কর্মধারয় সমাস হলো এমন একটি সমাস যেখানে বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের সমাস হয় এবং পরপদের অর্থই প্রধানরূপে প্রতীয়মান হয়। এই সমাসে দুটি পদ একই ব্যক্তি বা বস্তুকে নির্দেশ করে এবং পূর্বপদ সাধারণত পরপদের গুণ, বৈশিষ্ট্য বা পরিচয় প্রকাশ করে।
'জজ সাহেব' পদটিতে 'জজ' শব্দটি একটি পদবি বা পরিচয়, যা 'সাহেব' নামক ব্যক্তিকে বিশেষিত করছে। এখানে যিনি জজ, তিনিই সাহেব—অর্থাৎ, উভয় পদ একই ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে এবং 'সাহেব' পদের অর্থই এখানে প্রধান। তাই এটি কর্মধারয় সমাসের একটি উদাহরণ। এই ধরনের কর্মধারয় সমাসে সাধারণত ব্যাসবাক্য করার সময় 'যিনি... তিনি...' অথবা 'যে... সে...' ব্যবহার করা হয়।
কর্মধারয় সমাসের কয়েকটি প্রকারভেদ রয়েছে, যেমন: সাধারণ কর্মধারয়, মধ্যপদলোপী কর্মধারয়, উপমান কর্মধারয়, উপমিত কর্মধারয় এবং রূপক কর্মধারয়। 'জজ সাহেব' পদটি সাধারণ কর্মধারয় সমাসের অন্তর্ভুক্ত।
সমাস হলো বাংলা ব্যাকরণের একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে দুই বা ততোধিক পদকে একত্রিত করে একটি নতুন অর্থবোধক শব্দ তৈরি করা হয়। এর ফলে বাক্য সংক্ষিপ্ত, সুস্পষ্ট ও শ্রুতিমধুর হয়।
'সহকর্মী' পদটি বহুব্রীহি সমাসের উদাহরণ। বহুব্রীহি সমাসে সমস্যমান পদগুলির কোনোটির অর্থ প্রধান না হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি তৃতীয় অর্থ প্রাধান্য লাভ করে। 'সহকর্মী' শব্দটির ব্যাসবাক্য হলো 'একই কর্মে নিযুক্ত যে'। এখানে 'সহ' বা 'কর্মী' কোনো একটি পদের অর্থ প্রধান নয়, বরং এই দুটি পদের সমন্বয়ে একটি নতুন অর্থ – অর্থাৎ 'একই পেশায় নিয়োজিত একজন ব্যক্তি' – প্রকাশিত হচ্ছে, যা তৃতীয় একটি অর্থ। এটি বহুব্রীহি সমাসের সংজ্ঞানুসারে গঠিত হয়েছে।
"এক শব্দে প্রকাশ" বা "বাক্য সংক্ষেপণ" বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে একটি দীর্ঘ বাক্য বা বাক্যাংশকে একটিমাত্র শব্দে সংক্ষিপ্ত করা হয়। এর ফলে ভাষা আরও সংক্ষেপ, স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং শ্রুতিমধুর হয়। এটি বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও প্রকাশভঙ্গিকে উন্নত করে। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা যেমন - বিসিএস, ব্যাংক, বা অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি চাকরির পরীক্ষায় বাংলা ব্যাকরণের এই অংশ থেকে প্রশ্ন এসে থাকে। "যা বার বার দুলছে" এই বাক্যাংশটিকে এক শব্দে প্রকাশ করলে হয় "দোদুল্যমান"।
এক শব্দে প্রকাশ বা বাক্য সংক্ষেপণ বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে একটি বড় বাক্য বা বাক্যাংশকে একটিমাত্র শব্দে প্রকাশ করা হয়, যা ভাষার সংক্ষেপণ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। 'যার উপস্থিত বুদ্ধি আছে' বাক্যটিকে এক শব্দে 'প্রত্যুৎপন্নমতি' বলা হয়, যার অর্থ দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা। এটি বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও বাংলা ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ে ব্যবহৃত হয়।
বাক্য রচনা: আজকাল অনেকে সামান্য স্বার্থের জন্য চোখের পর্দা ফেলে যেকোনো অন্যায় করতে দ্বিধা করে না।
‘চোখের পর্দা’ একটি বহুল প্রচলিত বাংলা বাগধারা যার আক্ষরিক অর্থ চোখের উপর থাকা আবরণ হলেও, এর ভাবার্থ হলো লজ্জা বা শালীনতাবোধ। মানুষের মধ্যে যে নৈতিক বোধ বা সম্ভ্রম থাকে, যা তাকে অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত রাখে, তাকেই এই বাগধারার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। যখন কোনো ব্যক্তি নির্লজ্জের মতো আচরণ করে বা কোনো অন্যায় কাজ করতে দ্বিধা করে না, তখন বলা হয় তার ‘চোখের পর্দা’ নেই বা ‘চোখের পর্দা’ উঠে গেছে। এটি কারো চরম নির্লজ্জতা বা নৈতিক অবক্ষয় বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
উত্তরঃ
অতি সতর্ক বা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব করা।
ব্যাংকে নতুন কর্মচারী হিসেবে সব কাগজপত্র ছ কড়া ন কড়া দেখে বুঝে নেবে।
“ছ কড়া ন কড়া” বাগধারাটি অতি সতর্কতা, পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হিসাব করা, অথবা সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করার অর্থ প্রকাশ করে। এর আক্ষরিক অর্থ প্রাচীন মুদ্রাব্যবস্থায় কড়ি বা কড়া (ক্ষুদ্রতম একক) হিসাব করার সঙ্গে যুক্ত, যেখানে সামান্য পরিমাণও যেন ভুল না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া হতো। এটি এমন একটি অবস্থা বোঝায় যেখানে কোনো কাজে সামান্যতম ভুল বা অবহেলা এড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ মনোযোগ এবং যত্ন নেওয়া হয়। সাধারণত আর্থিক লেনদেন, আইনি প্রক্রিয়া বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই বাগধারাটি ব্যবহৃত হয়, যা পেশাগত জীবনে নির্ভুলতা ও দক্ষতার গুরুত্ব তুলে ধরে।
প্রদত্ত শব্দ 'প্রত্যূস' ভুল বানানে লেখা হয়েছে। এর সঠিক বানান হলো 'প্রত্যুষ'।
বাংলা ভাষায় 'প্রত্যুষ' শব্দটি একটি তৎসম শব্দ, যা সংস্কৃত থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো ভোরের প্রারম্ভ বা সকাল। এটি 'প্রতি' (প্রতি) এবং 'ঊষা' (ভোর) শব্দের সন্ধির মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। এখানে মূর্ধন্য 'ষ' (ষ) ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাংলা বানানরীতির একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে। ভুল বানানে 'স' (স) ব্যবহারের ফলে শব্দের মূল অর্থ বা উচ্চারণগত কোনো পরিবর্তন না হলেও, তা প্রমিত বাংলা বানানরীতি অনুযায়ী অশুদ্ধ।
“পাকস্থলী” একটি তৎসম শব্দ এবং এর সঠিক বানান হলো 'পাকস্থলী', যেখানে শেষ বর্ণে দীর্ঘ-ঈ-কার (ী) ব্যবহৃত হয়। বাংলা বানানের নিয়ম অনুযায়ী, কিছু তৎসম শব্দে দীর্ঘ-ঈ-কার ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে, যদিও তদ্ভব শব্দে সাধারণত হ্রস্ব-ই-কার ব্যবহৃত হয়। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সঠিক বানানের জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রদত্ত শব্দটি ছিল "নীরিক্ষন", যা ভুল বানান। এর শুদ্ধ রূপ হলো "নিরীক্ষণ"।
"নিরীক্ষণ" শব্দটি "নির" উপসর্গ এবং "ঈক্ষণ" মূল শব্দাংশ থেকে এসেছে। এখানে 'ঈ' (দীর্ঘ ই-কার) ব্যবহৃত হবে কারণ এটি মূল 'ঈক্ষণ' শব্দের অংশ। এছাড়া, 'র' ধ্বনির পর 'ণ' (মূর্ধন্য-ণ) বসে, যেখানে সাধারণত 'ন' (দন্ত্য-ন) বসে না, এটি বাংলা বানানের একটি প্রচলিত নিয়ম।
অর্থ: গভীরভাবে দেখা, মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা করা বা পর্যবেক্ষণ করা।
বাংলা বানানে এটি একটি সাধারণ ভুল। 'নুন্যতম' সঠিক বানান নয়, সঠিক বানান হলো 'নূন্যতম'। 'নূন্যতম' শব্দটি 'নূন' এবং 'তম' প্রত্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত। 'নূন' অর্থ অল্প বা কম। এর সঙ্গে 'তম' প্রত্যয় যোগ হয়ে superlative অর্থ বোঝায়, অর্থাৎ সবচেয়ে কম বা সর্বনিম্ন। এখানে 'নূ' (দীর্ঘ ঊ কার) ব্যবহার করা হয়, 'নু' (হ্রস্ব উ কার) নয়।
বাক্য রূপান্তর বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে বাক্যের অর্থ অপরিবর্তিত রেখে তার গঠন পরিবর্তন করা হয়। প্রদত্ত বাক্যটি একটি জটিল বাক্য এবং এটিকে সরল বাক্যে রূপান্তর করতে বলা হয়েছে।
সরল বাক্য: যে বাক্যে একটি মাত্র কর্তা (উদ্দেশ্য) এবং একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া (বিধেয়) থাকে, তাকে সরল বাক্য বলে। যেমন: আমি ভাত খাই।
জটিল বাক্য: যে বাক্যে একটি প্রধান খণ্ডবাক্য এবং এক বা একাধিক অপ্রধান খণ্ডবাক্য সংযোজক অব্যয় (যেমন: যে, যা, যিনি, যেই, যখন, তখন, যদি, তবে ইত্যাদি) দ্বারা যুক্ত থাকে, তাকে জটিল বাক্য বলে। যেমন: যিনি সৎ, তিনিই সুখী।
প্রদত্ত জটিল বাক্যটি হলো "আমার এমন কিছু নেই যা তোমাকে দিতে পারি।" এখানে "আমার এমন কিছু নেই" এটি প্রধান খণ্ডবাক্য এবং "যা তোমাকে দিতে পারি" এটি অপ্রধান খণ্ডবাক্য। অপ্রধান খণ্ডবাক্যটিকে একটি বিশেষ্য বা বিশেষণ স্থানীয় পদগুচ্ছে পরিবর্তন করে সরল বাক্যে রূপান্তর করা হয়েছে।
রূপান্তরিত সরল বাক্য: "তোমাকে দেওয়ার মতো কিছু আমার নেই।" এই বাক্যে "আমার" কর্তা এবং "নেই" সমাপিকা ক্রিয়া। "তোমাকে দেওয়ার মতো কিছু" এই অংশটি একটি বিশেষ্য স্থানীয় পদগুচ্ছ হিসেবে কাজ করছে, যা বাক্যের মূল অর্থ অপরিবর্তিত রেখেছে। বাক্য রূপান্তরের এই দক্ষতা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য প্রমিত বাংলা লেখায় নির্ভুলতা ও সাবলীলতা আনতে সহায়ক হয়।
উত্তরঃ
বাবা জিজ্ঞেস করলেন তাদের নির্বাচনি পরীক্ষা কবে থেকে শুরু হবে।
উক্তি পরিবর্তনের নিয়মানুসারে, যখন কোনো প্রশ্নবোধক প্রত্যক্ষ উক্তিকে পরোক্ষ উক্তিতে রূপান্তর করা হয়, তখন রিপোর্টিং ভার্ব হিসেবে 'বললেন' এর পরিবর্তে 'জিজ্ঞেস করলেন', 'জানতে চাইলেন' ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। প্রশ্নবোধক বাক্যটি যদি 'কবে', 'কী', 'কেন', 'কোথায়', 'কেমন' ইত্যাদি প্রশ্নসূচক শব্দ দিয়ে শুরু হয়, তাহলে পরোক্ষ উক্তিতে সেই প্রশ্নসূচক শব্দটিই সংযোজক (conjunction) হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে সাধারণত 'যে' সংযোজকটি ব্যবহৃত হয় না। এছাড়া, সর্বনামের পরিবর্তন বক্তা ও শ্রোতার সাপেক্ষে হয় এবং পরোক্ষ উক্তিটি একটি সাধারণ বর্ণনামূলক বাক্যের মতো গঠিত হয়, অর্থাৎ প্রশ্নবোধক চিহ্ন উঠে গিয়ে পূর্ণচ্ছেদ বসে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রয়েছে হাজার বছরেরও বেশি দিনের গৌরবময় ইতিহাস; অথচ বাংলা বানানের ইতিহাস এখনো দুইশ বছরও হয়নি। উনিশ শতকের পূর্বে বাংলা বানানের নিয়ম বলতে তেমন কিছু ছিল না। উনিশ শতকের শুরুর দিকে যখন বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সূত্রপাত ঘটে এবং ঐ সাহিত্যের বাহন হিসেবে সাহিত্যিক গদ্যের উন্মেষ হয়, তখন বাংলা বানানের একটি নিয়ম নির্ধারণ করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই বানানের নিয়ম সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম মেনে রচনা করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে বিশ শতকের বিশের দশকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৩৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বাংলা বানানের নিয়ম প্রবর্তিত হলেও বাংলা বানানের সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৮৮ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মশালা করে ও বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে বাংলা বানানের নিয়মের একটি খসড়া প্রস্তুত করে। বিশ্বভারতী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের অনুসৃত বাংলা বানানের নিয়মের আলোকে ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি 'প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম' প্রণয়ন করে।
বাংলা একাডেমির 'প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম' ভাবনা-কেন্দ্রে রেখে বাংলা বানানের প্রধান নিয়মগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
ই-কার যুক্ত শব্দ:
শব্দের শেষে জগৎ, বাচক, বিদ্যা, সভা, ত্ব, তা, নী, ণী, পরিষদ, তত্ত্ব ইত্যাদি থাকলে তার পূর্বে ঈ-কার না হয়ে সাধারণত ই-কার হয়। যেমন-