"সমাজবিজ্ঞান হলো অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান"- উক্তিটি ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের।
সমাজবিজ্ঞান ন্যায় অন্যায় বোধ নিরপেক্ষ অর্থাৎ বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিপ্রবণ বিজ্ঞান।
বিজ্ঞানের প্রধান ধর্মই হচ্ছে নৈতিকতার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকা। আর তাই সমাজবিজ্ঞানও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখে। সমাজবিজ্ঞানীগণ ব্যক্তিগত মূল্যবোধের দ্বারা কোনোভাবেই প্রভাবিত না হয়ে যাবতীয় সামাজিক ঘটনা বিচার-বিশ্লেষণ করেন। এ কারণেই সমাজবিজ্ঞানকে মূল্যবোধ নিরপেক্ষ বিজ্ঞান হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়।
উদ্দীপকের বিষয়বস্তু সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।
মানবসমাজের আদিম উৎসভূমি হচ্ছে গ্রামীণ সমাজ এবং বর্তমানেও বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ গ্রামনির্ভর। আর এ বিষয়ে জানার জন্যই সমাজবিজ্ঞানে যে শাখার উদ্ভব হয়েছে তা হলো গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান। সমাজবিজ্ঞানের এ শাখায় গ্রামীণ সমাজজীবন, সমাজের অনুষ্ঠান- প্রতিষ্ঠান, কৃষি কাঠামো, অর্থনীতি, পরিবার, নেতৃত্ব কাঠামো, ক্ষমতা কাঠামো, মর্যাদা, সামাজিক স্তরবিন্যাস ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
উদ্দীপকেও গ্রামীণ সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। এখানে গ্রামের কৃষক রহিম মিয়ার পরিবার ও কৃষি কাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রহিম মিয়ার ঘরে নতুন ধান ওঠায় পিঠা-পায়েস তৈরির আয়োজন করার বিষয়টি গ্রামীণ সমাজের অন্যতম অনুষ্ঠান নবান্ন উৎসবকে নির্দেশ করে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের বিষয়টি গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞানেরই আলোচ্য বিষয়।
উদ্দীপকের রহিম মিয়ার অবস্থার উত্তরণে সমাজবিজ্ঞানের পাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্দীপকের রহিম মিয়া একজন বর্গাচাষী। সে অন্যের জমিতে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু তার মনে দুঃখ তার ফলানো ফসল অন্যের ঘরে চলে যায়। তার বাসনা তার যদি একটু জমি থাকতো তাহলে এ কষ্ট আর হতো না। রহিম মিয়ার বক্তব্যে সম্পত্তির ভিত্তিতে শ্রেণি বৈষম্যের বিষয়টি বা সম্পত্তির মালিকানার ভিত্তিতে সামাজিক অসমতা বা স্তরবিন্যাসের দিকটি পরিলক্ষিত হয়। আর সামাজিক অসমতা বা স্তরবিন্যাস সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়।
সামাজিক অসমতা বা স্তরবিন্যাস বলতে বোঝায়, সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে উঁচু-নিচু প্রভেদ। সমাজবিজ্ঞান সমাজের মানুষের এই উঁচু-নিচু প্রভেদ নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা চালায়। সামাজিক স্তরবিন্যাসের মূল কারণ কী, এর শেকড় কোথায় গ্রোথিত, এর পিছনে কোন উপাদানগুলো ক্রিয়াশীল ইত্যাকর বিষয়গুলোর কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি এর সমাধান বা স্তরবিন্যাসের মাত্রা কমিয়ে আনার উপায় নিয়েও বিচার বিশ্লেষণ করে। সমাজে সবাই সম-সম্পদের মালিক নয়, আবার সবাই একই মর্যাদার অধিকারী নয়। অর্থাৎ প্রত্যেকটি মানুষই হয় একজনের থেকে বেশি সম্পদশালী, না হয় কম সম্পদশালী। হয় বেশি মর্যাদার অধিকারী, না হয় কম মর্যাদার অধিকারী। সমাজবিজ্ঞান এই কম সম্পদশালী বা কম মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিদের বিভিন্ন সৎ উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে সামাজিক স্তরবিন্যাস কমিয়ে আনার শিক্ষা দেয়। কেননা, সামাজিক গতিশীলতার মধ্য দিয়ে মানুষ তার নিজের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে।
তাই বলা যায়, রহিম মিয়া তার কর্মদক্ষতার মাধমে তার সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান তার জন্য ফলপ্রসূ হবে।
Related Question
