Activities of Bangladesh Govt. (Mujibnagar) in the War of Liberation
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা তথা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবময়। পাকিস্তানি শাসকচক্রের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার লক্ষ্যেই ১০ এপ্রিল ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় (১৭ এপ্রিল শপথ বাক্য পাঠ)। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস এই সরকার 'মুজিবনগর সরকার' নামেই পরিচিতি ছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি সরকারের যে সকল প্রশাসনিক কাঠামো থাকে এবং যে সকল দায়িত্ব পালন করতে হয় মুজিবনগর সরকার সেরকম একটি গতিশীল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল। প্রচণ্ড প্রতিকূলতার মাঝে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান, এক কোটির ওপর শরণার্থীর জন্য ত্রাণব্যবস্থা করা, দেশের অভ্যন্তর থেকে আগত লক্ষ লক্ষ মুক্তিপাগল ছাত্র-জনতা-যুবকদের যুবশিবিরে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে গেরিলাবাহিনী গঠন করে পাকিস্তানিদের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি করা; স্বাধীন বাংলা বেতারের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ রাখা এবং সাথে সাথে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করা- এসব ছিল মুজিবনগর সরকারের অবিস্মরণীয় কীর্তি যা সমকালীন ইতিহাসের বিচারে অতুলনীয়।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ইতিহাস পাঠে জানা যায়, একদিকে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ মিলে মুক্তি বাহিনী গঠন করে দেশকে শত্রুমুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। অন্যদিকে মুষ্টিমেয় কিছুলোক মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে বিভিন্ন বাহিনী গঠন করে পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করে।
১৮৭১ সালের Unification of Germany প্রক্রিয়াকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছিল বিসমার্কের সফল পররাষ্ট্র নীতি। ফ্রান্স, ইতালি, রুশ ফেডারেশনের সাথে মৈত্রীপূর্ণ সম্পর্কই এ একত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল।
জনাব আশরাফ ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বেতারে জয়বাংলা বাংলার জয় গানটি শুনে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হন। এমনকি তিনি দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
The Government of Bangladesh (Mujibnagar) Ministry, Department and Others
মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত সরকারই মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে (জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ) বিজয়ী আইনসভার সদস্যদের সমন্বয়ে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। বাংলার শোষিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত জনতার মুক্তির বাসনাকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমর্থনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনই ছিল মুজিবনগর সরকারের মূল্য উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য মুজিবনগর সরকার বেশ কিছু মন্ত্রণালয়, বিভাগ, শাখা খোলে এবং বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
মন্ত্রণালয় (Ministry)
মুজিবনগর সরকারের ১২টি মন্ত্রণালয় ছিল। যথা:
১। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
২। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
৩। অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
৪। মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়।
৫। সাধারণ প্রশাসন বিভাগ।
৬। স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
এছাড়াও ছিল নিম্নলিখিত সংস্থা:
১। পরিকল্পনা কমিশন।
২। শিল্প ও বাণিজ্য বোর্ড।
৩। নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, যুব ও অভ্যর্থনা শিবির।
৪। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটি।
৫। শরণার্থী কল্যাণ বোর্ড।
৭। তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়।
৮। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
৯। ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়।
১০। সংসদ বিষয়ক বিভাগ।
১১। কৃষি বিভাগ।
১২। প্রাদেশিক বিভাগ।
সচিবালয়: মুজিবনগর প্রশাসন পরিচালিত হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ সচিবালয়ের মাধ্যমে। যার গঠন ছিল নিম্নরূপ:
| প্রধান সচিব | জনাব রুহুল কুদ্দুস |
| সংস্থাপন সচিব | জনাব নুরুল কাদের খান |
| অভ্যন্তরীণ সচিব | জনাব আব্দুল খালেক |
| প্রতিরক্ষা সচিব | জনাব আব্দুস সামাদ |
| তথ্য সচিব | জনাব আনোয়ারুল হক খান |
| বৈদেশিক সচিব | জনাব মাহবুবুল আলম চাষী |
| কেবিনেট সচিব | জনাব তওফিক ইমাম |
| অর্থ সচিব | জনাব খন্দকার আসাদুজ্জামান |
প্রধান সচিব বা মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতি সচিবালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের অন্যতম দায়িত্ব ছিল আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সাধন করা। সংস্থাপন সচিব ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে।
প্রশাসনিক বিভাগ (Administration Department)
দেশব্যাপী সুষ্ঠু প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জুলাই মাসে বাংলাদেশকে ১১টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। এগুলোর নাম দেওয়া হয়েছিল জোনাল কাউন্সিল। মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণাকারী প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে আঞ্চলিক চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে একজন করে আঞ্চলিক প্রশাসক বা জোনাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর নিয়োগ করা হয়। আঞ্চলিক প্রশাসক তার অধীনস্থ অঞ্চলে রাজনৈতিক সমন্বয়কারীর দায়িত্ব লাভ করেন। প্রতিটি অঞ্চলে আঞ্চলিক কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
পরিকল্পনা কমিশন
মুজিবনগর সরকার ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিকল্পনা কমিশন গঠন করে। কমিশনটি ছিল নিম্নরূপ:
ড. মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী চেয়ারম্যান
ড. খান সরওয়ার মুর্শেদ সদস্য
ড. মোশাররফ হোসেন সদস্য
ড. এম আর বোস সদস্য
ড. আনিসুজ্জামান সদস্য
যুব অভ্যর্থনা শিবির নিয়ন্ত্রণ বোর্ড
মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ২৪টি যুবশিবির ও ১১২টি অভ্যর্থনা শিবির স্থাপন করা হয়েছিল। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। অধ্যাপক ইউসুফ আলী (এমএনএ) ছিলেন এই বোর্ডের প্রধান। বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে আসা ব্যক্তিদেরকে প্রথমে অভ্যর্থনা শিবিরে রিপোর্ট করতে হতো এবং সেখান থেকে তাদেরকে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে প্রেরণ করা হতো। । যুবকদের পাঠানো হতো যুবশিবিরে, নারীদের নারী শিবিরে। বিভিন্ন যুবশিবির থেকে মুক্তিযোদ্ধা বাছাই করা হতো।
মুজিবনগর সরকারের কার্যাবলি
মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।। । এ অস্থায়ী সরকারের উল্লেখযোগ্য কার্যাবলি সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
১. সামরিক তৎপরতা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করাই ছিল মুজিবনগর সরকারের প্রধান কাজ। তাছাড়া মুক্তিবাহিনীকে সংগঠিত করা, ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা, পুনর্বিন্যাস করা এবং আহত সৈনিকদের চিকিৎসা ও সাহায্যের ব্যবস্থা করা এবং এ সকল উদ্দেশ্যে সাহায্য লাভের জন্য ভারত সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা ছিল মুজিবনগর সরকারের অন্যতম কাজ।
২. কূটনৈতিক তৎপরতা: মুজিবনগর সরকার বৈদেশিক রাষ্ট্রগুলোর নিকট থেকে সাহায্য, সহানুভূতি, সমর্থন ও স্বীকৃতি লাভের উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালায়। কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও স্টকহোমসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রচারণা ও সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে। মুজিবনগর সরকার বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বহির্বিশ্বের বিশেষ দূত নিয়োগ করে মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বনেতাদের সমর্থন ও সহযোগিতা আদায়ের চেষ্টা করে।
৩. বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা: মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী বাঙালিদের নিয়ে বেসামরিক প্রশাসনযন্ত্র গড়ে তোলে। শত্রুমুক্ত এলাকায় শাসন করার ব্যবস্থা করে সেখানে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহের ব্যবস্থা করে।
