আমলাতন্ত্রের আধুনিক আলোচনার জনক এবং 'আদর্শ আমলাতন্ত্রের উদ্ভাবক' হলেন জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার।
আমলাতন্ত্র হলো স্থায়ী, বেতনভুক্ত, দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন। আমলাতন্ত্র আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অঙ্গ। আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।
আমলা বা বেসামরিক কর্মকর্তাগণ রাজনৈতিক প্রশাসকদের মতো জনপ্রতিনিধি নন। আমলাদের শিক্ষাদীক্ষা, জীবনধারণ পদ্ধতি, গোষ্ঠীগত সংহতি, দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুই অনেকটা ভিন্ন প্রকৃতির। অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বে আমলারা নিজেদের 'প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক্ত কর্মচারী ও সেবক' না ভেবে নিজেদেরকে জনগণের প্রভু মনে করেন। ফলে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। জনবিচ্ছিন্ন থাকতে তারা ভালোবাসেন।
আমলারা খুব বেশি আনুষ্ঠানিক। সবকিছুই তারা করতে চান প্রশাসনিক নিয়মরীতি ও বিধিবিধানের আলোকে। এর ফলে জনগণের সমস্যার মানবিক দিকটি উপেক্ষিত হয়। সমস্যা সমাধানে বিধি মোতাবেক যথাযোগ্য নিয়মে অগ্রসর হতে গিয়ে সময় নষ্ট হয় এবং সমস্যা ততদিনে আরও জটিল হয়ে পড়ে। জনগণের চাওয়া-পাওয়া, আবেদন-নিবেদন অফিসের ফাইলের 'লালফিতার বাঁধনে' আটকা পড়ে থাকে। জনগণের হয়রানি ও দুর্ভোগ বেড়ে যায়। এর ফলে শুধু আমলাতন্ত্রই অপ্রিয় হয়ে ওঠে না, নির্বাচিত সরকারও জনবিচ্ছিন্ন ও অপ্রিয় হয়ে ওঠে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যাশা করা হয় যে, আমলারা বেতনভোগী কর্মচারী হিসেবে জনসেবা করবে, রাজনীতি নিরপেক্ষ থেকে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এ প্রত্যাশা সবসময় পূরণ হয় না।
বেসামরিক প্রশাসনের ওপর সামরিক হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতা ও অন্তঃকলহ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের দুর্নীতি ও অসততা, সামরিক বাহিনীনির্ভর রাজনীতি ইত্যাদির ফলে অনেক দেশে আমলাতন্ত্রের অতি বিকাশ ঘটে। আমলাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকতার বাড়াবাড়ি, লালফিতার দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। দায়িত্বশীল না থাকার মানসিকতা থেকে তারা শুধু জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে না বরং তাদের অনেকের মধ্যেই 'জনগণের প্রভু' সাজার মানসিকতা বৃদ্ধি পায়। এমনকি আমলাদের একটি অংশের মধ্যে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণের মানসিকতাও বৃদ্ধি পায়।
Related Question
View AllBureaucracy' শব্দের প্রতিশব্দ 'আমলাতন্ত্র'।
আমলাতন্ত্রের এক বড় ত্রুটি হলো লালফিতায় দৌরাত্ম্য। কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বের নজিরকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে অতি আনুষ্ঠানিকতা পালনকে লালফিতার দৌরাত্ম্য বলা হয়। পদসোপান ভিত্তিতে কাগজপত্রের অনুমোদন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, যা দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ। এর ফলে প্রশাসনিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়।
আমলাতন্ত্র একটি পেশাদার, দক্ষ ও নিরপেক্ষ বাহিনী। তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে তারা এই পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে থাকেন। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের মমতাজ আলীর কার্যক্রমেও এরূপ দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দেখা যায়। মমতাজ আলী তার কাজের ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী তার দায়িত্ব পালন করেন এবং সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন অনুসারে তার কাজ করেন। এটি আমলাতন্ত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। মমতাজ আলী সাহেব তার। দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে তিনি তার কর্মকাণ্ডে যে সক্ষমতা প্রদর্শন। করেছেন, তা আমলাতন্ত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমলাতন্ত্রের পদের ধারাক্রম কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। এখানে আমলাতন্ত্রের কার্যপ্রণালি এবং প্রক্রিয়া দেখা যায়।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আমলাদেরকে বহুবিধ কার্যাবলি সম্পাদন করতে হয়। উন্নয়মূলক কাজেও মমতাজ আলীদের মতো আমলারা মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। অনেক সময় তাদের ভূমিকা দেশের উন্নয়নের ধারক ও বাহকের ন্যায়। আবার ক্ষেত্রবিশেষে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়।
আমলারা রাষ্ট্রের জনগুরুত্বপূর্ণ সব কাজের তদারকিতে নিয়োজিত থাকেন। প্রশাসনিক নীতি নির্ধারণ, নীতির বাস্তবায়ন তথা কাজ সম্পন্ন করা, সরকারি সম্পদের হেফাজত করা, বিচারসংশ্লিষ্ট কাজ ইত্যাদি আমলাদের রুটিনওয়ার্ক। সরকারের যাবতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিকল্পনা করা, সম্ভাব্যতা যাচাই করা, সমীক্ষা করা, বাজেট প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদনের সুপারিশ করা, কাজ বাস্তবায়ন করা, তদারকি করা ইত্যাদি আমলাদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সূচনা ও বাস্তবায়ন করার মূল দায়িত্ব এ আমলাদের ওপরই ন্যস্ত থাকে।
আমলাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা যত বেশি হবে, এসব ক্ষেত্রে সফলতা তত দ্রুত আসবে। কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নয়নের অগ্রভাগে থাকেন এ আমলারা। এছাড়া সামাজিক পরিবর্তন, অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ইত্যাদি অবস্থাগত ক্ষেত্রেও আমলাদের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। তবে আমলাতন্ত্রের অতি আনুষ্ঠানিকতা, লালফিতার দৌরাত্ম্য স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অদক্ষতা, অবহেলা এবং অ-পেশাদারি আচরণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু এটি আমলাতন্ত্রের নীতির পরিপন্থী। আমলাতন্ত্রে কখনো এরূপ প্রত্যাশা করা হয় না। কিন্তু জনাব আলী সাহেবের মতো দক্ষ, সৎ ও কর্মনিষ্ঠ আমলারাই দেশের উন্নয়নের ধারক ও বাহক, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
অধ্যাপক অগ আমলাতন্ত্রকে পেশাদার দক্ষ বাহিনী বলে অভিহিত করেন।
কোনো সংগঠন পরিচালনার জন্য স্থায়ী বেতনভুক্ত দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে আমলা বলা হয়। আধুনিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র বলতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী বেতনভুক্ত কর্মীবাহিনীকে বোঝায়। আমলারা সুশৃঙ্খলভাবে পরস্পর পদের ক্রম অনুযায়ী সংযুক্ত এবং রাজনীতি নিরপেক্ষ থেকে তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ম্যাক্স ওয়েবারকে আমলাতন্ত্রের জনক বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!