সময়ের মূল্য
ভূমিকা: ক্ষনিকের এই সময়ে মানুষ কত কিছুইনা করে। কেউ কষ্ট করে টাকা পয়সা রোজগার করে ধনী হওয়ার জন্য কেউবা কষ্ট করে নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত করার জন্য। যে যাই হতে চাক না কেন সব কিছুর জন্য প্রয়োজন সময়। কারন ক্ষনিকের এই পৃথিবীতে নিজেকে সফল করার জন্য প্রয়োজন সময়ের মূল্য দেয়া। নিজেকে সফল ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সময়কে শ্রদ্ধা করা, সময়ের হিসেব করে চলা। পৃথিবীতে যত বড় বড় জ্ঞানী এবং বিখ্যাত ব্যক্তি বর্গ ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছে তারা সবাই ছিলেন সময়ের প্রতি অনেক নিষ্ঠাবান ছিলেন। কথায় আছে "সময় এবং স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করেনা।" নদীর পানি যেমন চলমান তেমনি সময়ও চলমান। সময় তার গতিতে চলে তাকে কখনো আটকে রাখা যায়না। এই পৃথীবিতে তারাই সফল হতে পারে বা জয়মাল্য তারাই পায় যারা সময়ের মূল্য বোঝে। সুতরাং, মহামূল্যবান এই সময়কে কখনো অবহেলা করা উচিৎ নয়।
সময়ের মূল্য: "মহাকাল ছুটিছে অনন্ত ধায় কেহ তারে ধরিতে নাহি হায়।" যখন পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল তার আগ থেকে সময় তার নিজের গতিতে চলছে তো চলছেই। তার যাত্রা অসীমে। সারা জীবন ধরে কেউ যদি অধ্যাবসায় করে তবু সময় কে তার গতি থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। কেউ সময়কে আটকে রাখতে পারবেনা।
সময় হচ্ছে অমূল্য একটি সম্পদ। যাকে কখনো কেউ কিনতে পারবেনা। পৃথিবীতে অনেক কিছু কেনা গেলেও এই অমুল্য সম্পদ কে কখনো কেনা সম্ভব নয়। অনেক কিছুর আর্থিক মূল্য নিরুপন করা গেলেও সময়ের যে মূল্য রয়েছে তা নিরুপন করা সম্ভব নয়। বহমান নদী যেমন সাবলীল এবং প্রবাহমান সময় ঠিক তেমনি। এক সেকেন্ডের জন্যেও তার স্থির হওয়ার অবকাশ নেই। মানুষ এবং এই পৃথীবির সব কিছু একদিন থেমে যাবে কিন্তু দুরন্ত এই সময় তার গতিতে চলতেই থাকবে। তাই কবি Banjamin Franklin লিখেছেন- "You can't keep today's hour for tomorrow." অর্থাৎ আজকের কাজ কালকের জন্য রেখনা। আজ যে কাজটি করবে বলে কালকের জন্য রেখে দিবে কাল সেই কাজ করার সময় ও সুযোগ নাও পেতে পার। প্রকৃতির নিয়মে সময়ের সাথে সাথে আমাদের কাজও শেষ করা উচিৎ। কিন্তু সেটা অবহেলায় যদি কালকের জন্য ফেলে রাখি তাহলে এই সেই কাজ কখনোই সম্পন্ন করা হবেনা। এক সময় অন্য কাজের নিচে চাপা পরে যাবে। তাই সময়ের কাজ সময়ে করা উচিৎ।
সময়ের মূল্য নিয়ে ধর্ম যা বলেঃ মহান আল্লাহতালা বলেছেন, "সময়ের আদি এবং অন্ত নেই, আমিই সময়।" আল্লাহতালা সব কিছুর জন্য সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। মুসলিমরা দিনে যে পাচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। সেই নামাজের জন্যেও সময় বেধে দেয়া আছে। ফজরের নামাজ যেমন জোহরে পরলে হবেনা, তেমনি জোহরের নামাজও ফজরে পরলে হবেনা।
ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) সময়ের ব্যপারে অনেক সচেতন ছিলেন। তিনি সব সময় সঠিক সময়ে নামাজ আদায় করতেন, তার সব কাজ সঠিক সময়ে করতেন। হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন, "যদি কোনো মুমিন অন্য কোনো মুমিনের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে সাক্ষাতের ওয়াদা করে এবং সময়মত হাজির না হয় তবে তার উপর খোদার লানত বর্ষিত হতে থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ সে ঐ মুমিনকে অপেক্ষায় রাখে।"
সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করাঃ বাংলার লোক কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে এ হাহাকার "এপার গঙ্গা ওপর গঙ্গা, মধ্যখানে চর " অর্থাৎ এপার বলতে কবি বুঝিয়েছেন জন্ম, ওপার বলতে কবি মৃত্যুকে বুঝিয়েছেন এবং মধ্যখানে চর বলতে জীবনের সীমাবদ্ধ সময় কে বুঝিয়েছেন। এই ছোট্ট এবং সীমাবদ্ধ সময়ে নিজেকে সফল ব্যক্তি এবং স্বপ্ন পুরন করতে চাইলে প্রয়োজন সময়ের সঠিক মূল্যায়ন। নির্দিষ্ট সময়ের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা। তবেই নিজেকে ব্যক্তিত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। যুগ যুগ ধরে বিখাত মনিষী, বিজ্ঞানী, জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাই করে গেছেন। তাই তারা ইতিহাসের পাতায় চির স্বরনীয় হয়ে আছেন।
সময়ের বৈশিষ্ট্যঃ কবি বলেছেন, "সময় হলো এক অমোঘ সত্য যা আমাদের সবাইকে একদিন ছাড়িয়ে যাবে।" অর্থাৎ সময় তার নিজস্ব গতিতে চলে। সে আপন গতিতে চলে কারো জন্য থামেনা। সব কিছুর যেমন নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে ঠিক তেমনি সময়েরও রয়েছে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য। সময়ের বৈশিষ্ট্য হলো এর গতিশীলতা। সময় কে জগতের কোনো নিয়মে বাধায় সম্ভব না। কেউ সময় কে তার নিয়ন্ত্রনে আনতে পারবেনা। কেয়ামত পর্যন্ত সময় তার নিজের গতিতে চলবে তার অস্তিত্ব বিরাজমান থাকবে। ঘড়ির কাটা সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে সময় অতীত কে আরো ভারী করে তোলে। আল্লাহ ছাড়া সময়কে ধরে রাখার ক্ষমতা আর কারো নেই। এখন যে সময় চলে যাচ্ছে একটু পর এই সময় অতীত হয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ হলো মরিচীকার মত। কখনোই ভবিষ্যৎ কে হাতের মুঠোয় পাওয়া যায়না।
সময়ের সদ্ব্যবহারঃ ফকির লালন সাই বলে গেছেন তার গানে- "সময় গেলে সাধন হবেনা দিন থাকিতে দিনের সাধন কেন করলেনা।"
এই গানটির মাধ্যমে লালন সাই বোঝাতে চেয়েছেন যে সময় কে তুমি আজ অবহেলা করছ, যে কাজ ফেলে রাখছ পরের দিন করার জন্য সেই সময় কখনো ফিরে পাওয়া যাবেনা। যদি আমরা সময়ের সদ্ব্যবহার না করি তাহলে আমাদের সকল স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে, কোনো আশা পুরন হবেনা। আমাদের সাধনা কখনোই স্বার্থক হবেনা। " দিন থাকিতে দিনের সাধনা কেন করলেনা" এই লাইনটির মানে হচ্ছে মানুষ যখন সময় কে অবহেলা করে সময় ফুড়িয়ে ফেলে আফসোস করতে থাকে, সেই কান্না এবং আফসোস বৃথা। কারন সময় থাকতে সময়ের মর্ম না বুঝে আফসোস করা বোকামি। জীবনের লক্ষ্য পূরনের জন্য সময় থাকতে সময়ের কাজ শেষ করতে হবে, তবেই আমাদের স্বপ্ন পূরন হবে। লালন সাই এই গানের মাধ্যমে এই মুল্যবান কথাটিই বোঝাতে চেয়েছেন।
সময়ের সদ্বব্যবহার করে অনেক মানুষ তাদের স্বপ্ন পুরন করেছেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনষ্টাইন মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে আপেক্ষিকতা তত্বের আবিষ্কার করেন। তার জীবনী থেকে জানা যায় সময়ের ব্যপারে অনেক সতর্ক ছিলেন। তাইতো মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে এমন জটিল একটি তত্ব আবিষ্কার করতে পেরেছেন।
