিন দিনের মজুরি রাষ্ট্রকে প্রদানে সক্ষম- তারা ভোটাধিকার লাভ করে; এদেরকে 'সক্রিয়', যারা উক্ত করদানে অক্ষম- তাদের 'নিষ্কিয়' নাগরিক বলে অবহিত করা হয়। ফ্রান্সের তৎকালীন মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখের মধ্যে মাত্র ৪৫ লাখ নাগরিক 'সক্রিয়' বলে বিবেচিত হয়।
সংবিধান সভা বিচারালয়গুলোকে আইন বিভাগ বা শাসন বিভাগ থেকে মুক্ত করে নেয়। এর ফলে বিচারকগণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। তবে স্থানীয় আদালতগুলোর ওপরে হাইকোর্ট বা আপিল আদালত স্থাপন করা হয়।
সংবিধান সভা ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বেশ কিছু সংস্কার সাধন করে। সভা সকল পরোক্ষ কর বাতিল করে, জমি এবং অস্থাবর সম্পত্তির ওপর নতুন কর পদ্ধতি চালু করে, গ্রামে গ্রামসভা এবং শহরে মিউনিসিপ্যালিটিকে এসব কর আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করে। সভা বাণিজ্যিক কারবারের ওপর আয়কর দেওয়ার প্রথা প্রবর্তন করে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট দূর করার জন্য দাতব্য কর আদায়ের ব্যবস্থা চালু করা হয়। সংবিধান সভা গির্জার সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাতে নিয়ে আসে এবং প্রাপ্ত সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে এ্যাসাইন্যাট নামক এক প্রকার কাগুজে মুদ্রা বাজারে চালু করে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যকে অবাধ রাখা হয়, স্বাধীনভাবে ব্যক্তি উদ্যোগে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার - অধিকার দেয়া হয়
সংবিধান সভা ফরাসি গির্জার পুরাতন সকল কালা-কানুন বাতিল করে, সকল গির্জাকে জাতীয়করণ করে এবং ধর্মযাজকদেরকে ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান প্রবর্তন করে। আগে বিশপ ও অন্যান্য যাজকরা রোমের পোপ কর্তৃক মনোনীত হতেন। নতুন ব্যবস্থায় যাজকরা সরকারি কোষাগার থেকে বেতন পেতেন। গির্জার জমি তাদের ভোগদখল করার সুযোগ রহিত করা হয়।
সংবিধান সভা অবশ্য ফ্রান্সের বেকারদের কর্মসংস্থানের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি। অধিকন্তু ১৭৯১ সালের ১৪ জুলাই এডভোকেট ল্য শেপলিয়র-এর প্রস্তাব মোতাবেক ফ্রান্সে শ্রমিক ধর্মঘট ও সংগঠন করার অধিকার বিলোপ করা হয়। এ ধরনের কিছু ত্রুটি ছাড়া সংবিধান সভা বিপ্লবের পথে ফ্রান্সকে অনেকখানি অগ্রসর হতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। ১৭৯১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের জন্য নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। এ পর্যন্ত জাতীয় সংবিধান সভায় যে সকল আইন বা ডিক্রি গৃহীত হয়েছিল নতুন সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৭৯১ সালের ১ অক্টোবর সাংবিধানিক সভার স্থলে বিধান সভা ফ্রান্সকে পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করে।
বিধান সভার শাসনকাল (১৭৯১-৯২): রাজতন্ত্রের পতন
নতুন সংবিধান অনুযায়ী ফ্রান্সে বিধান (Assembly ছবি) সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বর সাংবিধানিক সভার কার্যকাল শেষ হয় এবং ১ অক্টোবর থেকে বিধান সভার (Legislative Assembly কর্মকাণ্ড শুরু হয়, ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। বিধান সভায় ৭৪৫ জন সদস্য নির্বাচি হন। এদের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের অনুসারী প্রায় ২৬০ জন এবং প্রজাতন্ত্রে বিশ্বাসী জ্যাকোবিন গোষ্ঠী বা পরিচিত ১৩৬ জন সদস্য ছিলেন। তবে জ্যাকোবিন দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে জিরন প্রদেশ থেকে আগতরা পৃঞ্চ হয়ে যায়। এরা জিরন্ডিস্ট নামে পরিচিত ধারার শক্তি পরবর্তী সময়ে পরিচিত হতে থাকে। বিধান সভায় এসব ধারা বাইরেও মধ্যপন্থি (মডারেট) চিন্তা ধারার গোষ্ঠীও বেশ সক্রিয় ছিল।
বিধান সভার শাসনকালে ফ্রান্সে দ্রুত অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বিপ্লব বিরোধী শক্তিও ঐ সময় মাথাচাড় দিয়ে ওঠে। অথচ বিধান সভা এসব প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পায় নি। চারদিকে দুর্নীতিবাজ, কালোবাজারী, লুটেরা ও ধনিকগোষ্ঠী অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকে। এক শ্রেণির যাজন পুরাতন যাজকতন্ত্রের প্রতি সমর্থন জানাতে থাকে, নতুন Civil Constitution of the Clergy-র প্রতি বৈরিতা প্রদর্শ শুরু করে। এছাড়া রাজতন্ত্রের ঘোরতর সমর্থক যারা দেশ থেকে পলায়ন করে প্রতিবেশী দেশসমূহে আশ্রয় নিয়েছি সেসব এমিগ্রি (Emigres) সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর হতে থাকে। বিধান সভাকে এসব সমস্যা মোকাবিলা করার হয়েছিল। অবশ্য যেসব ধর্মযাজক নতুন ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য পোষণ করবে না বিধান সভা তাদের সরকারি বেড ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সেই বিদ্রোহীদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে গণ্য করে দেশত্যাগীদের সম্পর্কেও বিধান সভা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারির মধ্যে যারা দো' প্রত্যাবর্তন করবে না, তাদের জায়গা-সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করবে। কিন্তু রাজা আইন দুটির বিরুদ্ধে Veto প্রদা করলে জ্যাকোবিন ও জিরন্ডিস্টরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অবস্থার ক্রমেই অবনতি ঘটতে থাকে। ২০ জুন, ১৭৯২ খ্রিস্টাে প্যারিসের জনতা টুইলারিস রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে। রাজা-রানি এ যাত্রা রক্ষা পেলেও ছদ্মবেশ ধারণ কর্ত পলায়নকালে ভ্যারেন্নে নামক স্থানে তাদেরকে জনতা চিনে ফেলে এবং প্যারিতে ধৃত অবস্থায় তারা আনীত হন। এ ফলে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের জনগণের তীব্র ধিক্কার উচ্চারিত হয় এবং রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দাবি জোরদার হতে থাকে। অস্ট্রিয়াও ঐ সময় রাজা-রানিকে উদ্ধারের নামে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে হুমকি প্রদান করে ইউরোপের সকল বিপ্লববিরোধী শক্তির সাহায্য কামনা করে। ফলে ফ্রান্সে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হবে থাকে। বিধান সভা "মাতৃভূমি বিপন্ন” এই ধ্বনি তুলে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফ্রান্সের অভ্যন্তরে অরাজকতা বেড়ে যায়, শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্ট প্যারির বিপ্লবী কমিউনগুলো টুইলারি রাজপ্রাসাদ পুনরায় আক্রমণ করে। রাজা-রানিকে বন্দী করা হয়। রাজতন্ত্র উচ্ছেদের ঘোষণা দিতে বিধান সভা বার্ধ
হয়।
জাতীয় কনভেনশন (১৭৯২-১৭৯৫ খ্রি.): ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
জিরন্ডিন, জ্যাকোবিন এবং প্রতিবিপ্লবী থ্যার্মিডোরিয়ানদের শাসন, ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটার সাথে সাথে বিধান সভার কার্যকারিতাও ফুরিয়ে যায়। নতুন জাতীয় পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হতে থাকে; দেশে নৈরাজ্য, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বেড়েই চলে। অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মাত্র ৭.৫০ শতাংশ ভোটার ভোট প্রদান করেন। ৭৫০ জন সদস্য নির্বাচিত হন। নতুন যে জাতীয় পরিষদ গঠিত হয় ফ্রান্সে এটিকে জাতীয় কনভেনশন নামে অভিহিত করা হয়েছিল। উক্ত জাতীয় কনভেনশন ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হলেও ঐ সময়ের মধ্যে ফ্রান্সে তিনটি পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। নিম্নে উক্ত তিন শক্তির শাসনকাল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
জিরন্ডিন শাসনামল (১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ থেকে ২ জুন ১৭৯৩ খ্রি.)
