বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষাগোষ্ঠী ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, এটি ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের ইন্দো-ইরানীয় শাখার অন্তর্গত ইন্দো-আর্য উপশাখার একটি ভাষা।
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা (যেমন বৈদিক ও ধ্রুপদী সংস্কৃত) থেকে কালক্রমে মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার (যেমন পালি, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ) মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে। আনুমানিক খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে মাগধী প্রাকৃত ও মাগধী অপভ্রংশের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র রূপ পরিগ্রহ করে।
‘কাব্য-আমপারা’ বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এটি তার ইসলামিক ভাবধারার রচনার একটি অংশ, যেখানে তিনি পবিত্র কুরআনের ৩০তম পারা (আমপারা)-কে কাব্যিক রূপ দিয়েছেন। এই গ্রন্থটি ধর্মীয় শিক্ষাকে সহজবোধ্য ও সুললিত কাব্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করে, যা পাঠককে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণা দেয়। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে একাধারে বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি এবং ইসলামী রেনেসাঁর কবি হিসেবে পরিচিত। তার লেখায় একদিকে যেমন শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ছিল, তেমনি অন্যদিকে ইসলামি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়েও অসংখ্য অনবদ্য সৃষ্টি রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থের নাম হলো 'শেষ লেখা'। এটি তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৪১ সালে প্রকাশিত হয়। এই কাব্যের কবিতাগুলো তিনি তাঁর জীবনের শেষ সময়ে, বিশেষ করে রোগশয্যায় থাকাকালীন সময়ে রচনা করেছিলেন। 'শেষ লেখা' কাব্যগ্রন্থে মোট ১৫টি কবিতা সংকলিত হয়েছে এবং এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো 'তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি', যা তাঁর জীবনের শেষ দিকের দর্শন ও অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়। এই কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক জীবনের শেষ বেলার এক মর্মস্পর্শী দলিল।
কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলনের নাম 'ব্যথার দান'। এটি ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয়। এই সংকলনে 'ব্যথার দান', 'হেনা', 'বাদল রাতের শরাব', 'ঘুমের ঘোরে' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নজরুলের ছোটগল্পে প্রেম, বিদ্রোহ, মানবতা এবং সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি ফুটে ওঠে, যা তার সাহিত্যকর্মের মূল বৈশিষ্ট্য। যদিও তিনি মূলত বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত, তার ছোটগল্পগুলোও বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের জনপ্রিয় আখ্যানকাব্য ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয়। এই কাব্যের প্রধান দুটি চরিত্র হলো সোজন এবং দুলী। সোজন এক মুসলিম যুবক এবং দুলী এক হিন্দু যুবতী। তাদের অসাম্প্রদায়িক প্রেম গ্রামীণ সমাজের সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা পেরিয়ে এক মর্মান্তিক পরিণতি লাভ করে। এই কাব্য গ্রাম বাংলার চিরায়ত প্রেম, সামাজিক কুসংস্কার এবং দুই সম্প্রদায়ের মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রার করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