ছাত্রজীবনে সময়ের মূল্যঃ ছাত্রজীবন কে বলা হয় জীবন সংগ্রামের প্রস্ততির সময়। এই সময় আমরা নিজেকে যেভাবে পরিচালিত করব ভবিষ্যতে ঠিক সেরকম ফলাফল পাব। এই সময় যে বীজ বপন করা হয় ভবিষ্যতে ঠিক তেমন ফল পাওয়া যায়। ছাত্রজীবনে অধ্যায়ন হচ্ছে প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। প্রতিদিনের পড়া পরবর্তী সময়ের জন্য ফেলে না রেখে প্রতিদিন শেষ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
ছাত্রজীবনে পাঠাভ্যাসের পাশাপাশি শরীরচর্চা, চরিত্রগঠন এবং সংযমের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এক জন ছাত্র তার ছাত্রজীবনে যত পরিশ্রম করবে তার কর্মজীবন তত সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এই সাফল্য নির্ভর করে একজন ছাত্রের সময়ের সঠিক মূল্যায়নের উপর। সুতরানফ, শৈশব থেকে সময়ের প্রতি সবার শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিৎ। ছাত্রজীবনে যারা সময় নষ্ট করেনা, দৈনন্দিন কর্মসূচিকে অবহেলা করেনা তারাই ছাত্রজীবনে সোনার কাঠির পরশ পায়। তাইতো এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছেন, " সময়ের প্রতি যাদের শ্রদ্ধা নেই, তারাই পৃথিবীতে নিঃস্ব, বঞ্চিত ও পরমুখাপেক্ষী।"
জাতীয় জীবনে সময়ের মূল্যঃ ছাত্রজীবনের মত জাতীয় জীবনে সময়ের মূল্য অপরিসীম। যে জাতি কর্মতৎপর নয় সে জাতি কখনো এগিয়ে যেতে পারেনা। তাদের জীবনে শুধু পতন আছে কোনো উত্থান থাকেনা। একটি জাতি আলস্য, ঔদাসীন্য, অনিয়মানুবর্তিতার কারনে চিরতরের জন্য একটি সভ্যতা থেকে মুছে যেতে পারে। আমাদের দেশের সাথে যদি উন্নত দেশ গুলোর তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে তারা সময়ের ব্যপারে অনেক সচেতন, সবাই প্রচন্ড অধ্যাবসায়ী। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা সবার কাছেই অলস হিসেবে পরিচিত। কারন আমাদের কোনো সময় জ্ঞান নেই। পরনিন্দা, পরচর্চা করে আমরা আমাদের সময়কে হেলায় নষ্ট করি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারনে জাপান একদম নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল কিন্তু তাদের সময়নুবর্তীতার কারনে আজ তারা উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছে। আজ তারা বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে দাড়িয়েছে। তাই আমরা যদি আমাদের দেশের উন্নতি করতে চাই জাতি হিসেবে নিজেদের জাপানিদের মত উন্নত করতে চাই তাহলে অবশ্যই সময়কে গুরুত্ব দিতে হবে এবং সময়ের কাজ সময়ে করতে হবে। তাইতো স্পানিশ দার্শনিক ব্যালটাজার গার্সিয়ান বলেছেন, "যার হাতে কিছুই নেই, তার হাতেও সময় আছে। এটাই আসলে সবচেয়ে বড় সম্পদ"
সময়ই শ্রেষ্ঠ সম্পদঃ মানব জীবন গঠিত কতকগুলো মুহূর্তের সমষ্টি নিয়ে। তাই প্রতিটি মুহূর্তই মানুষের জন্য মহামূল্যবান। অনেকে সময়কে ক্ষুদ্র বলে অবমূল্যায়ন করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে সময়ের ক্ষেত্রে সামান্য বলে কোনো কিছু নেই। সময় হচ্ছে অসামান্য জিনিস। জীবনে এক সেকেন্ডের অপচয় করলেও জীবন থেকে অনেক সম্ভাবনাময় জিনিস মানুষ হারিয়ে ফেলে। যদি কেউ সময় কে জীবনে কাজে লাগায় তাহলে সেই ব্যক্তি তার জীবনে সফলতা অর্জন করতে পারে। সময় কে ভালভাবে কাজে লাগাতে পারলে ধন সম্পদ, বিদ্যা- বুদ্ধি, যশ খ্যাতি সব - কিছু অর্জন করা সম্ভব।
সময়ের গুরুত্বঃ আমাদের জীবন ক্ষনস্থায়ী। কিন্তু কাজের মাধ্যমে যে গৌরব অর্জন করি তা ক্ষনস্থায়ী। মানব জীবনে অফুরন্ত শিক্ষা রয়েছে, রয়েছে অপরিমেয় কর্তব্য, আর কর্ম জগতের পরিধি ক্রমবর্ধমান। তাই সময় কে সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়ে জীবনের কাঙ্খিত লক্ষে পৌঁছানো উচিৎ। সঠিক সময়ে ফসলের বীজ বপন করলে যেমন শস্যের উৎপাদন ভাল করা যায়, রোগে আক্রান্ত হলে যেমন সঠিক সময়ে ওষুধ খেতে হয়, তেমনি সঠিক দায়িত্বের মাধ্যমে নিয়মিত পাঠাভ্যাসের মাধ্যমে পরীক্ষায় কাঙ্খিত ফলাফল লাভ করা যায়। তাইতো কবি বলেছেন, "সময়ের গুরুত্ব বুঝে করা যারা কাজ। তারা আজ স্মরনীয় জগতের মাঝ।" সময়ের মূল্যায়ন ও জীবনে সাফল্য সময় গতিশীল তাই তাকে কখনো থামিয়ে রাখা যায়না। সময় কে কোনো কিছু দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়। সে কোনো লোভ বা ভয়ের পরোয়া করেনা। সময় প্রকৃতিগত ভাবেই নিষ্ঠুর ও নির্মম। অথচ সময়কে সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়ে জীবনে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। যারা সময়কে সঠিক ভাবে কাজে লাগায় তারাই জীবনে সফল হয়। কিন্তু তারা সময় কে অবহেলা করে, হেলা করে তাদের জীবনে সম্ভাবনার সকল দ্বার বন্ধ হয়ে যায়, জীবনে ভয়াবহ পরিনতি ডেকে আনে।
সময়নিষ্ঠ ব্যক্তি ও জাতির উদাহরণঃ জগতে যারা ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তারা সময়ের প্রতি অনেক নিষ্ঠাবান ছিলেন। তারা কেউ সময়ের ব্যপারে উদাসীন ছিলেন না। তারা জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত কে মেপে মেপে ব্যবহার করেছেন। কোনো জড়তা বা অলসতা তাদের গ্রাস করতে পারেনি। আব্রাহাম লিংকন সামান্য শ্রমিক থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন সময় কে কাজে লাগিয়ে। ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) তার জীবনের প্রতিটি সময় কে কাজে লাগিয়েছেন। এরিষ্টটল আলেকজেন্ডারের গৃহশিক্ষক থেকে সময়কে কাজে লাগিয়ে হয়েছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শেরে বাংলা ফজলুল হক, আইনস্টাইন এবং টমাস আলভা এডিসন সহ বিখ্যাত ব্যক্তিগন তাদের সময়কে কাজে লাগিয়ে আজ চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
সময়নিষ্ঠ জাতি হিসেবে ইংরেজ, আমেরিকান, জাপানি, ভিয়েতনামি, চাইনিজ এরা বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে আছে। সময়কে কাজে লাগিয়ে যে উন্নতির চরম শিখরে পৌছানো যায় এই জাতি গুলো তা দেখিয়েছেন। আমাদের মত অউন্নত দেশের কাছে তারা আজ রোল মডেল।
উপসংহারঃ ছোট্ট এই জীবনে উন্নতি করতে চাইলে সময়ের মূল্য দেয়ার বিকল্প কিছু নেই। আমাদের জীবনকে মহিমান্বিত করতে পারে সময়ের সঠিক ব্যবহার। মানুষের জীবন মহামূল্যবান তাই মহামূল্যবান এই জীবনকে সময় অপচয় করে নষ্ট হতে দেয়া উচিৎ নয়। অতীতে যারা সফল ব্যক্তি হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে তারা সবাই অনেক নিষ্ঠাবান ছিলেন। ভবিষ্যতেও তারাই সফল হবেন যাদের সময় জ্ঞান আছে।
বিজয় দিবসের তাৎপর্য
উপস্থাপনা:
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বরে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হয় এই দিনে। তাই প্রতি বছর এই দিনটি যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা:
