রাজা আলসিনৌসের রাজবাড়ি ছিল অপরূপ সৌন্দর্যের আধার।
'অতিথি' গল্পে অডিসিয়স রাজা আলসিনৌসের রাজবাড়িতে প্রবেশ করতে গিয়ে তার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। প্রথমেই চোখে পড়ে সারি সারি ফলের গাছ। কোনোটা ফল দেয় গ্রীষ্মকালে, কোনোটা শীতকালে। সারা বছর ধরেই ফল ও ফুলের সমারোহ। মাঠ, ঝরনা, সবজি বাগান সবই আছে সেখানে। রাজপ্রাসাদের দরজাগুলো সোনার তৈরি। দরজার কাঠামো রূপার। ভিতরে ঢুকেই চোখে পড়ে সোনা ও রূপা দিয়ে বানানো প্রতীকী কুকুর। দেওয়ালের পাশে সুন্দর কাপড়ে ঢাকা উঁচু উঁচু আসন।
ফলে দেখা যায়, রাজা আলসিনৌসের মহানুভবতার মতোই তাঁর প্রাসাদও ছিল ঐশ্বর্যমন্ডিত।
দূরদেশ কিংবা মাঝ সমুদ্রে বিপর্যয়ের মধ্যে আটকা পড়েও অডিসিয়সের দেশপ্রেম ছিল জাগ্রত। যেকোনো অবস্থাতেই তিনি দেশে ফিরে যেতে চান। দেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করাতেই তাঁর জীবনের সার্থকতা।
'অতিথি' গল্পে অডিসিয়ুস সামুদ্রিক বিপর্যয়ে পড়ে সঙ্গীদের হারান। ভাসতে ভাসতে গিয়ে দেবী কেলিপসোর দ্বীপে আছড়ে পড়েন। দেবী তাঁকে আশ্রয় দেন। অমরতা ও চিরযৌবনের লোভ দেখিয়ে তাঁকে আটকে রাখতে চান। কিন্তু অডিসিয়সের কাছে অমরতা কিংবা চিরযৌবনের চেয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল প্রবল। এক মুহূর্তের জন্যও তিনি দেশকে ভুলতে পারেননি। অবশেষে দেবীর আনুকূল্যে তিনি দ্বীপ থেকে মুক্তি পেলেও ফের ভাগ্যবিপর্যয়ে আশ্রয় পান রাজা আলসিনৌসের রাজ্যে। সেখানে রাজবাড়ির চমৎকার আতিথিয়েতায় মুগ্ধ হলেও তাঁর মন পড়ে থাকে নিজের দেশে। রাজা আলসিনৌস তাঁকে আন্তরিকতাপূর্ণ আহ্বানে সেখানে থেকে যাওয়ার সুযোগ দিলেও অডিসিয়স বেছে নেন দেশে ফেরার প্রস্তাব। যেকোনো প্রাচুর্যের চেয়ে নিজ দেশে, আপনজনের মাঝে ফেরাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অমরতা তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন নিজের দেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করবেন বলে। স্বদেশের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিতে উদ্বুদ্ধ করে। দেশে ফেরার থেকে বড়ো চাওয়া এবং প্রাপ্তি তাঁর কাছে আর কিছু নেই।
অডিসিয়ুসের মাঝে দেশপ্রেমের যে বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়, তা তাঁকে মহান করে তোলে। নির্বিঘ্ন জীবন, অমরত্বের প্রস্তাব, রাজকীয় ঐশ্বর্যের চেয়ে তাঁর কাছে স্বদেশই হয়ে উঠেছে প্রধান।
অপরিচিত অতিথি হলেও অডিসিয়ুসকে রাজ দরবারে সৌহার্দপূর্ণভাবে আপ্যায়ন করা হয়।
'অতিথি' গল্পে অডিসিয়ুস রাজা আলসিনৌসের প্রাসাদে সাহায্যের জন্য গেলে তাঁকে রাজার পারিষদসহ সবাই আন্তরিকভকভাবে গ্রহণ করেন।
সবাই মন দিয়ে তাঁর বিপর্যয়ের কাহিনি শোনেন। রাজা-রানি তাঁকে সাহায্যস্বরূণ দেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। রাজবাড়িতে তাঁর জন্য রাজকীয় খাবারদাবার, পোশাক-পরিচ্ছদ ও বিছানার বন্দোবস্ত করা হয়।
অপরিচিত বলে অডিসিয়সের প্রতি অসৌজন্য আচরণ না করে রাজা আলসিনৌসের দরবারে তাঁকে সম্মানিত অতিথি হিসেবেই গ্রহণ করা হয়।
একজন অপরিচিত বিদেশি অতিথিকে আন্তরিকতাপূর্ণ অভ্যর্থনায় রাজা আলসিনৌসের মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায়। অতিথির আকাঙ্ক্ষা অনুসারে তাঁর দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে রাজা নিজের উদারতার পরিচয় দেন।