'চাঁদের অমাবস্যা' হলো বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত একটি বিখ্যাত উপন্যাস। এটি ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে গ্রামীণ পটভূমিতে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, কুসংস্কার এবং প্রকৃতি ও জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রকৃতি ও মানুষের অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক এবং অতীন্দ্রিয়তার এক ভিন্ন জগৎ ফুটিয়ে তুলেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে তাকে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী করেছে। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে 'পথের পাঁচালী', 'আরণ্যক', 'অপরাজিত' ইত্যাদি অন্যতম।
মুনীর চৌধুরীর 'কবর' নাটকটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত একটি প্রতীকী নাটক। ১৯৫৩ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় মুনীর চৌধুরী এটি রচনা করেন। নাটকের মূল বিষয়বস্তু হলো ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম, ও বাঙালির জাতিসত্তা বিকাশের আকাঙ্ক্ষা। এটি শহীদদের আত্মোৎসর্গ এবং তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বরতার বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ ও প্রতিবাদকে চিত্রিত করে। নাটকের চরিত্রগুলো প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে মৃত শহীদেরা জেগে উঠে ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। এটি বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক নাটক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংশপ্তক হলো বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সার রচিত একটি কালজয়ী উপন্যাস। এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। এই উপন্যাসে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষাপট বর্ণিত হয়েছে।
উপন্যাসটি প্রথমে সাপ্তাহিক 'সচিত্র সন্ধানী' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৬৭ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এতে গ্রামীণ জীবন, রাজনৈতিক সচেতনতা, পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রাম, এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে মানুষের জীবন, প্রেম, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হলেন রমজান, শাহেদ, প্রমুখ, যাদের মাধ্যমে তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানুষের দৃঢ়চেতা মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।
আকবর হোসেন (১৯১৭-১৯৮১) ছিলেন একজন খ্যাতিমান বাংলাদেশী সাহিত্যিক। তিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প রচনার জন্য সুপরিচিত। তাঁর সাহিত্যকর্ম গ্রামীণ বাংলার জীবনযাপন, সামাজিক বাস্তবতা এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতা অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরে। 'কাঞ্চনগ্রাম' তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় উপন্যাস, যা পাঠক মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়।
এই উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজ, কুসংস্কার, দারিদ্র্য এবং মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার একটি বাস্তবসম্মত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। আকবর হোসেন তাঁর লেখায় তৎকালীন সমাজের অসঙ্গতি ও পরিবর্তনশীল জীবনধারার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতেন, যা তাঁর সাহিত্যকে কালোত্তীর্ণ করেছে।
হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন একজন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত প্রথম সংকলন গ্রন্থের সম্পাদনা করেন তিনি। এই সংকলনটির নাম 'একুশে ফেব্রুয়ারি'।
বইটি ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত হয় এবং এতে ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ, কবিতা ও গল্প স্থান পায়। এই গ্রন্থটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সত্য প্রকাশের দুরন্ত সাহস নিয়ে আমৃত্যু সকল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার ও প্রতিবাদী। এ জন্য তাঁকে বাংলা সাহিত্যের 'বিদ্রোহী কবি' বলা হয়। আবার একই সাথে কোমল দরদি মন নিয়ে ব্যথিত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে থেকেছেন তিনি। এক হাতে বাঁশি আরেক হাতে রণতূর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, আর এসেই প্রচলিত শিল্পধারাসমূহকে পাল্টে দিয়ে নতুন বিষয় ও নতুন শব্দে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে করেছেন সমৃদ্ধতর।