১ সেপ্টেম্বর ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় কনভেনশনের অধিবেশন শুরু হয়। জিরোন্ড অঞ্চলের নামে অভিহিত হলেও ঐ সময় নরমপন্থি বুর্জোয়াদের প্রাধান্য কনভেনশনে ছিল। ফ্রান্স যতদিন ইউরোপে যুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল ততদিন কনভেনশনে জিরন্ডিনদের প্রভাব ছিল, এরপর তাতে ভাঁটা পড়ে। তাছাড়া জিরন্ডিনগণ কনভেনশনে রাজার ভাগ্য নির্ধারণ, নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং কমিউন প্রতিষ্ঠার দাবি প্রসঙ্গে দৃঢ় কোনো অবস্থান গ্রহণ করতে পারেনি, অপরদিকে এসব দাবি নিয়ে জ্যাকোবিনরা ছিল সোচ্চার। জ্যাকোবিনদের অনড় অবস্থানের কারণেই রাজাকে কনভেনশন মৃত্যুদণ্ড প্রদান করতে বাধ্য হয়। তাছাড়া সংবিধান রচনার ওপরও তারা জোর প্রদান করে, দেশে সাধারণ নিরাপত্তা সমিতি (Committee of General Defence) নামক একটি সংস্থা তৈরি করা হয়। দেশে খাদ্য সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে। জিরন্ডিনরা নতুন সংবিধান রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও নিজেদের মধ্যেই বিরোধ বেড়ে যায়। ফলে জনগণের কাছে জিরন্ডিনদের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয়, জ্যাকোবিনদের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। তারা খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে। ২ জুন, জ্যাকোবিনরা জনতাকে নেতৃত্ব প্রদান করে, ক্ষমতা থেকে জিরন্ডিনরা বিতাড়িত হয়, জ্যাকোবিনরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।
জ্যাকোবিনদের শাসনামল (২ জুন ১৭৯৩ খ্রি. থেকে ২৭/২৮ জুলাই ১৭৯৪ খ্রি.)
১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২ জুন জ্যাকোবিনরা ক্ষমতা দখল করে। ফ্রান্সের এই রাজনৈতিক দল ছিল প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এবং বিপ্লবের রক্ষক। কিন্তু এ সময় ফ্রান্সে প্রতি বিপ্লব দেখা দেয়। প্যারিসের কমিউনের একাধিপত্য ও অত্যাচারে ডিপার্টমেন্টে (শাসন এলাকা) তীব্র বিক্ষোভ দেখা দেয়। জিরোনডিস্ট দলের পতনে লায়ন্স (Lyons), মারসাই, বরদো প্রভৃতি শহরগুলোতে প্রতি বিপ্লব বা বিপ্লব বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়। এই রাজনৈতিক গৃহ বিবাদের সুযোগে ফ্রান্সের ধর্মযাজকগণ লা-ডেনডি (Le-vende) কৃষকদের বিপ্লবকালীন ধর্মীয় সংস্কার আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ইন্ধন দেয়। এভাবে ধর্মের নামে ও রাজতন্ত্রের সমর্থনে ফ্রান্সে প্রতি বিপ্লব শুরু হয়। পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ফ্রান্সের বিপ্লবী সরকারকে উৎখাতের জন্যে জোট গঠন করে ফ্রান্স আক্রমণ করে। এই অবস্থায় জ্যাকোবিন দল ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ প্রতি বিপ্লব এবং দেশ রক্ষার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করে প্রতি বিপ্লব বা অরাজক অবস্থার অবসান করার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সন্ত্রাস বা ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে প্রতি বিপ্লব দমন করা হয়েছিল বলে জ্যাকোবিন দলের এ শাসনব্যবস্থাকে সন্ত্রাসের রাজত্ব (Reign of Terror) বলা হয়। জ্যাকোবিন দলের নেতা রোবসপীয়র ছিলেন সন্ত্রাসের রাজত্বের প্রধান স্থপতি।

হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে এক বিভীষিকার সঞ্চার করাই ছিল জ্যাকোবিন দলের প্রধান লক্ষ্য। তারা প্রচার করত যে ত্রাসই হচ্ছে দ্রুত বা বলিষ্ঠ ন্যায়বিচারের পথ। সুতরাং ত্রাসই হচ্ছে পুণ্যের পথ।
(Terror is only justice more prompt more vigorous, more invexorable and therefore virtue's child). সন্ত্রাসের রাজত্ব বাস্তবায়নে প্রথমেই সংবিধান রদ করা হয় এবং দুটি ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করে তাদের হাতে সন্ত্রাসের শাসন পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
এই কমিটি হলো- (১) জননিরাপত্তা কমিটি (২) সাধারণ নিরাপত্তা কমিটি। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুলাই হতে ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই পর্যন্ত জননিরাপত্তা কমিটি রাষ্ট্রের সকল কর্তৃত্ব গ্রহণ করে সন্ত্রাসবাদী শাসন পরিচালনা করেছিল। এই কমিটির সদস্য ছিল এগার জন। এর মধ্যে প্রধান ছিলেন রোবসপীয়র।
থার্মিডোরীয় প্রতিক্রিয়া জাতীয় কনভেনশনের পতন
বিপ্লবীদের প্রবর্তিত ফরাসি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী জুলাই-আগস্ট মাসটিকে থার্মিডোর মাস নামে অভিহিত করা হয়। জাতীয় কনভেনশনে সংঘটিত অভ্যুত্থান মূলত প্রতিবিপ্লবী শক্তির সমর্থনে হয়েছিল। ২৮ জুলাই অর্থাৎ ১০ থার্মিডোর ২২ জনকে এবং ২৯ জুলাই বা ১১ থার্মিডোর প্যারি কমিউনের ৭০ জন সদস্যকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়। 'গোল্ডেন ইয়থ' নামধারী যুবকরা জ্যাকোবিন ক্লাবগুলো গুঁড়িয়ে ফেলে, অথবা বন্ধ করে দেয়। গণনিরাপত্তা কমিটি নিষিদ্ধ করা হয়, এমনকি প্যারিসের কমিউনগুলোও বাতিল করে দেয়া হয়। জ্যাকোবিনদের শাসনকে মুছে ফেলতে গিয়ে থার্মিড়োরগণ প্রতিবিপ্লবই সম্পন্ন করতে থাকে। ফ্রান্সে কার্যত নতুন আর এক সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। এটিকে "শ্বেত সন্ত্রাস” নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। শ্বেত সন্ত্রাসে অগণিত মানুষ মৃত্যুবরণ করে। অনেকে এ হত্যাকে জ্যাকোবিনদের পরিচালিত সন্ত্রাস ও হত্যার চেয়েও ভয়াবহ বলে অভিহিত করে থাকেন। দেশে আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে, দ্রব্যমূল্য বেড়ে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়। জাতীয় কনভেনশনে প্রতিবিপ্লবী বুর্জোয়া শক্তি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কনভেনশনের বিপ্লবী সদস্যদের হত্যা করা হয়। দেশে খাদ্যাভাব, বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, হত্যা, জাতীয় রক্ষীবাহিনী কর্তৃক বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত প্রতিবাদকে প্রতিহত করা ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে ১৭৯৫ সালের মে মাসে (ফরাসি প্রেরিয়াল মাস) ফ্রান্সে বিদ্রোহ বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। থার্মিডোরীয় বুর্জোয়ারা অবস্থা বুঝতে পেরে নতুন সংবিধান রচনায় হাত দেয়। ২২ আগস্ট কনভেনশন নতুন সংবিধান গ্রহণ করে। প্রজাতন্ত্রের নতুন সংবিধান অনুযায়ী দুই কক্ষবিশিষ্ট শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। ১৭৯৫ সালের ১০ অক্টোবর উচ্চকক্ষের ৫ জন ডাইরেক্টর কর্তৃক ফ্রান্স শাসিত হওয়ার বিধান প্রবর্তন করা হয়। বিলুপ্ত হয় জাতীয় কনভেনশন। প্রতিষ্ঠিত হয় ডাইরেক্টরি শাসন ব্যবস্থা।
ফরাসি বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই
ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্সের সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনা, শিক্ষা ও বিপ্লবের আগে ফ্রান্স ছিল একটি সামন্ততান্ত্রিক দেশ। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তা পুঁজিবাদী ধারায় বিকশিত হতে থাকে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে। ফ্রান্সে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও ধর্মযাজকগোষ্ঠীর প্রভাব দুর্বল হতে থাকে। ফ্রান্স কার্যত একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে বিপ্লবের মাধ্যমে। ফরাসি বিপ্লব ফ্রান্সের জন্য সংবিধান প্রণয়ন করেছে, বিভিন্ন নামে ফ্রান্সে জাতীয় সংসদ গঠন করেছে, ফ্রান্সকে প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারের মাধ্যমে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে অবদান রেখেছে। এই বিপ্লব ফরাসি জাতির মধ্যে

ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্সের সমাজকেই নয়, গোটা ইউরোপকেও আলোড়িত করেছিল। গণতন্ত্র, যুক্তিবাদ, ব্যক্তি স্বাধীনতা, সাম্য, শোষণমুক্তি, নাগরিক অধিকার ইত্যাদি ধারণা ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহে বিস্তার লাভ করে। তাই ১৭৮৯ সালের বিপ্লবকে আধুনিক ইউরোপের নতুন পর্ব হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
