১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল সরকার বাংলাদেশকে ৪টি জোনে ভাগ করে
মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী এদেশীয় পাকিস্তানি দোসরদের মধ্যে আলবদর বাহিনীর কার্যক্রম অত্যন্ত জঘন্য ও বর্বর ছিল। জামায়াতে ইসলামির ছাত্রসংঘের বিকৃত মস্তিষ্কের ছাত্রদের নিয়ে গঠিত আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী। এদের মূলকাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও নারীদের ধরে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দেওয়া। এ বাহিনী সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক গণত্যার মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে এ বাহিনীর সহায়তায় ডিসেম্বরের শুরু থেকে পাকিস্তানি বর্বররা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা করেছিল।
উদ্দীপকে উল্লিখিত দৃশ্যটি আমার পাঠ্যবইয়ের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে।
যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পিছু হটে ঢাকায় অবরুদ্ধ হয়। ঢাকায় কোণঠাসা হয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল নিয়াজি সব আশা ছেড়ে দিয়ে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোর ৫টা থেকে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। যৌথ বাহিনীর বিভাগীয় কমান্ডার জেনারেল নাগরা পাকিস্তানি বহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করে আত্মসমর্পণের সময় ১৬ ডিসেম্বর দুপুর ১টায় নির্ধারণ করেন। ঐ দিন আত্মসমর্পণের দলিলসহ যৌথ বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব দুপুর ১টায় ঢাকায় আসেন। বিকেলে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকার আগরতলা থেকে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হন। এদিন সকাল থেকে অবরুদ্ধ ঢাকাবাসী রাস্তায় নেমে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে রেসকোর্সের ময়দানে হাজির হয়। বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে খোলা আকাশের নিচে একটি টেবিলে বসে লে. জেনারেল জগজিৎ জিং অরোরা ও লে. জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। প্রথা অনুযায়ী আত্মসমর্পণকারী প্রধান নিয়াজি নিজের কোমরের বেল্ট, ইউনিফর্মের ব্যাজ ও রিভলবার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে প্রদান করে। নিয়াজিকে অনুসরণ করে উপস্থিত পাকিস্তানি সৈন্যরা ব্যাজ খুলে অস্ত্র রেখে আত্মসমর্পণ করে।
উক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় চূড়ান্ত হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর শীতের পড়ন্ত বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে এবং আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষরের ফলে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় চূড়ান্ত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করেছিল। কিন্তু এ স্বাধীনতা পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালিদের জন্য স্বপ্নেই রয়ে গেল। বাঙালিরা সিংহের খাঁচা থেকে হায়েনার ডেরায় বন্দি হয়। যখন ২৩ বছরের পাকিস্তানি মাৎস্যন্যায় বাঙালি যৌক্তিক দাবি ও অধিকারের আন্দোলন শুরু করে তখন পাকিস্তানিরা বুঝতে পারে যে, বাঙালিদের আর দাবিয়ে রাখা যাবে না। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর নির্মম গণহত্যা চালায়। ঐ রাতে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নের দিশারি বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় স্বাধীনতাযুদ্ধ। এ মহান যুদ্ধে বাংলার সামরিক, আধাসামরিক ও বেসামরিক জনগণ অংশগ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকারের তৎপরতায় দেশীয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় মুক্তিবাহিনী এবং সর্বশেষে যৌথ বাহিনীর প্রাণপণ চেষ্টায় প্রায় আড়াই লাখ মা-বোনের ইজ্জত এবং ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা। আর ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
Related Question
View Allমুক্তিবাহিনী সরকারি পর্যায়ে ২ ভাগে বিভক্ত ছিল।
নিয়মিত বাহিনী গঠিত হওয়ার পর নিয়মিত বাহিনীর অংশ হিসেবে স্থল বা সেনাবাহিনী গঠিত হয়।
১৯৭১ সালের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার জলঢাকায় এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ অনষ্ঠানে আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ৬১ তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন দেয়। এভাবে শুরু হয় বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর যাত্রা। এসব অফিসার পরবর্তীকালে বিভিন্ন সেক্টরে যোগ দেওয়ায় মুক্তিযুদ্ধে গতি সঞ্চার হয়।
উদ্দীপকে বর্ণিত ব্যক্তিরা মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অনিয়মিত বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছিল।
অনিয়মিত বাহিনী গঠিত হয় যুবক, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও সকল পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে বিভিন্ন সেক্টরের অধীনে। এ বাহিনীর সরকারি নামকরণ ছিল গণবাহিনী বা এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার বা মুক্তিযোদ্ধা)। এ বাহিনীর সদস্যদের দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণের পর একজন কমান্ডারের অধীনে তাদের নিজ নিজ এলাকায় গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করা হতো। এ বাহিনীর জন্য কোনো সামরিক আইন কার্যকর ছিল না। গেরিলা বাহিনীর সদস্যদের কোনো বেতনভাতা দেওয়া হতো না। অনিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার। এছাড়া উল্লিখিত বাহিনীর বাইরে আরও কয়েকটি অনিয়মিত বাহিনী ছিল। মূলত স্থানীয় ভিত্তিতে ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে এসব গেরিলা বাহিনী গঠিত ছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে শেখ ফজলুল হক মণির নিয়ন্ত্রণাধীনে গঠিত হয়, মুজিব বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্যদের সকলে ছাত্রলীগের সদস্য। তন্মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, আ.স.ম. আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখ যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেন। মুজিব বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৬,০০০। এছাড়া ন্যাপ (মোজাফফর), কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব দলীয় বাহিনী ছিল।
উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, উদ্দীপকে উল্লিখিত বাহিনী অর্থাৎ নিয়মিত বাহিনীর কার্যক্রম ছিল মূলত পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা।
এ ধরনের সাধারণ লোকজন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় ছিল অসম্ভব- উক্তিটি যথার্থ।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন সেই বিভীষিকাময় সময়ে বজঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ দেশের স্বাধীনতা অর্জনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। বাংলাদেশের যুবক, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক এবং সকল পর্যায়ের মানুষের সার্বিক অংশগ্রহণে গঠিত হয়েছিল অনিয়মিত বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্যদের দুই সপ্তাহ প্রশিক্ষণের পর একজন কমান্ডারের অধীনে নিজ এলাকায় গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করা হতো। মূলত স্থানীয় ভিত্তিতে ও রাজনৈতিক মতাদর্শে এসব গেরিলা বাহিনী গঠিত ছিল বলে গেরিলা বাহিনী কখনো তাদের নীতি থেকে চ্যুত হয়নি। এছাড়া আঞ্চলিক পর্যায়ে অর্থাৎ সেক্টর এলাকার বাইরে কিছু বাহিনী গড়ে উঠেছিল। এ সকল বাহিনীর বেতনভাতা না থাকলেও তারা তাদের দায়িত্বে কখনো অবহেলা করেনি।
গেরিলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড ছিল ছেচ্ছাসেবা ও তারা ছিল স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
দেশের অভ্যন্তরে জনগণের মনোবল অটুট রাখা, পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের অতর্কিত আক্রমণে পরাস্ত করা ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু যেমন-যোগাযোগ ও বিদ্যুৎব্যবস্থা ধ্বংস করা, যুদ্ধের জন্য লোকবল সংগ্রহ ও তাদের ট্রেনিং প্রদান ছিল এসব বাহিনীর প্রধান কাজ। কাগজে-কলমে গেরিলারা সেক্টর কমান্ডার দ্বারা পরিচালিত হলেও বাস্তবে এরা এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রিত হতো। বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা ছিল লক্ষাধিক। এছাড়া এর কয়েকগুণ ছিল স্বেচ্ছাসেবক।
পরিশেষে বলা যায়, অনিয়মিত বা সাধারণ লোকজন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় অসম্ভব ছিল।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন ৬নং সেক্টরের বিস্তৃতি ছিল রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও পর্যন্ত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের আঞ্চলিক সুবিধা চিন্তা করে যে প্রশাসনিক পরিষদ গঠন করা হয়, তা জোনাল কাউন্সিল নামে পরিচিত।
বেসামরিক প্রশাসনকে অধিক গণতান্ত্রিক করার জন্য বাংলাদেশের আঞ্চলিক সুবিধা চিন্তা করে সমগ্র বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে প্রথমে ৯টি ও পরে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। সেপ্টেম্বর নাগাদ অঞ্চলগুলোর বিন্যাস হয়েছিল আঞ্চলিক প্রশাসনিক পরিষদ গঠনের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট এলাকার জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের প্রশাসনিক পরিষদের সদস্য করে তাদের ভোটে নির্বাচিত একজন করে চেয়ারম্যানকে পরিষদের প্রধান করা হয়। চেয়ারম্যানের অধীনে একজন করে সচিব নিযুক্ত করা হয়। একই সাথে প্রতিটি জোনে সরকার হতে ৭ জন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়, যা জোনাল কাউন্সিল নামে পরিচিত।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!