কাজী নজরুল ইসলাম ২৪ মে, ১৮৯৯ সালে (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। (কাজী ফকির আহমেদ এর ২য় স্ত্রী জাহেদা খাতুন)। জাহেদা খাতুনের চার পুত্রের অকাল মৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম হয় বলে তার নাম রাখা হয়- দুখু মিয়া। বাল্যকালে তাঁকে 'ত্যারা ক্ষ্যাপা' ও 'নজর আলী' নামেও ডাকা হতো। সাহিত্যে তিনি 'নুরু' নামও ব্যবহার করেছেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে পিতার মৃত্যু (১৯০৭) হলে তিনি চরম দারিদ্র্যে নিপতিত হন।
১৫ ডিসেম্বর, ১৯২৯ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে জাতীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এ অনুষ্ঠানে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর সভাপতির ভাষণে নজরুলকে 'প্রতিভাবান বাঙালি কবি' বলে আখ্যায়িত করেন।
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে মুক্তক ছন্দের প্রবর্তক।
বাংলা ভাষায় তিনি প্রথম ইসলামি গান ও গজল রচনা করেছেন।
১০ অক্টোবর, ১৯৪২ সালে মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে দূরারোগ্য (পিক্স ডিজিজ) ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় এই ঋদ্ধ ও সম্ভাবনাময় জীবন আমৃত্যু নির্বাক হয়ে যায়।
কাজী নজরুল ইসলামের সমগ্র রচনাবলি বাংলা একাডেমি থেকে 'নজরুল রচনাবলি' (২০০৫) নামে ১২ খণ্ডে প্রকাশিত।
তিনি ২৯ আগস্ট, ১৯৭৬ সালে (১২ ভাদ্র, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) সকাল ১০টা ১০মিনিটে মাত্র ৭৭ বছর বয়সে ঢাকার পিজি হাসপাতালে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে বিকেল ৫.৩০ ঘটিকায় সমাধিস্থ করা হয়।
নজরুল কোন দৈনিক পত্রিকার সান্ধ্য পত্রিকা 'নবযুগ' (১২ জুলাই, ১৯২০) যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন ।
এ পত্রিকা নজরুলের সাথে যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন কমরেড মুজাবপ আহমদ। পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এ.কে ফজলুল হত ১৯৪২ সালে 'দৈনিক নবযুগ' পত্রিকা প্রকাশিত হলে নজরুল ইসলাম এর সম্পাদক নিযুক্ত হন।
অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা 'ধূমকেতু' (১৯২২); 'লাঙল' (১৯২৫) তিনি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন ।
কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত রচনাবলি
প্রথম প্রকাশিত রচনা/গল্প
'বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী' (১৯১৯)। এটি 'সওগাত' পত্রিকার মে-জুন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
প্রথম প্রকাশিত কবিতা
'মুক্তি' (১৯১৯)। এটি 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
'অগ্নিবীণা' (সেপ্টেম্বর, ১৯২২)। কবি এ কাব্যটি বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে উৎসর্গ করেন।। কাব্যে মোট ১২টি কবিতা আছে। এ কাব্যের অন্তর্ভুক্ত বিখ্যাত কবিতা 'বিদ্রোহী' ৬ জানুয়ারি, ১৯২২ সালে (২২ পৌষ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ; শুক্রবার) 'সাপ্তাহিক বিজলী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। 'অগ্নিবীণ কাব্যের প্রথম কবিতা 'প্রলয়োল্লাস'।
প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ
'তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা' (১৯১৯)। এটি 'সওগাত পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায় (অক্টোবর-নভেম্বর) প্রকাশিত হয়।
প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ
'যুগবাণী' (অক্টোবর, ১৯২২)
প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ/ গল্পগ্রন্থ
'ব্যথার দান' (১৯২২)
প্রথম প্রকাশিত নাটক
'ঝিলিমিলি' (১৯৩০)
প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস
'বাঁধনহারা' (১৯২৭)
নজরুলের নিষিদ্ধ গ্রন্থঃ
সাহিত্য সমালোচক শিশির কর 'নিষিদ্ধ নজরুল' নামক গ্রন্থে ৫টি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা: 'যুগবাণী' (নিষিদ্ধ-২৩ নভেম্বর, ১৯২২। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ১৯৪৭), 'বিষের বাঁশি' (নিষিদ্ধ- ২২ অক্টোবর, ১৯২৪। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার-২৭ এপ্রিল, ১৯৪৫), 'ভাঙার গান' (নিষিদ্ধ- ১১ নভেম্বর, ১৯২৪), 'প্রলয়শিখা' (নিষিদ্ধ- ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩০), 'চন্দ্রবিন্দু' (নিষিদ্ধ- ১৪ অক্টোবর, ১৯৩১)।
*** গ্রন্থ হিসেবে 'অগ্নিবীণা' কাব্যটি কখনো নিষিদ্ধ হয়নি। এ কাব্যের 'রক্তাম্বরধারিণী মা' কবিতাটি নিষিদ্ধ হয়। 'ধূমকেতু' পত্রিকার পূজা (২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২) সংখ্যায় রাজনৈতিক কবিতা 'আনন্দময়ীর আগমনে' প্রকাশিত হলে পত্রিকার এ সংখ্যা নিষিদ্ধ হয় এবং নজরুল ইসলাম গ্রেফতার হন। এ কবিতা রচনার জন্য কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে (ব্রিটিশ সরকার) রাজদ্রোহের অভিযোগে ১৬ জানুয়ারি, ১৯২৩
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কাব্যগ্রন্থগুলোঃ
কাজী নজরুল ইসলামের মোট কাব্য সংখ্যা ২২টি।
‘দোলনচাঁপা’ (অক্টোবর, ১৯২৩): কাজী নজরুল ইসলাম রাজবন্দি থাকা অবস্থায় কাব্যটি প্রকাশিত হয়। এটি প্রেমের কাব্য। তাঁর স্ত্রী দুলির নামানুসারে এ কাব্যের নামকরণ করেন। এ কাব্যের প্রথম কবিতা ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে'। বেলাশেষে, পূবের হাওয়া, চোখের চাতক, অবেলার ডাক, পূজারিণী ইত্যাদি এ কাব্যের অন্যতম কবিতা ।
‘বিষের বাঁশি’ (আগস্ট, ১৯২৪): ২২ অক্টোবর, ১৯২৪ সালে গ্রন্থটি নিষিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল ২৭ এপ্রিল, ১৯৪৫ সালে। এটি তিনি উৎসর্গ করেন এদেশের নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রনায়িকা মিসেস এম. রহমানকে (মোসাম্মদ মাসুদা খাতুন)।
‘ভাঙার গান' (আগস্ট, ১৯২৪): এটি মেদিনীপুরবাসীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।
‘ছায়ানট' (১৯২৪): এটি উৎসর্গ করেন মুজাফ্ফর আহমদ ও কুতুবউদ্দীন আহমদকে ।
‘চিত্তনামা’ (১৯২৫): দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ দার্জিলিঙে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকার্ত কবি অর্ঘ্য, অকাল- সন্ধ্যা, সান্ত্বনা, রাজভিখারি নামে কয়েকটি কবিতা লেখেন। ‘ইন্দ্ৰপতন' কবিতায় কবি মহানবীর সাথে চিত্তরঞ্জনকে তুলনা করে কবিতা লেখেন ।
‘জন্মিলে তুমি মোহাম্মদের আগে হে পুরুষবর কোরানে ঘোষিত তোমার মহিমা হতে পয়গাম্বর।' এ কবিতাটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে মুসলিমরা কবির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে এটির সংশোধিত রূপ প্রকাশ পায়। কাব্যটি উৎসর্গ করেন চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবীকে। বাসন্তী দেবীকে তিনি মা বলে ডাকতেন ।
‘ঝিঙেফুল' (১৯২৬): শিশুতোষ কাব্য। এটি উৎসর্গ করেন বীর বাদলকে ।
‘সাতভাই চম্পা' (১৯২৬): শিশুতোষ কাব্য । ‘সর্বহারা' (১৯২৬): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার'। এটি উৎসর্গ করেন বিরজাসুন্দরী দেবীকে।
‘সিন্ধু হিন্দোল' (১৯২৭): এ কাব্যের বিখ্যাত কবিতা ‘দারিদ্র্য’। এটি উৎসর্গ করেন হাবীবুল্লাহ বাহার শামসুন্নাহার মাহমুদকে ।
‘সঞ্চিতা' (১৯২৮): বিভিন্ন কাব্যের বাছাইকৃত কবিতা সংকলন। এতে মোট ৭৮টি কবিতা ও গান সংকলিত হয়েছে। তিনি এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করেন এবং উৎসর্গপত্রে লিখেন : “ বিশ্বকবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু' ।
‘ চক্রবাক’ (১৯২৯): চট্টগ্রামে অবস্থানকালে লেখা অধিকাংশ কবিতা এতে স্থান পায়। তিনি এটি উৎসর্গ করেন তৎকালিন ঢাকা ইন্টারমেডিয়েট কলেজের (বর্তমান- ঢাকা কলেজ) অধ্যক্ষ সুরেন্দ্রনাথ মৈত্রকে।
