পূর্ব বাংলার বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস ছিলেন জাতিতে ব্রাহ্মণ। তাঁর আরাধ্য দেবতার নাম বাশুলী বা বিশালাক্ষী। তিনি চৈতন্যপূর্ব যুগের কবি অর্থাৎ চৌদ্দ শতকের শেষার্ধ থেকে পনের শতকের প্রথমার্ধ সময়ের কবি ছিলেন। তিনি বড়ু চণ্ডীদাস থেকে পৃথক কবি ছিলেন এ কথা নিশ্চিত।
বাংলা ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলির আদি কবি চণ্ডীদাস।
চণ্ডীদাস সহজিয়াপন্থী কবি ছিলেন।
তিনি পূর্বরাগ পর্যায়ের পদ রচনায় পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন।
চৈতন্যদেব তাঁর পদাবলি শুনে বিমোহিত হয়েছিলেন।
চণ্ডীদাসঃ
চণ্ডীদাস ছিলেন বৈষ্ণব কবি, সহজিয়াপন্থী ও বাশুলি দেবীর ভক্ত। তিনি বাংলা ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলির আদি কবি। শিক্ষিত বাঙালি বৈষ্ণব সাহিত্যের রস ও আনন্দের সংবাদ পেয়েছে চণ্ডীদাসের পদাবলি থেকে। চৈতন্যদেব তাঁর পদাবলি শুনে বিমোহিত হয়েছিলেন। তিনি পূর্বরাগ পর্যায়ের পদ রচনায় পাণ্ডিত্য দেখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চণ্ডীদাসকে 'দুঃখবাদী কবি' বলেছেন।
Key Notes:
চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকে সম্পূর্ণ পৌরাণিক ভূমিকায় স্থাপন করেছেন। তিনি রাধার চরিত্রে মিলনের আনন্দের চেয়ে বিচ্ছেদের বেদনাকে তীব্রতর করে রূপায়িত করেছেন।
চণ্ডীদাস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, 'চণ্ডীদাস সহজ ভাষায় সহজ ভাবের কবি- এই গুণে তিনি বঙ্গীয় প্রাচীন কবিদের মধ্যে প্রধান কবি।' এছাড়াও তিনি চণ্ডীদাসকে 'দুঃখবাদী কবি' বলেছেন।
চণ্ডীদাসকে প্রথম মানবতাবাদী কবি বলা হয় । তিনি 'শুনহ মানুষ ভাই / সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপর নাই' বলে জাত-পাতযুক্ত সমাজে প্রথম মানবতার বাণী কাব্যে ধারণ করেছেন। তাছাড়া ব্যক্তিজীবনেও তিনি জাত-সংস্কারের ঊর্ধ্বে ছিলেন।
বিখ্যাত উক্তি: ঘর হইতে আঙিনা বিদেশ।
সই কেমনে ধরিব হিয়া আমার বঁধুয়া আন বাড়ী যায় আমার আঙিনা দিয়া।
“সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই” এই বিখ্যাত উক্তিটি মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি চণ্ডীদাসের বাণী হিসেবে পরিচিত। এই উক্তিটির মাধ্যমে মানবধর্মকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে, যেখানে মানুষ এবং মানবতাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে বলে বিবেচিত। এটি তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ভেদাভেদের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ ছিল এবং মানবতাবাদী চিন্তাধারার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। চণ্ডীদাস মূলত বৈষ্ণব পদাবলী রচনার জন্য বিখ্যাত, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার মাধ্যমে মানবপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমের গভীর সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে।
বড়ু চণ্ডীদাস মধ্যযুগের আদি বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান কবি। তাঁর রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য বাংলা সাহিত্যের প্রথম এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি ১৯০৯ সালে বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ বাঁকুড়ার কাকিল্যা গ্রাম থেকে একটি গোয়ালঘর থেকে আবিষ্কার করেন।
এই কাব্যের মূল বিষয়বস্তু হলো রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলা। বৈষ্ণব পদাবলির পূর্বসূরী হিসেবে এই কাব্যটির ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। চণ্ডীদাস মূলত তিনজন — বড়ু চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস এবং দ্বিজ চণ্ডীদাস— যাদের মধ্যে বড়ু চণ্ডীদাসকেই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি প্রাক-চৈতন্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বাংলা ভাষার বিবর্তন অধ্যয়নের জন্য এটি অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান।
কবি জয়দেব গোস্বামী সংস্কৃত সাহিত্যের একজন মধ্যযুগীয় অন্যতম প্রসিদ্ধ কবি। তিনি গীতগোবিন্দ কাব্যের রচয়িতা। সংস্কৃত কাব্য গীতগোবিন্দের অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর প্রভাব রয়েছে। বাংলা ভাষায় বৈষ্ণব পদাবলির সূচনা জয়দেবের গীতগোবিন্দের পদাবলি থেকেই বলে ধারণা করা হয়।ভক্তি বিজয়ের রচয়িতা সন্ত মহীপতির মতে জয়দেব হলেন বেদব্যাসের অবতার।
কবি জয়দেবের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূমের কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি গ্রামে। তার নামে সেখানে প্রতি বছর মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বেশ কিছু মন্দির ও আশ্রম পরিবেষ্টিত এই গ্রামটি একটি ধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে এই স্থানে বাউল মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।এই গ্রামে জয়দেব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাধামাধবের মূর্তির পুজো করা হয়ে থাকে এবং যে আসনে বসে তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন বলে মনে করা হয়, তা সংরক্ষণ করা রয়েছে।এই গ্রামের যুগলকিশোর মুখোপাধ্যায় বর্ধমান রাজদরবারের সভাকবি ছিলেন। মনে করা হয়ে থাকে, তার অনুরোধে বর্ধমানের মহারাণী ব্রজকিশোরী ১৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দে এই গ্রামে জয়দেবের জন্মভিটেয় রাধাবিনোদ মন্দির স্থাপন করেন। ১৮৬০-এর দশকে নির্বাক বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের রাধারমণ ব্রজবাসী এই গ্রামে তাদের কুলগুরু জয়দেবের জন্মভিটেয় নির্বাক আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে রাধাবল্লভ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়।
তার পিতার নাম ভোজদেব গোস্বামী ও মাতার নাম রামাদেবী।বাংলা,উড়িষ্যা ও দাক্ষিণাত্যর সংস্কৃৃতিতে জয়দেবের প্রভাব অনস্বীকার্য৷
জয়দেব ছিলেন লক্ষ্মণসেনের (১১৭৮-১২০৬) রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম; অপর চারজন হলেন গোবর্ধন আচার্য, শরণ, ধোয়ী ও উমাপতিধর।