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায়। মধ্যরাতের পর তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। তবে গ্রেফতারের আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিবাহিনী রুখে দাঁড়িয়ে গণহত্যাকারী পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিহত করতে থাকে। প্রতিবেশী ভারত অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। জয় হয় বাঙালির। জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
বিজয়ের প্রকৃত অর্থ:
প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আমাদের জীবনে নিয়ে আসে সংগ্রামী বিজয়ের স্মৃতি। জীবনকে গৌরবান্বিত তোলার শপথ এ পবিত্র দিনটি থেকেই আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে। বিজয় অর্জন বড় কথা নয়, তার সুফলকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়াই বড় কথা। 'স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন'- এ আপ্তবাক্যটিকে আমাদের ভুলে গেলে বিজয় দিবসের তাৎপর্য অর্থহীন হয়ে পড়ে।
পটভূমি:
১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তঝরা সংগ্রামের পর ১৬ই ডিসেম্বরে মহান বিজয় সাধিত হয়েছে। কিন্তু এই স্বাধীনতা মূলত এই নয় মাসের ফসল নয়, এর শুরু হয়েছে অনেক আগে। ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত আমাদের দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রায় দশ বছর শাসনের পর ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিলে বাংলাদেশ হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ।
পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ছিল দুটি আলাদা ভূখণ্ডে বিভক্ত। পূর্ববাংলা পরিচিত ছিল পূর্ব পাকিস্তান নামে। অন্যটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। প্রথম থেকেই পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। তারা পূর্ব পাকিস্তানিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করত।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষ প্রথম তাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচার, দুঃশাসন পূর্বপাকিস্তানের মানুষ মুখ বুজে সহ্য করেনি। '৬২, '৬৬-এর ছাত্র আন্দোলন এবং '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা বুঝিয়ে দেয় বাঙালি কারো হাতে বন্দি থাকতে রাজি নয়।
বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট:
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে পাকিস্তান রাষ্ট্র। বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে তখন উক্ত রাষ্ট্রের একটি প্রদেশ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। তাদের দুঃশাসন ও অর্থনৈতিক শোষণে এদেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও তাদের নিকট শাসনভার না দিয়ে চালাতে থাকে ষড়যন্ত্র।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' বলে জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। সারা বাংলায় শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাক সেনাবাহিনী এদেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যাপক গণহত্যা চালায়।
একই রাতে তারা বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে হামলা চালায়। কিন্তু গ্রেফতারের আগেই ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর পাক সেনাবাহিনীর প্রধান আত্মসমর্পণ করলে এদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এ কারণে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস।
স্বাধীনতা সংগ্রাম:
স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এদেশের সর্বস্তরের জনগণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাতৃভূমিকে শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে এদেশের জনগণ। পাকিস্তানিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি এ দেশের শিশু, বৃদ্ধ, যুবক, নারী। ঘরবাড়ি, দোকানপাট সবকিছু তাদের গোলার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
এসব অত্যাচারের মুখে বাঙালিরাও বসে থাকেনি। দেশের সবখানে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, কৃষকসহ সাধারণ জনতাকে নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। মুক্তিবাহিনী দেশের সীমান্তে এবং দেশের ভিতরে যুগপৎভাবে শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে।
বিজয় দিবসের কর্মকান্ড:
দিবসটির সূচনা হয় একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে। ভোর বেলা থেকেই সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়। সবাই মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের প্রতি সম্মান জানাতে সেখানে সমবেত হয়। প্রতিটি বাড়ি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। রাস্তাঘাট বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়।
সন্ধ্যাবেলায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়। বেতার ও টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। পত্রপত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র ও সাময়িকী প্রচার করে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আগত ছাত্রছাত্রীরা জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করে। তারা এ সময় বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণকারীদের অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং শারীরিক কসরৎসহ বিভিন্ন খেলাধুলা উপভোগ করেন। এ দিনে মসজিদে মসজিদে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহিদদের জন্য মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও একইভাবে শহিদদের বিদেহী আত্মার উদ্দেশ্যে শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করা হয়। দেশের সকল শিশুসদন, জেলখানা, হাসপাতাল ও ভবঘুরে কেন্দ্রে এ দিনে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে, পাড়ায়-মহল্লায় সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিজয়ের সেই পরিবেশ:
ঢাকায় ১৬ই ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়। আত্মসমর্পণের দৃশ্য দেখার উদ্দেশে হাজার হাজার নারী-পুরুষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। জনপদে কোথাও তিলমাত্র ঠাঁই নেই। মৃদু চলার গতিতে আনন্দের আতিশয্যে তারা আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে।
তাদের হৃদয়ভরা আবেগ প্রকাশ পাচ্ছিল। আজ জাগ্রত জনতার বিজয় দিবস। আজ নব উদ্যমের জোয়ার এসেছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর খুশিতে যেন ফেটে পড়ে। সমগ্র ঘরবাড়ি, দালান-কোঠার শীর্ষদেশে শোভা পায় রক্তরঙিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।
বিজয় দিবসের ইতিহাস:
বিজয় মহান, কিন্তু বিজয়ের জন্য সংগ্রাম মহত্তর। প্রতিটি বিজয়ের জন্য কঠোর সংগ্রাম প্রয়োজন। আমাদের বিজয় দিবসের মহান অর্জনের পেছনেও বীর বাঙালির সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাস রয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় প্রথম থেকেই বাঙালিদের মনে পশ্চিমা শোষণ থেকে মুক্তিলাভের ইচ্ছার জাগরণ ঘটে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নানা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা প্রবল আকার ধারণ করতে থাকে। অবশেষে বাঙালির স্বাধিকার চেতনা ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে রূপ লাভ করে। বাঙালির স্বাধিকারের ন্যায্য দাবিকে চিরতরে নির্মূল করার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালি-নিধনের নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে।
এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাঙালিরা রুখে দাঁড়ায়। গর্জে ওঠে, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলে। কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পী-সাহিত্যিক, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান- বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাইকে নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশমাতৃকার মুক্তিসংগ্রামে। সুদীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ চলে।
অবশেষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এদেশের মুক্তিসেনা ও মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘ রক্তাক্ত সংগ্রামের অবসান ঘটে। বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। অর্জিত হয় বাংলাদেশের মহান বিজয়।
আত্মসমর্পণ:
বাংলাদেশ সময় বিকাল ৫টায় আত্মসমর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পাক বাহিনীর অধিনায়ক লে. জে. নিয়াজী, রাও ফরমান আলী ও তিরানব্বই হাজার সৈন্যের নিয়মিত বাহিনী যুদ্ধবন্দি হয়। তাদেরকে বন্দি শিবিরে নিয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়া হয়।
বিজয় দিবসের গুরুত্ব:
স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসে প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ শাহাদাত বরণ করেছে। তাদের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের মহান স্বাধীনতা। আমরা সেই শহিদদের কাছে চিরঋণী। আমাদের সব কর্ম ও উন্নয়ন চেতনার মূলে রয়েছে শহিদদের আত্মত্যাগ। তারাই আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব।
চূড়ান্ত বিজয়:
১৯৭০ সালের নির্বাচনে এদেশের মানুষ পূর্ববাংলার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিরা এদেশের মানুষের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা না দিয়ে দমনের পথ বেছে নেয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সৈন্যরা এদেশের নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হত্যা করে অসংখ্য বাঙালিকে। এ বর্বরতা বাঙালিদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। তারাও প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়।
২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালিদের অসীম সাহস, দেশপ্রেম এবং বীরত্বের কাছে পরাজিত হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। ঐ দিন বাংলার আকাশে বিজয়ের লাল সূর্য উদিত হয়। চারদিকে মানুষের মনে মুক্তির আনন্দ হিল্লোল জেগে ওঠে।'
৭১-এর বিজয়োল্লাস:
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলার আকাশে উদিত হয়েছিল মুক্তির লাল টকটকে সূর্য। স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে মানুষ সেদিন মুক্তির আনন্দে রাজপথে নেমেছিল। মুক্তির উল্লাসে মুখরিত ছিল বাংলার আকাশ-বাতাস। ১৯৭১ সালের এই বিজয়ের দিনটি ছিল বাঙালির মহা উৎসবের দিন। এর চেয়ে আনন্দের দিন বাঙালির জীবনে আর আসেনি।
বিজয় দিবস ও আমাদের প্রত্যাশা:
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পেরিয়ে গেছে। রাজনৈতিক মুক্তি অর্জিত হলেও দেশের আপামর জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আজো অর্জিত হয়নি। প্রতিবছর বিজয় দিবসের আদর্শ আমাদের কর্ণকুহরে যে বার্তা শোনায়, বাস্তব জীবনে আমরা তা ভুলে যাই বার বার।
তবু বিজয়দিবসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রতিজ্ঞায় ঋদ্ধ হয়ে উঠি আমরা। আমরা বিজয়ের তাৎপর্যকে যথার্থতা দানে সফল হলেই এ দিবস উদযাপনের সার্থকতা ফুটে উঠবে।
বিজয় দিবসের উৎসব:
১৬ ডিসেম্বর ভোরে সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসটির শুভ সূচনা হয়। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মহাসমারোহে বিজয় দিবস পালন করে। ১৫ ডিসেম্বর রাত থেকেই বিজয় দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি চলে। দেশের সব স্কুল- কলেজ, বাড়ি, দোকানপাট, ভবন ও যানবাহনে শোভা পায় লাল-সবুজ পতাকা। স্কুল-কলেজ কিংবা রাস্তায় রাস্তায় আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।
স্বাধীনতার আনন্দে সব শ্রেণির মানুষ যোগ দেয় এসব অনুষ্ঠানে। কোথাও কোথাও বসে বিজয় মেলা। সরকারিভাবে এদিনটি বেশ জাঁকজমকভাবে উদযাপন করা হয়। ঢাকার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষ এই কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন।
অনেক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিশেষ ক্রোড়পত্র। বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের আত্মার শান্তি ও দেশের কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করা হয়। শহরে সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় আলোকসজ্জার। দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বিজয় দিবস উদ্যাপিত হয়।
বিজয় দিবসের তাৎপর্য:
বাঙালির জীবনের এক ঐতিহাসিক দিন ১৬ই ডিসেম্বর। শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অর্জিত বিজয় আমাদের চেতনায় চির অম্লান। আমাদের জাতীয় জীবনে তাই এ বিজয় দিবসের বিশেষ তাৎপর্য আছে। এ বিজয় আমাদের এনে দিয়েছে মুক্ত জীবনের স্বাদ। আমরা এখন স্বাধীন। এ বিজয়ের ফলে আমরা পেয়েছি একটি পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ।
পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছি নিজেদের অবস্থান। এ পাওয়া আমাদের অনেক বড় পাওয়া। এ বিজয় আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। সমগ্র বিশ্বের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের প্রেরণা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর অশিক্ষার বিরুদ্ধে নতুন সংগ্রামে বিজয় দিবস আমাদের প্রেরণার উৎস।
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাঙালি জাতি অবতীর্ণ হয়েছিল '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে। লাখো শহিদের সেই স্বপ্ন-সাধ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বিজয় দিবসের চেতনা চিরজাগ্রত রাখা সম্ভব।