‘ সন্ধ্যা' (১৯২৯): এ কাব্যের অন্যতম কবিতা ‘চল্ চল্ চল্’ । ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ' এর দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য নজরুল ঢাকায় আসেন। তখন তিনি সৈয়দ আবুল হেসেনের সরকারি বাসা বর্ধমান হাউসে (বর্তমান- বাংলা একাডেমি) অবস্থানকালে এ গানটি রচনা করেন। এটি প্রথম ‘নতুনের গান' শিরোনামে ‘শিখা’ পত্রিকায় ১৯২৮ (বাংলা- ১৩৩৫) সালে প্রকাশিত হয়। এটি উৎসর্গ করেন মাদারীপুরের শান্তিসেনাদেরকে। ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এ কবিতার / গানের ২১ চরণ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হয় ।
‘ প্রলয়শিখা' (১৯৩০): এ কাব্যের জন্য কবি ৬ মাস কারাভোগ করেন।
‘ মরুভাস্কর' (১৯৫০): এটি হযরত মুহাম্মাদ (স) এর জীবনীভিত্তিক গ্রন্থ। এটি ৪টি সর্গে ১৮টি খণ্ড-কবিতা নিয়ে রচিত।
‘শেষ সওগাত' (১৯৫৮): এ কাব্যের ভূমিকা লেখেন প্রেমেন্দ্র মিত্র ।
জরুলের উপন্যাস ৩টি ‘বাঁধনহারা' (১৯২৭): এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রোপন্যাস। ১৯২১ সাল থেকে এটি ধারাবাহিকভাবে ‘মোসলেম ভারত' পত্রিকায় ছাপা হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত এ উপন্যাসের কিছু অংশ ১৯২৭ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় বাদ পড়ে যায়। পরবর্তীতে তা খুঁজে পাওয়া গেলে ১৯ মে, ২০০৬ সালে দৈনিক 'প্রথম আলো' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের পত্র সংখ্যা ১৮টি। নুরুর সাথে মাহবুবার প্রণয় এবং বিয়ের উদ্যোগ অনেক এগিয়ে গেলে হঠাৎ নুরু পালিয়ে গিয়ে সৈনিক জীবন গ্রহণ করে। যদিও এর পেছনে দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালীন কোনো তাগিদ ছিলনা। অনেকের মতে, এ উপন্যাসের নুরুই নজরুল। চরিত্র: নুরুল হুদা, মাহবুবা, সাহসিকা, রাবেয়া।
‘মৃত্যুক্ষুধা' (১৯৩০) : ত্রিশাল গ্রাম ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এটি রচিত। এটি ১৯২৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘সওগাত' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩০ সালে। (সুত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান।
‘ কুহেলিকা' (১৯৩১): ১৯২৭ সাল থেকে পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। এটি রাজনৈতিক উপন্যাস। কারণ, নায়ক জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে স্বদেশী আন্দোলনকে সশস্ত্র বিপ্লবকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ উপন্যাসের বিখ্যাত উক্তি- ‘নারী কুহেলিকা, ইহারা মায়াবিনীর জাত। ইহারা সকল কল্যাণের পথে মায়াজাল পাতিয়া রাখিয়াছে। ইহারা গহন-পথের কন্টক, রাজপথের দস্যু।'
কাজী নজরুলের গল্পগ্রন্থগুলোঃ
'ব্যথার দান' (ফেব্রুয়ারি, ১৯২২): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। এতে মোট ৬টি গল্প আছে- ব্যথার দান, হেনা, অতৃপ্ত কামনা, বাদল-বরিষণে, ঘুমের ঘোরে, রাজবন্দীর চিঠি।
'রিক্তের বেদন' (১৯২৫): প্রতিটি গল্পই সমকালীন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের গল্পসমূহ হলো: রিক্তের বেদন, বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী, মেহের-নেগার, সাঁঝের তারা, রাক্ষুসী, সালেক, স্বামীহারা, দুরন্ত পথিক। গল্পগুলোর প্রধান বিষয় প্রেম।
'শিউলিমালা' (১৯৩১): এ গ্রন্থের গল্পগুলো হলো: পদ্ম-গোখরো, জিনের বাদশা, অগ্নি-গিরি, শিউলিমালা।
নজরুলের নাট্যগ্রন্থগুলোঃ
'ঝিলিমিলি' (১৯৩০): এটি ঝিলিমিলি, সেতুবন্ধ ও শিল্পী নামের ৩টি নাটকের সংকলন এবং প্রথম নাট্যগ্রন্থ।
