১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের আইনসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য চারটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোটের নাম- হলো যুক্তফ্রন্ট।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ চালালে বাঙালি ছাত্র, জনতা, পুলিশ, ইপিআর সাহসিকতার সাথে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বিনা প্রতিরোধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে বাঙালিরা ছাড় দেয়নি। মুক্তিযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র- ছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। অর্থাৎ সর্বস্তরের বাঙালি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধ গণযুদ্ধে রূপলাভ করে।
ছক-১ আমাদের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রয়েছে বাংলাদেশের দামাল ছেলেদের আত্মত্যাগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই এ রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে এপ্রিল মাসে পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা যখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়, তখনই বিতর্কটি পুনরায় শুরু হয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ই মে চৌধুরী খলীকুজ্জামান এবং জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. মুহাম্মদ এনামুল হকসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ছাত্র সমাজ ও সর্বস্তরের জনগণ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। সর্বশেষ ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানে জিন্নাহর অনুকরণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলে আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। এক পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলার দামাল ছেলেদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।
ভাষা আন্দোলনের জীবন উৎসর্গকারী শহিদদের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে জাতীয় শহিদ মিনার। ১৯৫৩ সাল থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি 'শহিদ দিবস' হিসেবে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে আমরা শ্রদ্ধানিবেদন করি এবং প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণ করি। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউেেনস্কো দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। অতএব বলা যায়, ছক-১ ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
ছক-২-এ 'গ'-এর ঘটনা অর্থাৎ ১৯৯০ সালের আন্দোলন- সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা শুরু হয়।
স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্রের হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবরণের পর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। দেশে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক, বেসামরিক আদলে সেনাশাসন অব্যাহত ছিল। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল বাংলাদেশের জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। ফলে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দীর্ঘ প্রায় নয় বছরের শাসনকালে প্রবল গণআন্দোলনের সম্মুখীন হয়। এক পর্যায়ে সংগঠিত হয় এরশাদ বিরোধী ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান। এ সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট এবং ৫ দলীয় বাম জোট একটি অভিন্ন কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ হলে ১৯৯০-এর ৪ ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ৬ ডিসেম্বর তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে জেনারেল এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। বাংলাদেশে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং গণতন্ত্রের পুনঃর্যাত্রা শুরু হয়। সকল দলের অংশগ্রহণে ১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক ধারা চালু হয়। দেশে অবাধ তথ্যপ্রবাহ সৃষ্টি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পত্র-পত্রিকার ওপর থেকে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার ইত্যাদির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি কর্তৃক শাসনব্যবস্থা পরিচালনার পথ উন্মুক্ত হয়। এ অগ্রযাত্রায় দেশের সকল শ্রেণিপেশার মানুষ বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত ছক-২ এ 'গ' ঘটনা অর্থাৎ ১৯৯০ সালটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। কারণ ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসকের পতন ঘটে এবং দেশে গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা শুরু হয়।
Related Question
View Allপাকিস্তানি শাসন আমলে বাঙালিদের জাতীয় মুক্তির প্রথম আন্দোলনের নাম ছিল 'ভাষা আন্দোলন'।
৬ দফা দাবিনামায় পূর্ব বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিকসহ সকল অধিকারের কথা তুলে ধরা হয় বলে একে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বলা হয়।
ছয় দফা কর্মসূচি বাঙালির জাতীয় চেতনামূলে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার কথা বলা না হলেও এ ৬ দফা কর্মসূচি বাঙালিদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। এ ছয় দফা দাবির পথ ধরে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। এ কারণে ছয় দফাকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বলা হয়।
সারণি-ক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে।
পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে অগ্রসর ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসনশোষণ প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ব পাকিস্তান দ্রুত পিছিয়ে যেতে থাকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেতে থাকে দুই অঞ্চলের মধ্যকার বৈষম্য। এসব ক্ষেত্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র অন্যতম। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য বিরাজ করছিল। মোট অফিসারের মাত্র ৫%, সাধারণ সৈনিকদের 'মাত্র ৪%, নৌবাহিনীর উচ্চপদে ১৯%, নিম্নপদে ৯%, বিমানবাহিনীর পাইলটদের ১১% এবং টেকনিশিয়ানদের ১.৭% ছিল বাঙালি।
উদ্দীপকের সারণি-ক থেকে উপরোল্লিখিত প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের বৈষম্যের চিত্রই দেখতে পাই। অতএব বলা যায়, সারণি-ক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের বৈষম্য ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকে সারণি-খ এ প্রদর্শিত বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা ছিল ভয়াবহ বৈষম্যমূলক।
পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্ব বাংলার চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তান অনেক বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করেছিল। ১৯৫৫-৫৬ থেকে ১৯৫৯-৬০ অর্থবছর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান লাভ করেছিল মোট বাজেটের বরাদ্দের মাত্র ১১৩ কোটি ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা, অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তান পেয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। একইভাবে ১৯৬০-৬১ থেকে ১৯৬৪-৬৫ অর্থবছর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬৪৮০ মিলিয়ন টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ছিল ২২,২৩০ মিলিয়ন টাকা। পূর্ব বাংলার পাট, চা, চামড়া প্রভৃতি বিদেশে রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো, তার সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় হতো। ফলে ব্যবসায় বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, কৃষিসহ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের চাইতে কয়েকগুণ পিছিয়ে পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকে প্রদর্শিত সারণি-খ এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। এ বৈষম্য ছিল ভয়াবহ ও হতাশাব্যঞ্জক।
১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
বাংলা ভাষা-সাহিত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বাঙালির জাতিগত পরিচয়ে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে, সে জাতীয় ঐক্যকে বলা হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ। মূলত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আমাদের মধ্যে যে জাতীয় চেতনার জন্ম হয়, তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ হচ্ছে বাঙালি জাতির ঐক্যের প্রতীক।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