ফরাসি বিপ্লব রাতারাতি সব পরিবর্তন নিয়ে আসে নি। অনেক ভুল-ভ্রান্তি ও বিচ্যুতির পরও ফ্রান্সের জনগণ বিপ্লবের আদর্শকে ত্যাগ করেনি। বিপ্লবের পথে ফ্রান্সে অনেক রক্ত ঝরেছে, দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, বিপ্লবকে ধ্বংস করার চেষ্টাও হয়েছে, প্রতিবিপ্লবী শক্তি ফ্রান্সের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। ফ্রান্সের জনগণ তারপরও বিপ্লবের আদর্শের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে ১৮৩০ ও ১৮৪৮ সালে পর পর দুটি বিপ্লব সংঘটিত করেছে। ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউন গঠিত হয়েছে ফরাসি বিপ্লবের চেতনা থেকে। ফ্রান্স বিপ্লবের আদর্শকে ত্যাগ করেনি, বরং এর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বার বার বিপ্লব সংঘটিত করেছে। ফরাসি সমাজ বিপ্লবের আদর্শকে এখনও ত্যাগ করেনি। ফ্রান্সে এখনও বিপ্লবের সকল নায়ক, নেতা-কর্মীকে শ্রদ্ধা করা হয়। ফ্রান্সের অনেক রাস্তাঘাট ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়েছে বিপ্লবীদের নামে। ফ্রান্সের তরুণ, শিশু কিশোরগণ ফরাসি বিপ্লবের সৈনিকদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে, তাঁদের ছবি বহন করে। ফরাসি জাতি প্রতি বছরই ১৪ জুলাইকে তাদের প্রধান জাতীয় দিবস' হিসেবে পালন করে থাকে। এর মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের চেতনায় তারা উজ্জীবিত হওয়ার শপথ নতুন করে গ্রহণ করে থাকে। কর্যাস। বপ্লব এভাবেই ফ জাতির কাছে মহান এক ঐতিহাসিক কালপর্ব হিসেবে সমাদৃত হয়েছে পৃথিবীর সব দেশেই ফরাসি বিপ ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পঠিত হয়। এই বিপ্লবের ইতিহাস পাঠে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলিত হয়, নিজ। দেশের বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধ এখানেই নিহিত রয়েছে। ও সংগ্রামের সাথে মিলিয়ে দেখাব চেষ্টা করে। ফরাসি বিপ্লবের দেশীয় ও আন্তজার্তিক
ফরাসি বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই
: ফরাসি বিপ্লবকে বলা হয় আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা। শুধু ইউরোপের সমা অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিক্ষা সংস্কৃতিতেই নয়, ইউরোপের বাইরে অন্যান্য দেশেও এই বিপ্লবের প্রভাব দ্রুত ছড়ি পড়েছিল। এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফরাসি বিপ্লব সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে পঠিত হচ্ছে। ইতিহাস শাস্ত্র। বিপ্লব থেকে শিক্ষা নেওয়ার তাগিদ সবচেয়ে বেশি দিয়ে থাকে। বিশেষত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এই বিপ্লা প্রভাব অনেক বেশি হওয়ায় এই বিপ্লবের ঘটনাবলি পুঙ্খানুপুঙ্ক্ষরূপে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনে আবেগতাড়িত না হয়ে বাস্তবোচিত বিচার বুদ্ধির প্রয়োগ ঘটানোর ওপর বিশেষভাবে গুরু আরোপ করা হয়ে থাকে। উনিশ শতক শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লব পুরাতন ফরাসি সমা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে সচেষ্ট ছিল। আবার গোটা উনিশ শতকে ইউরোপের সমাজ ও রাজনীতিতে এই বিং ব্যাপক কাঁপুনির সৃষ্টি করতে পেরেছিল। ফলে উনিশ শতকের ইউরোপ ছিল বিপ্লবের ইউরোপ-যা ছিল মূলত ১৭৮৪ সালের ফরাসি বিপ্লবেরই অসমাপ্তিকে পূর্ণতা দানের চেষ্টা মাত্র। বস্তুত ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের প্রল নিম্নোক্তভাবে দেখা যেতে পারে।
১. জাতীয়ভাবে প্রভাব: ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল এর অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক, রাজনৈানি ও শিক্ষা সাংস্কৃতিক জীবনে।
(ক) আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিপ্লবের আগে ফ্রান্স ছিল একটি সামন্ত সমাজ। বিপ্লবের শুরু থেকেই সামর ব্যবস্থার পরিবর্তনে বিপ্লবে অংশ নেওয়া সকল শক্তিই ভূমিকা রেখেছিল। ভমি ব্যবস্থার সংস্কার আর্থ-সামালিন ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ধারা সূচনা করে। ফলে ফ্রান্স থেকে সামন্ততন্ত্র উচ্ছেদ হতে থাকে। কৃষক শ্রেণি জামিন মালিকানা লাভ করার সুযোগ পায়। ফ্রান্সে সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার নির্মম ও নিষ্ঠুর শোষণে কৃষক শ্রেণি বাই উৎপাদনের প্রতি আগ্রহ হারাতে বাধ্য হয় ফলে ফ্রান্সের কষি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। ফরাসি বিপ্ল ফ্রান্সে সামন্ত ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে যে সংস্কার শুরু করে তার ফলে ফ্রান্সের কৃষি ব্যবস্থা পরবর্তী সময়ে আধুনিক চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। ফ্রান্সের নতুন আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিল।
খ) রাজনৈতিক প্রভাব: ফরাসি বিপ্লব ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক বিপ্লব। পুরাতন রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দ্বার উন্মুক্ত করা হয়। ফ্রান্সে গণতান্ত্রিক ধারা চালু হওয়ার ক্ষেত্রে এই বিপ্লব নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল। যদিও ফ্রান্সে গণতান্ত্রিক ধারা চালু হতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স ধাপে ধাপে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দ্রুত উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হয়। তবে ফরাসি বিপ্লব সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে উনিশ শতকে ১৮৩০ এবং ১৮৪৮ সালে নতুন নতুন বিপ্লব সংঘটিত করে, ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউন সংঘটিত করে। প্রথম (১৯১৪-১৮) এবং দ্বিতীয় (১৯৩৯-১৯৪৫) বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার অন্যতম ক্ষেত্র হয়েছিল ফ্রান্স। তারপরও ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব থেকে ফ্রান্স ছিটকে পড়ে নি।
গ) শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রভাব: ফরাসি দেশ আঠারো শতকে শিক্ষা-সংস্কৃতিতে 'আলোকিত দেশ' হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে ভলত্যেয়ার, মন্টেস্কো, রুশো, দিদেরো, হুগোসহ অংসখ্য মনীষীর জন্ম হয়েছিল। তারা তাদের অগ্রসর চিন্তার কারণে তখনই ফ্রান্স এবং বাইরের দেশগুলোতে বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেন। এ সব মনীষী ফ্রান্সের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কড়া সমালোচক ছিলেন। ফ্রান্সের জনগণকে উন্নত জীবন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তাঁরা তাদের লেখনী অব্যাহত রেখেছিলেন। তাঁরা একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ফরাসি বিপ্লব তাঁদের সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ প্রদানে উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিপ্লবের শুরুতে ঘোষিত মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের পথ ধরেই ফ্রান্সে শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তনের ধারা সূচিত হয়। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, 'আমাকে তোমরা একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদেরকে শিক্ষিত জাতি উপহার দিবো'। বিপ্লবের পথ ধরেই ফ্রান্স শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সুযোগ লাভকরে। এখন ফ্রান্স একটি আধুনিক উন্নত দেশ বলে স্বীকৃত।
২। ইউরোপে প্রভাব বিস্তার: ফরাসি বিপ্লব শুরু থেকেই ইউরোপের দেশ ও জাতিসমূহকে ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত করেছে। ইউরোপের বেশির ভাগ রাষ্ট্র তখন সামন্তবাদ ও রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্ত ভিত্তি নিয়ে অবস্থান করছিল। সে সব দেশের অগ্রসর মানুষ এ সব অপশক্তিকে অপসারিত করার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। ফরাসি বিপ্লব তাদেরকে নতুন পথ দেখাতে সক্ষম হয়। তারাও রাজতন্ত্রের উচ্ছেদে তখন সংঘবদ্ধ হতে থাকে, সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনে কৃষক ও মেহনতী মানুষদের সংগঠিত করার প্রেরণা লাভকরে। ইউরোপের সব দেশের নেতৃবৃন্দ ফরাসি বিপ্লবের প্রতি আকৃষ্ট হন, কেউ কেউ ফরাসি বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেন। ইউরোপের দেশে দেশে বিদ্রোহ ও বিপ্লবের ঘটনা প্রবাহ ঘটতে থাকে। ইউরোপের পুরাতন ব্যবস্থার ওপর ফরাসি বিপ্লব বরফ গলাতে শুরু করে। জার্মান এবং ইতালি জাতি নিজেদের জাতীয় বিকাশে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রেরণা লাভ করে, এক সময় তারা সাফল্য অর্জন করে। মধ্য ইউরোপীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহ জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত হওয়ার প্রেরণা খুঁজে পায়। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী গোটা ইউরোপকে আন্দোলিত' করে তোলে। ফরাসি বিপ্লবের প্রভাবে ইউরোপ এক সময় আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্য লাভ করে।