'রাজবন্দীর জবানবন্দী' (০৭/০১/১৯২৩): এটি তিনি জেলে বসে লেখেন। 'ধূমকেতু' পত্রিকায় 'আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা প্রকাশিত হলে তা নিষিদ্ধ হয় এবং নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়। হুগলী জেলে বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে নজরুল অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনশন শুরু করেন। এ অবস্থায় নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পাঠান- 'Give up hunger strike, our literature claims you', কিন্তু ঠিকানা না থাকায় জেল কর্তৃপক্ষ সে চিঠি রবীন্দ্রনাথের নিকট ফেরত পাঠায়। এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'বসন্ত' নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে তিনি ৩৯ দিন পর অনশন ভঙ্গ করেন। জেলে থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষ তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তা মাত্র ৪ পৃষ্ঠায় লিখিতভাবে আদালতে উপস্থাপন করেন, এটাকেই বলা হয় 'রাজবন্দীর জবানবন্দী'। এ প্রবন্ধে তিনি নিজেকে 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন- "শুনেছি, আমার বিচারক একজন কবি। শুনে আনন্দিত হয়েছি। বিদ্রোহী কবির বিচার বিচারক কবির নিকট।” পরবর্তীতে তিনি জেল থেকে ১৫ অক্টোবর, ১৯২৩ সালে মুক্তি পান।
'যৌবনের গান': ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জে মুসলিম যুব সমাজ কাজী নজরুল ইসলামকে অভিনন্দন জানাতে গেলে তাদের উদ্দেশ্যে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তারই পরিমার্জিত লিখিত রূপ 'যৌবনের গান'।
'যুগবাণী' (১৯২২): এ গ্রন্থের অন্তর্গত প্রবন্ধ 'ভাব ও কাজ', 'উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন'।
'রুদ্রমঙ্গল' (১৯২৭): রুদ্রমঙ্গল, আমার পথ, মোহরম, বিষ-বাণী, ক্ষুদিরামের মা, ধূমকেতুর পথ, মন্দির ও মসজিদ, হিন্দু-মুসলমান- নামে মোট ৮টি প্রবন্ধ এ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ প্রবন্ধের বিখ্যাত উক্তি- 'আমার কর্ণধার আমি।
আমার পথ দেখাবে আমার সত্য।' 'দুর্দিনের যাত্রী' (১৯২৬), 'ধূমকেতু' (১৯৬১)।
'রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম': ইরানের জীবনবাদী কবি ওমর খৈয়ামের কবিতা অনুবাদ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। ডিসেম্বর, ১৯৫৯ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সৈয়দ মুজতবা আলী এর ভূমিকা লেখেন।
'কাব্য আমপারা' (১৯৩৩): এ গ্রন্থে কাজী নজরুল ইসলাম পবিত্র কুরআন শরীফের ৩৮টি সুরার অনুবাদ করে তা ছন্দে ছন্দে সাজিয়েছেন।
'দিওয়ানে হাফিজ' (১৯৩০), 'মক্তব সাহিত্য' (১৯৩৫)।
নজরুল পরিচালিত চলচ্চিত্রঃ
'ধূপছায়া' (১৯৩১)। নজরুল অভিনীত চলচ্চিত্র 'ধ্রুব'। কানাডায় নজরুলকে নিয়ে ফিলিপ স্পারেল 'নজরুল' নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
'আনন্দময়ীর আগমনে' (ধূমকেতুর পূজা সংখ্যায় ১৯২২ সালে) কবিতা প্রকাশিত হলে নজরুল গ্রেফতার হন ।
বাংলাদেশের রণসংগীতের রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলাম। তার রচিত "চল্ চল্ চল্, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল" বাংলাদেশের রণসঙ্গীত হিসেবে গৃহীত।
নজরুল মস্তিষ্কের ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারান ১০ অক্টোবর, ১৯৪২ সালে। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে।
নজরুলকে বাংলাদেশে আনা হয় ২৪ মে, ১৯৭২ সালে। ১৯৭২ সালের এইদিনে 'জাতীয় কবি' ঘোষণা করা হয়। কাজী নজরুল ইসলামকে 'জাতীয় কবি' হিসেবে ঘোষণার গেজেট জারি করা হয় ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪ সালে।
নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬ সালে; মৃত্যুর ছয়মাস পূর্বে।
'কুহেলিকা' কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি বিখ্যাত উপন্যাস, যা ১৯৩১ সালে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে প্রেম, বিদ্রোহ, আত্মত্যাগ এবং তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করা হয়েছে। এটি নজরুলের বিপ্লবী চেতনা ও রোমান্টিক ভাবধারার এক অনবদ্য মিশ্রণ।
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ এবং দার্শনিক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যে কারণে তিনি 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে সমধিক পরিচিত। তার সাহিত্যে সাম্য, মানবতা এবং বিদ্রোহের বাণী প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছে।
