জগদলে কোন রোগ কুখ্যাত ছিল?

Updated: 9 months ago
উত্তরঃ

জগদলে ম্যালেরিয়া রোগ কুখ্যাত ছিল।

299

আমার শৈশবের অদ্ভুত স্বপ্নময় কিছুদিন কেটেছে জগদলে। জগদলের দিন আনন্দময় হবার অনেকগুলো কারণের প্রধান কারণ স্কুলের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। সেখানে কোনো স্কুল নেই । কাজেই পড়াশোনার যন্ত্রণা নেই । মুক্তির মহানন্দ ।
আমরা থাকি এক মহারাজার বসতবাড়িতে, যে-বাড়ির মালিক অল্প কিছুদিন আগেই দেশ ছেড়ে ইন্ডিয়াতে চলে গেছেন। বাড়ি চলে এসেছে পাকিস্তান সরকারের হাতে। মহারাজার বিশাল এবং প্রাচীন বাড়ির একতলায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা। দোতলাটা তালাবদ্ধ। শুধু দুতলা নয়, কয়েকটা ঘর ছাড়া বাকি সবটা তালাবদ্ধ, কারণ মহারাজা জিনিসপত্র কিছুই নিয়ে যান নি। ঐসব ঘরে তাঁর জিনিসপত্র রাখা ।
ঐ মহারাজার নাম আমার জানা নেই । মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনিও বলতে পারলেন না । তবে তিনি যে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ছিলেন তার অসংখ্য প্রমাণ এই বাড়িতে ছড়ানো। জঙ্গলের ভেতর বাড়ি। সেই বাড়িতে ইলেকট্রিসিটির ব্যবস্থা করার জন্য তাঁর ছিল নিজস্ব জেনারেটর। দাওয়াতের চিঠি ছেপে পাঠানোর জন্যে মিনি সাইজের একটা ছাপাখানা ।
বাবাকে অসংখ্যবার বলতে শুনেছি— মহারাজার রুচি দেখে মুগ্ধ হতে হয়। আহা, কত বই! কত বিচিত্র ধরনের বই ।
বিকেলগুলিও কম রোমাঞ্চকর ছিল না। প্রতিদিনই বাবা কাঁধে গুলিভরা বন্দুক নিয়ে বলতেন—চল বনে বেড়াতে যাই । কাঁধে বন্দুক নেয়ার কারণ হচ্ছে প্রায়ই বাঘ বের হয়। বিশেষ করে চিতাবাঘ । বাবার সঙ্গে সন্ধ্যা পর্যন্ত বনে ঘুরতাম। ক্লান্ত হয়ে ফিরতাম রাতে। ভাত খাওয়ার আগেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসত। কত বিচিত্র শব্দ আসত বন থেকে। আনন্দে এবং আতঙ্কে শিউরে শিউরে উঠতাম । একদিন কাঁপুনি দিয়ে আমার এলো জ্বর। বাবা-মা দুজনেরই মুখ শুকিয়ে গেল— লক্ষণ ভালো নয়। নিশ্চয় ম্যালেরিয়া। সেই সময়ে এই অঞ্চলে ম্যালেরিয়া কুখ্যাত ছিল। একবার কাউকে ধরলে তার জীবনীশক্তি পুরোপুরি নিঃশেষ করে দিত। ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। আমরা প্রতিষেধক হিসেবে বায়োকেমিক ওষুধ ছাড়াও প্রতি রবিবারে পাঁচ গ্রেন করে কুইনাইন খাচ্ছি। তার পরও ম্যালেরিয়া ধরবে কেন?