'অতিথি' গল্পে ভাগ্য বিপর্যয়ে অডিসিয়স রাজা আলসিনৌসের রাজ্যে গিয়ে পৌছান। সেখানে গিয়ে রাজ দরবারে সাহায্য প্রার্থনা করেন। রাজা-রানি তাঁকে সৌহার্দপূর্ণ অভ্যর্থনায় গ্রহণ করেন। রাজকীয় অতিথির ন্যায় তাঁকে আপ্যায়ন করা হয়। রাজার টেবিলে বসেই তাঁকে আহার করানো হয়। রাজার ইশারায় রাজপুত্র উঠে গিয়ে তাঁর বসার বন্দোবস্ত করেন। সপারিষদ তাঁর বৃত্তান্ত শোনেন। পারিষদও তাঁর প্রতি সহানুভূতিপরায়ণ ছিলেন। সবাই চলে গেলে রাজা-রানি অডিসিয়সের বিপর্যয়ের কাহিনি শোনেন। অডিসিয়ুস তাঁর পুরো ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করলে রাজা তাঁর প্রতি গভীর আন্তরিকতা প্রকাশ করেন। অডিসিয়সকে রাজা আলসিনৌস তাঁর রাজ্যে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। অডিসিয়স চাইলে স্বচ্ছন্দে এবং সম্মানের সাথেই সেখানে থাকতে পারবেন বলে আশ্বস্ত করেন। আর অডিসিয়স চলে যেতে চাইলে রাজা তাঁর দেশে যাওয়ার জন্য রাজকীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সুদক্ষ নাবিক ও মজবুত জাহাজে করে তাঁকে দেশে পাঠানোর বন্দোবস্তের আশ্বাস দেন। অডিসিয়সের ঘুমানোর জন্য রাজকীয় বিছানার আয়োজন করা হয়। এভাবে রাজা আলসিনৌস একজন অপরিচিত অতিথির প্রতি সৌহার্দের পরিচয় দেন। তিনি রাজধর্ম রক্ষা করেন। অতিথিকে তাঁর দেশে পাঠানোর বন্দোবস্তে তারই দৃষ্টান্ত প্রকাশ পায়।
ফলে দেখা যায়, রাজা আলসিনৌসের উদারতা ও মহানুভবতায় অডিসিয়ুস রাজপ্রাসাদে আশ্রয় পান। তাঁর বদান্যেই অডিসিয়সের নিজ দেশে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
স্বদেশের প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসায় অডিসিয়ুস দেবী কেলিপসোর অমরত্ব ও চিরযৌবনলাভের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
'অতিথি' গল্পে অডিসিয়স সামুদ্রিক বিপর্যয়ে দেবী কেলিপসোর দ্বীপে আছড়ে পড়েন। দেবী তাঁকে সযত্নে আশ্রয় দেন। তিনি যদি জনপ্রাণীহীন সেই দ্বীপে থেকে যান, দেবী তাঁকে অমর ও চিরযৌবনা রাখবেন বলে প্রস্তাব দেন। কিন্তু অডিসিয়সের মন পড়ে থাকে স্বদেশে। প্রতি মুহূর্তেই দেশের জন্য তাঁর মন কাঁদতে থাকত।
দেশপ্রেমের জন্যই অডিসিয়স অমরতা ও চিরযৌবনলাভের মতো প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
মাঝ সমুদ্রে ঝড়ের কবলে জাহাজডুবি ও সঙ্গীরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে অডিসিয়স ভাসতে ভাসতে আশ্রয় পান দেবী কেলিপসোর দ্বীপে। সেখান থেকে ফিরতে গিয়ে পুনর্বার ঝড়ে নৌকাডুবির পরে কোনোমতে সাঁতরে তীরে পৌছান। ভাগ্যের এমন বিপর্যয়ই তাকে নিয়ে আসে আলসিনৌসের রাজ্যে।
'অতিথি' গল্পে অডিসিয়স রাজা আলসিনৌসের রাজ্যে অনাহূত অতিথি হয়ে আসেন। রাজবাড়িতে গিয়ে সাহায্য চাইলে প্রকাশ পায় তাঁর দুর্ভোগ ও দুরবস্থার কাহিনি। মাঝ সমুদ্রে বজ্রের আঘাতে তাঁর জাহাজ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তাঁর সঙ্গীরা সবাই ডুবে মারা যায়। একটি কাঠের তক্তা ধরে ভাসতে ভাসতে গিয়ে পৌঁছান নির্জন এক দ্বীপে। জনপ্রাণীহীন সেই দ্বীপে ছিল দেবী কেলিপসোর বসবাস। দেবী তাঁকে আশ্রয় দিলেও নিজের স্বার্থ চরিতার্থের জন্য তাঁকে আটকে রাখতে চান বিভিন্ন প্রলোভনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরার সংকল্প ও আকুতিতে দেবী তাঁর দেশে ফেরার বন্দোবস্ত করেন। অডিসিয়স নৌকা তৈরি করেন, দেবী খাবারদাবার, জামাকাপড় দিয়ে সাহায্য করেন। অনুকূল আবহাওয়ায় শান্ত সমুদ্রে চলতে চলতে আচমকা ঝড় ওঠে। পুনরায় তাঁর নৌকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। অডিসিয়ুস কোনোমতে সাঁতরে তীরে পৌছান। সেখান থেকে কোনোভাবে পাড়ে উঠে আশ্রয়ের খোঁজ করতে গিয়ে রাজা আলসিনৌসের রাজ দরবারে পৌছান। সমুদ্রযাত্রায় অডিসিয়সকে বারবার দুর্ঘটনার মুখোমুখি। প্রতিবারই তিনি কোনোমতে প্রাণে বাঁচেন। বারবার বিপদের হাত থেকে বাঁচতে বাঁচতে এসে আশ্রয় পান রাজা আলসিনৌসের রাজ্যে। মমতাই তাকে এখানে নিয়ে আসে।
অডিসিয়সের সমুদ্রযাত্রা ছিল দুর্ভাগ্যজনক। বারবার ঝড়ের কবলে পড়া ও ভাগ্যবিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়াই তাঁকে রাজা আলসিনৌসের রাজ্যে এনে দাঁড় করায়।
রাজা আলসিনৌস তাঁর রাজধর্ম ও মহানুভবতার পরিচয় দিয়ে অভিসিয়ুসকে নিজ দেশে পৌছে দিতেই প্রশ্নোক্ত দৃঢ় মন্তব্যটি করেছিলেন।
রাজা আলসিনৌস অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ মানুষ। অডিসিয়স তাঁর কাছে নিজ দেশে ফেরার জন্য সাহায্য চাইলে তিনি তাঁকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি অডিসিয়সকে কথা দেন, সমুদ্রের শেষ প্রান্তেও যদি তাঁর দেশ হয়, তবুও তাঁদের আপত্তি নেই। রাজার দক্ষ নাবিকেরা তাঁকে নিরাপদেই পৌঁছে দেবে। প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি দ্বারা রাজা আলসিনৌসের অতিথিপরায়ণতা ও মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায়।
অডিসিয়স ও আলসিনৌস উভয়ের মধ্যেই প্রকাশ পায় রাজধর্ম, দেশপ্রেম ও মহানুভবতা। তাঁদের ব্যক্তিত্বের গুণাবলি উভয়কে কাছাকাছি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করে।
'অতিথি' গল্পে ইথাকা রাজ্যের রাজা অডিসিয়স ভাগ্য বিপর্যয়ের ফলে আশ্রয় নেন রাজ আলসিনৌসের রাজ্যে। রাজা আলসিনৌস তাঁকে আন্তরিকতাপূর্ণ আতিথেয়তায় আশ্রয় ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। অডিসিয়সকে ট্রয় যুদ্ধ শেষে নিজ দেশে ফেরার সময় সামুদ্রিক ঝড়ে জাহাজডুবিতে সঙ্গী হারিয়ে আশ্রয় নিতে হয় দেবী কেলিপসোর দ্বীপে। দেবী কেলিপসো তাঁকে অমরত্বের লোভ দেখিয়ে দ্বীপে আটকে রাখতে চাইলে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ অডিসিয়স অমরত্বের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে দেশে ফিরতে চান। দেশে ফিরতে গিয়ে আবার তাঁকে সামুদ্রিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে আশ্রয় নিতে হয় আলসিনৌসের রাজ্যে। রাজা আলসিনৌস তাঁকে সম্মান
ও আন্তরিকতার সাথে তাঁর রাজ্যে আশ্রয় দিতে চাইলেও তিনি নিজ দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। রাজা আলসিনৌস অডিসিয়সের প্রকৃত পরিচয় না জেনেও ভিনদেশি আগন্তুক হিসেবেই নিজ প্রাসাদে আশ্রয়
দেন। অতিথি হিসেবে তাকে রাজকীয় সেবায় বরণ করেন। সম্মানের সাথে তাঁকে নিজ রাজ্যে অবস্থানের প্রস্তাব দিলেও অডিসিয়স নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইলে তাঁর ফেরার জন্য রাজকীয় নৌবহরের বন্দোবস্ত করেন।