৩.আন্তর্জাতিক প্রভাব তৎকালীন বিশ্ব পরিসরে ফরাসি বিপ্লব প্রথম বড় ধরনের বিপ্লব হিসেবে পরিগণিত হয়েছে যার প্রভাব ফ্রান্সের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয় মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সব দেশেই ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতার প্রেরণা হিসেবে ফরাসি বিপ্লবকে গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ শ্রদ্ধার চোখে গ্রহণ করেছে। লাতিন আমেরিকায় স্পেনিশ দখলদারদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের প্রেরণাতে ছিল ফরাসি বিপ্লবের নেতাদের বীরত্ব। এশিয়া এবং আফ্রিকাতেও বিশ শতকের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব কার্যকর ছিল। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে বিপ্লবের নেতা লেনিন ফরাসি বিপ্লবের অভিজ্ঞতাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। শুধু বিপ্লবের জন্যেই নয়, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা নির্মাণে ফরাসি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা সকলকে সচেতন করতে পারে। সে কারণে ফ্রান্সে ১৭৮৯ সালে সংঘটিত বিপ্লবটি পৃথিবীব্যাপী মহান ফরাসি বিপ্লবের মর্যাদায় পঠন পাঠন ও উদ্যাপনের ধারা। পৃথিবীর সর্বত্র এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিপ্লব ও বিপ্লবীদের কথা স্মরণ করেছি, তাদের আত্মত্যাগ থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা উচ্চারণ করেছি; ফরাসি বিপ্লবের কথাও তাতে উচ্চারিত হয়েছে। আমাদের দেশেও প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল ফরাসি বিপ্লব উপলক্ষে লেখালেখি এবং অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। এভাবেই ফরাসি বিপ্লব গত দুশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সর্বত্র নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলছে।
ফরাসি বিপ্লব - প্রফেসর জে.এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যারে এর লেখা বই

নেপোলিয়নের পরিচয়: যেসব ব্যক্তি স্বীয় কর্ম ও প্রতিভা দ্বারা ইতিহাসের গতি পরিবর্তন করতে সমর্থ
হয়েছিলেন, নেপোলিয়ন তাদের অন্যতম। ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমরনেতা, রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারক নেপোলিয়ন ইতালির কর্সিকা দ্বীপে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিজেই বলেন, "আমার দেশ যখন মরণাপন্ন তখন আমার জন্ম হয়।" জন্মের কিছুদিন পরই কর্সিকায় ফ্রান্সের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ফ্রান্সের সাথে তার ভাগ্য জড়িয়ে যায়। তার পিতার নাম ছিল কার্লো বোনাপার্ট এবং মাতার নাম ছিল লেটিজ়িয়া বোনাপার্ট। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন নির্ভীক, অনমনীয় ও অধ্যবসায়ী। অল্প বয়সে সামরিক শিক্ষা লাভ করে ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লেফটেন্যান্ট হন। বিপ্লবী জেকোবিন দলে যোগদান করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি টুলোঁ বন্দর থেকে ইংরেজ বাহিনীকে বিতাড়নে নেতৃত্ব দিয়ে ফ্রান্সের নিরাপত্তা রক্ষা করেছিলেন। বিজয়ের পুরস্কারস্বরূপ তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি পান। এর কিছুদিন পরেই রাজতন্ত্রীদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে জাতীয় সম্মেলনকে রক্ষা করলে তিনি ফরাসিদের শ্রদ্ধা ও আস্থাভাজন নেতায় পরিণত হন।
ডাইরেক্টরি শাসন ও নেপোলিয়নের উত্থান
ফরাসি বিপ্লবোত্তর ফ্রান্সে ডাইরেক্টরি শাসন ছিল ১৭৯৫-৯৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। হোবার্ট, দাঁতন ও রোবস্পিয়ারের নেতৃত্বে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব (১৭৯৩-৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) ফ্রান্সে চালু হয়েছিল তার অবসানের পর ডাইরেক্টরি শাসন শুরু হয়। ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় সম্মেলন (National Assembly) বিপ্লবের যে তৃতীয় সংবিধান প্রণয়ন করে, তাতে শাসনভার পাঁচজন ডাইরেক্টর বা পরিচালকের হাতে ন্যস্ত হওয়ায় একে ডাইরেক্টরি শাসন বলে। ডাইরেক্টরি শাসনামলে নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ইতালীয় অভিযানের নেতৃত্ব দিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ইতালীয় অভিযানে তার সমর কৌশল ও ক্ষিপ্রতা এবং দৃঢ় সংকল্প তাকে একজন 'ক্ষুদ্র সেনাপতিতে' পরিণত করে। ১৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দে অস্ট্রিয়া পরাজিত হলে ইতালিতে ফ্রান্সের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। নির্ভীক সেনাপতি বিজয়ের পর দেশে ফিরলে তাকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়। দেশপ্রেমিক সেনাপতি চিরশত্রু ইংল্যান্ডকে অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। ভারতবর্ষে ইংল্যান্ডের যোগাযোগ বন্ধ ও তাদের আর্থিক শক্তিকে দুর্বল করার জন্য তিনি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা (১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) করেন। যুদ্ধক্ষেত্র ছিল মিশর। ভূমধ্যসাগরে ইংরেজ নৌ সেনাপতি নেলসনের দৃষ্টি এড়িয়ে তিনি মাল্টা দখল করে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় উপস্থিত হন। অতঃপর তিনি কায়রো দখল করেন। কিন্তু নৌশক্তিতে ইংল্যান্ড শক্তিশালী হওয়ায় নীলনদের যুদ্ধে (১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি পর্যুদস্ত হন। মিশর অভিযানে তার ব্যর্থতা তিনি বুঝতে পারেন। ফরাসি বাহিনীকে মিশরে তাদের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়ে তিনি ফ্রান্সে পালিয়ে আসেন। দেশে এসে তিনি এক দুর্নীতিগ্রস্ত ও হতাশাগ্রস্ত ফ্রান্স দেখেন। জনগণ ডাইরেক্টরির অপশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। এ সময় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের নেতৃত্বের দ্বিতীয় শক্তিজোট গঠিত হয়। তারা জোটবদ্ধ হয়ে ফ্রান্সকে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এ রকম ক্রান্তিলগ্নে তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ডাইরেক্টরি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই নভেম্বর 'কনসুলেটর' শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। কনসুলেট আমলে কার্যত ফ্রান্সের নির্বাহী ক্ষমতা নেপোলিয়নের হাতে চলে যায়। ক্ষমতা গ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, "আমি ফ্রান্সের রাজমুকুটকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখি, আমি তরবারির সাহায্যে তা মাথায় তুলে নিই।"
কনসুলেটর হিসেবে নেপোলিয়ন
ডাইরেক্টরি শাসনের পতন হলে ফরাসি বিপ্লবের 'চতুর্থ সংবিধান' প্রণয়ন করা হয়। নতুন শাসনতন্ত্র অনুযায়ী ক্ষমতা তিনজন 'কনসুল' দ্বারা গঠিত একটি কনসুলেটের উপর অর্পিত হয়। সিয়েস, ডোকাস ও নেপোলিয়নকে নিয়ে গঠিত এ সরকারকে কনসুলেট শাসনব্যবস্থা বলা হতো। নেপোলিয়ন হন এক নম্বর কনসুল এবং অতিরিক্ত ক্ষমতার অধিকারী। কার্যত প্রশাসনিক সকল ক্ষমতা নেপোলিয়নের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। কনসুলেট ব্যবস্থা জনসাধারণের নিকট পেশ করা হলে তা বিপুল ভোটাধিক্যে পাস হয়। ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই ডিসেম্বর তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন যে, "বিপ্লবের মূলনীতি জয়যুক্ত হয়েছে এবং বিপ্লবের পরিসমাপ্তি ঘটেছে।"
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সংস্কার
কনসুলেটর হিসেবে নেপোলিয়ন পাঁচ বছর (১৭৯৯-১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দ) ক্ষমতায় ছিলেন। এ সময় তিনি ফরাসি জাতির উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কারসাধনে আত্মনিয়োগ করেন। তার সংস্কারগুলোতে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শসমূহ প্রতিফলিত হয়। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তিনি যে সংস্কার ও উন্নতি সাধন করেন তার জন্যই পৃথিবীর ইতিহাসে তার নাম অমর হয়ে আছে।
তার সংস্কারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল:
১। জাতির ক্ষত উপশম করা;
২। একটি সুষ্ঠু ও সুদৃঢ় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা;
৩। আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য ও অনাচার দূর করা।
৪। খ্যাতির মোহ, গৌরবের আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের মন জয় করার ঐকান্তিক বাসনা।
এসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নেপোলিয়ন নিম্নলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
ক. শাসনতান্ত্রিক সংস্কার নেপোলিয়ন সর্বপ্রথম ফ্রান্সে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার
লক্ষ্যে দেশ থেকে রাজনৈতিক দলাদলি উচ্ছেদ করেন। সমগ্র ফ্রান্সকে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে আনার জন্য ফ্রান্সের প্রদেশগুলোতে একই শাসননীতি ও আইনকানুন প্রবর্তন করলেন। বিপ্লবের যুগে ফ্রান্সকে ৮৩টি প্রদেশে ও ৫৪৭টি জেলায় ভাগ করা হয়েছিল, তিনি তা অব্যাহত রাখেন। পূর্বে সরকারি কর্মচারীরা জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত হতেন। তিনি এ পদ্ধতি উঠিয়ে দিয়ে প্রথম কনসুলেট কর্তৃক মনোনয়নব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। প্রাদেশিক শাসকরা প্রথমে কনসুল ও পরে সম্রাট পদের সৃষ্টি হলে সম্রাট কর্তৃক নিযুক্তির ব্যবস্থা চালু করেন। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা অনেকাংশে কমিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনাধীনে আনেন। এভাবে নেপোলিয়ন কেন্দ্রীয় আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রবর্তন করে শাসনব্যবস্থাকে সুষ্ঠু, ন্যায়সংগত ও কার্যকর করলেন।
খ. অর্থনৈতিক সংস্কার: অর্থনৈতিক সংস্কার তার শাসনামলে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ডেভিড টমসর্নের
মতে, পূর্বতম শাসনব্যবস্থার ক্যান্সার ছিল অর্থব্যবস্থা ও করপ্রথা। অর্থনৈতিক সমস্যাই ফরাসি বিপ্লবের জন্য মূলত দায়ী ছিল। সুতরাং এই দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে ফ্রান্স যত শিগগির আরোগ্য লাভ করে সেদিকে নেপোলিয়ন বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি ফ্রান্সের অর্থনৈতিক কাঠামোকে সুদৃঢ় কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য Bank of France নামে একটি জাতীয় ব্যাংক ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা যাতে সহজে ব্যাংক থেকে অর্থ সাহায্য পান তার ব্যবস্থা করেন। তিনি দেশে মুদ্রানীতির আধুনিক নীতিসম্মত সংস্কার সাধন করেন। নেপোলিয়ন কর প্রদানে ফরাসিদের স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে দিলেন এবং কর আদায় প্রথার সংস্কার সাধন করলেন। নেপোলিয়ন কৃষকদের দুর্দশা লাঘবের উদ্দেশ্যে তাদের করের হার হ্রাস করেন। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ব্যাপারে যাতে কোনো প্রকার অমিতব্যয়িতা বা দুর্নীতির অবকাশ না থাকে সেদিকে তিনি কড়া নজরদারির ব্যবস্থা করেন। এছাড়া যাতায়াতের সুবিধার জন্য তিনি নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ ও পুরনো রাস্তার সংস্কার সাধন করেন। তার এ সমস্ত সংস্কারের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রচুর উন্নতি সাধিত হলো। এতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘকাল পর সুষ্ঠু ও সুবিন্যস্ত হলো।
গ. আইন সংস্কার: ফ্রান্সের কনসুলেটর হিসেবে নেপোলিয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো তার আইন সংস্কার।
ইতিপূর্বে ফ্রান্সে কোনো সুসংবদ্ধ আইন প্রচলিত ছিল না। যে চারশটি বিভিন্ন রকমের আইন প্রচলিত ছিল তাতে যথেষ্ট বৈষম্য ছিল। নেপোলিয়ন অনেক কষ্ট স্বীকার করে প্রাচীনকাল থেকে ফ্রান্সে প্রচলিত সমস্ত আইন সংগ্রহ করে এগুলোর সংস্কার সাধন করেন। পাঁচজন বিচক্ষণ আইনবিদের সমন্বয়ে ও তার তত্ত্বাবধানে একটি আইন কমিশন গঠন করে 'আইন-বিধি' প্রণয়ন করেন, যাকে Code Napoleon বলা হয়। এতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, ধর্মীয় স্বাধীনতা, আইনের চোখে মানুষের সমতা, কৃষকদের ভূমি মালিকানা স্বত্ব প্রভৃতি বিপ্লবের আদর্শ স্বীকৃতি লাভ করে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ভ্রাম্যমাণ বিচারক ব্যবস্থা সৃষ্টি তার অন্যতম একটি কীর্তি। জুরি প্রথা পূর্বের মতো বহাল রাখা হয়। তার প্রবর্তিত দেওয়ানি আইন ও কার্যবিধি, ফৌজদারি আইন ও কার্যবিধি এবং বাণিজ্য আইন ছিল জটিলতামুক্ত ও সুবিন্যস্ত। রোমান আইনের মূল আদর্শের উপর ভিত্তি করে এগুলো রচিত বলে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তা গৃহীত হয়। তিনি নিজেই এ আইন-বিধির গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, "চল্লিশটি যুদ্ধে জয়লাভ করা আমার সত্যিকারের গৌরব নয়, যা কখনো মুছে ফেলা যাবে না এবং যা চিরস্থায়ী হবে তা হলো আইন-বিধি।"২৪ তার আইন-বিধির জন্য তাকে দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান বলা হয়।
ঘ. ধর্মীয় সংস্কার: ধর্মনীতি পুনর্গঠনের ব্যাপারেও তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন। ধর্মীয় সংস্কারের ব্যাপারে
তিনি উদার নীতি গ্রহণ করেন। তার ধর্মীয় সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় ব্যাপারে ঐক্য ও শান্তি স্থাপন করা। নেপোলিয়ন তার বিখ্যাত 'Concordate of 1801' বা ধর্ম মীমাংসা নীতি দ্বারা পোপ ও ফরাসি চার্চের পারস্পরিক বিরোধ দূর করেন। এ মীমাংসার ফলে স্থির হয় যে, রোমান ক্যাথলিক ধর্মই ফরাসিদের ধর্ম। আরও স্থির হয় যে, যাজক সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মচারী সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং পোপ কর্তৃক এসব নিয়োগ অনুমোদিত হবে। নিম্নস্তরের কর্মচারী বিশপ কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং এ নিয়োগ সম্রাট কর্তৃক অনুমোদিত হবে। এভাবে ফরাসি চার্চের উপর তার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। মূলত ফরাসি চার্চ রাষ্ট্রের একটি বিভাগে পরিণত হলো। প্রকৃতপক্ষে নেপোলিয়নের ধর্ম সংস্কার তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচায়ক। নেপোলিয়নের ধর্ম সংস্কার সম্পর্কে ঐতিহাসিক কোব্যান বলেন, "The Concordate was a great victory for Bonaparte and a master, stroke of Policy. The Emperor was able hence Forth to use the clergy as an instrument of government.২৫
ঙ. অন্যান্য সংস্কার: শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারসাধন ও উন্নয়ন তার উল্লেখযোগ্য অবদান। দেশের শিক্ষার উন্নতির
প্রতি তার সজাগ দৃষ্টি ছিল। তার আমলে ফরাসি ভাষার প্রসার ও সমৃদ্ধি ঘটে। তিনি জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি সরকারি ব্যয়ে বহু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বহু কারিগরি বিদ্যালয়ও স্থাপন করেন। তারই চেষ্টায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সে 'University of France' প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি জাতি-ধর্ম ও রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে সকল শ্রেণির নাগরিককে সমান সুযোগ দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক সমতা প্রদান করেন। প্রকৃত গুণীদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার জন্য ১৮০২ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়ন 'Legion of Honour' নামে একটি সম্মানসূচক খেতাব সৃষ্টি করেন। এ সম্মানপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বংশগত মর্যাদার পরিবর্তে প্রকৃত গুণের ও স্বীয় কর্মের ভিত্তিতে নির্বাচিত হতেন। এভাবে তিনি তার অনুগত একটি অভিজাত সম্প্রদায় সৃষ্টি করেন।
নেপোলিয়নের সংস্কার ফ্রান্সের জাতীয় জীবনে নতুন প্রাণস্পন্দনের সঞ্চার করেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফরাসি বিপ্লবের দুর্বার গতিধারায় যে সংঘাত দেশ ও জনগণের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল, এসব সংস্কারের ফলে সেগুলোর অবসান হয়। তার একনায়কতন্ত্র বিপ্লবের ধ্বংসাত্মক শক্তিকে বাধা প্রদান করেছিল। তবে একথা সত্য যে, বিপ্লবপ্রসূত সাম্যনীতি, জনকল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা স্থাপন করে বিপ্লব ও স্বৈরাচারী শাসনের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। তার সংস্কারে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ যেমন প্রতিফলিত হয়, আবার ধর্মীয় ক্ষেত্রে আপস করে যাজকদের প্রাধান্য, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ প্রভৃতি স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ড ছিল বিপ্লবের আদর্শের পরিপন্থী। তবে তার সংস্কারগুলোর লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়া, যাতে তিনি অনেকাংশেই সফল। ঐতিহাসিক ফিশার বলেন, "তার সামরিক বিজয়গুলো ক্ষণস্থায়ী হলেও ফ্রান্সে তার বেসামরিক কার্যাবলি গ্রানাইটের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ছিল। "২৬
নেপোলিয়নের সংস্কারসমূহের সীমাবদ্ধতা
নেপোলিয়নের সংস্কারসমূহের সীমাবদ্ধতাও ছিল। যেমন-