৪. জনগণের নৈতিক মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখা যুদ্ধ অবস্থায় দেশের প্রতিজন নাগরিক উদ্বিগ্ন থাকে। প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধের অবস্থা, গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি জানতে চায়; যা একটি কেন্দ্র থেকে সাধারণত সরবরাহ করা হয়ে থাকে। মুজিবনগর সরকার সেই শক্তিশালী কেন্দ্রের ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জনগণের নৈতিক মনোবল সবসময় চাঙ্গা রেখেছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গান, সংবাদ, চরমপত্র প্রভৃতি প্রচারের মাধ্যমে জনগণকে উদ্দীপ্ত রেখেছে।
৫. স্বাধীনতা পরবর্তী কার্যাবলি কার্যত স্বাধীন হওয়ার পর মুজিবনগর সরকারই প্রথম দেশ শাসনের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। এ সরকার নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনে। ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে শীঘ্রই অনেক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন করে।
এ সরকার গঠিত হওয়ায় বাঙালিরা সংগ্রামী চেতনায় এবং নব আশায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। যুদ্ধাবস্থায় এবং যুদ্ধ পরবর্তী সংকটময় মুহূর্তে মুজিবনগর সরকারই ছিল বাঙালি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Formation of the Freedom Fighter (Land, Naval and Air Forces)
২৫ মার্চের কালরাতে গণহত্যার শুরু থেকেই বাঙালিরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন, প্রাক্তন ইপিআর, পুলিশ, আনসার কোথাও কোথাও ছাত্র-জনতা বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে। ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত এবং অপরিকল্পিতভাবে। মুজিবনগর সরকার গঠনের পর কর্নেল এম.এ.জি ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী পুনর্গঠন করা হয়। অন্তর্ভুক্ত করা হয় নিয়মিত বাহিনী এবং ক্রমান্বয়ে গড়ে তোলা হয় সেক্টর, ফোর্স, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী। পাশাপাশি স্থানীয় প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে অনিয়মিত 'বাহিনী, বেসামরিক বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। মোটকথা সর্বস্তরের মানুষদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় বিশাল মুক্তিবাহিনী। যে যার যার অবস্থান থেকে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
১৮ এপ্রিল এম.এ.জি. ওসমানীকে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে নিম্নলিখিত বাহিনীসমূহ গঠন করা হয়:
১। নিয়মিত বাহিনী: বাংলাদেশকে মুক্ত করার শপথ নিয়ে নিয়মিত বাহিনী গঠন করা হয়। এ বাহিনীতে দক্ষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত সৈন্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে নিয়মিত বাহিনী গঠন করা হয়। এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮,৬০০ জন। এদেরকে সামরিক বেতন ভাতা দেওয়া হতো। এ বাহিনীতে ৩টি ফোর্স গঠন করা হয়। মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১ম, ৩য় ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে 'জেড' ফোর্স, লে. কর্নেল শফিউল্লাহর নেতৃত্বে ২য় ইস্ট বেঙ্গল ও ৩ নম্বর সেক্টর নিয়ে 'এস' ফোর্স এবং লে. কর্নেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ৪র্থ, ৯ম ও ১০ম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে 'কে' ফোর্স গঠিত হয়। নিয়মিত বাহিনী হিসেবে স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী গড়ে তোলা হয়।
(ক) স্থল বা সেনাবাহিনী: মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ অক্টোবর ভারতের জলপাইগুড়ি জেলায় এক আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ৬১ জন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে দ্বিতীয় লেফটেনেন্ট পদে কমিশন দিয়ে সেনাবাহিনীর যাত্রা শুরু করেন। এ সকল অফিসাররা পরবর্তীকালে বিভিন্ন সেক্টরে যোগ দিলে যুদ্ধে গতি সঞ্চার হয়।
(খ) নৌবাহিনী: ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে নিয়মিত বাহিনী হিসেবে নৌবাহিনী গড়ে তোলা হয়। প্রধানমন্ত্রী
তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার আগস্ট মাসের শেষে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশ্যে কলকাতা পোর্ট কমিশন থেকে এম.ভি পদ্মা ও এম.ভি পলাশ নামে দুটি জাহাজ সংগ্রহ করা হয়। ৩৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে জাহাজ দুটিকে নৌযুদ্ধের উপযোগী করা হয়। নভেম্বর মাসে ৪৫ জন পালিয়ে আসা নৌ-সেনা নিয়ে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর গোড়াপত্তন করা হয়। এম.ভি পদ্মা ও এম.ভি পলাশসহ পাকিস্তান বাহিনীর নিকট থেকে দখলকৃত ৬টি নৌ-যান নিয়ে নৌবাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। নভেম্বর পর্যন্ত ৮৬০ জন নৌ-কমান্ডারকে ট্রেনিং দেওয়া হয়। এরা অনেক সফল অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানি রসদ বহনকারী জাহাজ এম.ভি আল-আকাস ও এম.ভি হরমুজসহ অনেক জাহাজ, ট্যাংক ডুবিয়ে দেয়।
(গ) বিমানবাহিনী গঠন: পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের তেজগাঁও এয়ারবেসের ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকারের নেতৃত্বে ১৮ জন
দক্ষ পাইলট (একাত্তরের মার্চ মাসে যে সকল বাঙালি পাইলট অফিসার বাৎসরিক ছুটিতে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল) এবং ৫০ জন টেকনিশিয়ান ও একজন কুকার নিয়ে বিমানবাহিনী গঠিত হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে বৈমানিক সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন এবং সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছিলেন সেই ফ্লাইট লেফটেনেন্ট মতিউর রহমানকে কড়া প্রহরায় পরিবারসহ করাচিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২০ আগস্ট ইন্সট্রাক্টর হিসেবে একটি জঙ্গী বিমানে জনৈক অবাঙালি ক্যাডেটকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। এ সময় অত্যন্ত দুঃসাহসিক দক্ষতা প্রদর্শন করে রাডারের
দৃষ্টি এড়িয়ে সীমান্ত অতিক্রমের প্রচেষ্টা করেন। কিন্তু উক্ত ক্যাডেট পরিস্থিতি উপলব্ধি করে তাকে বাধা দেন। ফলে পশ্চিম পাকিস্তানে ভারত সীমানায় মাত্র কয়েক মিনিট সময়ের মধ্যে ফ্লাইট বিমানটি বিধ্বস্ত হলে উভয়ে নিহত হন। এই বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য ফ্লাইট লেফটেনেন্ট মতিউর রহমানকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনিই হচ্ছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহিদ বীরশ্রেষ্ঠ। এ দিকে ক্যাপ্টেন খন্দকারের নেতৃত্বে বাকি ১৭ জন বৈমানিক এবং ৫০ জন টেকনিশিয়ান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য মুজিবনগর সরকারের নিকট রিপোর্ট করেন। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এদের গোপন প্রশিক্ষণ প্রদান, রানওয়ে এবং প্রয়োজনীয় বিমানের অভাব দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে বৈমানিকরা আপাতত স্থলবাহিনীর সাথে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ইতোমধ্যে বিমান বাহিনীর আরও কতিপয় অফিসার মুজিবনগরে হাজির হন। এরা হচ্ছেন ফ্লাইট লেফটেনেন্ট এম কাদের, ফ্লাইট লেফটেনেন্ট জামাল উদ্দীন, ফ্লাইট লেফটেনেন্ট সার্জেন্ট ফজলুল হক, ক্যাডেট অফিসার এম.এ কুদ্দুস এবং ক্যাডেট অফিসার এম. মাহমুদ প্রমুখ। মাত্র ৮ সপ্তাহকাল দুরূহ প্রশিক্ষণ শেষে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার দুর্জয় শপথ নিয়ে তৈরি হলো বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। তখন তাদের কাছে ছিল মুজিবনগর সরকারের সংগ্রহ করা একটি অটার প্লেন, একটি ডাকোটা বিমান এবং একটি অ্যালুয়েট হেলিকপ্টার।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২ ডিসেম্বর 'বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত' এই স্লোগান হৃদয়ে ধারণ করে সর্বপ্রথম বাংলার বিমান বাংলার আকাশে উড্ডীন হলো। হামলার জন্য ৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান বেছে নিল- (১) চট্টগ্রাম বন্দর (২) চট্টগ্রাম তেল শোধনাগার (৩) ভৈরব বাজার এবং (৪) নারায়ণগঞ্জ বন্দর। কয়েক দফা হামলা করে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে।
২। অনিয়মিত বা ফ্রিডম ফাইটার্স (এফ. এফ) বাহিনী নিয়মিত বাহিনী ছাড়াও অনিয়মিত বাহিনী গঠন করা হয়; যারা ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের দিশেহারা করে ফেলে। অনিয়মিত বাহিনী গঠিত হয় ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, কৃষক নিয়ে। এ বাহিনীর সদস্যদের দু'সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দিয়ে একজন কমান্ডারের অধীনে তাদের নিজ নিজ এলাকায় গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করা হতো। এ বাহিনীর জন্য কোনো সামরিক আইন কার্যকর ছিল না। তাদের কোনো বেতন ভাতাও দেওয়া হতো না। অনিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লক্ষ ১২ হাজার।