অডিসিয়স যেমন দেশপ্রেমে অমরত্ব লাভের প্রস্তাব থেকে রাজকীয় অতিথি হিসেবে স্থায়ী বসবাসের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে চারিত্রিক মহত্ত্বের পরিচয় দেন, আলসিনৌসও তেমনই অপরিচিত অতিথিকে আন্তরিকতার
সাথে আশ্রয় দিয়ে ও তাকে যথাযথভাবে দেশে পৌঁছানোর দায়িত্ব নিয়ে নিজের মহানুভবতা ও মহত্ত্বের পরিচয় দেন।
এর মধ্য দিয়ে উভয়ের রাজধর্ম, দেশপ্রেম, আন্তরিকতাপূর্ণ মনোভাব ও উদারতার পরিচয় মেলে, যা তাদের কাছাকাছি চরিত্রের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
স্বদেশে যাওয়ার পথে সামুদ্রিক ঝড়ে জাহাজ ডুবে যাওয়ায় অডিসিয়স নির্জন দ্বীপে আটকা পড়েছিলেন।
ইথাকা রাজ্যের রাজা অডিসিয়স ট্রয় যুদ্ধ শেষে সঙ্গীদের নিয়ে নিজ দেশে ফিরছিলেন। পথে বজ্রাঘাতে জাহাজ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সঙ্গী যারা ছিল তারা সবাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অডিসিয়স একটি তক্তা ধরে ভাসতে ভাসতে এসে পৌঁছান একটি নির্জন দ্বীপে। সেই দ্বীপে ছিলেন দেবী কেলিপসো। দেবী তাকে অমরত্বের লোভ দেখিয়ে সেই দ্বীপে দীর্ঘ সাত বছর আটকে রাখেন। ভাগ্য বিপর্যয়ে সামুদ্রিক ঝড়ে নিঃস্ব অডিসিয়স দেবী কেলিপসোর প্রলোভনের বশবর্তী হয়ে নির্জন দ্বীপে আটকা পড়েছিলেন।
দেশপ্রেমের চেতনা, উদারতা, মহানুভবতা, অতিথির প্রতি আন্তরিকতাসহ বিবিধ চারিত্রিক গুণাবলির প্রকাশ ঘটেছে 'অতিথি' গল্পে। যা থেকে ব্যক্তজীবনে মহৎ হওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়।
'অতিথি' গল্পে অডিসিয়স গ্রিসের ইথাকা রাজ্যের রাজা হলেও ভাগ্য বিপর্যয়ে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় আলসিনৌসের রাজ্যে। ট্রয় যুদ্ধের শেষে দেশে ফিরতে গিয়ে তাঁর ভাগ্য বিপর্যয়ের শুরু। তাঁকে দুইবার সামুদ্রিক ঝড়ের মুখোমুখি হতে হয়। প্রথমবার দেবী কেলিপসোর দ্বীপে আশ্রয় পেলেও দেবীর চক্রান্তে তাঁকে আটকা পড়তে হয়। দেশপ্রেমের চেতনায় বলিষ্ঠ অভিসিয়স অমরত্বের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে কেলিপসোর দ্বীপ থেকে মুক্তি পেলেও পুনর্বার সামুদ্রিক ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয় রাজা আলসিনৌসের রাজ্যে। আলসিনৌস ও তাঁর পারিষদ একজন অপরিচিত ভিনদেশি হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে আশ্রয় দেন পরম যত্নে। আলসিনৌস তাঁকে নিজ রাজ্যে সম্মানিত অতিথি হিসেবে স্থায়ী বসবাসের প্রস্তাব দিলেও নিজের দেশে ফেরার ইচ্ছাকেই তিনি প্রাধান্য দেন। রাজা আলসিনৌস তাঁকে রাজকীয় জাহাজে নিজ দেশে পৌছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। গল্পটিতে অডিসিয়সের দেশপ্রেম ও ব্যক্তিত্ববোধ প্রকাশ পায়। একইসাথে রাজা আলসিনৌসের রাজধর্ম, মহানুভবতা, অতিথির প্রতি আন্তরিকতাপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ পায়। এসব গুণাবলি মানুষকে মহৎ করে তোলে।
ফলে দেখা যায়, আলোচ্য গল্পটি পাঠে দেশপ্রেম, মহানুভবতা, অতিথির প্রতি আন্তরিকতার মতো চারিত্রিক গুণাবলির প্রকাশ থেকে ব্যক্তিজীবনে এসব গুণাবলি ধারণ করার শিক্ষা পাওয়া যায়।

অডিসিয়ুস নগরে ঢুকেছেন। তখন রাত নেমেছে এই অজানা নগরে। পদে পদে তাঁর দুশ্চিন্তা। পথে একটি মেয়েকে দেখতে পেয়ে বললেন, 'এই যে মেয়ে, শোনো, আমি এদেশের লোক নই। বাইরে থেকে এসেছি। কাউকে চিনি না এখানকার। আমি রাজবাড়ি যাব। বলে দেবে কি তার পথটা কোনদিকে?'
