দুটি বৃহৎ রাষ্ট্র অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণেই বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধের সৃষ্টি হয়েছিল। আমার মতে, প্রশ্নোক্ত উক্তিটি যথার্থ।
ষোড়শ শতাব্দীতে ভৌগোলিক আবিষ্কার এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের ফলে বিশ্বে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশ ঘটতে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিংশ শতকের প্রথম দশকে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় মার্কসবাদীয় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এসময় রাশিয়া অন্যতম পরাশক্তি হওয়ায় তার প্রভাবে অন্যান্য দেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়। ফলে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সাথে রাশিয়ার দূরত্ব বাড়তে থাকে। কিন্তু ইতিমধ্যে জার্মানিতে নাৎসিবাদ, ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটলে সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্র পার্থক্য ভুলে গিয়ে রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে নাৎসিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্র দ্বন্দ্ব আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিকাশে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র শাঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে একে অপরের বিরুদ্ধে অবরোধ চালু করে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১৯৫৬ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ১৯৬৫ সালে কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকট, ১৯৭৯ সালে আফগান সংকট স্নায়ুযুদ্ধের ছায়ারূপ। অবশেষে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্যে দিয়ে সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। পরিশেষে বলা যায়, সমাজতন্ত্র ও ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্যই স্নায়ুযুদ্ধের মূল কারণ I
উইনস্টন চার্চিল (Winston Churchill 1874-1965) (১৮৭৪-১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ): ইংরেজ রাজনীতিবিদ ও লেখক ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিক পরিচিত। প্রথম জীবনে তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সদস্য হলেও ধীরে ধীরে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও দক্ষতা দ্বারা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পূর্বে যেসব সম্মেলনের আয়োজন করা হয় সেখানে তিনি কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। তিনি শুধু রাজনীতিবিদ বা সুবক্তাই ছিলেন না, তার লেখার প্রভূত সম্ভার ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে আত্মজৈবনিক রচনার জন্য সাহিত্যে নোবেল পান। তাকে যুক্তরাজ্য ও বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়।
অনেকে মনে করেন, ফুলটন বক্তৃতায় চার্চিলের বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীতে ঠাণ্ডাযুদ্ধের সূচনা হয়। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে বিবিসি'র এক জরিপে তিনি সর্বকালের সেরা ব্রিটেনবাসী হিসেবে মনোনীত হন।'
বার্নার্ড বারুচ (Bernard Baruch 1870-1965) (১৮৭০-১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ): বার্নার্ড বারুচ ১৯শে আগস্ট ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার সাউথ ক্যারোলিনায় জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় তিনি একজন অর্থসংস্থানকারী ও স্টক বিনিয়োগকারী ছিলেন। যদিও তিনি রাজনৈতিক পরামর্শক ও বিবৃতি প্রদানকারী হিসেবে বেশি খ্যাতি অর্জন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের জাতীয় প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি পরাজিত জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে সহযোগিতা সৃষ্টির মাধ্যমে League of Nations সৃষ্টির উপর জোর দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে হ্যারি এস. ট্রমান তাকে জাতিসংঘের আণবিক শক্তি কমিশনে মার্কিন প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন।
পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টির লক্ষ্যে তিনি 'বারুচ প্ল্যান' পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও রাশিয়া কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি 'স্নায়ুযুদ্ধ' শব্দটি ব্যবহার করলে শব্দটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে জুন ৯৪ বছর বয়সে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে মারা যান।২
স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক অতিশয় আলোচিত বিষয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এর শুরু ও অবসান হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে। উক্ত সময়কালে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও রাষ্ট্রনায়করা স্নায়ুর এক ভয়াবহ চাপের মধ্যে ছিলেন বলে একে স্নায়ুযুদ্ধ বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন ছিল সারা বিশ্বের মানুষ।