৩। স্বাধীন বাহিনী নিয়মিত-অনিয়মিত বাহিনী ছাড়াও সম্পূর্ণ স্বাধীন অস্তিত্ব নিয়ে দেশের বাইরে এবং দেশের অভ্যন্তরেই বেশ কিছু বাহিনী গড়ে উঠেছিল; যারা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিভিন্ন অঞ্চল মুক্ত করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে তাদের অবদান অপরিসীম। এ সকল বাহিনীর মধ্যে ছিল-
(ক) মুজিব বাহিনী: মুজিব বাহিনীর জন্ম ভারতে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের বাছাই করা শিক্ষিত
তরুণদের নিয়ে এ বাহিনী গড়ে তোলা হয়। এ বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খান। বাংলাদেশ সরকার এবং সেক্টর কমান্ডারের অজান্তে দেরাদুন ও আসামের জাফলং-এ এদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এরা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দেশে প্রবেশ করে এবং পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
(খ) আফসারী বাহিনী ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা থানার মল্লিক বাড়ি গ্রামে একটিমাত্র রাইফেল নিয়ে মেজর আফসার উদ্দীন এ বাহিনী গড়ে তোলেন। তার এ বাহিনীতে প্রায় সাড়ে চার হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিল। ভালুকা থানায় পাকবাহিনীর সঙ্গে একটানা ৪৮ ঘণ্টা যুদ্ধ করে এ বাহিনী কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
(গ) হেমায়েত বাহিনী: দ্বিতীয় ইস্ট রেজিমেন্টের হাবিলদার হেমায়েত উদ্দিন ২৯ মে বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার বাটারা বাজারে এ বাহিনীর উদ্বোধন করেন। এ বাহিনী জুন মাসের মধ্যে ফরিদপুর ও বরিশালের বিস্তীর্ণ এলাকা মুক্ত করে। এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৫,০৫০ জন। হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া অস্ত্র দিয়েই এরা যুদ্ধ করে। মোট ১৮টি সফল আক্রমণ করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
(ঘ) কাদেরিয়া বাহিনী টাঙ্গাইলের কাদের সিদ্দিকীর (বাঘা সিদ্দিকী নামেও পরিচিত) নেতৃত্বে এ বাহিনী গড়ে ওঠে। এ বাহিনী ছিল অত্যন্ত দুর্ধর্ষ। এ বাহিনীর নাম শোনলেই পাকবাহিনীর বুকে কাঁপন ধরত। কাদেরিয়া বাহিনী ৩০০-এর অধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সহস্রাধিক পাক সৈন্য খতম করে। টাঙ্গাইল ও এর আশেপাশের প্রায় ১৫,০০০ বর্গমাইল এলাকা কাদেরিয়া বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
The Sector Management of the Liberation War
(The Sector Command)
১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠনের পর সমস্ত রণাঙ্গনকে মোট ৪টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। চট্টগ্রাম সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত হন মেজর জিয়াউর রহমান, কুমিল্লা সেক্টরে মেজর খালেদ মোশাররফ, সিলেট সেক্টরে মেজর শফিউল্লাহ এবং কুষ্টিয়া সেক্টরে মেজর আবু ওসমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১১ এপ্রিল মেজর নাজমুল হককে দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা এলাকায়, মেজর জলিলকে বরিশাল, পটুয়াখালী এলাকায় এবং ক্যাপ্টেন নওয়াজেশকে রংপুর 'এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে যুদ্ধকে আরও বেগবান করার লক্ষ্যে বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানকারী সকল সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে যথোপযুক্ত দায়িত্বে নিযুক্ত করা এবং যুদ্ধ এলাকা নির্ধারণের জন্য সেক্টরগুলোকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করার একান্ত প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের-সভাপতিত্বে রণনীতি ও সেক্টর ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করা হয়। কর্নেল রবকে চিফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকারকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত করা হয়।
সুষ্ঠু যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সকল পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে সামরিক এবং বেসামরিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের লক্ষ্যে প্রধান সেনাপতি কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর অধীনে সমগ্র রণাঙ্গনকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ প্রদান করা হয়। প্রত্যেক সেক্টরে মুজিবনগর সরকারের গেরিলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল অনন্য। সেক্টর নম্বর ও অঞ্চলসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডারগণের পূর্ণ তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| সেক্টর | আওতাধীন অঞ্চলসমূহ | দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার |
| ১নং | চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ফেনী নদী পর্যন্ত। | ক. মেজর জিয়াউর রহমান (এপ্রিল-জুন) খ. মেজর মো: রফিক (জুন-ডিসেম্বর) |
| ২নং | চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ফেনী নদী পর্যন্ত। | ক. মেজর খালেদ মোশাররফ (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) খ. মেজর এ.টি.এম. হায়দার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) |
| ৩নং | সিলেট জেলার হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, আখাউড়া, ভৈরব রেল লাইন থেকে উত্তরপূর্ব দিকের কুমিল্লা ও ঢাকা জেলার অংশবিশেষ। | ক. মেজর এ.কে. শফিউল্লাহ (এপ্রিল-ডিসেম্বর) খ. মেজর নুরুজ্জামান (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) |
| ৪নং | সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল। | মেজর সি.আর দত্ত |
| ৫নং | সিলেট জেলার সমগ্র উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল। | মেজর মীর শওকত আলী |
| ৬নং | রংপুর, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও। | উইং কমান্ডার এম. বাশার |
| ৭নং | দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল, বগুড়া, রাজশাহী এবং পাবনা। | ক. মেজর নাজমুল হক (এপ্রিল-আগস্ট) খ. মেজর কাজী নুরুজ্জামান (আগস্ট-ডিসেম্বর) |
| ৮নং | কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুরের অধিকাংশ ও খুলনার উত্তরাঞ্চল। | ক. মেজর আবু ওসমান চৌধুরী (এপ্রিল-আগস্ট) খ. মেজর এম.এ. মঞ্জুর (আগস্ট-ডিসেম্বর) |
| ৯নং | বরিশাল, পটুয়াখালী ও খুলনার দক্ষিণাঞ্চল। | মেজর এম.এ. জলিল |
| ১০নং | অভ্যন্তরীণ নৌপথ। | নৌবাহিনীর কমান্ডো দ্বারা পরিচালিত |
| ১১নং | সমগ্র ময়মনসিংহ জেলা এবং ব্রহ্মপুত্র নদ (যমুনা) উভয় তীরবর্তী এলাকা। | ক. মেজর আবু তাহের (আগস্ট-নভেম্বর) খ. ফ্লাইট লেফটেনেন্ট এম. হামিদুল্লাহ খান (নভেম্বর-ডিসেম্বর) |
৯ নম্বর পটুয়াখালী সেক্টরের সাব-সেক্টর সদর দপ্তর ছিল বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নে। এখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা দক্ষিণাঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনা করত। বর্তমানে বুকাবুনিয়াতে একটি মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে।
(Jonal council)
মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি, সাফল্য, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ এবং পরবর্তী কর্ম পদ্ধতি ইত্যাদি পর্যালোচনা করার জন্য জোনাল কাউন্সিল গঠন করা হয়। জোনাল কাউন্সিলের প্রধান ছিলেন এম.এ.জি. ওসমানী এবং ১১টি সেক্টরের অধিনায়কবৃন্দ সবাই এ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। কোন পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে শত্রুদের আক্রমণ করা হবে তা জোনাল কাউন্সিল নির্ধারণ করত। জোনাল কাউন্সিল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতেন।
এ সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সেপ্টেম্বর মাসে চূড়ান্তভাবে সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি অঞ্চল বা জোনে ভাগ করা হয়। প্রতিটি জোনের সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য আঞ্চলিক প্রশাসনিক পরিষদ গঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের প্রশাসনিক পরিষদের সদস্য করে তাদের ভোটে নির্বাচিত একজন করে চেয়ারম্যানকে পরিষদের প্রধান করা হয়। সরকার হতে চেয়ারম্যানের অধীনে একজন করে সচিব নিযুক্ত করা হয়। একই সাথে প্রতিটি জোনে সরকার হতে ৫ জন করে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। এ সকল নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা ছিল-১. আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ২. শিক্ষা কর্মকর্তা, ৩. ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, ৪. প্রকৌশল কর্মকর্তা, ৫. হিসাব বিভাগীয় কর্মকর্তা। প্রতিটি আঞ্চলিক জোনে আবার ৫টি উপ পরিষদ গঠিত হয়। যথা: ১. অর্থ উপ-পরিষদ ২. ত্রাণ উপ-পরিষদ ৩. স্বাস্থ্য-উপ পরিষদ ৪. প্রচার উপ-পরিষদ এবং ৫. শিক্ষা উপ-পরিষদ। প্রতিটি উপ-পরিষদ গঠনের বিধান ছিল আঞ্চলিক পরিষদ থেকে সর্বনিম্ন ৩ জন এবং সর্বোচ্চ ৭ জন সদস্য নিয়ে। প্রতিটি জোনে সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি আঞ্চলিক উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়।.