(ক) প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে সারা দেশে প্রশাসনিক ঐক্য ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় হলেও প্রিফেক্টগণ জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেদের খুব কমই নিয়োজিত করতে পারতেন। নেপোলিয়নের নিরন্তর যুদ্ধের রসদ সরবরাহ ও প্রশাসনযন্ত্রের ক্রীড়নক হয়ে তাদের ব্যস্ত থাকতে হতো। ফলে প্রশাসন কেন্দ্রীকরণ নীতি তার জন্য শেষ পর্যন্ত কোনো শুভ ফল বয়ে আনেনি। প্রিফেক্টদের নেপোলিয়নের দুর্দিনে কোনো সাহায্য করতে পারেননি।
(খ) নেপোলিয়নের আইন সংস্কারও শত্রুমুক্ত ছিল না। যেমন:
প্রথমত: ফ্রান্সের নারীসমাজের বন্ধনমুক্তি ও সমান অধিক অধিকার লাভের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল কোড নেপোলিয়ন দ্বারা তা দূরীভূত হয়। নারীদের সম্পত্তির অধিকার সংকুচিত করা হয়।
দ্বিতীয়ত: পুরুষ ও নারীর অধিকারের সমতাকে কোড নেপোলিয়নে অস্বীকার করা হয়।
তৃতীয়ত: পিতাকে পরিবারের উপর সামন্ততান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিয়ে স্ত্রী ও সন্তানের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা হয়।
চতুর্থত : তার আইন-বিধিতে শ্রমিকদের অধিকারের কোনো কথা ছিল না। তাদের নিম্নতম মজুরি ও ধর্মঘটের অধিকার স্বীকার করা হয়নি, বরং বুর্জোয়াদের স্বার্থের অনুকূলে ছিল।
(গ) নেপোলিয়নের শিক্ষা সংস্কারও শত্রুমুক্ত ছিল না। যেমন:
প্রথমত: তার শিক্ষাব্যবস্থায় মানুষের মুক্তচিন্তা ও চেতনার কোনো স্থান ছিল না।
দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পাঠ্যসূচিকে এমনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছিল, যাতে তার শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে ছাত্রদের মনে প্রশ্নের সৃষ্টি না হয়।
তৃতীয়ত: সৃজনশীল চিন্তাধারা, মৌলিক সৃষ্টি ও গবেষণাকে উৎসাহ না দেওয়ায় ফ্রান্সে শুধু অধিকসংখ্যক ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা ও সেনাপতি তৈরি হয়, কবি, সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবী তদ্রূপ সৃষ্টি হয়নি। সুস্থ সংস্কৃতি ফরাসি জীবনধারা থেকে নির্বাসিত হয়। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তার সংস্কারগুলো ফ্রান্সের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা করে; যা সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতীয় জীবনে শান্তি, স্থিতি ও সমৃদ্ধি এনে দেয়- বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ও ফরাসি বিপ্লব
ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্পর্ক কিরূপ ছিল তা তার দুটি উক্তি থেকে সহজেই বোঝা যায়।
তিনি ছিলেন একাধারে বিপ্লবের উত্তর-সাধক (Child the Revolution), আবার এর বিনাশক (Destroyer)। একদিকে তিনি বিপ্লবকে রক্ষা করেছিলেন, অবার অন্যদিকে তিনি একে ধ্বংস করেছিলেন। তাই একসময় তিনি বলেছিলেন, 'আমিই বিপ্লব' (I am the Revolution)। পরবর্তীকালে কোনো একসময় তিনি বলেছিলেন, "আমি বিপ্লবকে ধ্বংস করেছি।"২" তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সত্যতা নিহিত আছে।
ফরাসি বিপ্লবের ফলে জনসাধারণের মধ্যে যে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন তিনি নিজেই। সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও সম্রাট পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন কৌলীন্যের জোরে নয়, প্রতিভার বদৌলতে। তার প্রবর্তিত সংস্কারগুলোর সাথে বিপ্লবের ভাবাদর্শের কোনো মৌলিক বিরোধ ছিল না। আইনের চোখে সকলেই সমান- এ নীতিকে স্থায়িত্ব দান করে তিনি বিশ্বের সামনে বিপ্লবের একটি আদর্শ স্থাপন করেছিলেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আক্রমণ থেকে ফ্রান্সকে রক্ষা করে বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এছাড়া তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোতে ফ্রান্সের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বিপ্লবের প্রভাব ও আদর্শ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এসব বিবেচনায় তিনি যে নিজেই বিপ্লব ও বিপ্লবের রক্ষাকারী তা স্বীকার করে নিতে হয়।।
আবার ঘন ঘন শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের অমোঘ বাণী 'সাম্য ও শান্তি'তে তার বিশ্বাস ছিল, বিপ্লবীদের স্বাধীনতায় তার আস্থা ছিল না। তাই তিনি মন্তব্য করেন, "ফরাসি জাতির কাম্য সমতা, স্বাধীনতা নয়।" তার কতিপয় সংস্কার ও গৃহীত পদক্ষেপ বিপ্লববিরোধী ছিল। এ বিবেচনায় তাকে বিপ্লবের বিনাশক বলা চলে। তবে, বিপ্লবী আদর্শের প্রতি তার পূর্ণ আস্থা না থাকলেও তার কার্যক্রমগুলো ছিল ক্ষিপ্রগতির; এজন্য 'আমিই বিপ্লব'- এ উক্তিটি তার নামের সাথে অত্যন্ত মানানসই।
নেপোলিয়নের পতনের কারণসমূহ
বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পতন ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ফরাসি বিপ্লব তরঙ্গের চূড়ায় আরোহণ করে তিনি ফ্রান্সের সিংহাসনে উপনীত হন। ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তিনি রাজ্যবিস্তার, শাসন সংস্কার, সামরিক বিজয় প্রভৃতি ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের পরিচয় দেন। কিন্তু এর পর থেকে তার ভাগ্যরবি ধীরে ধীরে অস্তমিত হতে শুরু করে। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াটারলু যুদ্ধে পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনের চির অবসান ঘটে। নিচে তার পতনের কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
নেপোলিয়নের অনমনীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেপোলিয়নের আকাঙ্ক্ষা ছিল, তিনি ইউরোপের ভাগ্যবিধাতারূপে এক
বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন। কিন্তু এটি যে একটি অলীক স্বপ্ন, তা তার মতো বিচক্ষণ, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ কেন বুঝতে পারেননি, তা সাধারণ বুদ্ধিতে ব্যাখ্যা করা কঠিন। গভীর আত্মপ্রত্যয় ও অহমিকার কারণে তিনি তার জীবনের কতকগুলো শ্রেষ্ঠ সুযোগ হারিয়ে নিজেকে ভুল পথে পরিচালনা করেন।
লাইপজিগের যুদ্ধের পর মিত্রশক্তি নেপোলিয়নকে সম্মানজনক ফ্রাংকফুর্ট প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবে বলা হয়, নেপোলিয়ন বেলজিয়াম ও হল্যান্ড ত্যাগ করলে তাকে ফ্রান্সে রাজপদ দেওয়া হবে। কিন্তু নেপোলিয়ন রাজি হননি। কারণ তিনি তখনো নিজেকে অজেয় মনে করতেন। প্রকৃতপক্ষে মিত্রশক্তির ফ্রাংকফুর্ট প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা ছিল নেপোলিয়নের জীবনে বড় ভুল।
ভ্রান্ত স্পেনীয় নীতি: স্পেনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং স্পেনের সিংহাসনে নিজ ভাই যোসেফ
বোনাপার্টকে প্রতিষ্ঠিত করা নেপোলিয়নের জীবনে মারাত্মক এক ভুল ছিল। তিনি স্পেনবাসীর দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের উপর চরম আঘাত হেনে কূটনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেন। নেপোলিয়নের স্পেন আক্রমণ স্পেনবাসী কখনোই মেনে নেয়নি। ফলে স্পেনবাসী জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। এ আন্দোলনের পরিণতিস্বরূপ উপদ্বীপের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে স্পেনবাসীর জাতীয়তাবাদী এ সংগ্রাম ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও প্রেরণা জোগায়। যাহোক, স্পেনের মতো একটি ছোট দেশকে পরাস্ত করতে না পারায় তার সামরিক মর্যাদা বিনষ্ট হয়। প্রকৃতপক্ষে স্পেনেই নেপোলিয়নের সামরিক মর্যাদার সমাধি রচিত হয়। নেপোলিয়ন নিজেই বলেছেন, "স্পেনের ক্ষতেই আমার সর্বনাশ হয়।" (The Spanish ulcer ruined me.)২৮
সাম্রাজ্যের মধ্যে স্ববিরোধিতা নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্যের বিপর্যয় ছিল একরূপ সুনিশ্চিত, কারণ সাম্রাজ্যের
অন্তর্নিহিত স্বার্থ ছিল স্ববিরোধী ও অসংগতিপূর্ণ। ডেভিড থমসন-এর ভাষায়, "The Napoleonic Empire was doomed because of its inherent and self-defeating contradictions. "২৯ ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধের শুরু এবং ১৮১৪ খ্রিষ্টাব্দে নেপোলিয়নের সিংহাসন ত্যাগ- এই সময়ের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘটেনি। মহাদেশীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে নেপোলিয়ন ব্রিটেনের নৌশক্তি ও বাণিজ্য ধ্বংস করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এ ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য নেপোলিয়নকে রাজ্যজয়ের এক সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু ফ্রান্সের আগ্রাসন ব্রিটেন তথা ইউরোপের প্রতিরোধ ও আক্রমণাত্মক মনোভাব যারপরনাই কঠোর করে তুলেছিল। এটি ছিল রাজ্যজয় ও প্রতিরোধের এক জটপাকানো আবর্ত, যা নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্যের সংহতির পক্ষে ক্ষতিকারক হয়। নেপোলিয়নের বংশগত ও জাতীয়তাবাদী স্বার্থ ও নীতির মধ্যেও প্রচণ্ড অন্তর্বিরোধ ছিল, যা সাম্রাজ্যের ভিত্তি দুর্বল করে ফেলে। তিনি হল্যান্ড, নেপলস, ওয়েস্টফেলিয়া ও স্পেনের সিংহাসনে নিজের ভ্রাতাদের অভিষিক্ত করে ইউরোপে এক নতুন বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য স্থাপন করেন, যা ছিল বিপ্লবী আদর্শের পরিপন্থী। ফ্রান্সের স্বার্থেই তিনি এসব দেশকে পদানত করে রাখতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি একসময় মন্তব্য করেছিলেন, "My Policy is France before all." কিন্তু পূর্বতন পারিবারিক বংশানুক্রমিক ঐতিহ্য ও আধুনিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা সে সময় মোটেই সম্ভব ছিল না। যে আদর্শের কথা প্রচার করে তিনি ক্ষমতার চরম শিখরে আরোহণ করেছিলেন, তা তিনি নিজেই ধ্বংস করে নিজের পতন অনিবার্য করে তুলেছিলেন।
সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক ত্রুটি: ১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর
সাংগঠনিক চরিত্রের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। বিপ্লবী যুদ্ধের সময় যে 'মহান সেনাবাহিনী' (Grand Army) নেপোলিয়ন গড়ে তুলেছিলেন, অস্টারলিজ ও জেনার যুদ্ধে ও স্পেনীয় অভিযানে তা প্রায় ধ্বংস হয়ে যায় এবং নেপোলিয়নকে বিদেশি সেনার উপর নির্ভর করতে হয়। ফলে সেনাবাহিনীতে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়। এই বিদেশি সেনাবাহিনীর আনুগত্য সম্বন্ধে নেপোলিয়নের নিজেরই যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।
মস্কো অভিযানের অদূরদর্শিতা মস্কো অভিযান নেপোলিয়নের পতনের অপর প্রধান কারণ। প্রাকৃতিক
অসুবিধা অগ্রাহ্য করে সুদূর মস্কো অভিযানে প্রবৃত্ত হয়ে তিনি মারাত্মক ভুল করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ রুশ জনগণের গেরিলা যুদ্ধের ফলে অগণিত ফরাসি সেনা ও সেনাপতিগণ মৃত্যুবরণ করেন। হিটলারের মস্কো অভিযানের ন্যায় নেপোলিয়নের মস্কো অভিযানও চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এই ব্যর্থতার ফলে নেপোলিয়নের সামরিক শক্তি ও তার ব্যক্তিগত মর্যাদা বিশেষভাবে ক্ষুণ্ণ হয় এবং এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইউরোপের জনগণের মনে প্রবল জাতীয়তাবোধের সঞ্চার হয়। মস্কো অভিযান নেপোলিয়নের অদূরদর্শিতার অপর নিদর্শন বহন করে।
মহাদেশীয় ব্যবস্থার অসারতা ও প্রতিক্রিয়া নেপোলিয়নের পতনের অন্য কারণ হলো মহাদেশীয় ব্যবস্থা।
ইংল্যান্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই নেপোলিয়ন এই অবরোধপ্রথা অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু এটা কার্যকর করার জন্য যে নৌশক্তির প্রয়োজন ছিল, নেপোলিয়নের তা ছিল না। এই অবরোধ প্রথা অবলম্বনের ফলে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো এক চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় এবং তাদের মনে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে এক দারুণ বিদ্বেষের সঞ্চার করে। সমুদ্রের উপর ইংল্যান্ডের নৌশক্তি অপ্রতিহত থাকায় ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে গোপন ব্যবসা-বাণিজ্য চলতে থাকলে মহাদেশীয় ব্যবস্থার অসারতা প্রতিপন্ন হয়। এ ব্যবস্থার ফলে নেপোলিয়নের মিত্র রুশ সম্রাট আলেকজান্ডারও তার প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে ওঠেন এবং অপর মিত্রশক্তিগুলোও তার বিরোধী হয়ে ওঠে।
এ কথা অনস্বীকার্য, মহাদেশীয় অবরোধ কঠোরভাবে বলবৎ করতে গিয়ে নেপোলিয়ন নিজেই ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং এই বিচ্ছিন্নতাই তাকে বিপর্যয়ের সম্মুখে ঠেলে দেয়। এই মহাদেশীয় অবরোধ ইউরোপের জনগণের মনে নেপোলিয়নের প্রতি প্রবল ঘৃণার সঞ্চার করে। অবরোধ প্রথা কঠোরভাবে বলবৎ করতে গিয়ে তিনি বহু অহেতুক যুদ্ধের ও জটিলতার সৃষ্টি করেন, যা ফ্রান্সের পক্ষে ক্ষতিকর হয়। এযাবৎ নেপোলিয়নের প্রবল সমর্থক মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিদ্বিষ্ট হয়ে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। যে অর্থনৈতিক অস্ত্রের দ্বারা নেপোলিয়ন ব্রিটেনকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন, সেই অস্ত্রের আঘাত তাকেই পেতে হলো।
পোপের প্রতি দুর্ব্যবহার: পোপের সঙ্গে বিবাদ ও পোপের প্রতি দুর্ব্যবহার নেপোলিয়নের পতনের অপর কারণ। নেপোলিয়ন পোপের অধিকারভুক্ত সব বন্দরে ব্রিটিশ পণ্যবাহী জাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার দাবি করেছিলেন, কিন্তু পোপ নিরপেক্ষ থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলে নেপোলিয়নের সঙ্গে তার সংঘর্ষ বাধে। নেপোলিয়ন পোপকে বন্দি করে তার রাজ্য দখল করেন। ফলে নেপোলিয়ন ফ্রান্সের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের ঘৃণা ও বিদ্বেষ অর্জন করেন। ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বিরোধিতা স্বদেশে নেপোলিয়নের জনপ্রিয়তা বহুলাংশে ক্ষুণ্ণ করে।
ব্রিটিশ নৌশক্তির প্রাধান্য সমুদ্রের উপর ব্রিটিশ নৌশক্তির প্রাধান্য নেপোলিয়নের পতনের অপর কারণ। নেপোলিয়নের মহাদেশীয় ব্যবস্থা ব্রিটিশ শক্তিকে কোনো প্রকারেই খর্ব করতে পারেনি, বরং সমুদ্রের উপর ব্রিটিশ নৌশক্তি অপ্রতিহত থাকায় ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো ব্রিটেনের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং মহাদেশীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতার এটাই ছিল প্রধান কারণ। নীলনদের যুদ্ধে ও ট্রাফালগারের যুদ্ধে ফরাসি নৌশক্তি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। স্পেনের যুদ্ধেও ব্রিটিশ নৌশক্তি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রজোট ও ফরাসি জাতির শান্তি কামনা নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় শক্তিবর্গের রাষ্ট্রজোট ফ্রান্সের সামরিক শক্তিকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। ইউরোপের প্রায় সকল বৃহৎ শক্তি অস্ত্রধারণ করে নেপোলিয়নের সামরিক পরিকল্পনা এক প্রকার বানচাল করে দেয়। এছাড়া দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধবিগ্রহের ফলে ফরাসি জাতি শান্তির জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলে নেপোলিয়নের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা নেপোলিয়ন সাফল্যের চরম শিখরে আরোহণ করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শেষ পর্যন্ত তাকে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ইউরোপের রাজনীতি থেকে বিদায় গ্রহণ করতে হয়। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহাসিক ওয়াটারলু যুদ্ধে তিনি পরাজিত হলে মিত্রশক্তি তাকে আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসন দেয়। সেখানেই তার ঘটনাবহুল রাজনৈতিক ও সামরিক জীবনের অবসান ঘটে। বিশ্বের ইতিহাসে নেপোলিয়নের মতো বীরের এরূপ করুণ পরিণতি পাঠকের মনে গভীর রেখাপাত করে।
প্রধান শব্দসমূহের ব্যাখ্যা
Explanation of Key Words
বুরবোঁ: ফরাসি বিপ্লবের সময় এবং বিপ্লবপূর্ব সময়ে যে রাজারা ফ্রান্স শাসন করতেন তারা বুরবোঁ রাজবংশের ছিলেন।
বুরবোঁ রাজাদের শাসনকাল:
-(ক) চতুর্থ হেনরি (১৫৮৯ – ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ)।
(খ) ত্রয়োদশ লুই (১৬১০- ১৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দ)।
(গ) চতুর্দশ লুই (১৬৪৩ -১৭১৫ খ্রিষ্টাব্দ)।
(ঘ) পঞ্চদশ লুই (১৭১৫- ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দ)।
ঙ) ষোড়শ লুই (১৭৭৪ -১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দ)।
- এস্টেট (Estate): অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্সের সমাজ মূলত ৩টি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি শ্রেণিকে এস্টেট (Estate) বলা হতো। ধর্মীয় যাজকরা ছিল 1st Estate-এর অন্তর্ভুক্ত, অভিজাত সম্প্রদায় ছিল 2nd Estate এবং সাধারণ মানুষ (বুর্জোয়া, শ্রমিক, কৃষক, সর্বহারা) ছিল 3rd Estate-এর অন্তর্ভুক্ত। তৎকালীন শ্রেণিবিভক্ত ফরাসি সমাজের বাস্তব চিত্র এর মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