বিজয় দিবস উদযাপন:
বাঙালি জাতি এদিনই স্বাধীন জাতি হিসেবে দীর্ঘদিনের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে সগৌরবে জয়যাত্রা শুরু করেছে। তাই প্রতিবছর যথাযোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিজয় দিবস উদযাপিত হচ্ছে। এ দিনে সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ দিনটি সরকারি ছুটির দিন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোভাযাত্রা, র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা প্রভৃতির মাধ্যমে দিবসটিকে উদযাপন করে থাকে।
বিজয় দিবসের চেতনাঃ
বিজয় দিবস একটি অমূল্য ঐতিহাসিক দিন, যা আমাদের মনে জাগায় স্বাধীনতা, সাহস এবং জনগণের একত্রীকরণের চেতনা। এই দিনটি আমাদেরকে জাতীয় গর্ব এবং অভিমান দেয়, সেই গর্বের সাথে আমরা স্মরণ করি কীভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা বিপ্লব, সংগ্রাম এবং বিজয়ের জন্য অসংখ্য বিপন্ন করেছিলেন।
বিজয় দিবসের চেতনা আমাদের মনে জাগিয়ে দেয় যে সংগ্রাম, সঙ্গে একত্রিত জনগণের সংঘর্ষ এবং অপরাজেয়তা পরাজিত করতে সক্ষম হয়। এই চেতনা আমাদের মনে জাগিয়ে দেয় যে কোন প্রতিবাদ, যুদ্ধ, বিপণ্ড বা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সত্য, ন্যায় এবং মানবিকতা জয়লাভের জন্য সম্পূর্ণ সংগ্রাম করা উচিত।
আমাদের করণীয়:
অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের পর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তাই বিজয় দিবস আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এদিন উদযাপনের পাশাপাশি শহিদদের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানাব।
উপসংহার:
বহু রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের বিজয়। এ বিজয় বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় গৌরবের ধন। যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস পালন করা হয়। বিজয়ের চেতনা জাতির সব কর্মকাণ্ডে প্রবাহিত করতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প
ভূমিকা
আধুনিক বিশ্বে শিল্পায়নের ধারণা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষের পরিধেয় কাপড়ের উৎপাদন এক সময় শিল্প হিসেবেও পরিচিত ছিল। আজ অনেক দেশে শিল্পায়নের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্প নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনার সংযোজন আমাদের বাংলাদেশেও ঘটেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশে পোশাক রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। প্রকৃতপক্ষে, পোশাক শিল্প জাতীয় আয়ের প্রায় 64 শতাংশ জোগান দেয়। তাছাড়া এই শিল্প অনেক বেকারের কর্মসংস্থান করেছে। তাদের অধিকাংশই নারী। এর ফলে একদিকে যেমন নারীদের অর্থায়ন ও ক্ষমতায়নের কিছু সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে পুরুষের লাঞ্ছনার হাত থেকেও রক্ষা পাচ্ছে। পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের দ্বারা শোষিত হলেও সামগ্রিকভাবে এই শিল্প আমাদের দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অতীত অবস্থা
সুদূর অতীত থেকেই বিশ্ববাজারে বাংলার পোশাক শিল্পের যথেষ্ট চাহিদা ছিল। বিশেষ করে মসলিন ও জামদানি নামক সুক্ষ্ম কাপড় ছিল বিশ্ব বিখ্যাত। কিন্তু ব্রিটিশদের আগমনে পোশাক শিল্প অনেকাংশে ধ্বংস হয়ে যায়। তারা তাঁতশিল্পকে ধ্বংস করার জন্য নানা পরিকল্পনা করে। কাপড়ের বাজার তৈরির জন্য তারা মেশিনের মাধ্যমে বস্ত্র তৈরি শুরু করে। ফলে এক পর্যায়ে পোশাক শিল্প তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারাতে থাকে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বর্তমান অবস্থা
দীর্ঘ যাত্রার পর বাংলাদেশ তার তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বস্ত্র খাতে তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে চাইছে। এই শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি উৎসাহব্যঞ্জক অবদান রেখে চলেছে। তবে বস্ত্র খাতের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ কিছু শিল্প পণ্য বিদেশে রপ্তানি শুরু করে। 1977 সালে, বেসরকারী শিল্প উদ্যোক্তাদের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের বিকাশ ঘটে। তখন মাত্র কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল।
1985 সালে তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। শুরুতে ১৫০টি পোশাক কারখানা ছিল। এই সীমিত সংখ্যক কারখানা দিয়ে পোশাক শিল্পের সূচনা হলেও শিল্পপতিরা ধীরে ধীরে কারখানার সংখ্যা ও শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ান। দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্রিয় ভূমিকার কারণে এসব শিল্পের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৮ লাখ লোক কর্মসংস্থান করেছে, যার মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি, প্রায় ৮৫%।
পোশাক শিল্পের ইতিহাস
জীবনধারণের জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি সমাজে বসবাসের জন্য মানুষের বস্ত্রের প্রয়োজন। প্রাচীনকালে, লোকেরা লতা, পাতা, বাকল এবং পশুর চামড়া দিয়ে তাদের বস্ত্রের চাহিদা মেটাত এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তন্তু, সুতা এবং কাপড়ের প্রচলন হয়। কবে, কবে এবং কোথায় প্রথম কাপড়ের ব্যবহার শুরু হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও এক সময় মানুষ সুই সুতো দিয়ে সেলাই করে নিজেদের কাপড় তৈরি করত। ধীরে ধীরে মানুষ সেলাই মেশিনের সাহায্যে কাপড় তৈরি করতে থাকে। সেলাই মেশিনের সাহায্যে মানুষের কাপড় সেলাইয়ের ইতিহাস মাত্র 260 বছর আগের গল্প। সেলাই মেশিন উদ্ভাবকদের প্রাচীন ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রেডরিক 1755 সালে প্রথম যান্ত্রিক সেলাই মেশিন আবিষ্কার করেন। তারপর সেলাই মেশিন হাতের সেলাইয়ের মতো সেলাই তৈরি করতে পারে। আইজ্যাক মেরিট সিঙ্গার 1851 সালে বাণিজ্যিকভাবে সফল সেলাই মেশিন আবিষ্কার করেছিলেন।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এবং এর ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানিমুখী শিল্প। 1960 সালে, বাংলাদেশের প্রথম পোশাক ঢাকার উর্দু রোডে রিয়াজ স্টোর নামে যাত্রা শুরু করে। 1967 সালে, রিয়াজ স্টোরের উৎপাদিত 10,000 পিস শার্ট প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ থেকে দেশের বাইরে (যুক্তরাজ্য) রপ্তানি করা হয়েছিল। এরপর 1973 সালে তিনি রিয়াজ স্টোর" এর নাম পরিবর্তন করে "রিয়াজ গার্মেন্টস" করেন। এছাড়া এ যুগের আরও একটি পোশাকের কথা শোনা যায়, তা হলো 'দেশ গার্মেন্টস'। দেশ গার্মেন্টস তখনকার 100% রপ্তানিমুখী পোশাক ছিল। ৭০ এর দশকের শেষের দিকে এদেশে মাত্র ৯টি রপ্তানিমুখী কোম্পানি ছিল যারা ইউরোপের বাজারে প্রতি বছর ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা করত। সে সময় দেশে বড় ও বিখ্যাত পোশাক কারখানা ছিল ৩টি। সেগুলো হলো- রিয়াজ গার্মেন্টস, প্যারিস গার্মেন্টস, জুয়েল গার্মেন্টস।