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
The Subjects of the Liberation War
সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি
মুক্তিযুদ্ধকে সর্বদলীয় চরিত্রে রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মুজিবনগর সরকারের উদ্যোগে ৯ সদস্যের একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়। কেননা যেকোনো বৃহৎ কাজের জন্য সকলের সার্বিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। এ বিষয় উপলব্ধি করেই মুজিবনগর সরকার উপদেষ্টা কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কমিটিটি
ছিল নিম্নরূপ:
| আহ্বায়ক | তাজউদ্দীন আহমেদ (মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি), |
| সদস্য | মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (ন্যাপ ভাসানী) |
| সদস্য | অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ (মস্কোপন্থি ন্যাপ-এর প্রতিনিধি) |
| সদস্য | মনিসিংহ (কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি) |
| সদস্য | মনোরঞ্জন ধর (কংগ্রেস দলের নেতা) |
| সদস্য | ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (আওয়ামী লীগ দলের প্রতিনিধি) |
| সদস্য | এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান (আওয়ামী লীগ দলের প্রতিনিধি) |
| সদস্য | খন্দকার মোশতাক আহমেদ (মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি), |
| সদস্য | মোহাম্মদ তোয়াহা (পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি) |
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, মুজিবনগর সরকার একটি সুশৃঙ্খল সরকার কাঠামোর আওতায় সফলতার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে মাত্র নয় মাসের মধ্যে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, এই নয় মাস মুজিবনগর প্রশাসনের সকল স্তরের সদস্য নানাবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে দেশমাতৃকার কল্যাণে অবদান রেখেছেন।
গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধ
যুদ্ধ পদ্ধতি ছিল গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম পর্যায়ের যুদ্ধগুলো ছিল পরিকল্পনাহীন। অস্ত্র প্রাপ্তি ও প্রশিক্ষণ এ দু'কারণে মুক্তিযোদ্ধারা জুলাই মাসের আগে পরিকল্পিত কোনো আক্রমণ করতে সক্ষম হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আস্থার অভাবে প্রথম দিকে ভারত অস্ত্র দেয়নি। অবশ্য আগস্ট মাসে ৬৭ কোটি টাকার অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। আগস্ট মাস থেকেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকসেনা ও তাদের দোসরদের ওপর হামলা ও পাল্টা হামলা চালায়। হামলা চালায় পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি, সামরিক স্থাপনার ওপর। রাস্তা কেটে, ব্রিজ ভেঙে, ট্রেন লাইন উপরে ফেলে পাকবাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। অক্টোবরের শেষের দিকে মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা আক্রমণের পাশাপাশি সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পাকবাহিনীকে দিশেহারা করে ফেলে। এ সময় মুক্তিবাহিনী ৩,৫৫৯ জন পাক সৈনিক হত্যা করতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানের জনসংযোগ অফিসার মেজর সিদ্দিক মালিক বলেছেন, "প্রথম দিকে লাশ আমরা আকাশপথে পাকিস্তানে পাঠিয়েছি। কিন্তু জুলাই-আগস্ট মাসে সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টির ভয়ে মৃতদেহ পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হয়।"
স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি নৌ যুদ্ধেও মুক্তিযোদ্ধারা আগস্ট মাসের মাঝামাঝি ব্যাপক অভিযান চালায়। নৌপথে অভিযানের নাম ছিল অপারেশন জ্যাকপট। এ অভিযানের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বাংলাদেশে নৌপথে সৈন্য ও অন্যান্য সমর সরঞ্জাম পরিবহন বানচাল করা। গেরিলাদের আক্রমণে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিগুলো প্রায় অকেজো হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা ৪৫টি অভিযান চালিয়ে পাকিস্তানি এম.ভি হুরমুজ ও এম.ভি আব্বাস যুদ্ধ জাহাজসহ ১২৬টি যুদ্ধ জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। পাকবাহিনীর সীমাহীন হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধ্বংসযজ্ঞ এদেশের সকল পেশার জনগণকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে। তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হতে থাকে। যেকোনো মূল্যে স্বাধীনতা অর্জনই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, নারী, শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, শিল্পী, কামার, কুমার, জেলে বিভিন্ন পেশার মানুষ মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববদ্যালয়ের ছাত্ররা বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাঙালি ছাত্র যুবকরা শত্রুকে আঘাত হানবার প্রয়োজনীয় রণকৌশল শিখে নিয়ে দ্রুত বাংলার বনে-জঙ্গলে-গ্রামে-গঞ্জে এবং শহরে-নগরে ঢুকে পড়ে। গেরিলা পদ্ধতিতে চলে আক্রমণ। মুক্তিযোদ্ধারা সুযোগ বুঝে পাকবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকবাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কখনো কখনো পাকবাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর গেরিলা হামলায় পাকিস্তানি সুসজ্জিত বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জনগণের নিকট গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিফৌজ নামে সুপরিচিত ছিল। গেরিলা হামলা পাকবাহিনীর নিকট আতঙ্ক ছিল। ঢাকা শহরে - গেরিলা বাহিনী হামলা করে আইয়ুব খানের কু-কর্মের দোসর সাবেক গভর্নর মোনায়েম খানকে তার বাসভবনে হত্যা করে। গেরিলা বাহিনীর এরূপ নজিরবিহীন সাফল্য মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে গেরিলা বাহিনীর অবদান অনেকখানি।
যৌথবাহিনীর অভিযান
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে যৌথবাহিনী গঠন এবং অভিযান একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ভারতীয় বাহিনী নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিক্ষিপ্তভাবে প্রবেশ করতে থাকে। এদিকে মুক্তিবাহিনী গেরিলা ও সম্মুখ উভয় আক্রমণ করে ঢাকা, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ এবং খুলনা প্রভৃতি বড় বড় শহর থেকে পাকবাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকের নির্দেশে নভেম্বরে শেষের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের অমৃতসর, যোধপুর, পাঠনকোর্ট এবং আগ্রায় বিমান হামলা চালায়। এই বিমান হামলার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে পাক-ভারত যুদ্ধে রূপদান। ফলে বাধ্য হয়ে ভারত ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধে রূপদানে ব্যর্থ হয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আর এক ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের প্রাণপণ চেষ্টা করেন। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন 'নিক্সন'। তিনি যুদ্ধ বন্ধের দাবিতে সপ্তম নৌবহর পাঠান এবং তা বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এসেছিল। পাশাপাশি জাতিসংঘের l
নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো' প্রয়োগের ফলে উক্ত প্রস্তাব কার্যকর হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের অষ্টম নৌবহরের হুমকির মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সপ্তম নৌবহর ফেরত নিতে বাধ্য হয়। ২১ নভেম্বর ১৯৭১, বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথ কমান্ডার গঠন করে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে এটি গঠন করে। ভারতের লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরা এ বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত হন। যৌথ কমান্ডারের উদ্যোগে বাংলাদেশের রণাঙ্গনকে ৪টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। ৩ ডিসেম্বর ভারতের অমৃতসরসহ বিভিন্ন বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তানি বিমান বাহিনী হামলা চালালে শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। ঐ দিনই 'যৌথ কমান্ডার' ৩৩টি পাকিস্তানি বিমান ভূপাতিত করে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, সর্বপ্রথম যশোর শত্রু মুক্ত হয়। এরপর ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লালমনিরহাট মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে। কুমিল্লা ও ফেনীতে ৭০০ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। ঐ দিন অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর সর্ব প্রথম ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। পরের দিন যশোর বিমান বন্দরের পতন ঘটে। ১১-১২ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ, হিলি, কুষ্টিয়া, খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর ও সিরাজগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। অতঃপর যৌথবাহিনী ঢাকা দখলকে গুরুত্ব দেয়। ১২ ডিসেম্বর যৌথবাহিনী ঢাকায় পাক সামরিক অবস্থানে বিমান হামলা অব্যাহত রেখে চারদিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করে। ভারতের স্বীকৃতির সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের পট পরিবর্তন ঘটে। একদিকে মুক্তিযোদ্ধারা উৎসাহিত হয়; অন্যদিকে পাক সেনারা কোণঠাসা হয়ে যায়। ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকারীরা কিন্তু বসে রইল না। এবার তারা যে পরিকল্পনা গ্রহণ করল তা সভ্যতার সকল নৃশংসতাকে হার মানিয়ে দিল। তারা বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করল। বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা না দেখে তারা বাংলার বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে (১৪ ডিসেম্বর) তাদের এই কাজে সহযোগিতা করে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী। বুদ্ধিজীবী হত্যায় তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। পাকহানাদার বাহিনীর এরূপ নৃশংসতায় বাংলার দামাল ছেলেরা দমে মে না না। গিয়ে বরং আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক-বাহিনী এবং তাদের দোসরদের ওপর।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Media And The Liberation War Of Bangladesh