- বুর্জোয়া: আধুনিককালে বুর্জোয়া শব্দটি সমাজে শক্তিশালী সম্মানিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু ফরাসি সমাজে 'বুর্জোয়া' শব্দটি তাচ্ছিল্য অর্থে ব্যবহৃত হতো। যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে বা চাকরি করে বিত্তবান হয়েছিল তাদের বুর্জোয়া বলা হতো। ফ্রান্সের রাজনীতিতে তাদের কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান বা অধিকার ছিল না। ফরাসি সমাজের যাজক ও অভিজাতরা 'বুর্জোয়া' শব্দটি ঘৃণ্য অর্থে ব্যবহার করত। রাজনৈতিক অধিকারবিহীন মধ্যবিত্তদের অবমাননা করার জন্যই এটি ব্যবহার করা হতো। এতে বোঝানো হতো, বুর্জোয়া মানেই রাজসভার সদস্য হওয়ার অযোগ্য। তবে বুর্জোয়া শ্রেণি জ্ঞানদীপ্ত যুগের আলোকপ্রাপ্ত মানুষ ছিল। এদের দ্বারাই ফরাসি বিপ্লব সৃষ্টি হয়। ধনী বুর্জোয়াদের বলা হতো হুটে বুর্জোয়া আর শিক্ষক, আইনজীবী অর্থাৎ মধ্যবিত্তদের বলা হতো পাতি বুর্জোয়া।
ল্যাটিন শব্দ Burgus থেকে Bourgeois শব্দের উৎপত্তি। Burgus অর্থ শহর। সাধারণ অর্থে শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বুর্জোয়া। - বুদ্ধিজীবী: বুদ্ধিবৃত্তি অর্থাৎ বিদ্যা, অধ্যয়ন, মেধা ইত্যাদিভিত্তিক পেশার মাধ্যমে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদেরই বলা হয় বুদ্ধিজীবী। সাধারণত শিক্ষক, অধ্যাপক, গবেষক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, বিশেষজ্ঞ প্রমুখকেই বুদ্ধিজীবী বলে ধরা হয়। একটি দেশের জনমত গঠন ও তা পরিচালনার ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সে ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের বিপ্লব সংঘটনে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি লেখনীর মাধ্যমে জনগণকে বিপ্লবে উৎসাহিত করে।
- সর্বহারা শ্রেণি: যেসব মানুষের নিজেদের কোনো জমি বা উৎপাদনের উপকরণ নেই, যারা বেঁচে থাকার জন্য সারাজীবন মজুরির বিনিময়ে অন্যের সম্পত্তিতে কাজ করে, তারাই হলো সর্বহারা শ্রেণি বা শ্রমিক শ্রেণি বা Proletariat। অভিজাতরা ওই সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণিকে নিম্নশ্রেণি বলে গণ্য করত। ফরাসি বিপ্লবে এরূপ সর্বহারা শ্রেণি বিপ্লবের গতিকে ত্বরান্বিত করে। ফলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফ্রান্সে বিপ্লব সফল হয়।
- মার্কান্টাইলবাদ: ফরাসি বিপ্লবের সময়কালে মার্কান্টাইল মতবাদ বা সংরক্ষণবাদ অনুযায়ী খাদ্যশস্য দেশের বাইরে রপ্তানি করা নিষিদ্ধ ছিল। খাদ্যশস্য রপ্তানি ও অবাধ বিক্রি নিষিদ্ধ থাকায় খাদ্যদ্রব্যের ন্যায্য দাম পাওয়া যেত না। সরকার মনে করত কৃষকরা উদ্বৃত্ত খাদ্য চালান দিলে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। ন্যায্য দামের অভাবে কৃষকরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ফলে দেশের সর্বত্র সর্বহারা শ্রেণির বিদ্রোহ পরিলক্ষিত হয়।
- ফিজিওক্র্যাট: অর্থনীতিবিদদের একটি সংঘ দল। মার্কান্টাইল বা সংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে ফিজিওক্র্যাট নামক অর্থনীতিবিদরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। ফিজিওক্র্যাটরী একথা বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, বিশ্বে সম্পদের সীমা নেই। তিই খাদ্য ও শিল্পবস্তুর উৎপাদন বাড়বে ততই সম্পদ বাড়বে। এজন্য তারা শিল্প-বাণিজ্যের উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ লোপ এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে অবাধ বাণিজ্যের দাবি জানান।
- ক্যাপিটালিস্ট: মূলধনী বা পুঁজিবাদী শ্রেণিকে Capitalist বলা হয়। ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য উপনিবেশের সাথে চলত। ফলে এক শ্রেণির বণিকের হাতে প্রচুর অর্থসম্পদ সঞ্চিত হতে থাকে। তাদের সঞ্চিত পুঁজিই ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদের জন্ম দেয়। গ্রামীণ পর্যায়ে তাদের সঞ্চিত অর্থ সমবণ্টন না হওয়ায় বণিক শ্রেণি ও সাধারণ কৃষক শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে।
- লেত্রে ডি ক্যাশে এটি একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার উপর রাজার স্বাক্ষর নিয়ে যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা যেত। ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে লেত্রে ডি ক্যাশের মাধ্যমে অনেক লোককে হত্যা করা হতো।
- প্রথম এস্টেট ফ্রান্সে যাজক শ্রেণিকে বলা হতো প্রথম এস্টেট বা প্রথম সম্প্রদায়। তারা খুব জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করতেন এবং ধর্ম কর আদায় করতেন। তবে যাজক শ্রেণির মধ্যে নিম্নস্তরের যাজকরা আবার উপরের স্তরের যাজকদের ঘৃণার পাত্র ছিলেন।
- দ্বিতীয় এস্টেট: অভিজাতদের বলা হতো দ্বিতীয় এস্টেট। যাজকদের পরেই ছিল এদের স্থান। প্রথা হিসেবে ফ্রান্স থেকে সামন্তবাদ বিলুপ্ত হলেও অভিজাত শ্রেণির সামন্তপ্রথা থেকে পাওয়া সুবিধাসমূহ আগের মতো বহাল ছিল। সমাজের প্রতি দায়িত্বহীন অভিজাতরা যাজক ব্যতীত আর সকলের উপার্জনের উপর নির্ভর থাকত বলে তারা ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠেছিল।
- তৃতীয় এস্টেট: ফ্রান্সের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই তৃতীয় এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই এস্টেট আবার বুর্জোয়া, কারিগর ও কৃষক- এই তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। এই এস্টেটের লোকদের কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অধিকার ছিল না। তারা অত্যধিক করের ভারে জর্জরিত ছিল। তাই বুর্জোয়াদের অধিকার আদায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাদের বিপ্লবী করে তোলে।
- টেনিস কোর্ট শপথ: ফরাসি বিপ্লবের প্রথম দিককার এক নাটকীয় ঘটনা। ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে জুন তারিখে তৃতীয় স্টেট বা পার্লামেন্টের ডেপুটিরা আকস্মিকভাবে ভার্সাইয়ের নির্ধারিত সম্মেলনস্থল বন্ধ করে দেওয়াকে তৃতীয় এস্টেট আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়ার পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং রাজপ্রাসাদের অপর পাশের রাজকীয় টেনিস কোর্টে (লম্বা খোলা হল ঘরে) মুলতবি বৈঠকে মিলিত হন। মি. বেইলির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ডেপুটিরা শপথ গ্রহণ করেন, যে পর্যন্ত দেশের শাসনতন্ত্র শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত না হবে, সে পর্যন্ত তারা যখনই প্রয়োজন, তখনই বৈঠকে মিলিত হতে থাকবেন। স্বভাবতই এই শপথ ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার উপর জনগণের বিপ্লবাত্মক দাবিরই শামিল। অবশ্য এই শপথের তিন দিন পরেই ডেপুটিগণ তাদের সাবেক সম্মেলনস্থলে ফিরে যেতে সমর্থ হন।
- বাস্তিল দুর্গ: এটি ছিল একটি দুর্গ-কাম-কারাগার। প্যারিস নগরীর কাছে এর অবস্থান ছিল। বুরবোঁ রাজতন্ত্রের শোষণ ও অত্যাচারের প্রতীক ছিল এ দুর্গ। দুর্গটি খুবই সুরক্ষিত ছিল। দুর্গের প্রাচীর ৯০ ফুট উঁচু এবং ৭৫ ফুট প্রশস্ত ছিল, যা গভীর পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। দুর্গে প্রবেশের জন্য শক্ত একটি সেতু ছিল। বিপদের সময় সেতুটি টেনে তুলে রাখার ব্যবস্থা ছিল। বিপ্লবী জনতার উদ্দেশ্য ছিল দুর্গ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা এবং একই সঙ্গে বন্দিদের মুক্ত করা। উন্মত্ত জনতা ১৪ই জুলাই, ১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে 'বাস্তিলের অধিনায়ক দেলুপকে হত্যা করে রাজতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিলের পতন ঘটায়। জনতার হাতে ৩২ হাজার বন্দুক চলে যায়। বাস্তিলের পতনের সংবাদ পেয়ে রাজা ষোড়শ লুই মন্তব্য করলেন, "Yes
That'es Revolt." কিন্তু সংবাদবাহক বললেন, "Sir, It is not revolt, it is revolution." - সাসপেনসিভ ভেটো ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে সংবিধান সভা প্রণীত শাসনতন্ত্রে রাজার ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব করা হয়। শাসনতন্ত্রে বলা হয়, রাজা নতুন আইন বাতিল করতে পারবেন না, কিন্তু সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার জন্য তাকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয় তাকে সাসপেনসিভ ভেটো ক্ষমতা বলা হয়।
- সন্ত্রাসের রাজত্ব: ফরাসি বিপ্লবের অগ্রগতির ইতিহাসে সন্ত্রাস বা ত্রাসের রাজত্ব একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এর ব্যাপ্তিকাল ছিল ১০/১০/১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২৮/০৭/১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। ফরাসি বিপ্লবের পরে বিপ্লববিরোধী মনোভাব, রাজতান্ত্রিকদের দমন ও বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে জাতীয় কনভেনশনের বামপন্থি উগ্র জেকোবিন দল যে জরুরি অবস্থাভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিপ্লবী আদর্শকে সংহত করতে তৎপর ছিল, তা-ই ইতিহাসের সন্ত্রাসের বা ত্রাসের রাজত্ব। এর প্রধান নেতা ছিলেন রোবস্পিয়ার।
ফরাসি বিপ্লব-প্রফেসর নাসরিন বেগম ম্যাডাম এর লেখা বই
Read more