View Allআচার-আচরণের পশ্চাতে মানসিক কারণ ছাড়া অর্থনৈতিক, র ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি শক্তির প্রভাব রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে যে কয়েকজন ব্যক্তির অবদান স্বীকার্যক তার মধ্যে ম্যাকিয়াভেলি অন্যতম। সমাজদর্শন প্রচার করতে গিয়ে তিনি বাস্তবতার আশ্রয় নিয়েছেন। এর মাধ্যমে ম্যাকিয়াভেলি নি সমাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তার The Prince গ্রন্থে আলোচনা করেন। তার সমাজ আলোচনার মূল ভিত্তি ছিল মানব প্রকৃতি ও মানব মনোভাব। তৎকালীন সময়ে সমাজের মানুষ যে নৈরাজ্যকর অবস্থায় ছিল ম্যাকিয়াভেলি তার সুষ্ঠু ব্যাখ্যা দেন যা সমাজবিজ্ঞান বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত বিষয়টি হলো ধর্ম। কারণ ধর্ম হচ্ছে অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বিশ্বাস। ধর্মে জ্ঞান, অনুভূতি ও ক্রিয়ার এক সার্থক সমন্বয় দেখা দেয়। এছাড়া মানুষ পার্থিব ও অপার্থিব কোনো কিছু পাওয়ার আশায় এ শক্তিতে বিশ্বাস করে। ধর্ম সমাজবিজ্ঞানের পরিধিভুক্ত।
সমাজজীবনে ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে জাতি ও গোষ্ঠীগত পার্থক্য এবং শ্রেণিবিভাজন পরিলক্ষিত হয়। ধর্ম মানুষের আচরণ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ইত্যাদিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সমাজ বা গোষ্ঠীগত স্বকীয়তা দান করে। ধর্মীয় মূল্যবোধ, বিশ্বাস, ধর্মের উৎপত্তি ও এর বিকাশ, ধর্মের গুরুত্ব, ধর্মের প্রভাব, ধর্মের প্রকারভেদ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে এর কার্যকারিতা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সমাজবিজ্ঞান আলোচনা করে থাকে।
সুতরাং আমরা যথার্থই বলতে পারি যে, স্যারের আলোচিত ধর্ম সম্পর্কিত জ্ঞান সমাজবিজ্ঞানের পরিধিভুক্ত।
ধর্ম ছাড়াও সকল সামাজিক ঘটনাই সমাজবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়বস্তুর অন্তর্গত। প্রতিনিয়ত সমাজবিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখার উদ্ভব ঘটছে। নিচে সমাজবিজ্ঞানের শাখাসমূহ উল্লেখ করা হলো- মানবসমাজের সবচেয়ে আদিম সংগঠন হলো পরিবার। প্রাচীনকালে পরিবারকে কেন্দ্র করেই মানবসমাজের সব কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হতো। সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা হলো পরিবারের সমাজবিজ্ঞান।
ঐতিহাসিক সমাজবিজ্ঞানে প্রাচীন সমাজ, সমাজের উদ্ভব, বিকাশ এবং বর্তমান সমাজের জীবনযাত্রা সম্পর্কে গবেষণা করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম উপাদান হচ্ছে জনসংখ্যা। জনগণই সমাজের গোড়াপত্তন করে। সমাজ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করতে হলে জনসংখ্যার কাঠামো, বণ্টন, বয়ঃকাঠামো, আদমশুমারি, জনসংখ্যা তত্ত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে জানা অপরিহার্য।
অপরাধ, অপরাধপ্রবণতা, দারিদ্র্য, কিশোর অপরাধ, অপরাধের কারণ, অপরাধের স্বরূপ প্রভৃতি নিয়ে অপরাধ সমাজবিজ্ঞান আলোচনা করে থাকে।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াদির সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, গোষ্ঠী তথা নাগরিকের সম্পর্ক নিরূপণ করে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, সমাজবিজ্ঞানের পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত।
'ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও মালিকানা সব দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং শোষণের মূল'- উক্তিটি জার্মান দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্কস-এর।
সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে আমেরিকান আইনবিদ ও সামাজিক নৃবিজ্ঞানী লুইস হেনরি মর্গান অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন।
ইরোকুয়া ইন্ডিয়ান নৃগোষ্ঠীর উৎপত্তি ও বিবর্তন সম্পর্কে গবেষণা করে হেনরি মর্গান ১৮৭৭ সালে রচনা করেন 'Ancient Society', যেখানে তিনি সমাজ বিবর্তনের তিনটি ধাপ চিহ্নিত করেন; যথা- বন্যদশা, বর্বরদশা ও সভ্যতা। এছাড়া মর্গান আদিম পরিবারব্যবস্থা, বিবাহ এবং সম্পত্তির বিকাশ নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন, যা সামাজিক নৃবিজ্ঞানের ভিত্তিমূল হিসেবে বিবেচিত হয়। বস্তুত নতুন একটি বিজ্ঞান হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের পথচলায় লুইস হেনরি মর্গানের বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!