উত্তরঃ
ভূমিকা: খলিফা উমর (রা)-এর শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করে এবং এর ফলস্বরূপ একটি সুসংগঠিত ও ন্যায়ভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তিনি রাষ্ট্রের আর্থিক সুশাসন ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি বিস্তারিত ও দূরদর্শী রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যা ইসলামী অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করে।
উদ্দীপকের সাথে সম্পর্ক: উদ্দীপকে বাংলাদেশের 'জাতীয় রাজস্ব বোর্ড' (NBR) এর কার্যক্রম, উদ্দেশ্য এবং রাজস্ব আদায়ের উৎস সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। NBR-এর প্রধান কাজ হলো রাজস্ব নির্ধারণ, আদায়, হিসাব সংরক্ষণ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ সম্পাদন করা, যার প্রধান খাতগুলো হলো আয়কর, ভ্যাট, আমদানি ও রপ্তানি কর ইত্যাদি। খলিফা উমর (রা)-এর রাজস্ব ব্যবস্থাও রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে এবং জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন কর নির্ধারণ ও আদায়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে, তাঁর ব্যবস্থার মূলনীতি ছিল কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ন্যায়পরায়ণতা ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা, যা আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থার লক্ষ্যগুলোর সাথে তুলনীয় হলেও পদ্ধতিগত পার্থক্য বিদ্যমান।
খলিফা উমর (রা)-এর রাজস্ব ব্যবস্থার পর্যালোচনা: খলিফা উমর (রা) বাইতুল মালের অর্থ ব্যবস্থার সংস্কার করেন এবং বেশ কিছু নতুন রাজস্ব খাত প্রবর্তন করেন, যেমন—
- খারাজ (ভূমি রাজস্ব): বিজিত অঞ্চলের অনাবাদি জমি এবং মুসলিমদের মালিকানাধীন সকল আবাদি জমির ওপর ধার্যকৃত ভূমি কর। তিনি জমিসমূহের উৎপাদন ক্ষমতা ও সেচ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে খারাজের হার নির্ধারণ করেন, যা ছিল খুবই বিজ্ঞানসম্মত।
- জিজিয়া (নিরাপত্তা কর): অমুসলিম নাগরিকদের জানমাল ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়ে তাদের ওপর ধার্যকৃত কর। এর ফলে অমুসলিমরা মুসলিম রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধা ভোগ করতো।
- উশর (শস্য কর): মুসলিমদের মালিকানাধীন উর্বর জমিতে উৎপাদিত শস্যের ওপর ধার্যকৃত ১/১০ অংশ কর।
- সাদকা ও যাকাত: মুসলিমদের ওপর আরোপিত অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর, যা গরিব ও অভাবীদের মধ্যে বিতরণ করা হতো।
- গণিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ): যুদ্ধ জয়ের পর প্রাপ্ত সম্পদ, যার ১/৫ অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো।
- ফাই (যুদ্ধ ছাড়া লব্ধ সম্পদ): যুদ্ধ ব্যতীত মুসলিমদের হস্তগত হওয়া ভূ-সম্পত্তি বা অন্যান্য সম্পদ, যা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছিল।
খলিফা উমর (রা) রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তিনি 'দিওয়ান' প্রবর্তন করে রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানো নয়, বরং রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় করা এবং এই অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা, যা উদ্দীপকের NBR-এর কার্যক্রমের মূল লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার সময়ে সেচ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, সামরিক ব্যয় নির্বাহ, পেনশন প্রদান ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক কাজে রাজস্বের অর্থ ব্যয় করা হতো, যা আধুনিক রাষ্ট্রের বাজেট ব্যবস্থার অনুরূপ।
উপসংহার: খলিফা উমর (রা)-এর রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল তৎকালীন প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সুসংগঠিত, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী। উদ্দীপকের NBR-এর মতো তাঁর সময়েও রাজস্ব নির্ধারণ, আদায় ও হিসাব সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল, যা একটি আধুনিক রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতিগুলো ধারণ করে। তাঁর প্রবর্তিত ব্যবস্থা পরবর্তী মুসলিম শাসকদের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ হয়ে ছিল এবং আজও এর নীতিগুলো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রাসঙ্গিক।