পোশাক শিল্পের বাজার
যেকোনো উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পণ্যের বাজার তৈরি করা। তা না হলে পণ্য যতই ভালো হোক না কেন তা কোনো কাজে আসে না। আশার কথা, বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে যথেষ্ট চাহিদা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। কানাডা, ইইসি দেশ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ছাড়াও ২৩টি দেশে বাংলাদেশ তার পোশাক রপ্তানি করে। এসব পোশাকের মধ্যে রয়েছে শার্ট, পায়জামা, জিন্স প্যান্ট, জ্যাকেট, ল্যাবরেটরি কোট, গেঞ্জি, সোয়েটার, পুল ওভার, খেলাধুলার পোশাক, নাইট ড্রেস ইত্যাদি। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাকের বাজার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের অবদান
পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী অবদান রেখে চলেছে। এই সেক্টরের অবদানের প্রধান দিকগুলি নিম্নরূপ:
অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধি
পোশাক শিল্পের বিকাশের সাথে সাথে দেশের রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশের প্রায় শতাধিক বায়িং হাউস পোশাক ক্রয়-বিক্রয়ের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। জাতীয় আয়ের প্রায় ৬৪% আসে এই খাত থেকে। তবে এই আয় নির্ভর করে রপ্তানি বাণিজ্যের ওপর।
বেকার সমস্যা সমাধান
এই শিল্প বেকারত্ব হ্রাস এবং জাতীয় জীবনে স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কারণ এই খাতে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের এক মিলিয়নেরও বেশি নারী শ্রমিককে কর্মসংস্থান করা যেতে পারে।
দ্রুত শিল্পায়ন
পোশাক শিল্প দ্রুত শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে এদেশে বিভিন্ন স্পিনিং, উইভিং, নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং, প্রিন্টিং ইত্যাদি শিল্প গড়ে উঠছে। এ ছাড়া গার্মেন্টস, জিপার, বাটাম, ব্যাগলা ইত্যাদি শিল্পের প্রসার ঘটছে
পরিবহন এবং পোর্ট ব্যবহার
পোশাক শিল্পের আমদানি-রপ্তানি বন্দর থেকে কারখানায় পরিবহন শিল্পের অগ্রগতি এবং এগুলোর যথাযথ ব্যবহারে নেতৃত্ব দিয়েছে।
অন্যান্য অবদান
পোশাক শিল্পে বিনিয়োগ করে ব্যাংকগুলো লাভবান হচ্ছে। বীমা কোম্পানির প্রিমিয়ামের পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশে আসছে নতুন নতুন প্রযুক্তি।
ফ্যাশন শিল্পে সমস্যা
1 জানুয়ারী, 2005 থেকে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) দ্বারা প্রবর্তিত টেক্সটাইল এবং পোশাক সংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর হয়। মাল্টিফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট (MFA) চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। ফলে পোশাক শিল্প কোটা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আসলে কোটামুক্ত বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার জন্য আমাদের দেশ এখনো প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি তৈরি করতে পারেনি। যেখানে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, চীন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ কম খরচে মানসম্মত পোশাক উৎপাদন করছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। এই পশ্চাৎপদতার মূলে রয়েছে নানা সমস্যা।
পোশাক শিল্পের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। তবে আজকের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে টিকে থাকতে অনেক দূর যেতে হবে। এর জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের ISO সার্টিফিকেশন গ্রহণ করা উচিত। ক্রেতারা যেহেতু বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সর্বোপরি, আমাদের টেক্সটাইল ও পোশাকের মান উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দাম কমিয়ে চ্যালেঞ্জকে সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। সে লক্ষ্যে সরকার, উদ্যোক্তা ও ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের অবস্থান
2021 সালের শেষে, পোশাক রপ্তানিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে 4.72 বিলিয়ন ডলার। এর ফলে পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামকে টপকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে ৩ হাজার ৫৮০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পের বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের রপ্তানি মূল্য ছিল ৩ হাজার। 108 মিলিয়ন ডলার। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে চীনের অবস্থান প্রথম। আর বাংলাদেশ থেকে এক ধাপ নিচে অর্থাৎ প্রধান প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম চলে গেছে তৃতীয় স্থানে।
উপসংহার
মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশের বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে পোশাক শিল্পের ভূমিকা অনন্য। 1977 সালে হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা নিয়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সূচনা হয়েছিল, আজ এর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। জাতীয় আয়ের পাঁচ শতাংশের বেশি আসছে এ শিল্প থেকে। তাই এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সব ক্ষেত্রে সরকারি অনুগ্রহ পেলে এই শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে এবং বাংলাদেশের জন্য অসীম সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। আর পোশাক শিল্প ভবিষ্যতে আরও আধুনিক হয়ে উঠবে।
বিজ্ঞানের সুফল ও কুফল
ভূমিকা: মানুষ আজ একবিংশ শতাব্দীতে পা রেখেছে। বিজ্ঞানের রথে চড়েই তার এই বিজয়যাত্রা, কৌতুহলী মানুষের মন আবিষ্কার করে। ফেলেছে জীবন ও জগতের নানা গোপন রহস্য। সে আজ জেনে গেছে বিভিন্ন প্রাকৃতিক নিয়ম, নিয়মের ফল। তার অমিত শক্তির সীমাহীন বিস্তারের কথাও সে আজ জেনে গেছে। শুধু তাই নয়, সে আজ এ কথাও বুঝেছে তার অসীম শক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ধ্বংসের বীজ। ধ্বংসের এই বীজতলা তৈরি হয়েছে মানুষের বৈজ্ঞানিক সাফল্যের মাটিতেই। তাই মানুষ আজ যেমন গর্বিত তেমনি মানুষ আজ শঙ্কিতও বটে।
মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে বিজ্ঞান: একদিন অবাকবিস্ময়ে পৃথিবীর প্রথম মানুষ সূর্য ওঠা দেখেছিল। ঝড়, তুফান, বিদ্যুতের আকস্মিক ঝলকানির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদিন সে আতঙ্কিত হয়েছিল। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির ভয়ংকর রূপ দেখে মানুষ সেদিন স্তম্ভিত হয়েছিল। ভয়ে আর আতঙ্কে সেই প্রাকৃতিক শক্তিকে তাই তারা পুজো করতে শুরু করেছিল। এরপর একদিন আগুন আবিষ্কার হল। মানুষ জেনে ফেলল জল-স্থলের রহস্য। সরে গেল অন্তরীক্ষের যবনিকা। যুক্তি আর বুদ্ধি দিয়ে সে বিচার করে নিল বিশ্বব্রত্মাণ্ডের সমস্ত কার্যকারণ সম্পর্ক। আর তারপর থেকেই মানুষ জানতে শুরু করল নানা রোগব্যাধির কারণ। অকালমৃত্যু, মহামারি কমে এল। শস্যশ্যামলা হয়ে উঠল বসুন্ধরা। কারখানার সাইরেন জানিয়ে দিল বিশ্ববাসী আজ কর্মযজ্ঞে নেমে পড়ছে। দূরদূরান্তের এমনকি মহাকাশের নানা সংকেতও পৌঁছে দিয়েছে বিজ্ঞান। মানবসভ্যতার চালকের আসনে ধীরে ধীরে উঠে এল বিজ্ঞান। মানুষকে করে তুলল অনেকটাই কমহীন। আর এখান থেকেই দেখতে শুরু করলাম বিজ্ঞানের বিপরীতে অন্য এক ছবি।
বিজ্ঞানের কুফল: মানুষ আজ বিজ্ঞানের হাত ধরে ক্রমশই যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞান মানুষের জীবনে যে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে তা আমাদের ক্রমশই করে তুলেছে পরমুখাপেক্ষী। আমরা ক্রমশই আরামপ্রিয়, কর্মবিমুখ হয়ে পড়ছি। অন্যদিকে বিজ্ঞানের হাত ধরে সমাজে কর্মসংস্থানও ক্রমশই সংকুচিত হয়ে পড়ছে, কাজ হারাচ্ছে মানুষ। অন্যদিকে পৃথিবীতে জনসংখ্যা ক্রমশই বেড়ে চলেছে, ফলে সমাজে বেকারত্ব বাড়ছে। বিজ্ঞানকে হাতিয়ার করে মানুষ লাভের অঙ্ক বাড়াতে পারে বলেই কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমে কমে যাচ্ছে। এরই পাশাপাশি বিজ্ঞানের অতিরিক্ত ব্যবহারে পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে। শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, জলদূষণের ফলে পৃথিবীতে রোগব্যাধি বাড়ছে। বহু প্রজাতিসহ পশুপাখিও আজ ধ্বংসের প্রহর গুনছে। মারণাস্ত্রে ভরে গেছে নানা দেশের অস্ত্রভাণ্ডার। পরমাণু বোমা তো আছেই, তা ছাড়া জীবাণু বোমার আতঙ্কেও মানুষ আজ মানবপ্রজাতি ধ্বংসের আতঙ্ক বুকে নিয়ে প্রহর গুনছে।
উপসংহার: অমিত শক্তিধর মানুষ বিজ্ঞানের হাত ধরেই সাধনায় সিদ্ধি পেয়েছে। এই শক্তিসাধনার ফলশ্রুতিতে মানবজীবনে জমেছে যান্ত্রিকতা। তার মনের সুকুমার বৃত্তিগুলি আজ ধ্বংসের পথে। অথচ বিজ্ঞান মানবজীবনে সুখস্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে, তাকে অস্বীকার করার ক্ষমতাও আজ আর মানুষের নেই। তাই বিজ্ঞানের কল্যাণী মূর্তির পাশাপাশি ধ্বংসের ছবিও আমরা আজ লক্ষ করি। বিজ্ঞানের সাধনা হল সকল মানুষের কল্যাণসাধনা। বিজ্ঞানের শক্তিকে সুপথে পরিচালিত করলেই তা আশীর্বাদযোগ্য হয়ে উঠবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পদ্মাসেতু
ভূমিকা: পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতু। স্বপ্নের এই সেতু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সাথে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটাবে।
এই সেতুকে কেন্দ্র করে স্বপ্ন বুনছে দক্ষিন-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ। বাংলাদেশের সকল মানুষের আশা, এই স্বপ্নে পদ্মা সেতু বদলে দেবে দেশে অর্থনীতি এবং সেই সাথে উন্নত হবে মানুষের জীবনযাত্রা। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় এই প্রকল্প খুলে দেবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।
পদ্মা সেতুর গুরুত্ব: বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই দেশের বুক চিরে বয়ে চলেছে অসংখ্য নদনদী। প্রতিনিয়তই তাই আমাদের যাতায়াতব্যবস্থায় নৌপথের আশ্রয় নিতে হয়।
ফলে যোগযোগব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতা ও মন্থর গতি পরিলক্ষিত হয়। তাই যোগাযোগব্যবস্থাকে গতিশীল করার জন্য প্রয়োজন হয় পদ্মা সেতু। সেতু থাকলে দুই পাড়ের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নতি হয়, সেই সাথে ব্যবসা বাণিজ্য ভালো হওয়ায় মানুষের জীবনমানেরও উন্নতি ঘটে।
পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রেক্ষাপট: পদ্মা সেতু দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। এজন্য এই অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের কাছে তাদের দাবি বাস্তবায়নের কথা জানিয়ে এসেছে।
অবশেষে ১৯৯৮ সালে এই সেতুর সম্ভাবনার কথা বিবেচনায় এনে প্রথম সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০১ সালে এই সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু অর্থের জোগান না হওয়ায় সেতুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল।
পরবর্তীতে, ২০০৭ সালে পদ্মা সেতুর প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে এই সেতুতে রেলপথ সংযুক্ত করে।
প্রতিবন্ধকতা ও বাংলাদেশের সক্ষমতা: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু। এই প্রকল্প বিভিন্ন সময় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে।
২০০৯ সালের পর বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করলে তাদের সাথে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়। কিন্তু ২০১২ ঋণচুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংক; ফলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায় পদ্মা সেতুর প্রকল্প।
পরবর্তীতে সরকার ঘোষণা দেয়, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের। ষড়যন্ত্রের বাধা জয় করে এগিয়ে চলে পদ্মা সেতুর কাজ, নিজস্ব অর্থায়নে দৃশ্যমান হতে থাকে স্বপ্নের পদ্মা সেতু।
পদ্মা সেতুর বর্ণনা: পদ্মা সেতুই হবে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু। মূল সেতুর দের্ঘ্য হবে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ হবে ৭২ ফুট। সেতুটি হবে দ্বিতল, উপর দিয়ে চলবে যানবাহন এবং নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুটি নির্মিত হবে কংক্রিট এবং স্টিল দিয়ে। নদী শাসনের জন্য চীনের সিনহাইড্রো কর্পোরেশন কাজ পেয়েছে।
সেতুটির দুই পাশের সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কাজ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের আব্দুল মোমেন লিমিটেডকে। সেতুর নির্মাণকাজ তদারকি করছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বুয়েট এবং কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে কর্পোরেশন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস।
স্বপ্নের পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ প্রকল্পে ১৪টি নতুন স্টেশন নির্মান এবং ৬টি বিদ্যমান স্টেশন উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মান করা হয়েছে। আর এই ১৪টি স্টেশন হল- কেরানীগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা, শিবচর, ভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা, মুকসুদপুর, মহেশপুর, লোহাগাড়া, নড়াইল, জামদিয়া ও পদ্ম বিল। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নের ৬টি স্টেশন হল- ঢাকা, গেন্ডারিয়া, ভাঙ্গা, কাশিয়ানী, রূপদিয়া ও সিঙ্গিয়া।