বলা হয়ে থাকে "প্রচারেই প্রসার"। যেকোনো দেশ বা জাতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রচার মাধ্যম বিরাট ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় প্রচার মাধ্যমের গুরুত্ব অনেক বেশি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রচার মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রচার মাধ্যমের গুরুত্ব অনুধাবন করেই স্বাধীন বাংলাদেশের মুজিবনগর সরকার একটি স্বাধীন বাংলার বেতার কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা একান্তভাবে উপলব্ধি করে। বাংলাদেশ পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের কাহিনী দেশ এবং বহির্বিশ্বে প্রচারের জন্য বেতার কেন্দ্র স্থাপন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। একমাত্র বেতার যন্ত্রের মাধ্যমেই যুদ্ধকালীন সময় সরকারের অনুগত বাহিনী অগ্রগতি এবং শত্রু পক্ষের অবস্থান, যুদ্ধে গতি ও প্রকৃতি ইত্যাদি বিষয় জনসম্মুখে তুলে ধরে সাধারণ মানুষদের চাঙ্গা রাখা যায়।
মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বহির্বিশ্বে প্রচারের ক্ষেত্রে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মী এবং মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক কর্মতৎপরতা অপরিসীম অবদান রেখেছে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বেতার সম্প্রচার কেন্দ্রই স্বাধীন বংলা বেতার কেন্দ্র নামে পরিচিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র'-এর প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাস এ বেতার কেন্দ্র উৎসাহ উদ্দীপনামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করে বাংলার আপামর জনসাধারণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল এম.আর আখতার মুকুল রচিত ও পরিচালিত ব্যঙ্গ রচনা 'চরমপত্র'। মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ অনুষ্ঠান- জল্লাদের দরবার, অগ্নিশিখা, বাংলা ও ইংরেজি খবর, উদ্দীপনামূলক গান যেমন- জয়বাংলা বাংলার জয় (সূচনা সংগীত), আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, কারার ঐ লৌহ কপাট, কেঁদোনা কেঁদোনা মাগো, সোনা সোনা লোকে বলে, সোনা, শোন একটি মুজিব থেকে লক্ষ মুজিব, মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি ইত্যাদি।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ৩০ মার্চ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাক বিমান বাহিনীর বোমা হামলায় বেতার কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়। দ্বিতীয় পর্বে ৩ এপ্রিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় এবং শিলাগুরিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার ২৫ মে থেকে কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে ৫৮/৮ বাড়িতে ৫০ কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন একটি বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র স্থাপন করে। এটিই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্থায়ী কার্যালয়। ঢাকা বেতার কেন্দ্রের কতিপয় শিল্পী এখানে যোগদান করেন। তাদের মধ্যে আশফাকুর রহমান খান, তাহের সুলতান, শহিদুল ইসলাম, আলী রেজা চৌধুরী, এ.কে শামসুদ্দিন, মঞ্জুর কাদের প্রমুখ। বেতার কেন্দ্রটি পরিচালনার 'দায়িত্বে ছিলেন আব্দুল মান্নান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সম্পর্কে পাক শাসকগণ কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, ঐ বেতার কেন্দ্র সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করলে অনেকটা স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকার করা হয়, বিষয়টি ছিল খুবই স্পর্শকাতর। এদিক থেকে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' নামকরণ শতভাগ স্বার্থক হয়েছে।
পত্র-পত্রিকার অবদান
গণমাধ্যমের প্রসঙ্গ উঠলেই সবার সামনে চলে আসে পত্র-পত্রিকার কথা। যুদ্ধ সংঘটিত করতে, মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করতে, জনগণের মনে প্রত্যাশা জাগাতে ও স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গঠনে বাংলাদেশ ও বিদেশ থেকে প্রকাশিত অসংখ্য নিয়মিত ও অনিয়মিত পত্র-পত্রিকা এক বিশাল উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় বাংলাদেশকে নিয়ে লেখা হয়েছে সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, সংবাদ, কবিতা, গান, কার্টুন ইত্যাদি। ঐ সময় প্রকাশিত পত্র-পত্রিকাগুলো আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। একাত্তরে কী ঘটেছিল, তার বাস্তবতার প্রামাণিক দলিল হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন পত্র-পত্রিকা। মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাসে যে পরিমাণ পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে এত সংক্ষিপ্ত সময়ে এত পরিমাণ পত্র-পত্রিকা বের হয়েছে এমনটা আর দেখা যায় না। এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে মুক্তিযুদ্ধের সময় অবদান রেখেছে এমন কতিপয় পত্র-পত্রিকা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১। জয়বাংলা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের গণহত্যার পর ১১ই মে মুজিবনগর থেকে 'জয়বাংলা' নামে প্রথম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন আহমদ রফিক এবং মতিন আহমদ চৌধুরী। পত্রিকাটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাপ্তাহিক মুখপত্র ছিল। ২৫ পয়সা মূল্যের এ পত্রিকাটি ২৪শে ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৩৪টি সংখ্যা বের হয়। মুজিবনগর সরকারের বিভিন্নমুখী কর্মতৎপরতা যেমন পত্রিকাটিতে স্থান পেত তেমনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন ও দেশ-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনের সংবাদ ছাপা হতো। একটি সংখ্যায় সমস্ত পৃষ্ঠা জুড়ে ছাপা হয়েছিল ইয়াহিয়ার মুখের হিংস্র ছবি, যার ক্যাপসন ছিল 'এই জানোয়ারটাকে হত্যা করতে হবে'। জয়বাংলা-২, জয়বাংলা-৩ ও জয়বাংলা-৪ নামে ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকা ছিল। যার ভিন্ন ভিন্ন সম্পাদক ছিল।
২। বাংলার বাণী: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ সাপ্তাহিক পত্রিকা হচ্ছে বাংলার বাণী। হাফেজ হাবিবুর রহমানের সম্পাদনায় ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটিতে ৬ষ্ঠ সংখ্যায় একটি রাজনৈতিক ভাষ্যের শিরোনাম ছিল "কাহার সঙ্গে আপস, কীসের আপস"।
৩। অমর বাংলা: এটি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এর সম্পাদক ছিলেন এবি ছিদ্দিকী। এটি বেঙ্গল প্রেস এ্যান্ড পাবলিকেশন, ঢাকা। এটি স্বত্বাধিকারী পিপি বড়ুয়া কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। পত্রিকার নামের নিচে ইংরেজিতে Weekly Amor Bangla এবং "বাংলাদেশ মুক্তি আন্দোলনের মুখপত্র" এই কথাটি লেখা হতো। প্রথম প্রকাশ ৪ ঠা নভেম্বর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ।
৪। অগ্রদূত: রংপুরের রৌমারী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব আজিজুল হকের সম্পাদনায় ১৯৭১ সালের ৩১ শে আগস্ট এই পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। স্বাধীন বাংলার মুক্ত অঞ্চলের সাপ্তাহিক মুখপাত্র হিসেবে রংপুর জেলার রৌমারী কুড়িগ্রাম হতে পত্রিকাটি হাতে লিখে সাইক্লোষ্টাইলে প্রকাশিত হতো।
৫। অভিযান: খ্যাতনামা কবি ও সাংবাদিক সিকান্দার আবু জাফর 'অভিযান' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৮ই নভেম্বর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে "প্রয়োজন হলে দেবো এক নদী রক্ত... আমাদের সংগ্রাম চলবেই" এই লেখার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির। সাপ্তাহিক এ পত্রিকাটিতে যুদ্ধের সংবাদ ছাড়াও বিশ্ব রাজনীতি, কবিতা, সাংস্কৃতিক সংবাদ ও অনন্য সাধারণ সংবাদও প্রকাশিত হতো।
৬। অগ্নিবাণ: ঢাকা জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মুক্তি সংগ্রামীদের মুখপাত্র ছিল এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি। 'সবকিছুর ঊর্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান' পত্রিকাটিতে এ কথা লেখা হতো।
৭। আমার দেশ: মুক্তিযুদ্ধ সহায়ক এই জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন খাজা আহমদ। ২৫ পয়সা মূল্যের ৬ পৃষ্ঠার এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটিতে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর, হানাদার বাহিনীর পরাজয় ও মুক্তাঞ্চলের খবরাখবরই বেশি প্রাধান্য পেত।
৮। আমোদ: কুমিল্লা জেলার একটি আঞ্চলিক সাপ্তাহিক পত্রিকা আমোদ। একাত্তরে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে কুমিল্লা থেকে স্বাধীনতা বিরোধী তৎপরতার ওপর এর আটটি সংখ্যা বের হয়।
৯। ওরা দুর্জয় ওরা দুর্বার: মুক্তিবাহিনীর ক্রোড়পত্র হিসেবে 'ওরা দুর্জয় ওরা দুর্বার' বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তরের পক্ষ থেকে এম.আর. আকতার মুকুল কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