বাবা এই ভয়ংকর জায়গা থেকে বদলির জন্য চেষ্টা-তদবির করতে লাগলেন। শুনে আমার মন ভেঙে গেল। এত সুন্দর জায়গা, এমন চমৎকার জীবন— এসব ছেড়ে কোথায় যাব? ম্যালেরিয়ায় মরতে হলেও এখানেই মরব। তাছাড়া ম্যালেরিয়া অসুখটা আমার বেশ পছন্দ হলো। যখন জ্বর আসে তখন কী প্রচণ্ড শীতই-না লাগে! শীতের জন্যেই বোধহয় শরীরে এক ধরনের আবেশ সৃষ্টি হয়। জ্বর যখন বাড়তে থাকে তখন চোখের সামনের প্রতিটি জিনিস আকৃতিতে ছোটো হতে থাকে । দেখতে বড়ো অদ্ভুত লাগে । এক সময় নিজেকে বিশাল দৈত্যের মতো মনে হয়। কী আশ্চর্য অনুভূতি !
শুধু আমি একা নই, পালা করে আমরা সব ভাইবোন জ্বরে পড়তে লাগলাম ।
একজন জ্বর থেকে উঠতেই অন্যজন জ্বরে পড়ে। জ্বর আসেও খুব নিয়মিত। আমরা সবাই জানি কখন জ্বর আসবে। সেই সময়ে লেপ-কাঁথা গায়ে জড়িয়ে আগেভাগেই বিছানায় শুয়ে পড়ি।
প্রতিদিন ভোরে তিন ভাইবোন রাজবাড়ির মন্দিরের চাতালে বসে রোদ গায়ে মাখি। এই সময় আমাদের সঙ্গ দেয় বেঙ্গল টাইগার। বেঙ্গল টাইগার হচ্ছে আমাদের কুকুরের নাম। না, আমাদের কুকুর নয়, মহারাজার কুকুর। তাঁর নাকি অনেকগুলো কুকুর ছিল। তিনি সবকটাকে নিয়ে যান, কিন্তু এই কুকুরটিকে নিতে পারেন নি। সে কিছুতেই রাজবাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি হয় নি ।
মা তাকে দুবেলা খাবার দেন। মাটিতে খাবার ঢেলে দিলে সে খায় না। থালায় করে দিতে হয়। শুধু তা-ই না, খাবার দেবার পর তাকে মুখে বলতে হয়— খাও ।
খানদানি কুকুর। আদব-কায়দা খুব ভালো। তবে বয়সের ভারে সে কাবু। সারা দিন বাড়ির সামনে শুয়ে থাকে । হাই তোলে, ঝিমুতে ঝিমুতে মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে ।
এক ভোরবেলার কথা। আমার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। আমি কম্বল গায়ে দিয়ে মন্দিরের চাতালে বসে আছি। আমার সঙ্গে শেফু এবং ইকবাল । মা এসে আমাদের মাঝখানে শাহীনকে (আমার ছোট ভাই) বসিয়ে দিয়ে গেলেন । আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তার দিকে নজর রাখা, সে যেন হামাগুড়ি দিয়ে চাতাল থেকে পড়ে না যায় ।
মা চলে যাবার পরপরই হিসহিস শব্দে পেছনে ফিরে তাকালাম। যে-দৃশ্য দেখলাম সে-দৃশ্য দেখা জন্য মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল না। মন্দিরের বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে প্রকাণ্ড একটা কেউটে সাপ বের হয়ে আসছে। মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসে। ফণা তুলে এদিক-ওদিক দেখছে, আবার মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসছে, আবার ফণা তোলে। আমরা তিন ভাইবোন ছিটকে সরে গেলাম । শাহীন একা বসে রইল, সাপ দেখে তার আনন্দের সীমা নেই। সে চেষ্টা করছে সাপটির দিকে এগিয়ে যেতে। আর তখনই বেঙ্গল টাইগার ঝাঁপিয়ে পড়ল সাপটির ওপর। ঘটনা এত দ্রুত ঘটল যে আমরা কয়েক মুহূর্ত বুঝতেই পারলাম না কী হচ্ছে। একসময় শুধু দেখলাম কুকুরটা সাপের ফণা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছে । বেঙ্গল টাইগার ফিরে যাচ্ছে নিজের জায়গায়। যেন কিছুই হয়নি। নিজের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড সে শেষ করল ।
সাপ কুকুরটিকে কামড়াবার সুযোগ পেয়েছিল কি না জানি না। সম্ভবত কামড়ায়নি। কারণ কুকুরটি বেঁচে রইল, তবে নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিল।

