উত্তরঃ
বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এই অঞ্চলে দেশের প্রায় ২৫% মানুষ বসবাস করে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী এবং বাস্তুসংস্থান আজ অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন।
উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব:
জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাব বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে:
⇒ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: নাসা ও আইপিসিসি (IPCC)-এর তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে তলিয়ে যেতে পারে।
⇒ লবণাক্ততা বৃদ্ধি: সমুদ্রের লোনা পানি নদ-নদী হয়ে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এতে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে এবং কৃষিজমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
⇒ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ: ঘূর্ণিঝড় (সিডর, আইলা, আম্পান, মোখা) এবং জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।
⇒ কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি: উপকূলীয় অঞ্চলের প্রধান জীবিকা কৃষি ও চিংড়ি চাষ। লবণাক্ততার কারণে ধানের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং লোনা পানির আগ্রাসনে স্বাদু পানির মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে।
⇒ স্বাস্থ্য ঝুঁকি: লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে উপকূলীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও চর্মরোগের হার বাড়ছে।
⇒ বাস্তুচ্যুতি ও জলবায়ু উদ্বাস্তু: প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে, যাকে 'জলবায়ু অভিবাসন' বা Climate Migration বলা হয়।
টেকসই অভিযোজন কৌশল:
⇒ লবণাক্ততা সহিষ্ণু কৃষি: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) উদ্ভাবিত লবণাক্ততা সহিষ্ণু উচ্চফলনশীল জাত (যেমন-ব্রি ধান ৬৭, ৭০, ৯৭ ও ৯৯) বিস্তার ঘটানো। বন্যাপ্রবণ এলাকায় 'বেড়' বা ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের প্রসার ঘটানো।
⇒ জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামো: উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলোকে আরও উঁচু ও টেকসই করা এবং বাঁধের পাশে বনায়ন করে একে শক্তিশালী করা। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ যা দুর্যোগের সময় মানুষ ও গবাদি পশুর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।
⇒ সবুজ বেষ্টনী: উপকূলজুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল (যেমন- সুন্দরবন) রক্ষা এবং কৃত্রিমভাবে বনায়ন করা যা জলোচ্ছ্বাসের গতি কমিয়ে দেয়। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সুপেয় পানির অভাব দূর করা।
⇒ বিকল্প জীবিকা: লবণাক্ত পানিতে কাঁকড়া পালন, কুঁচিয়া চাষ এবং লোনা পানি সহনশীল হাঁস পালনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্যোগের পূর্বাভাস দ্রুত তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া।
⇒ রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সুপেয় পানির দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা করা।
⇒ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০: সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় 'বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০' (BDP ২১০০) গ্রহণ করেছে। এটি একটি শতবর্ষী মহাপরিকল্পনা যার মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বদ্বীপ গড়ে তোলা। এছাড়া 'বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেইঞ্জ স্ট্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান' (BCCSAP) এবং 'ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান' (NAP) এই অভিযোজন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।