সূচনা : বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা নদীমাতৃক এই দেশটি কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ দেশের জাতীয় অর্থনীতি অনেকটা কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে এ দেশ ভরে উঠে ফসলের সমারোহে। কৃষকের উৎপাদিত ফসল আমাদের খাদ্যচাহিদা পূরণ করে। আবার এই ফসল বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। তাই কৃষককে বলা হয়, এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি।
কৃষকের অতীত ইতিহাস : প্রাচীনকালে এ দেশে জনসংখ্যা ছিল কম, জমি ছিল বেশি। এ দেশে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো ও সমাজব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয় অতি প্রাচীনকাল থেকে। প্রাচীন যুগের গুহাচিত্রেও কৃষিকাজের নমুনা পাওয়া যায়। যাযাবর জীবন ছেড়ে মানুষ যখন স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে, তখন থেকেই কৃষির যাত্রা শুরু হয়। এরপর কৃষি ক্ষেত্রে মানুষ এগিয়ে গেছে উৎকর্ষতার স্বর্ণশিখরে। সেসময় তাদের ছিল গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গোরু আর পুকুরভরা মাছ। কৃষকের জীবন ছিল সুখী ও সমৃদ্ধ। এরপর এলো বর্গিদের অত্যাচার, ফিরিঙ্গি-পর্তুগিজ জলদস্যুদের নির্যাতন, ইংরেজদের খাজনা আদায়ের 'সূর্যাস্ত আইন', শোষণ ও নিপীড়ন। এলো মন্বন্তর, মহামারি। গ্রামবাংলা উজাড় হলো। কৃষক নিঃস্ব হয়ে গেল। সম্পদশালী কৃষক পরিণত হলো ভূমিহীন চাষিতে। এভাবেই এককালের সুখী ও সমৃদ্ধ কৃষকের গৌরবময় ইতিহাস অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
কৃষকের জীবন : রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নতুন নতুন ফসলের অযুত সম্ভারে এ দেশকে যারা সমৃদ্ধ করেছে তারা হলো এ দেশের কৃষক সম্প্রদায়, যাদের অধিকাংশই দরিদ্র ও নিরক্ষর। অথচ তারাই এ দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি। রোগক্লিষ্ট, ঋণভারে জর্জরিত এ মানুষগুলো জানে না যে, তাদের নিজের পল্লির বাইরে বৃহৎ এক পৃথিবী আছে। তাদের গায়ে ছেঁড়া কাপড়, থাকার জন্য ছনের ভাঙা ঘর। জীবনযাপনে তারা অত্যন্ত সহজসরল। তাদের জীবনের একমাত্র সম্বল হালের গোরু ও ভোঁতা কৃষি যন্ত্রপাতি। রোদ-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সারা দিন কাজ করে তারা মাঠ ভরে সোনার ফসল ফলায়, এতেই তাদের আনন্দ।
অর্থনীতিতে কৃষকের অবদানঃ কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেলে কেবল খাদ্যঘাটতি হয় না, দ্রব্যমূল্যের উপরেও পড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানার স্বাভাবিক উৎপাদনে সংকট দেখা দেয়। অভ্যন্তরীণ ও বহির্বাণিজ্যেও সৃষ্টি হয় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে, কৃষি উৎপাদন ভালো হলে অর্থনীতি সবল হয়ে ওঠে। খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল জোগায় কৃষি। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। এভাবে কৃষি ও কৃষক জাতীয় আয় সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান রাখছে।
শিল্পক্ষেত্রে কৃষকের অবদান : বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত অনেক শিল্প কৃষিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বাংলাদেশের কৃষকরাই এসব শিল্পের কাঁচামালের জোগান দেয়। যেমন: বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের প্রধান উপকরণ- পাট, তুলা, রেশম ইত্যাদি আসে কৃষি থেকে। চিনিশিল্পের অন্যতম উপকরণ আখ, তাও আসে কৃষি থেকে। এছাড়া কৃষকদের উৎপাদিত গম থেকে আটা, ময়দা প্রভৃতি তৈরি হয়।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে কৃষক : বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে কৃষক বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। পাটের 'জীবন রহস্য' আবিষ্কারের ফলে পাটের নতুন নতুন জাত সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া চা রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।
কৃষকের বর্তমান অবস্থা : বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ভূমিহীন। অন্যের জমিতে তারা বর্গাচাষ করে। অনেকের হালের বলদ পর্যন্ত নেই। এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের যথার্থ মূল্য পায় না। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। আশার কথা হলো, বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে দেশে কৃষিবিপ্লব সাধিত হয়েছে। এর ফলে কৃষক ও কৃষির উন্নয়ন ঘটেছে।
কৃষকের উন্নয়নে করণীয় : দেশের উন্নয়নের স্বার্থেই কৃষকদের উন্নয়ন দরকার। কৃষকের উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা রকম উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন:
তাদের উন্নয়নের জন্য বাস্তবভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা
তাদের জন্য নিজস্ব জমির ব্যবস্থা করা
কম দামে সার ও কীটনাশক সরবরাহ ও তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা
পচনশীল ফসল সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও আধুনিক চাষপদ্ধতি সম্বন্ধে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া
এছাড়া বন্যার পানি যেন ফসলের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারিভাবে উন্নতমানের বীজ সরবরাহ এবং প্রকৃত দরিদ্র কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
উপসংহার: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি ও কৃষকের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু কৃষকের সামাজিক মর্যাদা এখনো নিম্নস্তরে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষকের উপর চলছে অত্যাচার। মনুষ্যত্ব হয়েছে নিগৃহীত। সেই লাঞ্ছনার দিন আজ শেষ হোক। দিকে দিকে শুরু হোক কৃষি জাগরণের জোয়ার। কারণ, কৃষকের সমৃদ্ধির ভিতরই লুকিয়ে আছে আমাদের সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের বীজ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, 'আমাদের দেশের চাষের জমির উপর সমস্ত পৃথিবীর জ্ঞানের আলো ফেলিবার দিন আসিয়াছে।' কৃষকের উপর সামান্য নজর দিলে তারা দেশকে পালটে দিতে পারে। এর প্রমাণ, বর্তমানে বাংলাদেশ 'তলাবিহীন ঝুড়ি' বা 'খাদ্যঘাটতির দেশ'- এই অপবাদ ঘুচিয়ে খাদ্য-উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!