দ্বিতীয় দিনে তার চামড়া খসে পড়ল এবং দগদগে ঘা দেখা দিল। এ থেকে মনে হয় সাপ সম্ভবত কামড়েছে। সাপের বিষ কুকুরের ক্ষেত্রে হয়তো তেমন ভয়াবহ নয় ৷
আরও দুদিন কাটল। কুকুরটি চোখের সামনে পচেগলে যাচ্ছে। তার কাতরধ্বনি সহ্য করা মুশকিল। গা থেকে গলিত মাংসের দুর্গন্ধ আসছে।
বাবা মাকে ডেকে বললেন, আমি এর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। তুমি বন্দুক বের করে আমাকে দাও । বাবা আমাদের চেখের সামনে পরপর দুটি গুলি করে কুকুরটিকে মারলেন। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম বাবা দুঃখে বেদনায় কুঁকড়ে উঠেছেন। তবু শান্ত গলায় বললেন, যে আমার ছেলের জীবন রক্ষা করেছে তাকে আমি গুলি করে মারলাম। একে বলি নিয়তি ।
কিন্তু আমার কাছে বাবাকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মানুষদের একজন বলে মনে হলো। নিজেকে কিছুতেই বোঝাতে পারছিলাম না এমন একটি কাজ তিনি কী করে করতে পারলেন। রাগে, দুঃখে ও অভিমানে রাতে ভাত না খেয়ে শুয়ে পড়েছি। বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে বারান্দায় বসালেন ।
দুজন চুপচাপ বসে আছি। চারদিকে ঘন অন্ধকার। তক্ষক ডাকছে। বাড়ির চারপাশের আমের বনে হাওয়া লেগে বিচিত্র শব্দ উঠছে।
বাবা কিছুই বললেন না। হয়তো অনেক কিছুই তাঁর মনে ছিল। মনের ভাব প্রকাশ করতে পারলেন না। একসময় বললেন, যাও ঘুমিয়ে পড়ো। আমি সেদিন বুঝতে পারিনি বাবা কেন কুকুরটিকে এভাবে মেরে ফেলেছেন!
কুকুরটি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল ।

Related Question

View All

খাবার দেবার পর মুখে বলতে হয়- খাও।' কাকে?

Updated: 9 months ago
No explanation available yet.
1.2k

'নিয়তি' গল্পে 'মুক্তির মহানন্দ' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

Updated: 9 months ago
No explanation available yet.
1.9k

উদ্দীপকের লাল গরুটা নিয়তি' গল্পের যে চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে তা ব্যাখ্যা কর।

Updated: 9 months ago
No explanation available yet.
822

উদ্দীপকের নিধিরাম ও 'নিয়তি' গল্পের লেখক একই সূত্রে গাঁথা? যুক্তিসহ বুঝিয়ে দাও।

Updated: 9 months ago
No explanation available yet.
331

সৈকতের বাবা খাগড়াছড়ি জেলার বন বিভাগের কর্মকর্তা। এসএসসি পরীক্ষা শেষে সে বাবার কাছে খাগড়াছড়ি বেড়াতে যায়। সেখানে জঙ্গলাবৃত্ত পাহাড়ি পরিবেশ। বিকাল হতে না হতেই বুনো মশাদের উপদ্রব শুরু হয়। চারদিকে ডেঙ্গু জ্বরের ছড়াছড়ি যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার। রাতের অন্ধকার নামলেই শোনা যায় বিভিন্ন বন্য প্রাণীর ডাক। ভয়ে গা ছম ছম করে তার। আছে সাপের ভয়ও। দিনের বেলাতেও একাকী বাইরে বেড়ানো যায় না। এ অবস্থা ভালো লাগে না তার। তাই কয়েক দিন যেতে না যেতেই সে নিজ বাসা ঢাকায় ফিরে আসতে চায়।

Updated: 9 months ago
207

মহানন্দ কী? (জ্ঞানমূলক)

Updated: 9 months ago
No explanation available yet.
1k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র

Related Question

মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews