প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। এর ভাষা ও বিষয়বস্তু দুর্বোধ্য এবং এর কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ সাধক। এতে বিধৃত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্বকথা। এ সময়ের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতা ও ধর্মনির্ভরতা। ধর্মের বিষয়টি সমাজজীবনের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রিত করেছে, তাই সাহিত্যে ধর্মের কথা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রাচীন যুগের সময়কাল-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
৬৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর মতে
৯৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুকুমার সেনের মতে
৯০০-১৩৫০ খ্রি.
চর্যাপদ: বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য/কবিতা সংকলন চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন। ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে ১৯০৭ সালে 'চর্যাচর্য বিনিশ্চয়' নামক পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের সাথে 'ডাকার্ণব' ও 'দোহাকোষ' নামে আরও দুটি বই নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে আবিষ্কৃত হয়। ১৯১৬ সালে সবগুলো বই একসাথে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে প্রকাশ করেন।
বাংলার পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মালম্বী। তাদের আমলে চর্যাগীতিগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পদগুলো রচিত। পাল বংশের পরে আসে সেন বংশ। সেন বংশ হিন্দুধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যসংস্কার রাজধর্ম হিসাবে গ্রহণ করে। ফলে বৌদ্ধ সিদ্ধচার্যেরা এদেশ হতে বিতাড়িত হয় এবং নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন বাংলাদেশের বাহিরে নেপালে পাওয়া গেছে।
ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
চর্যাপদের শব্দগুলো অপরিচিত, শব্দ ব্যবহারের রীতি বর্তমানের রীতি থেকে ভিন্ন --এর কবিতাগুলো পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে 'সন্ধ্যা ভাষা'ও বলে। চর্যাপদের কবিতাগুলো গাওয়া হত। তাই এগুলো একইসাথে গান ও কবিতা।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার 'বাঙলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ' (Origin and Development of Bengali language) নামক গ্রন্থে ধ্বনি তত্ত্ব ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পদসংকলনটি আদি বাংলা ভাষায় রচিত। কেউ কেউ একে মৈথিলি, উড়িয়া বা আসামি ভাষা বলে দাবি করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, সেকালের বাংলা, উড়িয়া বা আসামি ভাষার পার্থক্য ছিল সামান্যই। উল্লেখ্য যে, চর্যাপদ উড়িষ্যা, বিহার, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের নিজ নিজ ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসাবে বিবেচিত।
এতে মোট ৫১ টি পদ'রয়েছে। কয়েক পাতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সর্বমোট সাড়ে ৪৬টি পদ পাওয়া গেছে। ২৩ নং পদটি খণ্ডিত আকারে উদ্ধার করা হয়েছে অর্থাৎ এর শেষাংশ পাওয়া যায়নি। ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদগুলো পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের মোট পদকর্তা ২৪। অনেকের মতে, আদি চর্যাকার লুইপা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রাচীনতম চর্যাকার শবরপা এবং আধুনিকতম সরহ বা ভুসুকু। কাহ্নপা সর্বাধিক ১৩ টি পদ রচনা করেন।
রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ চর্যাপদ এর অংশবিশেষ
চর্যাপদের কবি / পদকর্তা-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
২৩ জন
ড. সুকুমার সেনের মতে
২৪ জন
পদকর্তা: লুই, শবর, ককুরী, বিরুআ, গুণ্ডারী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, আজদেব, ঢেণ্টণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তন্ত্রী ও লাড়ীডোম্বী। পদকর্তাদের নামের শেষে সম্মানসূচক 'পা' যোগ করা হয়। যেমন: লুই থেকে লুইপা, শবর থেকে শবরপা।
কাহ্ন : ১৩ টি পদ রচনা করেন।
ভুসুকু : ৮ টি পদ রচনা করেন।
সরহ : ৪ টি পদ রচনা করেন।
লুই, শান্তি ও শবরী: ২ টি করে পদ রচনা করেন।
বাকিরা : ১ টি করে পদ রচনা করেন।
লাড়ীডোম্বী : কোন পদ পাওয়া যায়নি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫০টি এবং প্রাপ্ত পদ সাড়ে ছেচল্লিশটি।
ড. সুকুমার সেনের 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫১টি।
লুইপা। তিনি ২টি পদ রচনা করেন। যথা: ১, ২৯। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের বাঙালি কবি হিসেবে পরিচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, তিনি শবরপার শিষ্য ছিলেন। লুইপাকে আদি চর্যাকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
চর্যাপদের প্রথম পদটিঃ
কাআ (শরীর) তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল ॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই (বলে) গুরু পুচ্ছিঅ জাণ ॥
সঅল সহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মরিঅই ॥
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস ॥
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিত্তি বইঠা ॥
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা বা আলো-আঁধারির ভাষা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এর ভাষার নাম 'বঙ্গকামরূপী'। এটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ এবং মধ্যযুগের প্রথম নিদর্শন হিসেবে এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস। কাব্যটি বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রাম থেকে আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হয়।
কাব্যটির রচনাকাল:
সাধারণত চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ ভাগ (আনুমানিক ১৩৫০-১৪০০ খ্রিস্টাব্দ) এর রচনাকাল হিসেবে ধরা হয়। ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণের ভিত্তিতে এই সময়কালকেই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়।
কাব্যটির গুরুত্ব:
ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্য: এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মানবীয় প্রেমমূলক কাব্য এবং বৈষ্ণব পদাবলীর উৎস। বৈষ্ণব সাহিত্যধারার এক সুস্পষ্ট পথনির্দেশক হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ভাষা প্রাক-চৈতন্য যুগের মধ্য বাংলা ভাষার মূল্যবান নিদর্শন। এই কাব্যের মাধ্যমে প্রাচীন বাংলা ও আধুনিক বাংলার মধ্যবর্তী ভাষার বিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য: কাব্যে বর্ণিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা তৎকালীন বাঙালি সমাজের প্রেম-ভাবনা, সামাজিক রীতিনীতি, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং ধর্মচিন্তার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এর মাধ্যমে দেবতাকে মানবীয় রূপে দেখার প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।
আখ্যানগত বৈশিষ্ট্য: এটি একটি আখ্যানকাব্য যা কাহিনি প্রবাহের মধ্য দিয়ে রাধা, কৃষ্ণ ও বড়াইয়ের চরিত্র অঙ্কন করেছে। রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের মানবিক দিকগুলি এই কাব্যে গভীর সংবেদনশীলতার সাথে চিত্রিত হয়েছে।
এই কাব্যটি আবিষ্কারের পর বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নতুন করে রচিত হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
'কুহেলিকা' কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি বিখ্যাত উপন্যাস, যা ১৯৩১ সালে প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে প্রেম, বিদ্রোহ, আত্মত্যাগ এবং তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করা হয়েছে। এটি নজরুলের বিপ্লবী চেতনা ও রোমান্টিক ভাবধারার এক অনবদ্য মিশ্রণ।
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ এবং দার্শনিক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে তার লেখনী ছিল এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যে কারণে তিনি 'বিদ্রোহী কবি' হিসেবে সমধিক পরিচিত। তার সাহিত্যে সাম্য, মানবতা এবং বিদ্রোহের বাণী প্রবলভাবে উচ্চারিত হয়েছে।
চর্যাপদ হলো বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন এবং প্রাচীনতম বাংলা কাব্য। এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের এক ধরণের গান ও কবিতা সংকলন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস জানতে এবং প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে এটি মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার থেকে এর পুথি আবিষ্কার করেন। তাঁর সম্পাদনায় ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশিত হয়। চর্যাপদের ভাষা 'সন্ধ্যা ভাষা' নামে পরিচিত, যার অর্থ আংশিক আলো ও আংশিক অন্ধকারময় বা দ্ব্যর্থবোধক ভাষা।
উত্তরঃ
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য। কবি দুজন হলেন বড়ু চণ্ডীদাস ও চণ্ডীদাস।
মধ্যযুগের যে কাব্যটি প্রথমে এক কবি শুরু করেন এবং পরে আর এক কবি শেষ করেন বলে মনে করা হয়, সেটি হলো শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য।
কবি দুজনের নাম নিয়ে বাংলা সাহিত্যে একটি দীর্ঘ বিতর্ক আছে, যা 'চণ্ডীদাস সমস্যা' নামে পরিচিত। এই বিতর্ক সত্ত্বেও প্রথাগতভাবে যে দুজন কবির নাম এই প্রেক্ষাপটে আসে, তাঁরা হলেন:
বড়ু চণ্ডীদাস: তিনি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের মূল এবং প্রধান রচয়িতা হিসেবে চিহ্নিত। কাব্যের বিভিন্ন ভনিতায় তাঁর নাম উল্লিখিত হয়েছে।
চণ্ডীদাস: 'চণ্ডীদাস' নামে একাধিক কবির অস্তিত্ব থাকায় এবং তাঁদের মধ্যেকার রচনার সময়কাল ও বিষয়বস্তুর পার্থক্যজনিত কারণে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন যে অন্য কোনো চণ্ডীদাস (যেমন দ্বিজ চণ্ডীদাস বা দীন চণ্ডীদাস) পরবর্তীকালে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কিছু অংশ সংযোজন বা পরিমার্জন করেছিলেন, যদিও এই মতের সপক্ষে অকাট্য প্রমাণ নেই। তবে প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে এই নামটিও প্রাসঙ্গিক।
১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়ার কাঁকিল্যা গ্রামের এক গোয়ালঘর থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য আবিষ্কার করেন। এটি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা বিষয়ক একটি আখ্যান কাব্য এবং এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম আবিষ্কৃত একটি সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। এর মাধ্যমে আদি মধ্যযুগের বাংলা ভাষার এক মূল্যবান নিদর্শন পাওয়া যায়।
প্রাচীন যুগে রচিত বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নিশ্চিত নিদর্শন হলো চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থশালা থেকে এর পুঁথি আবিষ্কার করেন, যা ১৯১৬ সালে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা' নামে প্রকাশিত হয়।
চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের রচিত কিছু গান বা কবিতা, যা তাদের ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে। এর ভাষা প্রাচীন বাংলা ভাষারূপের একটি উদাহরণ এবং এটি আধুনিক বাংলা ভাষার উদ্ভবের প্রথম ধাপ নির্দেশ করে। চর্যাপদের রচয়িতাদের মধ্যে লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা, শবরীপা, সরহপা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। চর্যাপদ শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যেরই নয়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল।
কাজী নজরুল ইসলামের 'মৃত্যুক্ষুধা' উপন্যাসের মূলবক্তব্য তৎকালীন গ্রাম বাংলার মুসলিম সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য ও কুসংস্কারের চিত্র তুলে ধরা। এটি মূলত শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, সামাজিক অবিচার এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিবাদ। উপন্যাসে প্রেম, আত্মত্যাগ এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতার পাশাপাশি সাম্যবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে, যেখানে নারীর সংগ্রাম বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
'মৃত্যুক্ষুধা' (১৯৩০) কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় উপন্যাস এবং এটি তাঁর সাম্যবাদী ভাবধারা ও গণমানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই উপন্যাসের পটভূমি হলো হুগলি জেলার মুসলিম অধ্যুষিত একটি গ্রামীণ জনপদ, যেখানে অভাবী ও শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবন, তাদের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সামাজিক শোষণ ও বঞ্চনা নিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আনসার ও মেজোবৌয়ের প্রেম, তাদের চারপাশের মানুষের জীবনযুদ্ধ, এবং তৎকালীন সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদী মনোভাব মূল উপজীব্য। নজরুল দেখিয়েছেন কীভাবে ক্ষুধা মানুষের নীতি-নৈতিকতাকে প্রভাবিত করে এবং কীভাবে মানুষ চরম সংকটের মুখেও মানবিকতা ও প্রেমকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করে।
বিশেষ করে, উপন্যাসে নারীর অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সামাজিক নির্যাতন এবং তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রামকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি প্রেমকাহিনী নয়, বরং এটি শ্রেণি-সংগ্রাম, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং শোষিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক শক্তিশালী সাহিত্যিক দলিল।