১০। জন্মভূমি: বিয়ানীবাজার থানার মোস্তফা আল্লামার একান্ত প্রচেষ্টায় ও খরচে ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে জন্মভূমি সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির স্লোগান ছিল 'বাংলাদেশের সংগ্রামী জনগণের বিপ্লবী মুখপাত্র'। বিজয় পর্যন্ত এর ৩০টি সংখ্যা বের হয়।
১১। জাগ্রত বাংলা: বাঙালি ছদ্মনামে একজন সম্পাদক ছিলেন পত্রিকাটির। পত্রিকাটির কোন সংখ্যায় 'মুক্তি ফৌজের সাপ্তাহিক মুখপাত্র' আবার কোন সংখ্যায় 'মুক্তিবাহিনীর সাপ্তাহিক মুখপাত্র' লেখা থাকত।
১২। দাবানল: দাবানল নামের এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির স্লোগান ছিল "মুক্তিযোদ্ধা ও সংগ্রামী জনতার মুখপাত্র"। সম্পাদক ছিলেন মো. জিনাত আলী। :
১৪। বিপ্লবী বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের প্রচারের ক্ষেত্রে বরিশাল থেকে প্রকাশিত অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পত্রিকা বিপ্লবী বাংলাদেশ। এর সম্পাদক ছিলেন নুরুল আলম ফরিদ। "জনগণের নির্ভীক কণ্ঠস্বর" কথা তিনটি পত্রিকাটির নামের ওপরে লেখা থাকত। ২৬ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৯টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়।
এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র হিসেবে সে সময়ের অনন্য পত্রিকার মধ্যে ছিল- স্বাধীন বাংলা, স্বদেশ, লড়াই, রণাঙ্গন, মুক্তি, মুক্তবাংলা, মায়ের ডাক, বাংলাদেশ, বাংলার মুখ, বাংলার ডাক, বাংলার কথা, বঙ্গবাণী, ধূমকেতু, নতুন বাংলা, প্রতিনিধি, দুর্জয়বাংলা, গণমুক্তি, গ্রেনেড, উত্তাল পদ্মা ও ইশতেহার প্রভৃতি প্রায় শতাধিক পত্র-পত্রিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক তুলে ধরে যুদ্ধকে বেগবান করেছে এবং জয়ের ধারায় নিয়ে গেছে। দৈনিক ইত্তেফাকের মতো জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকাগুলো যখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তখন উল্লিখিত পত্রিকাগুলো মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিদেশি বাংলা পত্র-পত্রিকার মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রচারিত আনন্দবাজার পত্রিকা সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এমন কোনো দিন যায়নি যেদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু ছাপা হয়নি। কলকাতা থেকে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি পত্রিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে নিয়মিত প্রচারণা চালিয়েছে। ব্রিটেন থেকে বাংলাদেশ নিউজ লেটার ও বাংলাদেশ টুডে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছে।
মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান
মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ ছিল অভূতপূর্ব। অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে, খাবার দিয়ে, অস্ত্র লুকিয়ে রেখে, আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করে বিশেষ অবদান যেমন রেখেছে তেমনি সম্মুখ যুদ্ধেও তাদের অবদান রয়েছে। বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত ২ জন নারী তারামন বিবি ও ডাক্তার সিতারা বেগমের ন্যায় অসংখ্য নারী জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে।
"কোন কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারী
প্রেরণা দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয়ী লক্ষী নারী"
জাতীয় কবি কাজী নজরুলের এই লাইন কয়টি যেন পরিপূর্ণভাবে স্বার্থক ঘটেছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রে। মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিহাসে নারীদের সম্মান ও মর্যাদা অনেকখানি বৃদ্ধি করেছে। ছাত্রী বা বোন
স্বতঃস্ফূর্ত যুদ্ধে অংশ নিয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তাছাড়া ছেলে মুক্তিযোদ্ধা, ভাই মুক্তিযোদ্ধা,
স্বামী মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার অপরাধে কত নারীকে যে সম্ভ্রম দিতে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ৯ মাস ধরে
রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে প্রায় দু লক্ষ মা-বোনকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। স্বাধীনতা, শুধু
স্বাধীনতার জন্য। ঘরে বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বঙ্গ নারীরা।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা আহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার জন্য পাশে দাঁড়িয়েছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর
রহমান যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারীদের "বীরাঙ্গনা" উপাধিতে ভূষিত করে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান বাড়িয়ে দিয়েছেন।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Diplomatic Activities of Mujibnagar Government
রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের পাশাপাশি মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির প্রতি বিশ্বব্যাপী যে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল বহির্বিশ্বে মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ফল। কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে ছিল বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধি প্রেরণ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন আদায় ও বিদেশে তহবিল সংগ্রহ।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন আদায়
বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ইরাক, ইরান, ফিলিপাইন, আর্জেন্টিনার পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতগণ এবং কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, কাঠমান্ডু, হংকং প্রভৃতি স্থানে নিযুক্ত পাকিস্তান দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিকগণ মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে আনুগত্য জানায়। এ সংবাদে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে চীন এবং আমেরিকা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও এ সকল দেশের জনগণ এবং প্রচার মাধ্যম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। মুজিবনগর সরকারের প্রেরিত কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীর নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তিনি প্রথম বাঙালি হিসেবে লন্ডন ও জেনেভায় বিভিন্ন সমাবেশে বক্তৃতা দিয়ে হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে অপরিসীম ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী স্যার ডগলাস হিউম, জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব উখান্টের বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থন লাভের চেষ্টা করেন। এছাড়া মে মাসের প্রথম দিকে শেখ মুজিবের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক রেহমান সোবহান মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রতিনিধি। তিনি সেখানে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করেন। এ সময় তিনি বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় তদবির, বাংলাদেশের জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলে যোগদান, বাঙালি ও মার্কিন শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ, মার্কিন কংগ্রেসে তদবির ইত্যাদি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পাশাপাশি পাকিস্তানে বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ সকল তৎপরতার ফলে জুন মাসের শেষে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেন। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে দাতাগোষ্ঠী পাকিস্তানকে নতুন সাহায্যদানে এবং ঋণ প্রদান থেকে বিরত রাখে।
মুক্তিযুদ্ধের তহবিল সংগ্রহ
মুজিবনগর সরকারের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতা ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিদেশে তহবিল সংগ্রহ করা। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে 'বাংলাদেশ ফান্ড' নামে একটি তহবিল গঠন করা হয়। বিচারপতি আবু সাঈদ এ ফান্ডের বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য ছিলেন। এ ফান্ড ৩,৭৬,৫৬৮ পাউন্ড সংগ্রহ করে বাংলাদেশে প্রেরণ করেন। এছাড়া বাহরাইন বাংলাদেশ ক্লাব হতে ১৪৯৭.৫৭ পাউন্ড, কাতারের বাংলাদেশ শিক্ষাকেন্দ্র হতে ৩১০০.২৯ পাউন্ড, লিবিয়ার বাংলাদেশ শিক্ষাকেন্দ্র হতে ২৩৮২.২৯ পাউন্ড সংগ্রহ করেন। জাতিসংঘের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে যে অর্থ সাহায্য পাওয়া গিয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৮,৯১,৫৭,০০০ ডলার (যা বিভিন্ন দেশের সহায়তার মধ্যে সর্বোচ্চ), যুক্তরাজ্য ৩,৮১,১২,১৩২ ডলার, কানাডা ২,০২,৬০,৩০৭ ডলার এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ২,০০,০০,০০০ ডলার। এসব সাহায্য মুক্তিযুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Evil Activities of Anti-liberation Personalities