ভানুসিংহ ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছদ্মনাম। তিনি এই ছদ্মনামে "ভানুসিংহের পদাবলী" নামক একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এই কাব্যগ্রন্থটি মূলত বৈষ্ণব পদাবলীর ঢঙে লেখা একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে গঠিত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কৈশোরকালে বৈষ্ণব সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই কবিতাগুলো লেখেন, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিরহ ও মিলনকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। এটি বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রাথমিক কাব্যপ্রতিভার এক অনন্য নিদর্শন এবং একটি স্বতন্ত্র সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন একজন খ্যাতিমান বাঙালি কবি ও লেখক। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ হলো রক্তরাগ, হাসনাহেনা, সাহারা, খোশরোজ, বনি আদম এবং আমারি স্বপ্ন। তিনি রূপের নেশা ও এক মন এক প্রাণ নামে দুটি উপন্যাসও রচনা করেছেন। এছাড়া তাঁর গদ্যগ্রন্থের মধ্যে বিশ্বনবী ও আমার চিন্তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শেলীর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ 'দি ইভ অব ইস্টার'-এর অনুবাদও তিনি করেছিলেন।
কাজী নজরুল ইসলামের 'মৃত্যুক্ষুধা' উপন্যাসের মূলবক্তব্য তৎকালীন গ্রাম বাংলার মুসলিম সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য ও কুসংস্কারের চিত্র তুলে ধরা। এটি মূলত শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, সামাজিক অবিচার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিবাদ। উপন্যাসে প্রেম, আত্মত্যাগ এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতার পাশাপাশি সাম্যবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে, যেখানে নারীর সংগ্রাম বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
'মৃত্যুক্ষুধা' (১৯৩০) কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় উপন্যাস এবং এটি তাঁর সাম্যবাদী ভাবধারা ও গণমানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই উপন্যাসের পটভূমি হলো হুগলি জেলার মুসলিম অধ্যুষিত একটি গ্রামীণ জনপদ, যেখানে অভাবী ও শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তাদের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সামাজিক শোষণ ও বঞ্চনা নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আনসার ও মেজোবৌয়ের প্রেম, তাদের চারপাশের মানুষের জীবনযুদ্ধ, এবং তৎকালীন সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদী মনোভাব মূল উপজীব্য। নজরুল দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষুধা মানুষের নীতি-নৈতিকতাকে প্রভাবিত করে এবং কীভাবে মানুষ চরম সংকটের মুখেও মানবিকতা ও প্রেমকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে।
বিশেষ করে, উপন্যাসে নারীর অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সামাজিক নির্যাতন এবং তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রামকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি প্রেমকাহিনী নয়, বরং এটি শ্রেণি-সংগ্রাম, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং শোষিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক শক্তিশালী সাহিত্যিক দলিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস হলো বৌ-ঠাকুরাণীর হাট। এটি ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের কাহিনি মূলত যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অবলম্বনে রচিত, যেখানে ক্ষমতা লিপ্সা, পারিবারিক সংঘাত এবং রাজদ্রোহের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এটি রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হিসেবেও পরিচিত। তাঁর দ্বিতীয় ঐতিহাসিক উপন্যাস, রাজর্ষি, ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হয় এবং এর বিষয় ত্রিপুরা রাজ্যের ইতিহাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামি।