উত্তরঃ
যুক্তিবিদ্যায় পদ বা ধারণার সুস্পষ্ট অর্থ প্রকাশের জন্য সংজ্ঞার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রদত্ত দৃষ্টান্ত দুটিতে 'অজ্ঞানতা' ও 'শৈশব' দুটি ধারণাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত বা ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা সংজ্ঞার প্রকৃতি ও উদ্দেশ্যের বৈচিত্র্য তুলে ধরে। এই দুটি দৃষ্টান্তের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংজ্ঞার বিভিন্ন দিক উন্মোচিত করা সম্ভব এবং তাদের যৌক্তিক কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা যায়।
প্রথম দৃষ্টান্ত, "অজ্ঞানতা হলো জ্ঞানের অভাব", একটি নঞর্থক সংজ্ঞার (Negative Definition) উদাহরণ। এই ধরনের সংজ্ঞা কোনো পদের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা না করে, কী নয় তার উপর জোর দেয়। অর্থাৎ, এটি 'অজ্ঞানতা' কী, তা সরাসরি না বলে 'জ্ঞান'-এর অনুপস্থিতিকেই এর পরিচয় হিসেবে তুলে ধরে। যুক্তিবিদ্যায় নঞর্থক সংজ্ঞা সাধারণত অসম্পূর্ণ এবং অস্পষ্ট বলে বিবেচিত হয়, কারণ এটি পদের প্রকৃত স্বরূপ বা অপরিহার্য গুণাবলী সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়। এটি কেবল পদের সীমা নির্দেশ করে কিন্তু পদের অন্তর্নিহিত প্রকৃতি প্রকাশ করে না।
দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত, "শৈশব হলো জীবনের প্রভাতকাল", একটি রূপক বা আলংকারিক সংজ্ঞার (Metaphorical Definition) চমৎকার উদাহরণ। এটি 'শৈশব'কে জীবনের শুরুর দিকের সতেজতা, নতুনত্ব ও সম্ভাবনার সাথে তুলনা করেছে, যেমন প্রভাতকালের সাথে দিনের শুরুকে তুলনা করা হয়। এই ধরনের সংজ্ঞা কাব্যিক সৌন্দর্য ও আবেগ তৈরি করলেও যুক্তিবিদ্যার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সঠিক সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত নয়। কারণ এটি পদের জাতি ও বিভেদক লক্ষণ উল্লেখ করে না এবং এর সুস্পষ্ট অর্থ ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারে না। রূপক সংজ্ঞা সাধারণত বর্ণনাধর্মী এবং সাহিত্যিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়, যেখানে যৌক্তিক সুনির্দিষ্টতার চেয়ে ভাব বা অনুভূতির প্রকাশ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
দৃষ্টান্ত দুটির তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, দৃষ্টান্ত-১ একটি নঞর্থক সংজ্ঞা, যা কোনো পদের অস্তিত্বকে তার অনুপস্থিতির মাধ্যমে বোঝায় এবং যুক্তিগতভাবে অসম্পূর্ণ ও ক্ষেত্রবিশেষে অর্থহীন হতে পারে। অন্যদিকে, দৃষ্টান্ত-২ একটি রূপক সংজ্ঞা, যা উপমা বা তুলনার মাধ্যমে একটি ধারণাকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করে, কিন্তু এর যৌক্তিক ভিত্তি দুর্বল এবং এটি সুনির্দিষ্ট জ্ঞান প্রদানে অক্ষম। যুক্তিবিদ্যায় একটি সার্থক সংজ্ঞার প্রধান উদ্দেশ্য হলো পদের জাতি এবং বিভেদক লক্ষণ উল্লেখ করে তার সুস্পষ্ট অর্থ ও ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা। এই মানদণ্ডে, উভয় দৃষ্টান্তই আদর্শ সংজ্ঞার শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। তাই, যুক্তিবিদ্যার বিচারে সুনির্দিষ্টতা, স্পষ্টতা এবং যথার্থতার দিক থেকে উভয় প্রকার সংজ্ঞাই দুর্বলতা বহন করে এবং প্রকৃত সংজ্ঞা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, যদিও দৈনন্দিন বা সাহিত্যিক প্রয়োজনে তাদের ভিন্ন উপযোগিতা রয়েছে।