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক অধ্যায় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের কর্মতৎপরতা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর করাল গ্রাস থেকে দেশ মাতৃকাকে মুক্তি করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বস্তরের বাঙালি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবন বাজি রেখে যখন প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলার কতিপয় কুলাঙ্গার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে হাত মেলায়। যাতে মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করতে না পারে, দেশ যাতে পরাধীন থাকে। সেজন্য তারা পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন কমিটি গঠনের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মতৎপরতা শুরু করে। পাকিস্তান অখণ্ডতা রক্ষা ও ইসলামের নামে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে মিলে গণহত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশব্যাপী এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পথ চিনিয়ে নেওয়া, অতি গোপনে মুক্তিবাহিনীর তথ্য দেওয়া ও মুক্তিবাহিনীকে ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘৃণিত কাজ তারা করত। কিন্তু তাদের এ হীন উদ্দেশ্য কখনই সফল হতে পারে না।
শান্তি কমিটি
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় সর্বপ্রথম যে সংগঠনটির জন্ম হয় তা হলো 'শান্তি কমিটি'। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল টিক্কা খানের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জামায়াতে ইসলাম, কাউন্সিল মুসলিম লীগ, ওলামায়ে ইসলাম প্রভৃতি দলের অংশগ্রহণ এবং সহযোগিতায় এই "শান্তি কমিটি” গঠিত হয় এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। ঢাকা মহানগরীর কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি খাজা খায়েরউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে ঢাকা জেলা 'শান্তি কমিটি' গঠন করা হয়। এই কমিটি সর্বদাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থেকে দেশ যাতে স্বাধীন হতে না পারে সেজন্য সকল অপতৎপরতা চালায় এবং দখলদার বাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে মুক্তিবাহিনী ও তার পরিবার নিধন ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠে। এসব বাহিনী সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
রাজাকার বাহিনী
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের কলঙ্কজনক অধ্যায় হলো রাজাকার বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতা। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে লে. জে. টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স জারি করে কুখ্যাত "রাজাকার বাহিনী" গঠন করে। পাকিস্তানপন্থী ও স্বাধীনতা বিরোধীরা এই বাহিনীতে যোগদান করে। এরা পাক হানাদার বাহিনীর সাহায্যকারী বা দোসর হিসেবে কার্যরত ছিল।
রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলেছিল পাকিস্তান সরকার। শুরুতে আনসার মুজাহিদদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়। পরে পাকিস্তানপন্থী অনেকে এই বাহিনীতে যোগ দেয়। এই বাহিনী গঠনে জেনারেল নিয়াজীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ইসলামি ছাত্রসংঘের প্রধান মো: ইউসুফ রাজাকার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হন। পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে এদের বেতনের ব্যবস্থা ছিল। রিক্রুটের পর এই বাহিনীর সদস্যদের দেড় থেকে দুই সপ্তাহ মেয়াদের ট্রেনিং দেওয়া হতো। তাদের প্রশিক্ষক ছিলেন পাক সেনাবাহিনীর জোয়ানরা। বন্দুকে গুলি ভর্তি করে টার্গেট স্থানে গুলি নিক্ষেপ পর্যন্ত তাদের প্রশিক্ষণ সীমাবদ্ধ ছিল। ট্রেনিং শেষে রাজাকার সদস্যকে ৩০৩ রাইফেল দেওয়া হতো। দখলদারবাহিনীর দোসর ও আজ্ঞাবহ হিসেবে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এদের অন্যতম কাজ ছিল যেমন- মুক্তিযোদ্ধাদের অনুসন্ধান দেওয়া, হানাদারবাহিনীকে তাদের বাড়িঘর চিনিয়ে দেওয়া, গ্রাম থেকে গরু, ছাগল, মুরগি ধরে এনে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে সরবরাহ করা, গ্রাম থেকে যুবতী নারী ধরে এনে আর্মি ক্যাম্পে সরবরাহ করা ইত্যাদি। সে সময়ে কোনো পাকিস্তানপন্থী তার ব্যক্তিগত বা বংশীয় শত্রুকে নিধন করার কাজেও রাজাকার বাহিনীকে ব্যবহার করেছে। ঐসব পাকিস্তানি দালালরা রাজাকারকে দিয়ে তার প্রতিপক্ষকে মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী হিসেবে বন্দী করে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিত। প্রভাবশালী স্থানীয় দালালরা রাজাকার দিয়ে ভারতগামী শরণার্থীদের সর্বস্ব লুট করিয়েছে এমন তথ্যও পাওয়া যায়। এভাবে দেখা যায় যে, সকল অপকর্মের সঙ্গে রাজাকারদের নাম জড়িয়ে পড়ে।
আলবদর বাহিনী
রাজাকারবাহিনী গঠনের পর আল বদরবাহিনী গঠিত হয়। তবে রাজাকার অধ্যাদেশের মতো এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর উদ্যোগে ও প্রেরণায় এই বাহিনী গঠিত হয়।
জামায়াতে ইসলামির ছাত্রসংগঠন ও ইসলামি ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলা হয় (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে 'বদরের যুদ্ধের স্মরণে এর নামকরণ)। আল বদরদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করত পাকিস্তানবাহিনী। আলবদর বাহিনী স্বাধীনতার আন্দোলন নস্যাৎ করতে যেমন সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছে তেমনি বিরুদ্ধ শক্তিদের মুক্তিবাহিনী আখ্যা দিয়ে হত্যা কিংবা গুম করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য অনুসন্ধান, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, গোপন সংবাদ সংগ্রহ ইত্যাদি কাজে এ বাহিনী নিয়োজিত ছিল। বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান দায়িত্ব ছিল আলবদর বাহিনীর ওপর। তাই এই বাহিনী ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও হিংস্র প্রকৃতির।
আলশামস বাহিনী
স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য আর একটি বাহিনীর বিষয়ে জানা যায়। সেটি হলো আলশামস বাহিনী। ইসলামি ছাত্রসংঘের নেতাকর্মী ও প্রধানত অবাঙালি (বিহারিদের) নিয়ে এ বাহিনী গঠিত হয়। পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর এই দোসরদের কাজ ছিল দেশের অভ্যন্তরে বাঙালি ভাবধারার সমর্থক ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষকশ্রেণিকে হত্যা করা। এরা কখনো সহযোদ্ধা, কখনো বা বার্তাবাহক হিসেবে নানাভাবে স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থেকেছে।
বিহারি সম্প্রদায়
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এদেশে বসবাসরত বিহারি সম্প্রদায় পাকিস্তানি বাহিনীকে সমর্থন করে। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর এদেশে আগত বিহারি সম্প্রদায় সব সময় কেন্দ্রীয় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনী এদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয় এবং বাঙালি নিধনে দেয় অবাধ অধিকার। বাঙালিদের সম্পদ লুট করতে এদেরকে উৎসাহিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস জুড়ে বিহারি সম্প্রদায় যে লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা অকল্পনীয়।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস এদেশে হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা চালায়। তারা বাঙালি মুসলমানকে নিম্নজাতের বলে গণ্য করতো এবং তাদের হত্যাকাণ্ডকে পাপ জ্ঞান করত না। তারা পূর্বপাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনকে পুরোপুরি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে প্রতিটি সম্ভাবনাময় ছাত্র, প্রকৌশলী, ডাক্তার বা নেতৃত্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদের হত্যা করে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী 'পোড়ামাটি নীতি' অনুযায়ী বাংলাদেশের সব সম্পদ ধ্বংস করে দিতে চেয়েছে। যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির কোনোকিছুই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। এভাবে মাত্র নয় মাসে পাকিস্তানি দস্যুবাহিনী ও তাদের দোসর বিহারি, আলশামস, আলবদর ও রাজাকার বাহিনী প্রায় ত্রিশ লাখ বাঙালিকে হত্যা করে ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত হরণ করে।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Surrender of Pak-army and Rise of Independent Sovereign Bangladesh
দেশকে স্বাধীন করার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে বাংলার সূর্য সন্তানরা ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে অস্ত্র কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে অস্ত্র দীর্ঘ ৯ মাসে বিভিন্ন রণাঙ্গনে গর্জে উঠে পাকবাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এমনি অবস্থায় ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ভারতের স্বীকৃতি লাভের পর বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয় যৌথবাহিনী। যৌথবাহিনীর সেনাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন ভারতের লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। অতঃপর যৌথবাহিনী জল, স্থল, ও আকাশ পথে একযোগে প্রচণ্ড আক্রমণ করে পাকহানাদার বাহিনীকে একেবারে কাবু করে ফেলে। দিশেহারা
পাকবাহিনী পালাতে শুরু করে। এ সময় যৌথবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণের আহ্বান জানালে তারা কোনো কিছু না ভেবেই দ্রুত রাজি হয়ে যান।

