উত্তরঃ
'গ্রীন হাউজ' বা 'সবুজ ঘর' হলো মূলত কাঁচের তৈরি একটি ঘর, যা শীতপ্রধান দেশে তীব্র শীতে গাছপালাকে উষ্ণ রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়। এর কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক: সূর্যের ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোক রশ্মি খুব সহজেই কাঁচ ভেদ করে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ভেতরের ভূমি ও গাছপালাকে উত্তপ্ত করে। কিন্তু এই উত্তপ্ত বস্তুগুলো যখন তাপ বিকিরণ করে, তখন সেই তাপ বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের হওয়ায় তা আর কাঁচ ভেদ করে বাইরে যেতে পারে না। ফলে কাঁচের ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এই বিশেষ প্রক্রিয়াটিকেই 'গ্রীন হাউজ প্রভাব' বলা হয়।
গ্রীন হাউস প্রভাব (Greenhouse Effect)
গ্রীনহাউস প্রভাব হলো বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত কিছু গ্যাসের মাধ্যমে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপের একটি অংশ আটকে রাখার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, CFC ও জলীয়বাষ্প এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক গ্রীনহাউস প্রভাব পৃথিবীতে জীবনধারণের উপযোগী তাপমাত্রা বজায় রাখে। তবে শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, বন উজাড় ও অন্যান্য মানব কর্মকাণ্ডের ফলে এসব গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গ্রীনহাউস প্রভাব অতিরিক্ত শক্তিশালী হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত কিছু গ্যাস (যেমন: কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, সিএফসি, নাইট্রাস অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প) পৃথিবীর চারপাশে কাঁচের ঘরের মতো একটি আবরণ তৈরি করে। একে প্রাকৃতিক গ্রীন হাউজ প্রভাব বলা হয়। তবে বর্তমানে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে এই গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পরিবেশের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো প্রকট হচ্ছে:
গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন: গ্রীনহাউস গ্যাসগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপকে মহাকাশে ফিরে যেতে বাধা দেয় এবং পুনরায় পৃথিবীর দিকে পাঠায়। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাবে হিমবাহ গলন, তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং ঋতু ও জলবায়ুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বিশালাকার বরফখণ্ড ও হিমবাহ গলে সমুদ্রে পানির পরিমাণ বাড়ছে। একই সঙ্গে উষ্ণ সমুদ্রের পানি প্রসারিত হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠ আরও উঁচু হচ্ছে। এর ফলে নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলো বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমি ক্ষয় ও লবণাক্ততার ঝুঁকিতে পড়ছে।
জীববৈচিত্র্যের বিনাশ: তাপমাত্রা ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তাদের আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস এবং বনভূমির বাস্তুসংস্থান নষ্ট হওয়াও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি।
জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন : গ্রীনহাউস প্রভাবের ফলে ঋতুচক্র ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে। অসময়ে বন্যা, অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তাপপ্রবাহ ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে মানুষের জীবন, সম্পদ, কৃষি ও প্রাকৃতিক পরিবেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।
কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা ব্যাহত হওয়া: অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা ও লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাপমাত্রার পরিবর্তনে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে খাদ্য উৎপাদন কমে ভবিষ্যতে খাদ্যসংকট ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি : অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি উষ্ণ পরিবেশে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের বিস্তারের ঝুঁকি নতুন নতুন এলাকায় তৈরি হতে পারে। সুপেয় পানির সংকট ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগও জনস্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
পানি সম্পদের ওপর চাপ : দীর্ঘস্থায়ী খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও হিমবাহের পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে মিঠাপানির প্রাপ্যতা কমতে পারে। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে পানীয় জল ও কৃষিকাজে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পানি ব্যবস্থাপনা ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
অর্থনীতি ও জীবিকার ওপর প্রভাব: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি, মৎস্য, বন ও অন্যান্য জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও তাপপ্রবাহে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি হলে পুনর্বাসন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়।
ফলে বিশেষ করে দরিদ্র ও জলবায়ু-নির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।