তখন দুটি বৃহৎ শক্তির (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া) নেতৃত্বে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল বিশ্বের প্রায় সব দেশ। পুঁজিবাদী শিবিরের নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সমাজতান্ত্রিক শিবিরের নেতৃত্বে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই বৃহৎ শক্তির শক্তি-দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে স্নায়ুযুদ্ধের মাধ্যমে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী রাজনীতি ও স্নায়ুযুদ্ধ অনেকটা সমার্থক। বৃহৎ দুটি শক্তি ও তাদের আদর্শপুষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উত্থান-পতন, সন্দেহ, উত্তেজনা সবকিছুর মূলে কখনো পরোক্ষ আবার কখনো প্রত্যক্ষভাবে স্নায়ুযুদ্ধ কাজ করত। অদ্যাবধি স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব থেকে বিশ্ববাসী পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। সম্প্রতি সিরিয়া সংকট নিয়ে মার্কিন-রাশিয়া সম্পর্কের টানাপড়েন স্নায়ুযুদ্ধের নতুন রূপ। বিশ্ব রাজনীতির পূর্বরূপ ও পরিবর্তিত রূপ এবং এর প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভে এ অধ্যায়ের বিষয়গুলো শিক্ষার্থীকে সহায়তা করবে।
ট্রুম্যান তত্ত্ব
মার্শাল পরিকল্পনা;
ন্যাটো
ওয়ারশ জোট;
দাঁতাত;
কেন্নান থিসিস;
কিউবা সংকট;
গ্লাসনস্ত;
পেরেস্ত্রৈকা;
ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি
ন্যাম;
দ্বিমেরুবাদ;
ফুলটন বক্তৃতা;
বার্লিন অবরোধ;
WARSAW;
SEATO;
MEDO
স্নায়ুযুদ্ধ - পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের দ্বন্দ্ব-ড. মোঃ ওয়াহেদুল ইসলাম স্যারে এর লেখা বই
মার্শাল পরিকল্পনা ও ট্রুম্যান তত্ত্বের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের পদক্ষেপ হলো বার্লিন অবরোধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর রাজধানী বার্লিনকে ৪ ভাগে ভাগ করে শাসন শুরু হয়।আমেরিকা, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড তাদের অধিকৃত পশ্চিম বার্লিনে সংযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ নিলে রাশিয়ার স্ট্যালিন ক্ষুব্ধ হয়ে পশ্চিমের সাথে পূর্বের সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। এ অবরোধ প্রায় ১১ মাস ধরে চলার পর স্ট্যালিন প্রত্যাহার করে নেয়।
উদ্দীপকে বর্ণিত অবস্থানটি আমার পাঠ্যবইয়ের ন্যাটো এবং ওয়ারশ জোট গঠনের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধকালীন সময়ে শক্তির মহড়া দিতে এবং পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রসারের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রকে প্রতিহত করতে ১৯৪৯ সালে ন্যাটো গঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সে সময় ১২টি দেশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল ন্যাটো সামরিক জোট। এ জোটের সব দেশ ছিল পুঁজিবাদের সমর্থক এবং সমাজতন্ত্রের বিরোধী। সামরিক দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে চাপে রাখা এর মূল উদ্দেশ্য ছিল।
অপরদিকে, সামরিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে ন্যাটোর বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ওয়ারশ কোট গঠন করে। প্রকৃতপক্ষে, ন্যাটোর কার্যাবলি চ্যালেঞ্জ করার জন্য ওয়ারশ জোট গঠিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের আত্মরক্ষামূলক প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার জন্য ১৯৫৫ সালে এ জোট গঠিত হয়। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকের যমুনা নদীর তীরবর্তী সালেমপুর ও মকসুদপুর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই গ্রামের সাথে পাঠ্যবইয়ের ন্যাটো ও ওয়ারশ জোটের সাদৃশ্য রয়েছে।
উক্ত অবস্থাটি অর্থাৎ স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্বকে দুটি মেরুতে বিভক্ত করেছিল বলে আমি মনে করি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পায়। এরপর লেনিন ও স্ট্যালিনের দক্ষ নেতৃত্বে সাম্যবাদ শুধু রাশিয়ায় নয়, বিশ্বের অনেক দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। অল্প সময়ে পার্শ্ববর্তী ১৫টি রাষ্ট্র নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়। এর পরিধি ক্রমেই বাড়তে থাকে। অপরদিকে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই সাম্যবাদের গতিরোধ করতে গিয়ে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দেয়। স্নায়ুযুদ্ধ ধীরে ধীরে প্রকট আকার ধারণ করতে শুরু করে। এর ফলে Bipolar System প্রতিষ্ঠিত হয়। যার মূল ধারণা ছিল দ্বিমেরুকরণ। বৈশ্বিক রাজনীতিতে এ দ্বিমেরুকরণের প্রভাব বহু বছর ধরে বিদ্যমান থাকে। সুতরাং বলা যায়, উক্ত বিষয়টি অর্থাৎ- স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্বকে দুটি মেরুতে বিভক্ত করেছিল।
গ্লাসনস্ত শব্দের অর্থ মুক্তাবস্থা বা Open Air. ১৯৯০ সালে সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ মানবাধিকার ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য যে মুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, ইতিহাসে তাই গ্লাসনস্ত নামে পরিচিত। বিদ্যমান সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকবে কিনা বা এর পতনের পক্ষে-বিপক্ষে মুক্ত আলোচনার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক এ পদক্ষেপটি গৃহীত হয়।