উত্তরঃ
মদিনা সনদ বা কিতাব-উর-রসূল ইসলামের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হযরতের মদিনা পৌঁছার পর তিনি সেখানে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হন এবং শতধা বিভক্ত ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক ও আগত মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য, শান্তি ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করেন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তিনি একটি সনদ প্রণয়ন করেন যা ইসলামের ইতিহাসে 'মদিনা সনদ' নামে পরিচিত। ইবনে হিশাম তাঁর 'সীরাত' গ্রন্থে একে 'কিতাব-উর-রাসূল' S. M. Watt তাঁর গ্রন্থে একে 'The Charter of Medina' বলে আখ্যায়িত করেন। নিচে সনদের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো :
সনদের বৈশিষ্ট্য : মহানবী (স) কর্তৃক প্রদত্ত মদিনা সনদের ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে এর নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় :
প্রথমত, মদিনা সনদে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির আভাস রয়েছে। কারণ এখানে বলা হয়েছে সকল ধর্মাবলম্বী লোক একটি উম্মাহ করবে এবং তারা স্ব স্ব ধর্ম পালন করবে। এছাড়া উম্মাহভুক্ত অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিচারকার্যও স্ব স্ব ধর্মগ্রন্থ অনুসারে করার নীতি গৃহীত হয়।
দ্বিতীয়ত, সনদে গোত্রীয় প্রাধান্য রহিত করা হয়নি। তবে সংস্কার সাধন করে গোত্রীয় প্রাধান্যকে বৃহত্তর মুসলিম জাতির উপযোগী করে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয় এবং সামগ্রিকভাবে সকল গোত্রের ওপর মহানবী (স)-এর প্রাধান্য স্বীকৃত হয়।
তৃতীয়ত, সনদের মাধ্যমে আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে গাঢ় ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ভ্রাতৃত্ববোধ একটি উজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে।
চতুর্থত, সনদে সামগ্রিকভাবে আল্লাহকে জিম্মা প্রদান করা হয়েছে এবং রাষ্ট্র হিসেবে মদিনা একটি সাধারণতন্ত্রের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে।
পঞ্চমত, সনদে মদিনার সকল ইহুদিদের সমঅধিকার দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের বিষয়ে পুনঃপুন উল্লেখ করে মুসলমানদের সতর্কও করে দেওয়া হয়। কারণ, প্রথম থেকেই তাদের উদ্দেশ্য ছিল দুরভিসন্ধিমূলক। পাশাপাশি মক্কার কুরাইশদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
ষষ্ঠত, সর্বোপরি এ সনদে মহানবী (স)-এর মর্যাদা একাধারে প্রশাসক, বিচারক, সেনাপতি, আইন প্রণয়নকারী ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে চূড়ান্তভাবে স্বীকৃত হয়। অর্থাৎ 'Supreme leadership of the Prophet'-এর স্বীকৃতি পাওয়া যায় এই সনদে। এছাড়া এর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। যেমন-
i. সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব।
ii. মুসলিম সম্প্রদায় একটি অখণ্ড জাতি হিসেবে স্বীকৃত।
iii. মদিনার নিরাপত্তায় সকলের যৌথ দায়িত্ব।
iv. সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা দান।
v. মুসলিম-অমুসলিম সম্মিলিত একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি।
vi. অপরাধীকে কেউ আশ্রয় দেবে না।
vii. নিজ অপরাধের জন্য নিজেই দায়ী হবে।
viii. প্রতিশোধ হবে সমমাত্রিক। তবে প্রতিশোধের চেয়ে ক্ষমাই শ্রেয়।
পরিশেষে বলা যায়, মদিনা সনদ হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে ম্যাগনাকার্টা স্বরূপ। বস্তুত মদিনার রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও নাগরিক জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে মদিনা সনদ। ধর্ম প্রচারক ছাড়াও মহানবী (স) বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতা, এ সনদে তাই প্রমাণিত হয়েছে।