মূল সেতুর পিলার ৪২টি এর ভিতর নদীর মধ্যে ৪০টি ও নদীর দুই পাশে ২টি পিলার রয়েছে। নদীর ভিতরের ৪০টি পিলারে ৬টি করে মোট ২৪০টি পাইল রয়েছে।
এছাড়াও সংযোগ সেতুর দুই পাশের দুটি পিলারে ১২টি করে মোট ২৪টি পাইল রয়েছে। পিলারের উপর ৪১টি স্প্যান বসানো হয়েছে। এখানে মূল সেতুর কাজ পেয়েছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। এই সেতুর স্থায়িত্ব হবে ১০০ বছর।
পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যয়: তৎকালীন সরকার ২০০৭ সালে ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প পাশ হয়। এরপর ২০১১ সালে এই প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা।
পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যয় দ্বিতীয় বারের মতো সংশোধন কর হয় ২০১৬ সালে। এই ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে সেতুর ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
প্রথম দিকে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, আইডিবি এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলে, বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
অথনৈতিক দিক দিয়ে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব: পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী। এই সেতু বাস্তবায়নের ফলে দেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২১টি জেলার মানুষের ভাগ্য বদলে গেছে। রাজধানীর সাথে মানুষের সরাসরি সংযোগ ঘটছে এবং সেই সাথে অর্থনীতির গতিশীল হবে। অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব তুলে ধার হল-
1. শিল্পক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর গুরত্ব: পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দেশে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ হবে। এর ফলে এই অঞ্চলে গড়ে উঠবে নতুন নতুন শিল্প কারখানা। পায়রা সমুদ্র বন্দর গতিশীল হবে সেতুকে কেন্দ্র করে। ফলে ব্যবসায়ের সুবিধার্থে স্থাপিত হবে নতুন শিল্পকারখানা।
2. কৃষিক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকার ফলে ওই অঞ্চলের কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল পেতো না। পদ্মা সেতুর নির্মানের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা গতিশীল হয়। এতে কৃষকরা ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবে। এতে করে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
3. দারিদ্র বিমোচনে পদ্মাসেতুর প্রভাব: সেতু নির্মাণের ফলে যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এর ফলে অনেক মানুষের কর্মস্থানের সুযোগ হবে। সহজেই মানুষ কাজের জন্য অন্যান্য স্থানে যেতে পারবে। ফলে বেকারদের কর্মসংস্থান হবে।
পরিবেশ ভারাসাম্যের পদ্মা সেতুর ভূমিকা: পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে নদীর দুইপাশের এলাকায় নদীর পাড় বাঁধা হচ্ছে। যার কারণে নদীভাঙন রোধ করা যাচ্ছে।
তাছাড়াও নদীর ও সড়কের রাস্তার দুই পাশে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। এতে এসবা এলাকার পরিবেশের উপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করে বলে অবাধে বৃক্ষনিধন হয়। কিন্তু পদ্মা সেতুর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে বিদ্যুত ও গ্যাস সংযোগ দেওয়া সহজ হবে। ফলে তাদের জ্বালানির চাহিদা পূরণ হবে। সেই সাথে বৃক্ষনিধন কমে যাবে।
উপসংহার: বাংলাদেশের মানুষের একটি স্বপ্নের নাম পদ্মা সেতু। যা বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা পাল্টে দেবে। এই সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে উঠবে ব্যাপক শিল্পকারখানা, গার্মেন্টস, গোডাউন ইত্যাদি। এই সেতুর অচিরেই বদলে দেবে দেশের অর্থনীতি, উন্নত করবে মানুষের জীবনযাত্রা।
Related Question
View Allএকজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।
একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।
একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।
সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।
একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।
একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।
অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।
সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।
লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।
সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।
আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।
সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।
আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।
শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।
বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।
আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।
আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ
বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।
অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র
য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ:
সাম্যবাদের পতন:
১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।
গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:
সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ:
অর্থনৈতিক সংকট:
সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের উত্থান:
অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা:
নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।
সামাজিক পরিবর্তন:
পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
গুরুত্বপূর্ণ দিক:
- এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
- যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল।
পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।
১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-
১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।
২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:
সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয় একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।
অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।
অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।
২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। [ঊর্মি হোসেন]
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!