মেয়েটির বাড়ি রাজবাড়ির কাছেই। তার স্বভাবটি ভারি মিষ্টি। সে বলল, 'আমার সঙ্গে আসুন। দেখিয়ে দেবো। কিন্তু আপনি যে বিদেশি তা কাউকে আর বুঝতে দেবেন না। কারো সঙ্গে কথা বলবেন না। বিদেশিদের আমরা বড়ো একটা পছন্দ করি না।' অডিসিয়ুস বুঝলেন এ মেয়ে খুব বুদ্ধিমতী। কোনো কথা না বলে তিনি চললেন ওর পিছু পিছু।
অডিসিয়ুস দেখলেন, নগরটি প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। প্রাচীরের ওপরে জাহাজের মাজ্জ্বল সব দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে।
কিছুদূর গিয়েই দেখেন, চোখের সামনে জেগে উঠেছে রাজবাড়ি। দেখলেন, চমৎকার এক দৃশ্য। দূর থেকেই চোখে পড়ল রাজবাড়ির সামনের সারি সারি ফলের গাছ। ডালিমের, আপেলের, নাশপাতির, ডুমুরের, জলপাইয়ের। এখানে ফল মনে হয়, কখনো শেষ হবে না। আসলে তাই। সেসব গাছের এক দল ফল দেয় গ্রীষ্মকালে, আরেক দল শীতে। সারা বছর ধরেই ফুল ফুটছে, ফল পাকছে। লতিয়ে উঠেছে আঙুরলতা। থোকা থোকা ঝুলছে আঙুর। এক দিক দিয়ে পাকে আরেক দিক দিয়ে ফলে। তরকারিরও চাষ আছে দেখলেন অডিসিয়াস। সবুজেরা যেন আপন মনে খেলছে। মাঠের দুপাশে দুটো ঝরনা। একটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে মাঠের মধ্য দিয়ে। অন্যটি সারা শহরের লোকদের পানির জোগান দেওয়া শেষ করে এখন এসে যেন বিশ্রাম নিচ্ছে রাজবাড়ির কাছে। নিজে না দেখলে সেই দৃশ্যের বর্ণনা দেয়াও কঠিন।
অডিসিয়ুস দেখলেন যে রাজপ্রাসাদের দরজাগুলো সোনা দিয়ে তৈরি। দরজার কাঠামো কাঠের নয়, রূপার। হাতলগুলো সোনার। এগিয়ে দেখেন ভেতরে অনেকগুলো কুকুর, কোনোটি সোনার, কোনোটি রূপার, যেন পাহারা দিচ্ছে সবাই মিলে। ভেতরে ঢুকতেই চোখ পড়ল দেয়ালের পাশে উঁচু উঁচু সব আসন বসানো। প্রতিটি ঢাকা অতি সুন্দর কাপড়ে। রাজবাড়ির মেয়েরা সবাই কাজ করে। কেউ শস্য ভাঙে খুব মিহি করে। কেউ-বা তাঁত বোনে, কেউ কাটে সুতা। এই দেশে ছেলেদের দক্ষতা যেমন জাহাজ চালানোতে, মেয়েদের দক্ষতা তেমনি গৃহকাজে। এর মধ্য দিয়ে অডিসিয়ুস ঢিপঢিপ করা বুকে এগিয়ে এলেন সামনে। দেখেন, সোনার তৈরি যুবকেরা সব মশাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সব খেতে বসেছেন একসঙ্গে। সিংহাসন দেখে অডিসিয়ুস রাজাকে চিনলেন, চেহারা দেখে রানিকে। সোজা চলে গেলেন সেদিকেই। রাজাকে পার হয়ে রানির সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে হাত ধরলেন রানির।
হঠাৎ এমন একটা ঘটনা দেখে থ-মেরে গেছে সবাই। কারো মুখে রা নেই। কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে অডিসিয়ুসই শুরু করে দিলেন তাঁর নিজের কথা। বললেন, 'মহারানি, দয়া করে আমার কথাটি শুনুন। আমি এসেছি আপনাদের কাছে সাহায্য চাইতে। আপনার অতিথিদের কাছেও আমার একই আবেদন। আমি দেশছাড়া পথহারা এক পথিক। আমার প্রার্থনা, আপনারা আমাকে আমার দেশে পাঠিয়ে দেবার একটা ব্যবস্থা করুন।'
আবেদন শেষে রাজা-রানির সামনে ওই মেঝের ওপরেই বসে পড়লেন অডিসিয়ুস। দেখা গেল, কেউই কোনো কথা বলছেন না। বোধ করি বিস্ময় কাটছে না তাঁদের। শেষে একজন কথা বললেন। বয়সে বৃদ্ধ তিনি, ধনী জ্ঞানে ও অভিজ্ঞতায়। কথা বলেন চমৎকার। তিনি বললেন, 'রাজা আলসিনৌস, এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না। ইনি আগন্তুক, ধুলোতে বসে আছেন। আপনার উচিত একে উঠে বসতে বলা। এঁর জন্য খাবার আনতে হুকুম করা। আমরা সবাই তো অপেক্ষা করে আছি আপনি কী বলেন সেটা শোনার জন্য।'
আলসিনৌসের তখন খেয়াল হলো। অডিসিয়ুসকে হাত ধরে তুললেন তিনি। রুপার তৈরি আসনে বসতে দিলেন তাঁকে। রাজপুত্রদের একজন উঠে গেল রাজার ইশারায়, সেই আসনেই বসলেন অডিসিয়ুস। হাত ধোয়ার পাত্র এল। টেবিল এল সামনে। তারপর এল অত্যন্ত সুস্বাদু সব খাবার। রাজা বললেন, 'আপনারা সবাই ফিসিয়ানদের চালক ও পরামর্শদাতা। রাত তো এখন অনেক হয়েছে। খাওয়া দাওয়াও শেষ হয়েছে আমাদের। আজ এ-পর্যন্তই থাক। কাল সকালে বরং আমরা আবার মিলিত হব। তখন ঠিক করা যাবে এই অতিথির জন্য আমরা কী করতে পারি। জানি না, এঁর দেশ কোথায়, কত দূরে। যেখানেই হোক, যত দূরেই হোক, যাতে তিনি সহজে, নিরাপদে দেশে পৌঁছতে পারেন তার ব্যবস্থা অবশ্যই করা যাবে। আমরা ব্যবস্থা করব, সঙ্গে লোকও দেবো। এঁকে নিজের দেশে পৌঁছে দেবো। তবে আর একটা কথা। এমনও তো হতে পারে যে, ইনি আদপে মানুষই নন। মানুষের ছদ্মবেশ ধরে এসেছেন।
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন অডিসিয়ুস, 'ধন্যবাদ মহারাজ, ওই একটা বিষয়ে আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি। আমি মানুষই। ছদ্মবেশী দেবতা নই। আমার দুঃখের লম্বা ফিরিস্তি দিয়ে আমি আপনাদের বিরক্ত করতে চাই না। কষ্টে কষ্টে আমার হৃদয় শক্ত পাথর হয়ে যাওয়ার কথা। তবু ওই যে আপনাদের সামনে খাবার খেলাম অমন গপগপ করে, সে শুধু এই জন্যই যে আমি মানুষ, আর মানুষের পক্ষে ক্ষুধার চেয়ে বড়ো কোনো মুনিব নেই। প্রার্থনা এখন আমার কেবল একটাই, কাল সকালেই আপনাদের এই ভাগ্যাহত অতিথির যাত্রার ব্যবস্থাটা করুন। এখন একটি মাত্র ইচ্ছাই শুধু বেঁচে আছে; দেশের মাটিতে, আপনজনের মাঝখানে যেন আমি মরতে পারি। ব্যস আর কিছু নয়।'
অডিসিয়ুসের কথা বিফলে গেল না। মনে হলো খুশি হয়েছেন সবাই। একবাক্যে সবাই মিলে রায় দিলেন যে এঁকে স্বদেশে পাঠানোই ঠিক। তারপর তাঁরা বিদায় নিলেন পরস্পরের কাছ থেকে। চলে গেলেন যে যাঁর বাড়ি। রইলেন শুধু রাজা আলসিনৌস আর রানি এরিতি এবং তাঁদের সঙ্গে বসে সাহায্যপ্রার্থী অডিসিয়ুস। নারী গৃহকর্মীরা খাবারের পাত্রগুলো সরিয়ে নিচ্ছিল। এঁরা তিনজন কথা বলছিলেন।
রানিই প্রথমে বললেন কথা। অডিসিয়ুসের গায়ে তিনি তাঁর পরিচিত জামা কাপড় দেখে ভারি অবাক হয়েছেন। সেজন্য সরাসরিই প্রশ্ন করলেন তিনি। বললেন, 'কিছু মনে করবেন না, আমি সরাসরিই জিজ্ঞেস করছি আপনাকে। আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন? গায়ের জামা কাপড়গুলোই-বা পেলেন কোথায়? আপনি না বললেন যে আপনি এখানে এসেছেন ঘটনাচক্রে?'
সতর্কভাবে তখন জবাব দিলেন অডিসিয়স। বললেন আপন কাহিনি। 'মহারানি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার কাহিনি একটানা দুর্ভোগেরই কাহিনি। সেটা শুনতে গেলে আপনি বিরক্ত হবেন। সংক্ষেপে আমি আপনার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। ওই যে সমুদ্র আপনাদের দেশকে ঘিরে রেখেছে, ওই সমুদ্রেরই এক অজানা কোণে দ্বীপ আছে একটি। সেখানে জনপ্রাণী নেই, আছেন কেবল কেলিপসো। দেবী তিনি, সৌন্দর্যে তুলনাবিহীন। কিন্তু অন্যদিকে আবার ভীষণ ভয়ংকর। তাঁর ভয়ে সে দ্বীপে মানুষ তো ঘেঁষেই না, দেবতারাও পা দেন না। অথচ এমনি কপাল আমার যে সেই দ্বীপে গিয়েই আছড়ে পড়েছিলাম আমি। না, কোনো সঙ্গী ছিল না আমার। সঙ্গী যাঁরা ছিলেন, একসঙ্গে জাহাজে ছিলাম যাঁদের সঙ্গে, তাঁরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। মাঝ সমুদ্রে বজ্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল জাহাজ। কেবল আমিই বাঁচলাম, কোনোমতে। তক্তা ধরে ভাসতে ভাসতে নয় দিন পর দশ দিনের দিন রাতের বেলা অন্ধকারে আছড়ে গিয়ে পড়েছিলাম ওই দ্বীপে। সেই অনিন্দ্যসুন্দর দেবী আমাকে তুলে নিলেন। যত্ন করলেন। এ-ও বললেন যে, অমরতা দেবেন আমাকে, আমার আর বয়স বাড়বে না কোনোদিনই। কিন্তু একদিনের জন্য কেন, এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে কোনো শান্তি ছিল না। আমি আমার দেশকে ভুলতে পারিনি। সাত বছর ছিলাম সেই দ্বীপে। আমার চোখের পানি আকাশ দেখত, বাতাস দেখত। আর সেই পানিতে কাপড় ভিজত।
'অষ্টম বছরে কেন জানি না দেবীর হঠাৎ দয়া হলো। তিনি বললেন, যেতে দেবেন। নিজের হাতে নৌকা তৈরি করলাম আমি। তিনি সঙ্গে দিলেন প্রচুর পরিমাণে খাবার, আর কোনোকালেই ধ্বংস হবে না এমন জামাকাপড়। বাতাস দিলেন অনুকূল। রওনা তো হলাম। সতেরো দিন সমানে চলল নৌকা। আঠারো দিনের দিন দূরে দেখলাম, ছায়ার মতো ভেসে উঠেছে আপনাদের পাহাড়-পর্বতগুলো। আমার খুশি তখন দেখে কে। কিন্তু হায়, সেই হাসিখুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ দেখি ঝড় উঠেছে, আর সেই সঙ্গে উতলা হয়ে উঠেছে সমুদ্র। কী করব ঠিক করতে পারছি না। এমন কী ঘটেছে সেটা বুঝে ওঠার আগেই চোখের সামনে দেখলাম, নৌকাটা ভেঙে একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তবু পানিতে মাছের মতো সাঁতরে কোনোমতে বেঁচে রইলাম। তারপর বাতাস ও স্রোতের মুখে চলে এসেছি আপনাদের তটভূমিতে। কিন্তু পাড়ে উঠবার চেষ্টা করে দেখি-না, সে উপায় নেই। তাই আবারও সাঁতরাতে থাকলাম। শেষে একটা নদীর মুখ পেয়ে সেখানে ঢুকে ওঠার মতো জায়গা পেলাম একটু। জায়গাটা পাহাড়ি নয়, বাতাস যে আক্রমণ করবে তেমনও নয়।
'কোনোমতে পাড়ে উঠে আশ্রয় খুঁজলাম। এরই মধ্যে রাত এল নেমে। একটা ঝোপের ভেতর ঢুকে এলিয়ে দিলাম শরীর। সারা রাত অজ্ঞানের মতো ঘুমিয়ে, অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠেছি। সত্যি কথা বলতে কি, সূর্য তখন ওঠার দিকে নয় ডোবার দিকেই বরং। ঘুম ভাঙলে দেখি রাজ, কন্যার সঙ্গিনীরা বল নিয়ে ছোটাছুটি করে খেলছেন। স্বয়ং রাজকন্যাও আছেন তাদের সঙ্গে। রাজকন্যাকে দেখে তো প্রথমে মনে হয়েছিল কোনো দেবীকে দেখছি বুঝি। তাঁর কাছেই আবেদন করেছিলাম সাহায্যের জন্য। চমৎকার বিচক্ষণতা তাঁর। তিনি খাবার দিয়েছেন, জামা কাপড় দিয়েছেন। এই হলো বৃত্তান্ত আমার।'
রাজা আলসিনৌস বললেন, 'রাজকন্যা যা করেছে ঠিকই করেছে, তবে অপরাধ করেছে একটা। তার উচিত ছিল আপনাকে সরাসরি রাজবাড়িতেই নিয়ে আসা। সর্বপ্রথম তার কাছেই তো আপনি সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন।'
অডিসিয়ুস বললেন, 'মহারাজ, সেটা আপনার মেয়ের দোষ নয়। আমি নিজেও রাজি হতাম না সরাসরি আপনার কাছে আসতে। আমার ভয়, ছিল আপনি হয়তো খুশি হবেন না আমাকে দেখে।' রাজা শুনে হাসলেন। বললেন, 'এসব সামান্য ব্যাপারে আমরা রাগ করি না। আমি দেখছি স্বভাবের দিক থেকে আপনার সঙ্গে আমাদের গরমিল নেই। আপনি ইচ্ছে করলে স্বাচ্ছন্দ্যে আমাদের এখানে থাকতে পারেন। আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি হবে না। আর যদি মনে করেন চলে যাবেন তাতেও আমরা কেউ বাধা দেবো না। আপনার দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য আমি কী বলি শুনুন। আমি বলি, আপনি যদি চান কাল সকালেই রওনা হতে পারেন। আপনি জাহাজে যাবেন। আমাদের সুদক্ষ নাবিকেরা টানবে তার দাঁড়। ঘুমাতে ঘুমাতে চলে যাবেন। দূরত্বের প্রশ্ন নেই। সমুদ্রের শেষ প্রান্তেও যদি হয় আপনার দেশ, তবু আপত্তি নেই আমাদের। আমরা পৌঁছে দেবো আপনাকে। আপনি দেখবেন আমাদের নাবিকদের দক্ষতা।'
ধৈর্য ধরে শোনেন অডিসিফুস। তাঁর বুক ভরে ওঠে আশায়। কথাবার্তা যখন চলছিল তারই ফাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রানি এরিতি। গৃহকর্মীরা লেগে গিয়েছিল কাজে। মশাল হাতে নিঃশব্দ তৎপরতা তাদের। সুন্দর খাট এনে বিছিয়ে দিল একটা। ভারী বিছানা দিল পেতে। ওপরে পাড়ল চাদর। এনে রাখল গরম কম্বল। সব কাজ শেষ হলে অডিসিফুসের কাছে এসে বলল তারা, 'আপনার বিছানা তৈরি। ইচ্ছা করলে ঘুমুতে পারেন।' আর তখুনি বুঝলেন অডিসিয়ুস, ঘুমানো তাঁর জন্য কী ভীষণ প্রয়োজন।