অবশেষে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪.৩০ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লে. জে. এ.কে. নিয়াজী ৯৩ হাজার সৈন্য অস্ত্রশস্ত্রসহ যৌথ বাহিনীর পক্ষে লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন পাকবাহিনীর প্রধান আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী এবং যৌথবাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ক্যাপ্টেন এ.কে খন্দকার। আর এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়েই দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটে। জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। বিশ্বের মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকায় বাংলাদেশ নামে একটি নবীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা ভুলণ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা হারিয়ে বাঙালি জাতি পরাধীনতার অথৈ জলে হাবুডুবু খেতে থাকে এবং একই সাথে স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা অব্যাহত রাখে। সে চেষ্টার সারথি হয়ে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেন তিতুমীর, হাজী শরীয়তউল্লাহ, তাতিয়াতপি, লক্ষ্মীবাঈ, ক্ষুদিরাম, মাস্টার দ্যা সূর্যসেন, প্রীতিলতা প্রমুখ বীর বাঙালি। সেই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্ত, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অপরিসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা। আমাদের জাতীয় জীবনে এটি শ্রেষ্ঠ অর্জন। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। প্রতি বছর যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে এবং শহিদদের প্রতি অকৃত্রিম বিনম্র শ্রদ্ধা রেখে জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব পরিবেশে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন করা হয়। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বহমান থাকবে ততদিন ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস থাকবে। প্রতিবছর আসবে; প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দিবে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর কথা। লাল সবুজের বাংলাদেশে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস। সে ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
আত্মসমর্পণের দলিল
"পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ পূর্ব রণাঙ্গণে ভারতীয় এবং বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে বাংলাদেশে পাকিস্তানের সকল সশস্ত্রবাহিনীর আত্মসমর্পণের স্বীকৃত হচ্ছেন। এ আত্মসমর্পণ পাকিস্তানের সকল সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী এবং আধা-সামারিক ও বেসরকারি, সশস্ত্রবাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এসব বাহিনীর সকলেই- যারা যেখানে আছে, সেখানকার নিকটস্থ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ ও সকল অস্ত্র সমর্পণ করবে।"
"এই দলিল স্বাক্ষরের সময় থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কর্তৃপক্ষ লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীনস্থ বলে বিবেচিত হবে। কোনো প্রকার অবাধ্যতা আত্মসমর্পণের শর্ত ভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং যুদ্ধের স্বীকৃত ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা গৃহীত হবে। যদি আত্মসমর্পণের কোনো শর্তের ব্যাখ্যা বা অর্থ সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।"
"লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এ আশ্বাস প্রদান করেছেন যে, আত্মসমর্পণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির প্রতি জেনেভা কনভেনশনের শর্ত অনুযায়ী একজন সৈনিকের প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করা হবে এবং আত্মসমর্পণকারী সকল সামরিক ও আধা-সামারিক ব্যক্তির নিরাপত্তা ও সুব্যবস্থার অঙ্গীকার প্রদান করছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীনস্থ সেনাবাহিনী সকল বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের নিরাপত্তা প্রদান করবে।"
জগজিৎ সিং অরোরা। আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি
লেফটেন্যান্ট জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল
জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ সামরিক আইন প্রশাসক
ভারত-বাংলাদেশ বাহিনী পূর্ব রণাঙ্গন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড (পাকিস্তান)
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
সারসংক্ষেপ
নিয়মিত বাহিনী: দক্ষ ট্রেনিং প্রাপ্ত মুজিবনগর সরকারের নির্ধারিত সরকারি বাহিনী হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের নিয়মিত বাহিনী। এ বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্য। এ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ১৮,৬০০ জন। এদের সামরিক বেতন ভাতা দেওয়া হতো। এ বাহিনী নিয়েই ৩টি ফোর্স গঠন করা হয়।
স্বাধীন বাহিনী: নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনী ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ বাহিনী গড়ে ওঠে। দেশ স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এ সকল বাহিনী নিজেদের প্রচেষ্টায় অস্ত্র যোগার করে ট্রেনিং দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই সরকারের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া এ বাহিনী যুদ্ধ করেছে এবং কৃতিত্ব রেখেছে। স্বাধীন বাহিনীর মধ্যে মুজিব বাহিনী, আফসারী বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী উল্লেখযোগ্য।
শাস্তি কমিটি: মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যে সংগঠনটির জন্ম হয় তা হলো শান্তি কমিটি। পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল টিক্কা খানের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জামায়েত ইসলাম কাউন্সিল মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন ইসলামি দলগুলোর সহায়তায় এ কমিটি গঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা মহানগরীর কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি খাজা খায়েরুদ্দিন ছিলেন ঢাকা জেলা শান্তি কমিটির আহ্বায়ক। শান্তি কমিটি পাকবাহিনীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে।
বুদ্ধিজীবী দিবস: ২৫ মার্চ-এর কালরাত থেকে নয় মাসে পাকবাহিনীর নৃশংস হত্যার সর্বশেষ নজির ছিল ১৪ ডিসেম্বর বাংলার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা। মনীষী গোর্কি বলেছিলেন, মাছের যেমন পচন শুরু হয় মাথা থেকে, তেমনি কোনো জাতির অধঃপতনের সূত্রপাত হয় মস্তিষ্ক থেকে। গোর্কির এই উক্তি অনুসরণ করেই সম্ভবত পাকবাহিনী বাংলার বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল, যাতে বাঙালিকে মেধাশূন্য করা যায়। পাকবাহিনীর এই পরিকল্পনায় সহযোগিতা করেছিল এ। দেশীয় আলবদর, আলশামস এবং রাজাকার বাহিনী। বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরি করে তাদের ধরে আনা হয় ঢাকার মিরপুরের শিয়ালবাড়ি, মোহাম্মদপুরের রায়ের বাজার বদ্ধ ভূমিসহ বিভিন্ন স্থানে এবং তাদের হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর লাশের স্তূপে যাদের পাওয়া গিয়েছিল তাদের সকলের হাত-পা, চোখ বাঁধা ছিল। বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ স্মরণ রাখার জন্য স্বাধীনতার পর ১৪ ডিসেম্বর (বুদ্ধিজীবী হত্যার দিনটি) বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে সরকার ঘোষণা করে।
বেসরকারিভাবে শহিদ বুদ্ধিজীবীদের যে তালিকা পাওয়া যায় তাতে ১১০৯ জন বুদ্ধিজীবীর কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ৯৮৯ জন শিক্ষাবিদ, ৪১ জন আইনজীবী, ৫০ জন চিকিৎসক, ১৩ জন সাংবাদিক, ১৬ জন কবি-সাহিত্যিক। শিক্ষাবিদদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ফজলুর রহমান, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্যসহ ১৭ জন। চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আলিম চৌধুরী, শামসুদ্দীন প্রমুখ। সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন, শহীদুল্লাহ কায়সার, নিজামুদ্দিন আহমদ প্রমুখ। আইনজীবী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, নাজমুল হক সরকার, আবদুল জব্বার প্রমুখ। চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। প্রকৌশলী সামসুদ্দিন, নজরুল ইসলাম, সেকান্দার হায়াত চৌধুরী এবং গীতিকার আলতাফ মাহমুদ প্রমুখ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ: ৩০ লক্ষ শহিদ এবং ২ লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের মহান স্বাধীনতা।
বিশ্বের মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকায় পরিচিত একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ। যাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি
রাষ্ট্র, একটি পতাকা ও. বাঙালি জাতির সম্মান। তাদের স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার সাভারের
নবীনগরে নির্মিত করেছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ৮৪ একর আয়তনের ওপর নির্মিত সৌধটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট
জেনারেল হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সৌধটির শুভ উদ্বোধন করেন। ৭টি ফলকে ১৫০ ফুট বা ৪৬.৫০ মিটার উচ্চতার
সৌধটির স্থপতি সৈয়দ মাঈনুল হোসেন। ত্রিভুজাকৃতির সৌধটি নির্মাণে কংক্রিট ও সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়। জাতীয়
স্মৃতিসৌধটির ৭টি ফলকের তাৎপর্য হচ্ছে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যে সাতটি পর্যায় (১৯৫২-এর ভাষা
আন্দোলন, ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর
গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর অসহযোগ আন্দোলন এবং ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ) আন্দোলন হয়েছিল তার এক একটি
আন্দোলনকে এক একটি ফলকের প্রতীক হিসেবে বুঝানো হয়েছে। অনেকে আবার ৭টি ফলককে রংধনুর সাত রং-এর
সাথে তুলনা করেন। জাতীয় দিবসগুলোতে জাতীয় নেতৃবৃন্দ এই স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতীয় বীর সন্তানদের
প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন-জে. এম. বেলাল হোসেন সরকার স্যার এর লেখা বই
Read more