এতসব বিপদ ও উদ্বেগের শেষে রাতের বেলা নিশ্চিন্তে, আরামে ঘুমালেন তিনি।
Related Question
View Allরাজবাড়ির ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরম।
রাজবাড়ির দরজাগুলো ছিল সোনার তৈরি এবং কাঠামো রুপোর তৈরি। ভেতরে অনেক সোনা ও রুপোর কুকুর দেখতে পাওয়া যায়। ভেতরে আছে উঁচু উঁচু আসন যা কাপড়ে ঢাকা এবং রাজবাড়ির মেয়েরা সবাই কাজ করে। কেউ শস্য ভাঙে খুব মিহি করে আবার কেউ তাঁত বোনে, কেউ সুতো কাটে। সেখানে সোনার তৈরি যুবকেরা মশাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর গণমান্য ব্যক্তিরা সব একসঙ্গে খেতে বসেন।
উদ্দীপকে বলা হয়েছে দেশ-কাল ভেদে সব মানুষই এক, যা 'অতিথি' গল্পের রাজার আশ্বাসে প্রকাশ পেয়েছে।
দেশ-কাল-পাত্র ভেদে সব মানুষই এক। মানুষের প্রথম ও সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সে মানুষ। দেশ, কাল, পরিবেশ-পরিস্থিতি যাই থাকুন না কেন, মানুষই সবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। উদ্দীপকে মানুষকে সবার ওপরে স্থাপন দেওয়া হয়েছে। দেশ, কাল, পাত্রভেদে মানুষ কেবলই মানুষ। কোথাও কোনো পার্থক্য নেই। 'অতিথি' গল্পে রাজা ঠিক এই মনোভাব পোষণ করেছেন অডিসিয়ুসের প্রতি। দেশ-কাল-পাত্র কোনোকিছু বিবেচনা না করে তিনি অতিথি অডিসিয়ুসকে কথা দিয়েছেন তার নিজ দেশে পৌছে দেওয়ার। তাই বলা যায়, রাজার এই আশ্বাস ও আন্তরিকতা সাম্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটিই 'অতিথি' গল্পের একমাত্র দিক নয়-মন্তব্যটি যথার্থ।
মানুষের জীবনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বলে সমস্যা এলে সেই মানুষকে দূরে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। তাকে কাছে টেনে নিয়ে আন্তরিকতা দেখানোই মানবতা।
উদ্দীপকে মানুষের মানুষ পরিচয়ই বড় করে দেখানো হয়েছে। দেশ, কাল, পাত্র যাই হোক না কেন, সব মানুষই উদারতা ও সাম্যের অন্তর্ভুক্ত। উদ্দীপকে এ বিষয়টিই প্রকাশ পেয়েছে। 'অতিথি' গল্পে অতিথির প্রতি উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা ছাড়াও প্রকাশ পেয়েছে অডিসিয়ুসের জীবনের করুণ পরিণতি। যার ফলে সে নিঃস্ব হয়ে রাজার শরণাপন্ন হয়েছে সাহায্যের জন্য।
উদ্দীপকের সাম্য ও উদারতার দিক দিয়ে 'অতিথি' গল্পের সাদৃশ্য থাকলেও এটি গল্পের একমাত্র দিক নয়। গল্পে প্রকাশ পেয়েছে একজন 'সুশাসকের বৈশিষ্ট্য, দেশপ্রেম, রাজধর্ম, মহানুভভতা এবং অডিসিয়ুসের অসহায় অবস্থা, যেগুলো উদ্দীপকে অনুপস্থিত। তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
রাজপ্রাসাদের দরজাগুলো সোনা দিয়ে তৈরি।
সবার অবাক হওয়ার পরের নিস্তবদ্ধতা বোঝাতেই আলোচ্য উক্তিটি করা হয়েছে।
অডিসিয়ুস অত্যন্ত বিচলিত ও বিপদগ্রস্ত হয়ে নগরীতে প্রবেশ করেছিলেন। মূলত রাজা ও রানির কাছে তার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। আর এজন্য তিনি এতটাই মরিয়া ছিলেন যে, রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেই তিনি রাজা এবং রানিকে চিনে ফেললেন। আর রাজাকে অতিক্রম করে তিনি রানির কাছে পৌঁছলেন। রানির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তিনি রানির হাত ধরলেন। অডিসিয়সের এমন কাণ্ড দেখে সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন বলেই প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করা হয়েছে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!